একুশ দিন ধরে ভারতের এক প্রান্তে অনশন করলেন এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও তার সহযোগীরা। তিনি মহাত্মা গান্ধীর পথে অহিংসার ভাবনা নিয়ে হিমালয়ের পরিবেশ এবং এলাকার মানুষের জীবন জীবিকার সুরক্ষার ভাবনা নিয়ে যে আন্দোলন করছেন, এ দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যম তা প্রায় সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করল।‌ অথচ কিছুকাল আগেও সেই মানুষটিকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমের উচ্ছ্বাসের অন্ত ছিল না। একটি অত্যন্ত সফল চলচ্চিত্রের নায়কের জীবন তাঁর জীবনের আদলে নির্মিত বলে প্রচারিত হওয়ায় দেশে বিদেশে তাঁকে নিয়ে কৌতূহলের অন্ত ছিল না। একসময় তাঁর কারণেই এ দেশের প্রান্তে অবস্থিত ওই আশ্চর্য এলাকাটি আরও ভাস্বর হয়ে উঠেছিল।‌

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সোনম ওয়াংচুক এক ব্যতিক্রমী প্রযুক্তিবিদ ও শিক্ষক, যিনি বিজ্ঞানকে প্রকৃত অর্থে হাতে কলমে নেড়েচেড়ে মানুষের কাজে লাগিয়েছেন। তাঁর বরফ-স্তুপ লাদাখের মানুষের জল সমস্যা মেটানোর এক অভিনব প্রক্রিয়া। তাঁর উদ্ভাবনী শক্তির ফলেই ভারতের এই সংবেদনশীল সীমাঞ্চলে প্রবল ঠান্ডায় থাকা সৈনিকদের জন্য সৌর তাঁবু তৈরি করা গেছে।

প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কে থাকায় আজ বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকট ও হিমালয়ের সম্ভাব্য বিপর্যয়ের দিকে খেয়াল রেখে তিনি একের পর এক উদ্ভাবনের কথা ভেবেছেন এবং সকলের সহযোগিতায় এক বিকল্প পথের সন্ধান করে চলেছেন। ম্যাগসাসে থেকে আরম্ভ করে দেশে বিদেশে বহু সম্মানে ভূষিত সোনমের উপর রাষ্ট্র এবং তার পেটোয়া চতুর্থ স্তম্ভ আজ কেন ক্ষুব্ধ?

প্রশ্ন কি এটাই, যে এদেশের এই অপেক্ষাকৃত কম জনসংখ্যার (পড়ুন ভোটার সংখ্যার) অঞ্চলের আন্দোলন কেন সামনে আসবে? বিশেষত যে আন্দোলন হিমালয়ের পরিবেশ ধ্বংসের মত বিষয়কে সরাসরি কর্পোরেট আগ্রাসনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখিয়ে দিচ্ছে।

এখান থেকেই বিষয়টি অতি গম্ভীর হয়ে উঠছে। হিমালয়ের পরিবেশ যে নানাভাবে বিপন্ন তা নিয়ে বারবার কথা উঠেছে, পর্যটনের সঙ্গে এর যে ভয়াবহ সম্পর্ক আছে, তা হরিদ্বার-ঋষিকেশ বা চারধামের মত তীর্থস্থানে স্পষ্ট বোঝা গেছে। এর পাশাপাশি যে বিরাট প্রযুক্তিগত কেরামতি চালানো হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক উন্নতির জন্য, তার দুঃসহ পরিণাম সবাই দেখছেন। যোশীমঠের মানুষের হাহাকার হিন্দু হৃদয়সম্রাটকে যে স্পর্শ করেনি, তাও সবাই জানেন।‌ নির্মাণ শ্রমিকের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া এবং হাড় হিম করা উদ্ধারকার্য তো রীতিমত রিয়েলিটি শো হিসাবে ঘরে বসে দেখা হল।

কিন্তু লাদাখ? ২০১৯ সালে যে লাদাখের মানুষ সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল এবং জম্মু-কাশ্মীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আনন্দে আঁজলা ভরে বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁরা আজ ক্রুদ্ধ কেন? লাদাখের সাংসদ বিজেপির জামিয়াঙ্গ শেরিং নামগিয়াল লাদাখের জম্মু-কাশ্মীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হওয়া এবং ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল নিয়ে খুবই উচ্ছ্বসিত ভাষণ দিয়েছিলেন সংসদে, যদিও কাশ্মীরের মানুষকে রীতিমত সেনা দিয়ে ঘরবন্দি করে কাজটি সারা হয়েছিল। তারপরেও দীর্ঘ দিন কাশ্মীর সমস্তরকম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে।

লাদাখের মানুষকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে তাঁরা বিশেষ সুযোগসুবিধা পাবেন। সংবিধানের ২৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদের অন্তর্ভুক্ত ষষ্ঠ তফসিলে ঢুকলে তাঁদের জীবন, জমি, সম্পদ, চাকরি সমস্তই সুরক্ষিত থাকবে। স্বাধীন ভারতে যোগদানের সময়ে বেশ কিছু প্রদেশ বিভিন্ন সুরক্ষা কবচের প্রতিশ্রুতিতেই ভারত রাষ্ট্রে যোগ দেয়।‌ ৩৭০ বিলোপের পর লাদাখ স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হবে – এটিই সেখানকার মানুষের সবচেয়ে বড় আনন্দের কারণ ছিল। কিন্তু এর ফলে ভারি শিল্প নির্মাণ এবং খনিজ সম্পদ উত্তোলনের বিষয়ে যে কোনো সুরক্ষা থাকবে না – সে আশঙ্কা ছিলই। কাশ্মীর নিয়ে সেইসময় মূল ভূখণ্ডের মানুষের ভাবনা ছিল, যে এবার কাশ্মীরে জমি কেনা যাবে। কেন সেখানেই জমি কিনতে হবে, সে ব্যাখ্যা কেউ দেননি।

যা-ই হোক, হইহই করে কর্পোরেট নেমে পড়েছে লাদাখে। পরিবেশবান্ধব যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে সোনম এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অফ অল্টারনেটিভস লাদাখ যেসব সুস্থায়ী প্রয়োগ করেছেন, মুনাফাবাজরা তার ধারেকাছেও যাবে না। তাদের কাছে মাটির উপরে বা নিচে যা যা পাওয়া যায় সমস্তই পণ্য।

ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত হলে যেহেতু লাদাখের জনসংখ্যার ৯৭% জনজাতি গোষ্ঠীভুক্ত, তাই খানিকটা সুরক্ষা পাওয়া যাবে। স্থানীয় মানুষের ভাবনাও তেমনই। তফসিলি জনজাতির জাতীয় কমিশন থেকেও সেই সুপারিশ করা হয়েছে। জনজাতি গোষ্ঠীর অর্থাৎ ভূমিপুত্র ভূমিকন্যাদের নিজেদের জল, জঙ্গল, জমির অধিকার যাতে তাঁদের নিয়ন্ত্রণেই থাকে, সেই সুরক্ষাই দেয় এই তফসিল। কয়েক হাজার কোটি টাকার নির্বাচনী বন্ডের কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হওয়ার পর একথা সহজেই অনুমেয় যে শাসক দল তার বন্ধু কর্পোরেটদের সুলভে জমি দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, লাদাখ ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় গেলে সে প্রতিশ্রুতি পূরণ করা যাবে না। তা কী করে হতে দেয় কেন্দ্রের বিজেপি সরকার?

সোনাম বলেছেন, বড় শহরের জীবনযাত্রার ধরন লাদাখে আছড়ে পড়ে একরকম চাপ তৈরি করছে, ফলে যে দূষণ হচ্ছে তা ভয়াবহ। ইতিমধ্যেই পর্যটকের চাপে জলের অপ্রতুলতা দেখা দিয়েছে। ভারি শিল্প তৈরি হলে তো সর্বনাশ। ‌যদিও সরকারের বিনিয়োগ সংক্রান্ত পোর্টালে গেলে দেখা যাবে সৌরশক্তি প্রকল্পে বিনিয়োগ আহ্বান করা হয়েছে। সোনম বলছেন, সৌরশক্তির নামে যেভাবে ২০,০০০ একর সংবেদনশীল এলাকা নিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এখানে নতুন নতুন ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পের সঙ্গে আসবে ৩০,০০০-৪০,০০০ কর্মী, ফলে পরিবেশের উপর আরও চাপ‌ সৃষ্টি হবে। এমনিতেই লাদাখের হিমবাহগুলি যেভাবে গলছে তা চিন্তার। সেখানে জলের পরিমিত করতে হয়। মানুষ দিনে গড়ে পাঁচ লিটার জল ব্যবহার করে। অথচ সমতলের একজন মানুষ শুধু শৌচাগারেই ৮-৯ লিটার জল খরচ করে। সমতলে মানুষের জলের ব্যবহার গড়ে ১৫০-২০০ লিটার। তিন লাখ বাসিন্দার লাদাখে এখন পর্যটক আসছে বছরে (২০২২ সালের হিসাব) সাড়ে চার লাখ। বিপদ বেড়েই চলেছে। সর্বোপরি এই গোটা কর্মকাণ্ডে স্থানীয় মানুষের মতামতের কোনো ভূমিকা নেই, যেহেতু কোনো স্তরে তাঁদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। দিল্লি এবং পুদুচেরি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হলেও সেখানে বিধানসভা আছে। লাদাখে নেই।

অনশনের কিছুদিন আগে যে বিরাট আন্দোলন হয়, সেখানেও এই অঞ্চলের জনসংখ্যার ১০% যোগদান করে। একটা সময় সোনমকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। আন্দোলনের দাবিগুলি খুব স্পষ্ট। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হওয়ার আগে জম্মু-কাশ্মীরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকাকালীন লাদাখের মানুষের কথা বলার জন্য অন্তত চারজন বিধায়ক ছিলেন, একটি নির্বাচিত সরকার ছিল। অথচ এখন কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকার নেই, দূর থেকে আসা কেন্দ্রের প্রতিনিধির পক্ষে এলাকার সমস্যা বুঝে কাজ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই এটি একটি পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হোক, সেখানে নির্বাচিত বিধায়কদের নিয়ে বিধানসভা হোক – এই লাদাখের মানুষের দাবি। অত্যন্ত স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক দাবি। তাঁরা চাইছেন দুজন সাংসদ এবং এলাকার মানুষের জীবিকার সুরক্ষার জন্য একটি পাবলিক সার্ভিস কমিশন। অবশ্যই এর পাশাপাশি জনসংখ্যার ৯৭% জনজাতি হওয়ায় এঁরা ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত হতে চাইছেন।

ষষ্ঠ তফসিলের প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের একদা বক্তব্য ছিল, ওটি শুধুমাত্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির জন্য প্রযোজ্য। লাদাখের ক্ষেত্রে নাকি ষষ্ঠ তফসিল প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। তাহলে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ভিত্তি কী ছিল? মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতে ওস্তাদ জুমলাবাজ সরকারের কাছে অবশ্য এর কোনো উত্তর নেই। যাদের প্রচারযন্ত্র দাবি করে প্রধানমন্ত্রী খানিকক্ষণের জন্য রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছিলেন, অথচ বিধ্বস্ত মণিপুরে যাওয়ার তাঁর সময় হয় না – তাদের কাছে কী আশা করা যায়?

মূলধারার সংবাদমাধ্যমের প্রবল অনীহা সত্ত্বেও সোনম এবং তাঁর সহযোগীদের আন্দোলনের খবর আগুনের মত ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দেশে। কোনো রাজনৈতিক দলের উদ্যোগ ছাড়াই সাধারণ মানুষ, ছোট ছোট সংগঠন নিজেদের ক্ষমতা অনুযায়ী আন্দোলনের সমর্থনে অনশন করেছে, মানববন্ধন করেছে, বিষয়টি আলোচনার পুরোভাগে এসে পড়েছে। লাদাখ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা প্রবল চাপের মধ্যেও অনশন প্রাঙ্গণে এসে তাদের সমর্থন জানিয়েছে। সোনম বলছেন, এদের ভবিষ্যৎকে বাঁচাতেই এই লড়াই। অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তিনি নির্বাচনী বন্ড এবং কর্পোরেট তোষণের প্রসঙ্গ এনেছেন, আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে এই বন্ডের মাধ্যমে লাদাখের জল-জঙ্গল-জমির সওদা হয়ে গেছে। সোনম ও তাঁর সহযোগীরা এবার গান্ধীর ডান্ডি মার্চের মতই একটি পদযাত্রা সত্যাগ্রহ করতে চলেছেন।‌ এ আন্দোলন সহজে থামবে না।

থ্রি ইডিয়টস ছবিটি অতি জনপ্রিয় হলেও সেখানে মেধার জয়গান এত বেশি করা হয়েছিল যে মনে হয়েছিল মেধাই সব। মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত পরিবারের ‘মেধাবী’ ছেলেমেয়েদের যেভাবে কলে ছাঁটা হয় তার প্রকৃত চেহারা তুলে ধরা হলেও মেধা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার যোগাযোগ সেখানে কোনোভাবেই তৈরি হয়নি। বাস্তবের ইডিয়ট সেই দায়বদ্ধতা স্বীকার করে রুখে দাঁড়াতেই তাঁর প্রতি রাষ্ট্রের এবং মূলস্রোতের ভাবভঙ্গি একদম বদলে গেছে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.