আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি আগে সমুদ্রের মাঝখানে হিমশৈলের ধাক্কায় সলিল সমাধি হয়েছিল অতিকায় টাইটানিক জাহাজের। দু টুকরো হয়ে গিয়েছিল মানুষের নির্মাণের অহঙ্কার। টুকরো দুটি আজও একে অপরের থেকে ২,০০০ ফুট দূরে সমুদ্রের তলায় পড়ে আছে। এটি ডুবে গিয়েছিল কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের তীর থেকে ৬৯০ কিলোমিটার দূরে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২,৫০০ ফুট গভীরে। যাঁরা গত শতাব্দীতে জন্মেছেন, এমনকি একাধিক অস্কার পুরস্কারপ্রাপ্ত জনপ্রিয় টাইটানিক ছবিটা যাঁরা দেখেননি, তাঁরাও জানেন এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কথা। এর ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া যা আটের দশকে। আর সেই ধ্বংসাবশেষ দেখার রুদ্ধশ্বাস আয়োজন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন শহরভিত্তিক সাবমেরিন কোম্পানি ওশানগেট ইনকর্পোরেটেড (ওশানগেট এক্সপিডিশনস)। অকুস্থলে পৌঁছবার বাহন হিসাবে তৈরি হয় – টাইটান।
সারা পৃথিবীর ধনকুবেররা, যাঁরা রোমাঞ্চকর যাত্রা পছন্দ করেন, এমন কিছু মানুষ সওয়ার হয়েছেন টাইটানে। বছর বছর এই দুঃসাহসিক আয়োজন করে ওশনগেট এক্সপিডিশনস। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এবছর টাইটান আর টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ দেখে ফেরত আসেনি। গত বৃহস্পতিবার, ২২ জুন, টাইটানের সলিল সমাধি হয় টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রায় ১,৬০০ ফুট দূরে। দুবছর আগে থেকে ওশানগেট এক্সপিডিশনস এক সম্পূর্ণ টাইটানিক দেখার প্যাকেজ পরিচালনা করে আসছে। রোমাঞ্চপ্ৰিয় বিলাসী মানুষদের জন্য এ এক দুর্নিবার হাতছানি। এতদিন তাঁরা স্পেসএক্স বা ব্লু অরিজিন মারফত পাড়ি জমাতেন মহাকাশে। ওশানগেট তাঁদের দেখাচ্ছে অতলান্ত সমুদ্রের রহস্যময় জগৎ।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সাবমেরিন কোম্পানি ওশানগেটের সিইও ছিলেন স্টকটন রাশ। পৃথিবীর জনসংখ্যা উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে, অদূর ভবিষ্যতে মানুষ চাঁদে বা মঙ্গলগ্রহে বাসা বাঁধার ফন্দি আঁটছে। রাশ মনে করতেন, যেখানে পৃথিবীর তিন ভাগ জল, সেখানে মানুষ কেন সমুদ্রের তলায় থাকবে না? থাকলে কী করে থাকবে? তাঁর মতে সাবমেরিনই তার পক্ষে সবচেয়ে নিরাপদ। সেই দুঃসাহসিক রাশও মারা গেছেন শেষ টাইটানিক অভিযানে, তাঁর নিজের উদ্যোগে তাঁরই তৈরি ডুবোজাহাজে।
এবার আমরা জানার চেষ্টা করব, কী করে ধ্বংস হলো আজকের টাইটান। জিনিসটি আসলে একটি সাবমার্সিবল যান। এটি প্রথাগত সাবমেরিনের মত স্বাবলম্বী ও শক্তিশালী নয়, বরং জলের নিচে কোনো বিপদ আপদ হলে সাহায্য চাইতে হয় সমুদ্রপৃষ্ঠে থাকা অন্য জলযানের কাছে। ওশানগেট ইনকর্পোরেটেড সাধারণত তিনরকম সাবমার্সিবল যান বানায় – অ্যান্টিপোডস, সাইক্লপ্স – ১ (যাতে সর্বাধিক পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ৭২ ঘন্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকার অক্সিজেন মজুত থাকে) আর তার থেকে কিছুটা উন্নত সাইক্লপ্স-২, যার পোশাকি নাম টাইটান। এতে সর্বাধিক পাঁচজন লোক কোনোরকমে জবুথবু হয়ে থাকতে পারে – একজন পাইলট, একজন ডুবোজাহাজ বিশেষজ্ঞ আর তিনজন আরোহী। এই পাঁচজনের ৯৬ ঘন্টা বাঁচার মত অক্সিজেন থাকে ভিতরে। কার্বন ফাইবার ও টাইটেনিয়ামের তৈরি কাঠামোবিশিষ্ট এই ডুবোজাহাজ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চার কিলোমিটার নিচ পর্যন্ত নামতে পারে। এর দরজা বাইরে থেকে শক্ত করে আটকানো থাকে। বিপদে পড়লে যাত্রীরা ভিতর থেকে খুলতে পারবে না। এর মধ্যে আলাদা করে কোনো নেভিগেশন সিস্টেমও নেই। জলের নীচে জিপিএস, ওয়াইফাই – এসব কাজ করে না। পুরো সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করা হয় একটি গেমিং কন্ট্রোলার (লজিটেকের F710 কন্ট্রোলার) দিয়ে। টাইটানের আর একটি বড় সমস্যা ছিল। এতে কোনো আপতকালীন লোকেটর বিকন ছিল না। ফলে বিপদে পড়লে এটি কোনোভাবে নিজের অবস্থান জানাতে পারত না। মাত্র ২২ ফুট দীর্ঘ টাইটানের ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকার উপায় নেই। কোনোমতে জনাপাঁচেক আরোহী এর ভিতরে বসে থাকতে পারে। কার্বন ডাই অক্সাইড পরিশোধন করে বাতাস পুনঃসঞ্চালনের কোনো সুযোগও টাইটানে নেই। ইন্টারনেট সংযোগের জন্যে স্পেসএক্সের স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইট ব্যবহার করা হয় এতে। টাইটান প্রধানত তৈরি দুঃসাহসিক সামুদ্রিক অভিযানের রোমাঞ্চ অনুভব করার জন্য, গবেষণার স্বার্থে নয়। সাধারণত গভীর সমুদ্রের নিকষ কালো আঁধারের রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য যে অত্যাধুনিক ডুবোজাহাজ দরকার, টাইটান একেবারেই সে জিনিস নয়। যাত্রী সুরক্ষার সব বন্দোবস্ত এতে আছে – এ দাবি কখনোই করেননি নির্মাতারা। এসব জেনে বুঝেই এতে চড়েন অতিধনী যাত্রীরা – টাইটানিক জাহাজের ধ্বংসাবশেষ দেখবেন বলে। তাহলে হঠাৎ বিশ্বজুড়ে কেন টাইটান ডুবে যাওয়া নিয়ে এত কথা হচ্ছে?
গত ১৬ জুন, শুক্রবার, এমভি পোলার প্রিন্স নামক একটি জাহাজ নিউফাউন্ডল্যান্ড থেকে যাত্রা শুরু করে ১৭ জুন, শনিবার, টাইটানিক ডুবে যাওয়ার ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায়। ১৮ জুন, রবিবার, আটলান্টিক সময় সকাল নটায় টাইটান সমুদ্রে ডুব দেয়। প্রথম পৌনে দু ঘন্টা সব মোটামুটি ঠিকঠাকই ছিল। ওই সময়কালে ১৫ মিনিট অন্তর যোগাযোগ স্থাপন করা গেছে টাইটানের সঙ্গে। তারপর থেকেই বেপাত্তা। শেষবার ১১টা বেজে ৪৭ মিনিটে যোগাযোগ করা গিয়েছিল। ওইদিনই সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিট নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠে উঠে আসার কথা ছিল টাইটানের। কিন্তু সেই যে নিখোঁজ হল, আর তার দেখা নেই। এদিকে ২২ জুন সঞ্চিত অক্সিজেন শেষ হয়ে যাওয়ার কথা।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে টাইটানে চেপে প্রায় দু ঘন্টা সময় লাগে টাইটানিক জাহাজের ধ্বংসাবশেষের কাছে পৌঁছাত। যাত্রা শুরুর পর পৌনে দু ঘন্টা পর্যন্ত যোগাযোগ রক্ষা করা গিয়েছিল। অর্থাৎ হিসাব বলছে শেষ ১৫ মিনিটেই ঘটে অন্তর্মুখী বিস্ফোরণ।
এক নিমেষেই ইতিহাস হয়ে গেলেন দাউদ-হারকিউলিস কর্পোরেশনের ব্রিটিশ-পাকিস্তানি ব্যবসায়ী ৪৮ বছর বয়সী শাহজাদা দাউদ ও তাঁর ১৯ বছরের ছেলে সুলেমান দাউদ; ব্রিটিশ ধনকুবের, বিমানচালক ও মহাকাশ পরিব্রাজক হ্যামিশ হার্ডিং; ফরাসি নেভি কমান্ডার ও ড্রাইভার পল-অঁরি নার্জোলে এবং ওশানগেটের প্রতিষ্ঠাতা তথা সিইও ৬১ বছর বয়সী রাশ। তিনিই চালক ছিলেন। এঁদের মধ্যে হার্ডিংয়ের ঝুলিতে আছে সবচেয়ে কম বয়সে মেরু বরাবর উড়ে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করার কৃতিত্ব। সাতাত্তর বছর বয়সী নার্জোলে ৩৫ বার নেমেছেন টাইটানিকে ধ্বংসাবশেষ দেখতে।
নিয়তি বড়ই অদ্ভুত। এবারই প্রথম নয়, এর আগেও একবার পাঁচ ঘন্টার জন্যে টাইটানের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। সংস্থার একজন কর্মী অভিযোগও করেছিলেন বিশেষত অ্যাক্রিলিকের ভিউপোর্ট, যা দিয়ে টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়, তার গুণগত মান নিয়ে। এটি ১,৩০০ মিটারের নিচে ঠিকঠাক কাজ করে না।
আশাবাদী মানুষজন প্রথমে ভাবছিলেন টাইটানের যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়ত নষ্ট হয়ে গেছে, কিন্তু সমুদ্রের তলায় চলাচল করার ক্ষমতা অটুট আছে। আসলে এমন হতে পারে যে ব্যালাস্ট সিস্টেম ধ্বংস হয়ে গেছে কিংবা বাইরের জলের প্রচণ্ড চাপে সম্পূর্ণ দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছে টাইটান, সঙ্গে সঙ্গেই যাত্রীদের মৃত্যুর হয়েছে। শেষপর্যন্ত মার্কিন কোস্ট গার্ড ২২ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে, যে ‘ক্যাটাসট্রফিক ইমপালসন’ টাইটানের ধ্বংসের কারণ। অর্থাৎ অন্তর্মুখী চাপে চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়েছে টাইটান। এর একটি টুকরো – টেল কোন – পাওয়া গেছে টাইটানিকের ধ্বংসবশেষ থেকে প্রায় ১,৬০০ ফুট দূরে। এই ডুবোযানের আরও পাঁচটি অংশ খুঁজে পাওয়া গিয়েছে দূরনিয়ন্ত্রিত যানের সাহায্যে। এরপর এর কাছাকাছি মেলে প্রেশার হাল (যার কাজই হলো সাবমার্সিবলের ভিতরের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা)।
সমুদ্রের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে প্রতি দশ মিটারে পরিস্থিতির অসম্ভব পরিবর্তন হয়। দশ মিটার নামার অর্থ প্রতি বর্গইঞ্চিতে বস্তুর ভার ৬.৪৭ কেজি বেড়ে যাওয়া। সেই হিসাবে দু কিলোমিটার অন্তর একজন ডুবুরি প্রতি বর্গইঞ্চিতে ১,২৭০ কেজি বস্তুর বাড়তি ভার অনুভব করবেন, যা সহ্য করা আদতে অসম্ভব। টাইটানিকের ধ্বংসবশেষের জায়গায় জলের চাপ থাকে একটি বড় হাঙরের কামড়ের দেড় গুণ। টাইটানের বাইরের আস্তরণ এই বিশাল চাপ প্রতিরোধ করে, যাত্রীদের মাথায় পড়তে দেয় না। যদি সব ঠিকঠাক কাজ করত, তাহলে টাইটান নিশ্চিতভাবে উপরে উঠে আসতে পারত। আরেকটা বিপদও অবশ্য থাকে। বাইরে থেকে কেউ দরজা খুলে না দিলে অক্সিজেনের অভাবে আরোহীদের মৃত্যু নিশ্চিত।
টাইটানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কয়েক ঘন্টা পর থেকেই মার্কিন কোস্ট গার্ড, নেভি এবং কানাডিয়ান কোস্ট গার্ড মিলে ২০,০০০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল তন্নতন্ন করে খোঁজা শুরু করে। এ কাজ খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার নামান্তর। তাঁদের এই ‘রেসকিউ মিশন’ নিয়তির পরিহাসে ক্রমশ ‘রিকভারি মিশন’ হয়ে দাঁড়ায়। অবশেষে ২২ জুন মার্কিন কোস্ট গার্ডের রোবট ডুবুরি টাইটানিকের অবশেষ খুঁজে পায়।
আরো পড়ুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: আশা, আকাঙ্ক্ষা ও আশঙ্কা
অনেকে ভাবছেন এই টাইটান নামেই যত বিপত্তি। গ্রীক পুরাণ অনুযায়ী, অলিম্পিয়ান দেবতাদের ক্ষমতা দখলের আগে ক্ষমতাশালী ছিলেন টাইটান দেবদেবীরাই। কথায় বলে, শখের দাম লাখ টাকা, এক্ষেত্রে তো কোটির ঘরে। একবার এই রোমহর্ষক অভিযানে যেতে মাথাপিছু খরচ প্রায় আড়াই লাখ মার্কিন ডলার। আমাদের দেশের হিসেবে দু কোটি টাকার বেশি। এত টাকা খরচ করে এই অভিযানে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলবেন। কিন্তু কষ্ট করে এভারেস্ট জয় করা, সাঁতরে ইংলিশ চ্যানেল পেরনো, বিপুল অর্থ ব্যয় করে মহাকাশ ঘুরে আসার মানসিকতার মত লোকজন যদি হারিয়ে যায়, তাহলে মহাবিশ্বের বিস্ময় বা গভীর নীল সমুদ্রের অতলে কী আছে জানতে পারা যাবে না কোনোদিন। আমাদের গ্রহের শতকরা ৭০ ভাগই তো জল।
§ মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








