২৬ জানুয়ারির তাৎপর্য বিশ্বায়নের আনন্দচরকিপাকে আমরা ভুলতে বসেছিলাম অনেক দিনই। গোটা পৃথিবীটাই বাজারের দুনিয়াদারি, দেশে দেশে সীমারেখা মুছে যায়-যায়, এমন ক্রান্তিলগ্নে, খুব স্বাভাবিক, আমাদের নাগরিকত্বটাও বাজারের খরিদযোগ্য ব্র্যান্ডে আর আমাজনের পঞ্চাশ শতাংশ ছাড়ে এসে ঠেকেছিল, সত্যি। তার পর, হঠাৎ, এই বছরটা এল।
রিপাবলিক বললেই দু’-তিনটে চরিত্রকে মনে পড়ে। প্রথমে মনে হয় আর কে লক্ষ্মণ: কমন ম্যান। সেই ছাপোষা, দোহারা, টেকো, পরিপাটি চেহারার, ব্যাগ কাঁধের দুলকিচাল লোকটি, থুড়ি, নাগরিকটি। একই সঙ্গে মনে পড়ে: সত্যজিতের অনেকগুলো ছোটগল্প দখল করে থাকা অগুনতি কেরানি-গোছের চরিত্র। মনে আছে, ‘টেরোড্যাকটিলের ডিম’? গঙ্গার ঘাটে চমৎকার সূর্যাস্ত হয়, কেরানিবাবু আজ মাইনে পেয়েছেন। হঠাৎ কোত্থেকে একটা লোক পাশে এসে জুড়ে বসল, কী একটা চশমা দিল, তাতে না কি বাঙালি কেরানির চোখে ভেসে উঠবে সুদূর– আলাস্কা, উত্তর মেরু, আমাজন, অরোরা বোরিয়ালিস। গল্পের শেষে লোকটি হেরে যায়, তার আর মানসভ্রমণ করা হয়ে ওঠে না সেই সব প্রকাণ্ড পর্যটনভূমিতে, মাইনের সদ্য-পাওয়া বাহান্ন টাকা পঞ্চাশ নয়া পয়সাও ফাঁকতালে খোয়া যায়। সে যাক, কেরানিবাবু তথাপি এই ঠকে-যাওয়ার গল্পটাই বলবেন আজ রাতে ছেলের কাছে, যার অনুযোগ: বাবার বলা শেষ ক-দিনের গল্প যেন-বা ততটা জমছে না। কিংবা বঙ্কুবিহারী দত্ত, একটা হেরো লোক যে বাঁশবাগানে এলিয়েন দেখে। কিংবা রতনবাবু, যার সারা বছরের এক মাত্র উদ্ভট খেয়াল: তিনি পুজোর ছুটিতে দিনপনেরো কোনও গঞ্জ শহরে কাটিয়ে আসবেন, একা-একা ও নিরিবিলি।
রিপাবলিক বললে আমার এই লোকগুলোকেই মনে হয়– আর মনে হয় সিআইডি-র জনি ওয়াকার-কে। একটা নিতান্ত মাউথঅর্গান বাজাতে বাজাতে পাখির মত সহজে উড়ছেন, চনমনে আর খুশিয়াল সুরের টানে কেঁপে উঠছে আদিগন্ত বম্বে: রিপাবলিকের একনিষ্ঠ নাগরিকটি পরম অধিকারে ও আদরে গেয়ে উঠছেন, তামাম বম্বে আমার জান। জনি ওয়াকার তো আর নায়ক নন, তবু সদ্য-স্বরাজের দেশে রিপাবলিকের পোস্টার বয় তিনিই– একদম লক্ষ্মণের কার্টুনের অনুবাদ। গোরাদের আমলের ছাপ কিছু রয়ে গেছে, গোটা সাদাকালো শহর জুড়ে উত্তর-উপনিবেশ সময়ের মায়া, আলগোছ আলস্যের হাওয়া, মেরিন ড্রাইভে প্রেম করছে আর ছুটি কাটাচ্ছে লোকজন, দূর থেকে কেবল একটি-দুটি ঢেউ আছড়ে পড়ে হাজিরা দিচ্ছে নিস্তরঙ্গ শহরের গায়ে। গান এখানেই শেষ হয়। ভেবে নেওয়া যায়, সত্যজিতের কেরানিবাবুর মতই জনিও ঘরে ফিরবেন সন্ধেবেলা।
এই বছরটা হঠাৎ রিপাবলিক খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। রিপাবলিকের আশ্চর্য উলটপুরাণ, যেখানে গণতান্ত্রিক বৈধতার জোব্বা পরে স্বতঃসিদ্ধ সরকার তার সব নাগরিককে সন্দেহভাজন অপরাধী ঠাউরে নেয়, যেখানে প্রমাণ ছাড়াই গুলি করে নির্দোষ অভিযুক্তকে মেরে ফেলা হয়, নাগরিকের স্বেচ্ছাপ্রসূত ভোটকে চালনা করা যায় কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা আর কৃত্রিম মগজ দিয়ে, নির্বাচন হয় প্রতিনিধিত্বের বদলে কর্তৃত্বের জবানে, তখন রিপাবলিকের আদর্শ লঙ্ঘিত তো হয়ই, উপরন্তু, সরকার হয়ে ওঠে স্বৈরশাসক, সর্বেশ্বর, ইতিহাসের অতীত ও এক মাত্র সত্য। এই প্রচণ্ড ডিসটোপিয়া এক দিকে, আর উল্টো দিকে সাধারণতন্ত্রের সেই একক জনি ওয়াকার– ছাপোষা চেহারার একটা লোক মাউথ অর্গান-সহ বলছে, ইয়ে বম্বে মেরি জান, অথবা বলছে– ‘আমি আমার দেশকে ফিরে কেড়ে নেব/ বুকের মধ্যে নেব কুয়াশায় ভেজা কাশ বিকেল ও ভাসান/ সমস্ত শরীর ঘিরে জোনাকি না পাহাড়ে পাহাড়ে ঝুম/ অগণিত হৃদয় শস্য রূপকথা ফুল নারী নদী’…
এই আর কী!

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply