ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ে কমিউনিস্টদের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক নতুন নয়। বর্তমানে হিন্দুত্ববাদীদের রমরমার সময়ে এই বিতর্ক আরও দানা বেঁধেছে। পরাধীন ভারতে রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে ব্রিটিশদের ঘনিষ্ঠতার চর্চা ইদানীং গতিলাভ করেছে। তার বিপরীতে আবার স্বাধীনতা আন্দোলনে কমিউনিস্টদের কার্যকলাপ নিয়েও একটা মহল প্রশ্ন তুলে চলেছে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) আগস্ট বিপ্লবের বিরোধিতার প্রসঙ্গ তুলে তারা কমিউনিস্টদের দেশদ্রোহী প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু সিপিআই ছাড়া ভারতের অন্যান্য কমিউনিস্ট দলগুলির ভূমিকার কথা ইচ্ছে করেই তারা আলোচনা করে না।

সিপিআই, মানবেন্দ্রনাথ রায়ের র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি আগস্ট বিপ্লবের বিরোধিতা করলেও, ভারতবর্ষে সেসময় একাধিক কমিউনিস্ট দল ছিল। রেভোলিউশনারি সোস্যালিস্ট পার্টি (আরএসপি), রেভোলিউশনারি কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (আরসিপিআই), বলশেভিক লেনিনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (বিএলপিআই) প্রভৃতি মার্কসবাদী দলগুলি আগস্ট বিপ্লবে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। কোথাও কোথাও বিপ্লবে নেতৃত্বও দিয়েছিল। অনেকে শহিদও হয়েছিলেন। এই নিবন্ধে আগস্ট বিপ্লবে সেই দলগুলির ভূমিকা নিয়েই আলোচনা করা হবে। জাতীয়তাবাদী না মার্কসীয় আন্তর্জাতিকতাবাদ — কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে তারা এই বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেছিল তাও সংক্ষেপে আমরা এখানে আলোচনা করে নেব।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চরিত্র নিয়ে কমিউনিস্ট শিবিরে মতপার্থক্য ছিল। আগস্ট বিপ্লবে বিভিন্ন মার্কসবাদী দলের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের কারণ সেই মতপার্থক্য। তৃতীয় আন্তর্জাতিক কমিন্টার্নকে অনুসরণ করে সিপিআই প্রথমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বলেছিল। সিপিআই যুদ্ধ সঙ্কটকে বৈপ্লবিক পদ্ধতিতে কাজে লাগাতে বলে। কিন্তু ১৯৪১ সালে জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে, কমিন্টার্নের সঙ্গে সঙ্গে সিপিআই-এর অবস্থানও বদলে যায়। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ হয়ে যায় জনযুদ্ধ। আগস্ট বিপ্লবের বিরোধিতা তাদের সেই অবস্থানেরই অঙ্গ। অপরদিকে আরএসপি, আরসিপিআই, বিএলপিআই বিশ্বযুদ্ধকে প্রথম থেকেই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বলে। তাদের সেই অবস্থান কখনোই বদলায়নি। লেনিনবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে তারা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে পরিণত করার ডাক দিয়েছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের উপর চূড়ান্ত আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আগস্ট বিপ্লবে অংশগ্রহণ ছিল তাদের সেই অবস্থানের অঙ্গ।

আরএসপি ১৯৪০ সালে যুদ্ধ থিসিসে দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে পরিণত করার ডাক দেয়। জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করার পর ১৯৪১ সালের থিসিসে সেই অবস্থানে অবিচল থেকেই বলা হয় যে, ভারতের মতো দেশগুলিতে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন স্থগিত করার কোনো প্রশ্ন নেই। দলের ব্যাখ্যা ছিল, কোনো পুঁজিবাদী দেশই সোভিয়েত ইউনিয়নের মিত্র হতে পারে না। সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র কখনই ফ্যাসিবাদবিরোধী হয় না। একমাত্র স্বাধীন ও সোভিয়েত ভারতই সোভিয়েত ইউনিয়নকে রক্ষা করতে পারে। স্বাধীনতা আন্দোলন তীব্র করতে আরএসপি নেতৃত্ব কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টি (সিএসপি), ফরওয়ার্ড ব্লক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ সুদৃঢ় করেন। কারারুদ্ধ আরএসপি ও সিএসপি নেতৃত্ব ১৯৪১ সালে দেউলী কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে তিন দিন আলোচনা করে গৃহযুদ্ধ সংক্রান্ত কর্মসূচি চূড়ান্ত করেন। উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে যোগেশ চ্যাটার্জী বিপ্লবীদের সংগঠিত করতে থাকেন। চট্টগ্রামের কক্সবাজারের পথে আইএনএ-র সঙ্গে গোপনে লোকমান খান শেরওয়ানী যোগাযোগ করেন। আরএসপি কর্মীরা তাঁকে এই কাজে সাহায্য করেছিলেন।

কারারুদ্ধ কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ১৯৪২ সালের আগস্টে জাতীয় সংগ্রামের ওপর থিসিস রচনা করেন। সেখানে বলা হয়, সংগ্রামকে বৈপ্লবিকভাবে প্রসারিত, বিকশিত ও তীব্র করে জাতির ক্ষমতা দখল ও শ্রমজীবী জনতার শাসন প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত লক্ষ্যেই দল আগস্ট বিপ্লবে যোগ দিয়েছে। আরএসপি আগস্ট বিপ্লবে শুধু অংশগ্রহণই করেনি, অনেক স্থানে নেতৃত্বের ভূমিকাও পালন করেছিল। ব্রিটিশ পুলিশের আশঙ্কা ছিল, আরএসপি মানুষের সংগ্রামী মেজাজকে বিপ্লবী অভ্যুত্থানে পরিণত করতে পারে। নেতৃত্ব কারারুদ্ধ হলেও দলের কর্মীরা আগস্ট বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

বাংলা, বিহার, উত্তরপ্রদেশে আরএসপি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘটে আরএসপি-র ছাত্র সংগঠন নেতৃত্ব দেয়। তিনজন শহিদ হন। আরএসপি বিভিন্ন স্থানে টেলিফোন, টেলিগ্রাফের তার কেটে দেয়। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ট্রেন চলাচল বিপর্যস্ত হয়। কলকারখানার শ্রমিকরা আরএসপি-র নেতৃত্বে ধর্মঘটে সামিল হন। বিক্রমপুরে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা হয়। সেখানেও আরএসপি-র একজন আন্দোলনকারী শহিদ হন। ময়মনসিংহ ও ঢাকায় আরএসপি কর্মীরা সামরিক কর্মীদের সাহায্যে অস্ত্রও যোগাড় করেছিলেন। আন্দোলনে দিনাজপুরের বালুরঘাটে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে আরএসপি-ও বালুরঘাটে জাতীয় সরকার গঠনে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছিল। কলকাতাতে ছাত্র নেতৃত্ব আগস্ট আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। উত্তর কলকাতায় আরএসপি ছাত্র সংগঠনের নেত্রীরা ছিলেন আন্দোলনের সামনের সারিতে। দক্ষিণ কলকাতায় আরএসপি প্রভাবিত কালচারাল ক্লাব আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়।

যুক্ত প্রদেশের (উত্তরপ্রদেশ) বালিয়া, বস্তি, আজমগড় প্রভৃতি জায়গায় আরএসপি-র নেতৃত্বে একের পর এক থানা দখল করা হয়। মাইলের পর মাইল রেল লাইন উপড়ে ফেলে, টেলিগ্রাফের তার কেটে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ব্রিটিশ প্রভাব মুক্ত করে আরএসপি কর্মীরা বিভিন্ন স্থানকে মুক্তাঞ্চলে পরিণত করেন। বেশ কয়েক মাস বিপ্লবীদের নেতৃত্বে স্বাধীন সরকার পরিচালিত হয়। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে বালিয়ার আরএসপি নেতা রাজনারায়ণ মিশ্রের লখনৌ সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসি হয়। বিহারের জামশেদপুরে শ্রমিক ধর্মঘটে দল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল। ব্রিটিশ পুলিশ রিপোর্ট সেদিন বলেছিল যে, আরএসপি আন্দোলনকে সহিংস পথে নিয়ে গেছে।

সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বাধীন আরসিপিআই বিশ্বযুদ্ধের সময়ে সংগ্রাম তীব্র করতে ত্রিস্তরীয় নেতৃত্ব গড়ে তুলেছিল। প্রথম সারির নেতারা ধরা পড়লেও যাতে দলের কাজ চালানো যায়, তার জন্যই এই ত্রিস্তরীয় নেতৃত্ব গড়ে তোলা হয়। জঙ্গি শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের জন্য আরসিপিআই প্রথম থেকেই ব্রিটিশদের কুনজরে ছিল। জাতীয় কংগ্রেস ও সিএসপি-র তীব্র বিরোধী হলেও আগস্ট বিপ্লবে অংশগ্রহণে তাদের দ্বিধা ছিল না। আরসিপিআই আগস্ট বিপ্লবকে বিপ্লবী অভ্যুত্থানে উন্নীত করতে চেয়েছিল। কৃষকদের পাশাপাশি কারখানার শ্রমিকদের তারা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানায়। আন্দোলনের সময়ে বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক ধর্মঘট ও কৃষক আন্দোলনে দল নেতৃত্ব দিয়েছিল। তাদের ছাত্র সংগঠনও আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। আসামে আরসিপিআই-র ছাত্র সংগঠন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেয়। দলের বেশিরভাগ নেতাই যুদ্ধ চলার সময়ে গ্রেপ্তার হন এবং বিশ্বযুদ্ধ চলা পর্যন্ত কারারুদ্ধ ছিলেন।

বিএলপিআই ১৯৪২ সালে দলের মুখপত্রের প্রথম সংখ্যাতেই বলেছিল যে, স্বাধীন শ্রমিকরাই সোভিয়েত ইউনিয়নকে রক্ষা করতে পারে। তাদের মত ছিল, পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে সংগ্রামের পথেই সোভিয়েত ইউনিয়নকে রক্ষা করা যাবে। তারা বিশ্বযুদ্ধের সুযোগে সংগ্রাম তীব্র করতে কৃষক অভ্যুত্থানের কথা বলেছিল। দল কৃষকদের কাছে কেবল ব্রিটিশদের কর বয়কটই নয়, জমিদারদের খাজনা না দেওয়ারও আহ্বান জানায়। শ্রমিকদের ধর্মঘটের জন্য স্ট্রাইক কমিটি গড়ে তোলার ডাক দেয়। সাংগঠনিক ক্ষমতা সীমিত হলেও আগস্ট বিপ্লবে তাদের অবদান অস্বীকার করা যায় না। বাংলা, বিশেষত কলকাতা, এবং মাদ্রাজে বহু নেতা কারারুদ্ধ হন।

আগস্ট বিপ্লবের সময়ে বিভিন্ন বিপ্লবী গোষ্ঠী স্বাধীন সরকার গঠন করেছিল। মহারাষ্ট্রের সাতারায় বিপ্লবীরা প্রায় তিন বছর ব্রিটিশদের সমান্তরাল-স্বাধীন সরকার চালিয়েছিলেন। সাতারার আন্দোলনের নেতা নানা পাতিল স্বাধীনতার পর সিপিআইতে যোগ দিয়েছিলেন। সিপিআই আন্দোলনের বিরোধিতা করলেও, বহু স্থানে দলের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই দলীয় নির্দেশের পরোয়া না করে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। সেসব নিয়ে আলোচনা করলে নিবন্ধ দীর্ঘায়িত হবে। তাই ব্যক্তিবিশেষ বা বিভিন্ন বিপ্লবী গোষ্ঠীর নয়, শুধুমাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া মার্কসবাদী দলগুলির ভূমিকাই এখানে আলোচনা করা হল। এই দলগুলির রাজনৈতিক লাইন সংক্ষেপে আলোচনা না করলে বিশ্বযুদ্ধ ও আগস্ট বিপ্লব সম্পর্কে এদের অবস্থান সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা যাবে না।

আগস্ট বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী মার্কসবাদী দলগুলি ছিল তৃতীয় আন্তর্জাতিকের (কমিন্টার্ন) বিরোধী। সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদী নয়, মার্কসীয় আন্তর্জাতিকতার দৃষ্টিভঙ্গীতেই তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বলে মনে করেছিল। বিগত শতকের বিশের দশক থেকেই বিপ্লবীদের মধ্যে মার্কসবাদের চর্চা শুরু হয়েছিল। কমিন্টার্নের সঙ্গেও অনেকের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। তিরিশের দশকে কারারুদ্ধ বিপ্লবীরা সেই চর্চার আরও গভীরে যান। বিপ্লবীদের অনেকেই সিপিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত হন। আবার অনেক বিপ্লবীর মনে সেই সময়ে কমিন্টার্নের ভূমিকা, স্বাধীনতা আন্দোলনে সিপিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। পৃথক মার্কসবাদী দল গড়ার ভাবনা দানা বাঁধতে থাকে। সিপিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই কমিন্টার্নের বিভিন্ন অবস্থান ও তাদের নির্দেশে পরিচালিত দলের কর্মসূচির সঙ্গে একমত হতে পারছিলেন না। ১৯২৮ সালে কমিন্টার্নে এক দেশে সমাজতন্ত্রের তত্ত্বকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসাবে গ্রহণ, ভারতের মুক্তি সংগ্রাম বিষয়ে উপনিবেশ সংক্রান্ত থিসিস অনেকেই মেনে নিতে পারেন নি। ১৯৩৫ সালে কমিন্টার্নের সপ্তম মহাসম্মেলনে ফ্যাসিবাদ রুখতে বুর্জোয়া দলগুলির সঙ্গে ইউনাইটেড পপুলার ফ্রন্ট গড়ে তোলার তত্ত্বকেও তাঁরা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিচ্যুতি বলে মনে করেছিলেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ট্রটস্কিপন্থী নানা গোষ্ঠীও গড়ে উঠতে থাকে।

অনুশীলন সমিতি ও হিন্দুস্থান সোস্যালিস্ট রিপাবলিকান আর্মির (এইচএসআরএ) বিপ্লবীরা দেখলেন, কমিন্টার্নের নীতি সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতির থেকে আলাদা নয়। মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আন্তর্জাতিকতার পথ থেকে কমিন্টার্ন বিচ্যুত। সিপিআইও কমিন্টার্নকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জাতীয় কংগ্রেস সম্পর্কে ঘন ঘন অবস্থান বদল করছে। দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিচার না করে গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির (সি পিজিবি) নির্দেশে সি পি আই চলছে। সেই বিপ্লবীরা কমিন্টার্নের পথের অনুসারী না হয়ে একটি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দল গঠনের ভাবনা শুরু করেন। ১৯৩৬ সালে দেউলী জেলে অনুশীলন মার্কসবাদীরা একটি থিসিস রচনা করেন। ১৯৩৮ সালে বিপ্লবীরা জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সেই থিসিস গ্রহণ করেন। ১৯৪০ সালে তারই ভিত্তিতে আরএসপি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দল কমিন্টার্নের অনুসারী যেমন নয়, তেমন ট্রটস্কির চতুর্থ আন্তর্জাতিকের অনুসারীও ছিল না। দুই ধারার অননুসারী হিসাবেই এই দল প্রতিষ্ঠিত হয়।

সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে একসময় কমিন্টার্নের যোগাযোগ ছিল। তিনি ১৯২৮ সালে কমিন্টার্নের ষষ্ঠ মহাসম্মেলনে প্রতিনিধি হন। কিন্তু সম্মেলনের উপনিবেশ সংক্রান্ত থিসিসের সঙ্গে একমত হতে পারেননি। ভারতে জাতীয় সংগ্রাম সম্পর্কে কমিন্টার্নের অবস্থান তিনি মেনে নিতে পারেননি। এক দেশে সমাজতন্ত্রের তত্ত্বেরও তিনি বিরোধী ছিলেন। ১৯৩৪ সালে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ আরো কয়েকজন মার্কসবাদীর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট লিগ গড়ে ওঠে। কমিউনিস্ট লিগ ইউনাইটেড পপুলার ফ্রন্ট তত্ত্বেরও বিরোধী ছিল। পরবর্তীতে কমিউনিস্ট লিগ, আরসিপিআই নামে রূপান্তরিত হয়। এই দলকেও ট্রটস্কিপন্থী বলা যায় না।

বি এল পি আই ছিল ট্রটস্কিপন্থী দল। ভারত, সিংহল ও বার্মার বিভিন্ন ট্রটস্কিপন্থী গোষ্ঠী নিয়ে ১৯৪২ সালের মে মাসে এই দল গড়ে ওঠে। তাদের সঙ্গে চতুর্থ আন্তর্জাতিকের সরাসরি যোগাযোগ ছিল।

দলগুলির মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও এরা কেউই ফ্যাসিবাদী তো নয়ই, জাতীয়তাবাদীও ছিল না। অথচ, স্তালিনবাদ তথা কমিন্টার্নের বিরোধিতার জন্য এদের কেবল জাতীয়তাবাদীই নয়, ফ্যাসিবাদী বলার প্রবণতা আজও রয়েছে। সিপিআই যেহেতু কমিন্টার্ন স্বীকৃত ‘সরকারি’ কমিউনিস্ট ছিল, তাই তারাই সেসময়ে ভারতে একমাত্র কমিউনিস্ট দল বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলে। অন্য মার্কসবাদী ধারাগুলিকে বামপন্থী বা সমাজতন্ত্রী বলতে রাজি হলেও, কমিউনিস্ট বলতে আজও অনেকেই রাজি নন। তাই শত্রুশিবির সহজেই বলতে পারে যে, কমিউনিস্টরা আগস্ট বিপ্লবের বিরোধী ছিল। অবিভক্ত সিপিআইকেই একমাত্র কমিউনিস্ট দল বলে মনে করলে সেই ভুল ব্যাখ্যাই হবে।

এভাবেই ইতিহাস বিকৃতির ধারা অব্যাহত থাকে। হয়ে ওঠে ফ্যাসিবাদীদের মিথ্যা, ভন্ড প্রচারের হাতিয়ার। মজা হল, আগস্ট বিপ্লবে অংশগ্রহণকারীদের ফ্যাসিবাদী বলা হয়। অথচ, ফ্যাসিবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত, মুসোলিনিকে আদর্শ বলে মনে করা হিন্দুত্ববাদীরা কিন্তু সেদিন আগস্ট বিপ্লবের বিরোধিতা করেছিল। ব্রিটিশদের দুর্বল করে তারা ‘ফ্যাসিবাদের হাত শক্ত করা’-র পথ নেয়নি। ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ যে তাদের মিত্রশক্তি তা বুঝতে ভুল করে নি। শত্রু-মিত্র বুঝতে ওদের ভুল হয় না।

~মতামত লেখকের ব্যক্তিগত।

1 মন্তব্য

  1. খুবই উপযোগী লেখা! লেখককে ধন্যবাদ সঠিক ইতিহাসকে মোক্ষমভাবে তুলে ধরবার জন্যে। সেই সময়ে যে রাজনৈতিক আলোড়ন দেখা দিয়েছিল, তার আর্থসামাজিক ভিত্তি আজও মোটে বদলায়নি বরং পুঁজিবাদ আরো জীর্ণ হয়ে পরেছে। যারা আজকেও এই সমাজব্যবস্থার মধ্যেই প্রগতির দিশা খোঁজে, তাদের থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন পুঁজিবাদবিরোধী শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে আমাদের!

Leave a Reply