আচ্ছা ‘ব্যাটসম্যান’ কে কি ‘দন্ডপাণি’ বলা যায়? …..

না, মানে অধ্যাপক শঙ্করীপ্রসাদ বসুর সারাদিনের খেলা রচনায় বলতে গেলে এমনভাবেই ‘রাবীন্দ্রিক ক্রিকেট’ -এর সূত্রপাত।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অনেকেই ভাবছেন “রবীন্দ্রনাথ? ক্রিকেট খেলতেন? কই কোথাও দেখিনি তো!”

সে অনেকেই না দেখতে পারেন কিন্তু ‘ক্রিকেট’ একেবারে অনুল্লিখিত নয় কিন্তু রবীন্দ্র-সাহিত্যে।

বিষয়টির অবতারণা ঘটে ১৯৬১ সালে। জুন মাসে আমেরিকার লাইফ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় শ্রীমতী শান্তা রামরাওয়ের একটি প্রবন্ধ। তাতে লেখা হয়েছিল “পরিণত বয়সে কবি ক্রিকেট পারদর্শী হওয়ার উদ্দেশ্যে খেলা শুরু করেন, কিন্তু খেলার কায়দা আয়ত্ত করতে না পেরে তিনি খেদোক্তি করে বললেন ‘ক্রিকেট আমার কাছে ভ্রান্তির সৃষ্টি করে’।

১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারত-ইংল্যান্ডের ক্রিকেট টেস্টের আগে আনন্দবাজার একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। তাতে ‘অদ্ভুতাচার্য্য’ নামে যে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় সেখানে এই লাইফ পত্রিকার লেখাটি উল্লেখ করে লেখক জানান যে তিনি কেন্দ্রীয় উপমন্ত্রী শ্রী অনিল কুমার চন্দর কাছে এই ব্যাপারে জানতে চান। শ্রী চন্দ জানান যে এই ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। এরপর লেখক ঐ প্রবন্ধের লেখিকার কাছে এই ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি আরো অদ্ভুত উত্তর দেন। তিনি নাকি শ্রী চন্দর কাছ থেকেই জেনেছেন এবং শ্রী চন্দ জেনেছেন  মহলানবিশ এর কাছ থেকে। ফলে লেখক অর্থাৎ ‘অদ্ভুতাচার্য্য’ পুরো ব্যাপারটাকেই সন্দেহজনক বলেন।

কিছুদিন বাদে একটি অদ্ভুত চিঠি প্রকাশিত হয় আনন্দবাজার পত্রিকায়। ৩/১/১৯৬২ তারিখের সেই চিঠি লিখেছিলেন জনৈক জগদীশ রায়। তাঁর দাবি ১১ নম্বর স্টার রোডের বাড়িতে (বালীগঞ্জ) থাকার সময়ে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ক্রিকেট খেলার প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি তখন এই জগদীশ রায়কে দিয়ে ক্রিকেটের সরঞ্জাম আনিয়ে খেলা শুরু করেন এবং দুজন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান কোচও রাখেন। বাড়ির সামনেই মিলিটারি মাঠ (বোধ হয় আজকের সিসিএফসি)। সেখানে নিয়মিত খেলা হত। যার প্রভাবেই এই উদ্যোগ।

রবীন্দ্রনাথও যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু পায়ে বল লেগে চোট পাওয়ায় আর কোনদিন খেলেননি। সত্যেন্দ্রনাথ অবশ্য অনেক বয়সেও খেলেছেন এবং ভালো খেলতেন, কিন্তু কবি আর নামেননি। এটা সম্ভবত ১৮৯৮-৯৯ সালের ঘটনা। এই প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণের পর আর কোন সন্দেহই রইল না। কিন্তু ঝামেলা বাধাল তার ঠিক ছদিন বাদে, অর্থাৎ ৯/১/১৯৬২ তারিখে প্রকাশিত দাশরথি ঘোষের লেখা চিঠি। আনন্দবাজারেই।

দাশরথি দাবি করে বসলেন ‘কবিগুরুর ক্রিকেট খেলা’ নামে একটি প্রবন্ধ নাকি আগেই বেরিয়েছিল বসুমতী পত্রিকায়। লিখেছিলেন শ্রী ব্রহ্মণ্যভূষণ ও শ্রীমতী ক্ষমা বন্দ্যোপাধ্যায়। খেলাটি নাকি গোমোতে হয় (যেখান থেকে সুভাষচন্দ্র অন্তর্হিত হন)। সেই ১৯৬১-৬২ সালে বসুমতীর সম্পাদক ছিলেন প্রাণতোষ ঘটক। তিনি জানালেন “হতে পারে”। খোঁজখুঁজি শুরু হল। কিন্তু কিছু পাওয়া গেল না।

পত্রদাতাকে চিঠি পাঠানো হল। কিন্তু তিনি আলাদা করে কিছু বললেন না। জিজ্ঞাসা করা হলো প্রমথনাথ বিশীকে। তিনি জানালেন যে গুরুদেব অনেক কিছুই করেছেন, ব্যাট হাতে মাঠে নামা আশ্চর্য কিছু নয়। কিন্তু অনিল চন্দের উপস্থিতির সাথে সেখানে কোচবিহারের যে মহারাজার কথা বলা হচ্ছে তা অসম্ভব।

পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায়নি বলে ‘অদ্ভুতাচার্য্য’ ১২/২/১৯৬২ তারিখের পত্রিকায় এই প্রবন্ধ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করলেন। অবশেষে অধ্যাপক বিমলকুমার চট্টোপাধ্যায় লেখক শঙ্করীপ্রসাদ বসুকে জোগাড় করে দিলেন সেই প্রবন্ধ । ১৩৬২ (১৯৫৫) বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসের বসুমতী পত্রিকায় ঐ লেখা ছিল। কিন্তু এত খোঁজাখুঁজির পর কি দেখা গেল? ঐ লেখাটি একটি কাল্পনিক রম্যরচনা। মোটেই আসল খেলা নয়।

কিন্তু কিছু বিষয় খুব আকর্ষণীয়। দল দুটির নাম টেগোর ওয়ান্ডারার্স (বেহার ওয়ান্ডারার্স!!!!) এবং প্রিন্সেস ইলেভেন। টসে প্রিন্সেস দল জেতে। দলনায়ক ‘পাতিয়ালা’ কবিকে বলেন “কবি আপনি টসে হারলেও আশা করি আপনি খেলায় জিতবেন।”

কবির দল ধুতি পরে নেমেছিল (মোহনবাগান একবার নেমেছিল ক্রিকেট খেলতে গোষ্ঠ পালের নেতৃত্বে, ক্যালকাটা দলের রবার্ট ল্যাংডেন [সি এ বি-র প্রথম সভাপতি, প্লেন দুর্ঘটনায় মৃত, করাচিতে] আপত্তি করায় মোহনবাগান দল তুলে নেয়)। প্রিন্সেস ইলেভেন দলে ছিলেন পাতিয়ালা, পতৌদি, দলীপ, ভিজি। উপস্থিত ছিলেন রাজকুমারী শর্মিলা, শেলী ও মনি বেন, পঞ্চশ্রী দেববর্মা, জংবাহাদুরের মেয়েরা, ধারদোয়ানের রাজকুমারী, গায়কোয়াড় কন্যা প্রভৃতি অভিজাতবর্গ।

আগেই বলেছি পুরোটাই কল্পনা। কিন্তু সবটাই কি কল্পনা?

১৯৬২ সালের ৩রা জানুয়ারি আনন্দবাজারে জগদীশচন্দ্র রায়ের লেখা চিঠি প্রমাণ করে যে রবীন্দ্রনাথের ক্রিকেট খেলা পুরোপুরি কল্পনা নয়। চিঠিটার একটা অংশ শঙ্করীপ্রসাদ বসু সারাদিনের খেলা বইয়ে উদ্ধৃত করেছেন। তার অংশবিশেষ দিচ্ছি

১৯নং স্টোর রোডের সামনেই মিলিটারী মাঠ; সেই মাঠের একপাশে তখনকার দিনের ভারত-বিখ্যাত সাহেবদের ক্রিকেট-ক্লাব। ঐ ক্লাবে ভারতীয়দের সভ্য হবার কোন উপায় ছিল না, তাঁরা যতই বড় হউন না কেন। কোনো একদিন ঐ ক্লাবের ক্রিকেট-খেলা দেখে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মেজদাদাকে বলেন। সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর ম্যানেজার মিঃ ভোগেল এবং আমাকে ব্যাট, বল, নেট প্রভৃতি কিনতে পাঠিয়েছিলেন। ঐ সঙ্গে বলে দেন – ভারতীয় দোকান থেকে জিনিস কিনতে। আমরা এস্‌প্ল্যানেডের উত্তর দিকের দোকান থেকে সমস্ত জিনিস কিনে ফিরি। তার পরদিন থেকেই খেলা আরম্ভ হয়। সত্যেন্দ্রনাথ দুই জন অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ানকে মাইনে দিয়ে খেলা শিখাবার জন্য নিযুক্ত করলেন। রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকো থেকে প্রত্যহই খেলা দেখতে ও খেলতে আসতেন। রবীন্দ্রনাথের এই খেলা কিন্তু মোটেই ভাল লাগেনি। তার কারণ একদিন খেলতে-খেলতে একটা বল তাঁর পায়ে লাগে এবং তিনি জখম হন। তাছাড়া ক্রিকেট খেলার যা বিশেষ দরকার, তা তাঁর ছিল না। অর্থাৎ তিনি তাঁর মন ও চোখ ঠিক রাখতে পারতেন না। প্রায় তিন মাস পরে ক্রিকেট খেলা ছেড়ে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রিয় খেলা লাঠি নিয়ে থাকতেন। তাঁর দাদা অবশ্য বৃদ্ধ বয়সেও ক্রিকেট খেলতেন।

কাজেই তিনি যে খেলতেন, তা নিয়ে সন্দেহের বিশেষ অবকাশ নেই, তবে এটা ঠিক কবে সে ব্যাপারে সঠিক কিছু জানা যায় না। তবে ক্রিকেট ইতিহাসবিদ অভিষেক মুখার্জি তাঁর ব্লগে লিখেছেন “জগদীশবাবুর লেখা পড়ে মনে হয় যে চোটটা গৌণ কারণ। ক্রিকেট যে কেবলই যাতনাময় হতে পারে না সেটা উনি নির্ঘাত বুঝেছিলেন। বাহির-পানে চোখ মেলা আর পোষাচ্ছিল না সম্ভবতঃ।”

কিন্তু তার মানে কি এই যে কবি ক্রিকেটের খবর রাখতেন না ? অভিষেকদা (মুখার্জি)-র ভাষায় “আকাশে পাতিয়া কান খোঁজ নিতেন কী হচ্ছে না হচ্ছে? নাকি নীল পদ্মের মতই নিভৃতে থেকে যেত ক্রিকেট? ক্রিকেট নিয়ে কয়েকটা লেখা লিখলে পারতেন অবশ্য। ব্র্যাডম্যানকে আদৌ পছন্দ করতেন বলে মনে হয় না, মহাপঞ্চক গোছের কিছু বলে বসতেন হয়ত। বা হয়ত ‘বোঝা তোর ভারী হলে ডুববে তরীখান’ গোছের কিছু গেয়ে উঠতেন।”

এখানে উল্লেখ করা যেতেই পারে যে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ “বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদিগকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য” নামে একবার একটা সভার আয়োজন করেন। সেটা বৈশাখ ১৩১২। অর্থাৎ এপ্রিল বা মে ১৯০৫। সেখানে বক্তৃতা দিতে এসে রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় বললেন “আজ সাহিত্য-পরিষৎ আমাদিগকে যেখানে আহ্বান করিয়াছেন তাহা কলেজ-ক্লাস হইতে দূরে, তাহা ক্রিকেট-ময়দানেরও সীমান্তরে, সেখানে আমাদের দরিদ্র জননীর সন্ধ্যাবেলাকার মাটির প্রদীপটি জ্বলিতেছে।”

কিন্তু তার থেকেও বড় কথাটা আগেই বলেছিলেন “দিনের পড়া তো শেষ হইল, তার পরে ক্রিকেট খেলাতেও নাহয় রণজিৎ হইয়া উঠিলাম। তার পরে?” এটা নিশ্চিত ভাবে রঞ্জিকে বলা। কোনো ‘রণজিৎ’ বা ‘সমরবিজয়ী’ কে নয় – কারণ ১৮৯৯ থেকে ১৯০৫ সালের মধ্যে রঞ্জি ছিলেন বিধ্বংসী ফর্মে, ১৯০৪ সালে আড়াই মাসের মধ্যে ৮টা সেঞ্চুরি ও ৫টা হাফ সেঞ্চুরি করেছিলেন।

যাঁরা সন্দেহ প্রকাশ করতে পারেন তাঁদের জানিয়ে রাখি, সম্ভবত চৈত্র ১৩০৮-এ (অর্থাৎ মার্চ বা এপ্রিল ১৯০২) একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন, নাম ‘বারোয়ারি-মঙ্গল’। সেই প্রবন্ধে লিখেছেন “রামমোহন রায় আজ যদি ইংলণ্ডে যাইতেন তবে তাঁহার গৌরব ক্রিকেট খেলোয়াড় রঞ্জিত সিংহের গৌরবের কাছে খর্ব হইয়া থাকিত।”

বক্তৃতা ও প্রবন্ধ ছাড়াও চিরকুমার সভা-র দ্বিতীয় অঙ্কের দ্বিতীয় দৃশ্যে শ্রীশ দিব্যি বলছে “তোমরা যে দিনরাত্রি ফুটবল টেনিস ক্রিকেট নিয়ে থাক, তোমরা একবার পড়লে ব্যাট্‌বল গুলিডাণ্ডা সবসুদ্ধ ঘাড়-মোড় ভেঙে পড়বে।”

অবশ্যই লক্ষ্য করার বিষয় হল গোরা উপন্যাস। সেখানে আছে “এখানকার মেলা উপলক্ষেই কলিকাতার একদল ছাত্রের সহিত এখানকার স্থানীয় ছাত্রদলের ক্রিকেট-যুদ্ধ স্থির হইয়াছে। হাত পাকাইবার জন্য কলিকাতার ছেলেরা আপন দলের মধ্যেই খেলিতেছিল। ক্রিকেটের গোলা লাগিয়া একটি ছেলের পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে।”

কিংবা “ছাত্ররা গোরাকে চিনিত – গোরা তাহাদিগকে লইয়া অনেকদিন ক্রিকেট খেলাইয়াছে।”

কিছুটা আগে আছে  “ধাপার মাঠে শিকারির দলে নন্দর মতো অব্যর্থ বন্দুকের লক্ষ কাহারো ছিল না। ক্রিকেট খেলায় গোলা ছুঁড়িতেও সে অদ্বিতীয় ছিল। গোরা তাহার শিকার ও ক্রিকেটের দলে ভদ্র ছাত্রদের সঙ্গে এই-সকল ছুতার-কামারের ছেলেদের একসঙ্গে মিলাইয়া লইয়াছিল।”

ইংরাজি সহজশিক্ষার Chapter 38এ “for” শেখাতে গিয়ে “the potter makes a cup for his father” জাতীয় কয়েকটা একই ধরনের বাক্য ব্যবহার করেছেন। এরই একটা হল “the boy takes his bat for a game”.

আবার ক্রিকেট ইতিহাসবিদ অভিষেক মুখার্জির শরণাপন্ন হতে হলো। তিনি লিখেছেন “মজার ব্যাপার, এই ব্যাটবাহক বালক ছাড়া চ্যাপ্টারে বাকি সবাই হয় কাজ বা পড়াশুনো করছে। এরই শুধু অখণ্ড অবসর।“

‘নারীপ্রগতি’ কবিতাটি মনে আছে? সেখানে বলা আছে

তোমাদের গজগামিনীর দিনে

কবিকল্পনা নেয়নি তো চিনে;

কেনে নি ইস্‌টিশনের টিকেট;

হৃদয়ক্ষেত্রে খেলেনি ক্রিকেট;

চণ্ড বেগের ডাণ্ডাগোলায় –

তারা তো মন্দ-মধুর দোলায়

শান্ত মিলন-বিরহ-বন্ধে

বেঁধেছিল মন শিথিল ছন্দে।

“চণ্ড বেগের ডাণ্ডাগোলা” ক্রিকেট নিয়ে এমন বিশেষণ আর কেউ ব্যবহার করেছেন বলে জানা নেই।

সহজ পাঠের দ্বিতীয় ভাগের দ্বিতীয় অংশে আছে “অগত্যা বাইরে ব’সে আছি। দেখছি, ছেলেরা খুশী হয়ে নৃত্য করছে। কেউ বা ব্যাটবল খেলছে। নিত্যশরণ ওদের ক্যাপ‍্‌টেন।”

ব্যাটবল কী খেলা এই নিয়ে বিতর্ক আছে। অনেকে একে ক্রিকেটের স্থানীয় সংস্করণ বলেন। রবীন্দ্রনাথ-এর ছেলেবেলা-য় স্পষ্ট লেখা আছে “তখন খেলা ছিল সামান্য কয়েক রকমের। ছিল মার্বেল, ছিল যাকে বলে ব্যাটবল – ক্রিকেটের অত্যন্ত দূর কুটুম্ব। আর ছিল লাঠিম-ঘোরানো, ঘুড়ি-ওড়ানো। শহরে ছেলেদের খেলা সবই ছিল এমনি কম্‌জোরি। মাঠজোড়া ফুটবল-খেলার লম্ফঝম্ফ তখনো ছিল সমুদ্রপারে।”

উল্লেখযোগ্য যে ব্যাটবলের কথা যোগাযোগ উপন্যাসেও ছিল। “বিপ্রদাস বাল্যকালে যে ইস্কুলে পড়ত সেই ইস্কুলেরই সংলগ্ন একটা ঘরে বৈকুণ্ঠ ইস্কুলের বই খাতা কলম ছুরি ব্যাটবল লাঠিম আর তারই সঙ্গে মোড়কে-করা চীনাবাদাম বিক্রি করত।”

কবি সাহিত্যে নোবেল পান। তাঁকে নাইটহুড দেয় ব্রিটিশরা। তিনি জালিয়ানওয়ালাবাগের প্রতিবাদে নাইট উপাধি ত্যাগ করেন। তাঁকে ব্রিটিশদের সমর্থকরা উপহাস, ব্যঙ্গ করে। একশো বছর পর বিলেতে ক্রিকেট বিশ্বকাপে এক তৃতীয়াংশ খেলায় তাঁরই গান বেজেছে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে। একটা ম্যাচে তো দুই দেশের জাতীয় পতাকাই তাঁর লেখা ছিল। আরো ৭টি খেলায় তাঁর রচনার অনুবাদ বেজেছে। ব্রিটিশ হৃদয়ের ত্রাস, ব্রিটিশ নয়নের মণি বাংলার ভাষা ও গান, বিলেতের মাটিতে উড়ছে উপমহাদেশের পতাকা। নেটিজেনরা ‘মিম’ বানিয়েছে ‘ইংল্যান্ড ভাবছে আগে একটাকে হারালেই হতো, এখন দেশভাগ করে মুসকিল হলো, তিনটিকে হারাতে হয়’।

কে জানে, পড়ন্ত বিকেলের আলো যখন কলকাতার ময়দানে এসে পড়ে তখন স্পোর্টিং ইউনিয়ন তাঁবুর পাশ দিয়ে যেতে যেতে কোন ক্রিকেট পাগল কি গেয়ে ওঠেন “খর বল ধায় বেগে/পিচ ঢাকে ধুলা মেঘে/ওগো রায় ব্যাট সোজা ধরিও।”

রবীন্দ্রনাথ ও ক্রিকেট – ছবি Wikipedia এবং GetBengal এর website থেকে

1 মন্তব্য

  1. বাহ্ ! খুব ভালো লিখেছিস ……
    বিশেষ করে- “জগদীশবাবুর লেখা পড়ে মনে হয় যে চোটটা গৌণ কারণ। ক্রিকেট যে কেবলই যাতনাময় হতে পারে না সেটা উনি নির্ঘাত বুঝেছিলেন। বাহির-পানে চোখ মেলা আর পোষাচ্ছিল না সম্ভবতঃ”

Leave a Reply