এক বছরের বেশি সময় ধরে হয়ে চলা কোভিড-১৯ অতিমারী আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা সামনে এনেছে আরো প্রকটভাবে। হাসপাতালের পরিকাঠামো থেকে শুরু করে অক্সিজেন, টেস্টিং এবং টিকা প্রদানের পরিকাঠামোর অপ্রতুলতা আজ আমাদের এক অভূতপূর্ব সঙ্কটের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। পাশাপাশি শোনা যাচ্ছে বহু জরুরি ওষুধপত্র না পাওয়ার কথা বা ব্ল্যাক হওয়ার কথা। এই ওষুধ সঙ্কটের একেবারে গোড়ায় গিয়ে চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু বিভ্রান্তিমূলক ধারণা নিয়েই এই লেখা।
এক নতুন ব্যাধি হিসাবে কোভিড-১৯ উপস্থিত হওয়ার পর থেকেই তা থেকে নিরাময়ের সন্ধানে নানা ওষুধপত্র পরীক্ষিত হতে থাকে। নতুন ওষুধ, বা কোনও পুরনো, বা অন্য রোগের ওষুধ, আরেকটি নতুন বা অন্য রোগে কিভাবে প্রয়োগ করা হবে বা হয় সে বিষয়ে আমাদের অনেকেরই সম্যক ধারণা নেই। এমনকি আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সব শাখার পাঠ্যক্রমে এ বিষয়ে যে বিশদে পড়ানো হয়, তেমনও নয়। আধুনিক বায়োমেডিসিন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এর ড্রাগ-ট্রায়াল খুবই জরুরি। সহজ করে বললে এই যে অ্যালোপ্যাথিক মেডিসিনগুলো আমরা খেয়ে থাকি, এগুলো আমাদের শরীরে গিয়ে কিভাবে কাজ করবে, কী-ই বা এদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে, সে বিষয়ে কেবলমাত্র কোনো গ্রহণযোগ্য তাত্ত্বিক (teleological, pharmacological এমনকি physiological) ব্যাখ্যা কিংবা অ্যানেকডোটাল অ্যাকাউন্ট থেকেই ওইসব ওষুধ প্রয়োগ করা যায় না। নানা দফায়, প্রথমে ল্যাব-এ ‘in-vitro’ মডেলে, তারপর পশুপাখির উপর, এবং তারও পরে ইচ্ছুক স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে হয় ক্লিনিকাল ট্রায়াল, যাতে এক দলের উপর ‘প্লাসিবো’ আর এক দলের উপর সম্ভাব্য ড্রাগ-ক্যান্ডিডেটটি প্রয়োগ করা হয়। এভাবে অনেক অংশগ্রহণকারী নিয়ে হওয়া মাল্টি সেন্টার লার্জ স্কেল ক্লিনিকাল ট্রায়াল থেকেই কেবলমাত্র কোনোও ওষুধ প্রয়োগ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত করা যেতে পারে (অনেক সময়ই তা হয় ‘ডাবল ব্লাইন্ড’, যেখানে বৈজ্ঞানিক এবং যাঁদের ওপর প্রয়োগ করা হচ্ছে, তাঁরা কেউই প্রাথমিকভাবে জানেন না কে ‘প্লাসিবো’ পাচ্ছেন আর কে আসল ওষুধ, এবং আরো নানা জটিল পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়, যাতে কোনরকম পক্ষপাতিত্ব ড্রাগ নির্বাচনের উপর প্রভাব না ফেলে)।

এর পর একটি ড্রাগ এর বাজারে আসার ছাড়পত্র পাওয়ার কথা, যা প্রথম বিশ্বের প্রায় সবকটি দেশেই হয়ে থাকে স্বাভাবিকভাবেই। এইসব ‘randomised controlled trial’ বা সংক্ষেপে RCT হওয়ার পরে অনুমোদন পাওয়া ড্রাগও কিন্তু নিখুঁত নয়। এরপর থাকে ‘ফেজ ফোর ট্রায়াল’ বা ‘পোস্ট-মার্কেটিং সার্ভেল্যান্স’, অর্থাৎ কিনা সেসব ড্রাগ ট্রায়ালের বাইরে এসে বাজারে ব্যবহার হওয়ার পর কোনো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে কিনা তা দেখা ইত্যাদি। এখন দুঃখের কথা এই যে ‘গ্লোবাল সাউথ’ দেশগুলোতে এইসব নিয়ম নীতি এতটাই শিথিল যে সাধারণ সময়েই এসব মানা হয় না, এক রোগের জন্য অনুমোদিত ওষুধ সম্পূর্ণ অন্য রোগে বা নির্দিষ্ট প্রোটোকল না মেনেই আকছার প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। এর কারণ এবং প্রকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে, এই স্বল্প পরিসরে সে আলোচনা থেকে বিরত থাকতে হচ্ছে।
এখন আসা যাক সরাসরি কোভিড-১৯-এ প্রথম থেকে চালু হয়ে যাওয়া নানা ওষুধ ও পরামর্শের কথায়। যেসব চিকিৎসা পদ্ধতি আজ থেকে ১৪-১৫ মাস আগে প্রস্তাবিত হয়েছিল, সেগুলো সবই প্রায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র অধীনে ট্রায়ালে যায় এবং অনেকগুলোর রিপোর্টই এখন এসে গেছে। এতে দেখা যাচ্ছে যে প্রথমে যেসব ওষুধকে কার্যকরী বলে মনে করা হয়েছিল, তাদের অনেকেই আদৌ কার্যকরী নয়, এবং অনেকগুলিই সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। জরুরি ছিল RCT মেনে সরকারি নির্দেশিকাগুলোর নিয়মিত বদল। কিন্তু তা তো হচ্ছেই না, বরং ক্রমাগত বহু ভুয়ো তথ্য প্রচারিত হয়ে চলেছে। মানুষের অসহায়তার সুযোগে রমরমিয়ে চলছে কেবলমাত্র অপ্রয়োজনীয় ওষুধই নয়, এমনকি ভয়ানক ক্ষতিকারক ওষুধেরও কালোবাজারি। কেবল ওষুধ নয়, মাস্ক থেকে ভ্যাকসিন, টোটকা থেকে ‘হাইজিন থিয়েটার’, সবেতেই ইনফোডেমিক অব্যাহত সেই প্রথম থেকেই। এই ভ্রান্ত তথ্য থেকে মানুষকে বাঁচানোর কাজ একমাত্র সরকারই করতে পারেন, আর কেউ নয়। একথা বারবার বলে আসছেন ফাহিম ইউনুসের মত কোভিড ফ্রন্টলাইনে প্রথম থেকে লড়ে যাওয়া প্রখ্যাত চিকিৎসক-গবেষকরা। “Government should push out good COVID information with the SAME ENERGY that the disinformation machine uses” (@FaheemYounus, 27.04.21, 09:40AM IST) ।
Hydroxychloroquine, Ivermectin, Flavipiravir এইসব ওষুধ খাওয়ার কথা বলা হয়ে আসছে সেই প্রায় প্রথম থেকেই। তিনটেই সহজেই খেয়ে নেওয়া যায় (ইন্ট্রাভেনাস ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে বা অন্য কোনো জটিল উপায়ে প্রয়োগ করতে হয় না), তাই আরো নানা অ্যান্টিবায়োটিক্স, মাল্টি-ভিটামিন, মাল্টি-মিনারেলের সঙ্গে এই ওষুধগুলোর বাড়বাড়ন্ত প্রথম থেকেই। যেখানে সেই প্রথম থেকেই সরকারি স্বাস্থ্য নির্দেশিকাতে বলা হয়ে আসছে এইসব খাওয়ার কথা, সেখানে কিভাবে বুঝব যে এসব ঠিক নয়? RCT কী বা কেন, তা নিয়ে যখন এমনকি আমাদের সুপার-স্পেশালিস্টরাও কোনোদিনও ভাবার প্রয়োজন বোধ করেননি, সেখানে আমরা কী করে নিজে নিজে ভুয়ো তথ্য (‘ডিস্-ইনফরমেশন’) চিনে নেব?
বেশ কিছু এন জি ও এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত ডাক্তারবাবুরা নিজেদের এবং সংগঠনের প্রচারের স্বার্থে এইসব অননুমোদিত ড্রাগ-ককটেলের প্রচার করে আসছেন প্রথম থেকেই। আর খবরের কাগজ, স্থানীয় টিভি চ্যানেল, ফেসবুক থেকে ফ্রি-তে পাওয়া ‘বড়’ ডাক্তারবাবুদের পরামর্শই প্রধান হয়ে উঠেছে এই অতিমারীর দুঃসময়ে। ইনফোডেমিকে ভর করে ‘জনদরদী ও বিজ্ঞানমনস্ক জনস্বাস্থ্যকর্মী’ হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেতে চাওয়া এইসব ‘বৈজ্ঞানিক-চিকিৎসকদের’ কোভিড-১৯ সংক্রান্ত ভুয়ো তথ্যে ভরপুর ফেসবুক পোস্টগুলো লাইক, শেয়ার, ধন্যবাদসূচক কমেন্ট পাচ্ছে অনেক। আর এই মহৎ জুকেরবার্গিয় সামাজিক মাধ্যমের প্রযুক্তি এবং ‘ক্লায়েন্টেল’ এমনই যে কদাচিৎ এই তথ্যগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। যাঁরা ভুয়ো তথ্য এবং বিভ্রান্তিকর মেডিকাল তথ্যগুলোকে ক্রমাগত খন্ডন করার চেষ্টা করেন নিয়মিত, তাঁরা একে তো সংখ্যায় অপ্রতুল, তার ওপর তাঁদের বেশিরভাগেরই আঞ্চলিক ভাষাজ্ঞান সীমিত। সর্বোপরি তাঁরা টুইটারে সক্রিয় হলেও, ফেসবুকে প্রায় নেই বললেই চলে। জ্ঞান, তথ্য, বৈজ্ঞানিকতা, সমালোচনামূলক ও বিশ্লেষণাত্মক ভাবনা এবং মতামত- এসবের শ্রেণিবোধ ও ক্রম-বিভাজন (hierarchy) এমনকি সামাজিক মাধ্যমেও স্পষ্ট।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। আমার সাথে পড়া মেডিকাল কলেজের মেধাবী বুদ্ধিদীপ্ত ছেলেমেয়ে, যাঁরা আজ সফল চিকিৎসকও বটে, তাঁদের দুই একজনের কথা বলি। একজন নিজের কোভিড হওয়ার বহু আগে থেকেই দফায় দফায় মাসের পর মাস ICMR ও অন্যান্য সরকারি চিকিৎসা নির্দেশিকা মেনে prophylactically (প্রতিষেধক হিসাবে) Hydroxychloroquine, Ivermectin খেয়েছে। যদিও সেই টোটকা কাজে লাগেনি এবং অচিরেই সে কোভিড-পজিটিভ হয়েছে। পজিটিভ হওয়ার পর আরো আশঙ্কিত হয়ে ঐ ওষুধগুলো থেরাপিউটিক ডোজে (আরো বেশি পরিমাণে) খেয়েছে। সঙ্গে Azithromycin, জিঙ্ক, ভিটামিন D, C, এবং আরো অনেক আজব ককটেল। অনেক তথ্যপ্রমাণ দেখিয়েও আমার সেই ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে আমি অন্যরকম বুঝিয়ে উঠতে পারিনি। চিকিৎসা পাঠ্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত, প্রবলভাবে বিজ্ঞানমনস্ক, ‘এভিডেন্স-বেসড মেডিসিন’ (EBM) -এর এক প্রবাদপ্রতিম অধ্যাপকও Ivermectin খেয়েছেন, পরিবারের অন্যদেরও খাইয়েছেন। অন্য এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু নিজে না খেলেও, খাওয়া উচিত বলে মনে করেছে এবং প্রভুত পরিমাণে প্রেসক্রাইব করেছে। দেশের সর্বোচ্চ মেডিকাল প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা সুপার স্পেশালিস্ট এক সিনিয়র (যিনি আবার প্রবলভাবে একজন ‘সহি বাম’ এবং শহরের মেডিকাল বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে খুবই প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় এক আইকন), সবাইকে Flavipiravir খেতে বলেছেন, নিজের পরিবারের লোকেদেরও খাইয়েছেন। তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ ডিপি-তে তিনি কোভিড পজিটিভ হলেই Flavipiravir খাওয়ার গণ-পরামর্শ দিয়ে রেখেছেন।
এ হেন পরিস্থিতিতে অনেক তথ্যপ্রমাণ ঘেঁটে, নিয়মিত ট্রায়াল রিপোর্ট এবং বিভিন্ন হাসপাতালের প্রোটোকল অনুসরণ করে আমি নিজে এ সবের অসারতা বুঝলেও আমার ঘনিষ্ঠদের বেশিরভাগকেই বোঝাতে অসমর্থ হই। AIIMS থেকে শুরু করে ICMR-সহ দেশের সিংহভাগ মেডিকাল সংগঠন যখন ভুয়ো তথ্যে রাশ না টেনে উল্টে তা প্রচার করেন, তখন সামান্য এক-দুজনের বোঝাপড়ায় কী-ই বা আসে যায়! CMC Vellore, কস্তুরবা হাসপাতাল (MGIMS, Sevagram)-এর মত কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান নিয়মিত তাদের প্রোটোকল আপডেট করলেও এবং ব্যাপকভাবে এইসব ভুয়ো তথ্য ব্যান করার চেষ্টা করে গেলেও, ICMR তার মূল প্রোটোকল পাল্টায় না। কোভিড-১৯ সংক্রান্ত দেশের বেশিরভাগ সরকারি স্বাস্থ্যবিধিও একই থেকে যায়, কেবল নতুন নতুন ভুয়ো তথ্য সম্বলিত সুপারিশ যোগ হতে থাকে। সাথে পাল্লা দিয়া বাড়তে থাকে সামাজিক মাধ্যমে ককটেল থেরাপির প্রচার। অচিরেই ব্ল্যাক হতে শুরু করে Hydroxychloroquine এবং Ivermectin-এর মতন অতি সাধারণ ওষুধও। Hydroxychloroquine এবং Azithromycin একত্রে যে অত্যন্ত বিপদজ্জনক হতে পারে সেকথা ক্রমশই স্পষ্ট হতে থাকে বিভিন্ন ট্রায়ালে, এবং তা নিয়ে WHO নির্দিষ্ট নির্দেশিকাও জারি করে। তারপরেও Hydroxychloroquine-Azithromycin কিংবা Ivermectin-Doxycycline -এসবের বেলাগাম ব্যবহার চলতেই থাকে। Hydroxychloroquine মিথ যেমন দক্ষিণপন্থী মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর ভারতীয় বন্ধুরা প্রচার করে জনপ্রিয় করে তোলেন, Ivermectin তেমনই বাংলাদেশের অবদান। Hydroxychloroquine এবং Ivermectin যে ডোজে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হলে খেতে বলা হচ্ছে তা অনেকটা ট্রাম্প এর “strong bleaching agent” দিয়ে করোনা সারানোর পরামর্শের মত। কিন্তু গ্লোবাল সাউথের সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় এ হেন দুর্বিপাকের সময় পরিস্থিতি সামলাতে সস্তার টোটকা আর কী-ই বা হতে পারত! তাই বহু দায়িত্ববান প্রোথিতযশা চিকিৎসক-গবেষকরা বারবার বারণ করা সত্ত্বেও এইসব ড্রাগ-ককটেল যথেচ্ছভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সরকারি হাসপাতালের নির্দেশনামাতেও থাকছে।
Flavipiravir সরাসরি সরকারি নির্দেশিকা বা ICMR গাইডলাইনে না থেকেও কোভিড-১৯-এ কার্যকর একটা অ্যান্টিভাইরাল হিসাবে প্রথম থেকেই দেওয়া হয়ে আসছে। ২০১৪ সালে এই ওষুধ প্রথম জাপানে অনুমোদন পায় কেবলমাত্র জরুরি ভিত্তিতে গুরুতর ইনফ্লুয়েঞ্জার ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য। লক্ষণীয়, এই ওষুধ FDA ট্রায়ালে গেলেও আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডে কিন্তু এর কোনরকম ব্যবহারই অনুমোদন পায় নি। উহানে কোভিড-১৯-এ এটা ব্যবহার করা হয় আর কিছু না পেয়ে। অচিরেই এটা অনুমোদন পায় ইতালি, জাপান, রাশিয়া, ইউক্রেন, মলদোভা, কাজাখস্তানের মত কয়েকটি দেশে, যদিও কেবলমাত্র জরুরি ভিত্তিতে। হাঙ্গেরিসহ বেশ কিছু দেশে এটা প্রয়োগের আগে পেশেন্টকে কনসেন্ট ফর্ম সই করতে হয়, যেমন আমাদের কোন অপারেশনের আগে করতে হয়।

ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় পুরোপুরি অব্যাবহার্য্য এই ওষুধ ভারতে ‘মাইল্ড টু মডারেট’ কোভিড-১৯-এ ব্যবহারের জন্য DCGI অনুমোদন লাভ করে জুন ২০২০তে, কিছু ওষুধ কোম্পানির মদতপুষ্ট নির্দিষ্ট চিকিৎসকদের কৌশলী লবিয়িং-এর ফলে। অচিরেই মুম্বাইয়ের গ্লেনমার্ক ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা এর ট্রায়াল শুরু করে এবং ট্রায়াল ডেটা ম্যানিপুলেট করে, ভুল ব্যাখ্যা করে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই ঔষধের মিথ্যা কার্যকারিতা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ। যেসব চিকিৎসক এটাকে বাজারে আনার সুযোগ করে দিয়েছিলেন, তাঁরা অচিরেই এটাকে জনপ্রিয়ও করে তোলেন (সাধারণভাবে Fabiflu নামে পাওয়া যায়)। CMC ভেলোরের মতো অগ্রণী ও রোগীবান্ধব প্রতিষ্ঠান কিন্তু নিয়মিত তাঁদের চিকিৎসা নির্দেশিকা বদলে চলেন ট্রায়াল ডাটা অনুযায়ী। তাঁরা শুধু যে এর প্রয়োগে উৎসাহ দেন না তা নয়, অপব্যবহার বন্ধ করতে অচিরেই তাঁদের ফার্মেসি থেকে Fabiflu বিক্রিও বন্ধ করেন। কিন্তু দেশের অন্যান্য জায়গায় চলতেই থাকে এর ব্যাপক ব্যবহার, আর যেহেতু শুধু গিলে খেয়ে নিলেই হয়ে যায় (orally administrable, no need to admit patient for IV dosages etc.), আর অল্প কয়েক হাজার টাকাতেই পুরো কোর্স করে নেওয়া যায়, তাই ভয় এবং ভুয়ো তথ্যের সাহায্যে এটা দ্রুত জনপ্রিয় হয়। ফেসবুক খুললেই এখন দেখা যায় Flavipiravir-এর জন্যে হাহাকার। যেমনটা আমরা দেখি কোভিড-১৯-এর ‘ওয়ান্ডার কিওর’ হিসাবে সবচেয়ে বেশি প্রচারিত ওষুধ Remdesivir নিয়ে।
স্ক্রোল-কে দেওয়া এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে মুম্বাইয়ের বিশিষ্ট পালমোনোলজিস্ট ডাঃ ল্যান্সলট পিন্টো স্পষ্ট করে জানিয়েছেন এই সঙ্কটের কথা। Remdesivir, Tocilizumab, প্লাজমা থেরাপি — এসবের প্রসঙ্গে, খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন যে অন্য সব ককটেলের মতই “Remdesivir does not save lives.” আরো অনেক সচেতন চিকিৎসক-গবেষকের মত তিনিও জানাচ্ছেন ব্যক্তিগত ক্লিনিকাল অভিজ্ঞতা থেকে কোন ড্রাগ সুপারিশ করা যায় না, তার জন্য দরকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। “As a treating physician, it would be fallacious for me to believe that my personal clinical experience could not be beyond the realm of chance; this is why science believes in the law of large numbers and not on anecdotal evidences. If a physician believes strongly in an anecdotal experience, s/he should report it as case or an experience and such cases are often the seeds for future clinical trials. A pandemic is no excuse to trial therapies without evidence.”
একই কথা বিগত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বলে চলেছেন ফাহিম ইউনুস, তৃষা গ্রীনহ্যাল, এস পি কলন্ত্রি, মধুকর পাই এবং আরো অনেকে। কিন্তু এসবের থেকে অনেক বেশি ‘ক্যাচি’ হল বেশ কিছু নামী দামী ওষুধের প্রেসক্রিপশন, যাতে উদ্বিগ্ন রোগীদের বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে দ্রুত শান্ত করা যায়। সর্বোপরি এতসব ট্রায়াল রিপোর্ট মানতে গেলে ওষুধ কোম্পানির হাজার হাজার কোটির ব্যবসাও বন্ধ হয়ে যাবে। ভিত্তিহীন ককটেল থেরাপি ছড়িয়ে দিলেই সর্বাংশে সুবিধা। চিন্তিত মানুষ মারণব্যাধির বিরুদ্ধে ‘উপযুক্ত’ ওষুধ পেয়ে খুশি; মানুষের সংকটের সুযোগে মেডিকাল ব্যবসারও বাড়বাড়ন্ত, আর medico-bureaucratic দায়ও মেটানো গেল। তাই ফাহিম ইউনুস যতই ‘myth’ আর ‘fact’ এর তফাৎ সহজ করে টুইট করতে থাকুন না কেন, সহজ ভাষায় বোধগম্য ভিত্তিতে ভুয়ো তথ্যকে মিথ্যা প্রমাণ করতে থাকুন না কেন, আমাদের বিশেষজ্ঞরা সেসব জানতে এবং মানতে নারাজ।
অনেক অংশগ্রহণকারী নিয়ে হওয়া একাধিক লার্জ স্কেল RCT-তে (WHO সলিডারিটি ট্রায়াল সহ) স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে Remdesivir, অর্থাৎ কোভিড-১৯-এর যে তথাকথিত ‘ওয়ান্ডার ড্রাগ’ আজ দুর্লভ হয়ে ব্ল্যাক হচ্ছে (যা ঠেকাতে আদালতের নির্দেশে সরকারি নির্দেশনামা তৈরি করতে হচ্ছে), তা মারা যাওয়ার সম্ভাবনা একটুও কমায় না এবং কোনভাবেই মাইল্ড/ মডারেট ডিজিজকে আরো খারাপ (severe) হওয়া থেকে আটকাতে পারে না। কিন্তু অনেক ছোট ওপেন ট্রায়ালে (যেগুলোর গ্রহণযোগ্যতা যথেষ্ট সন্দেহজনক) দাবি করা হয়েছে যে হাসপাতালে ভর্তি থাকার সময় কমাতে এর কোন ভূমিকা থাকলেও থাকতে পারে। যদিও এখানেও নানা ‘ফ্যালাসি’ আছে। যেমন সেক্ষেত্রে এটা দ্রুত প্রয়োগ করতে হবে, অতিরিক্ত অক্সিজেনের অভাব হলে এবং আরো অনেক প্যারামিটার ঠিক থাকলে তবেই ওষুধটা দেওয়া যাবে, নচেৎ নয়। মজার ব্যাপার, কোভিড-১৯-এর ফলে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া বা অন্য খারাপ লক্ষণগুলো প্রায় কোনটাই দ্বিতীয় সপ্তাহের আগে দেখা যায় না। ফলত সেখানে Remdesivir প্রয়োগে উপকারের সম্ভাবনা নেই বা খুবই কম। তাই ১৬ই এপ্রিল ২০২১, Remdesivir সংক্রান্ত এক মামলার শুনানিতে গুজরাট হাইকোর্ট আক্ষেপ করেন: “the public doesn’t know… public thinks Remdesivir will save them from Covid-19… unnecessary hype has been created…the state should have seen to it that Remdesivir was not given that much of importance if it was not at all that relevant’।
এই শুনানির পর ওই নির্দিষ্ট ড্রাগটিকে সংযতভাবে এবং কেবলমাত্র সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড মেনে ব্যবহার করার সরকারি নির্দেশিকা বেরিয়েছে। তবে অন্য বিপুল প্রচারিত ককটেল-থেরাপিগুলো যেমন চলার তেমনি চলছে। সাম্প্রতিককালের এই সরকারি নির্দেশিকায় কি কি প্রোটোকল মেনে রেমডিসিভির দেওয়া যাবে তাও বলা রয়েছে। উপরন্তু রোগীর পরিবারের হাতে কেবলমাত্র যে স্লিপ লিখে ওষুধের নামটি ধরিয়ে দেওয়া যাবে না, হাসপাতালকেই ন্যায্য দামে তা সোজা পথে সরাসরি প্রস্তুতকারক সংস্থা বা ডিলারের কাছ থেকে কিনে রোগীর জন্য ব্যবস্থা করে দিতে হবে, সেই নির্দেশও স্পষ্ট করে এখানে বলা আছে। কিন্তু তবুও অনেক জায়গাতেই আগের মতোই রেমডিসিভির লিখে রোগীর পরিবারকেই কিনে নিয়ে আসতে বলা হচ্ছে, যা কিন্তু এখন বেআইনিও বটে। পাশাপাশি প্লাজমার আবেদন, Flavipiravir, Itolizumab, আর গুচ্ছ গুচ্ছ অদ্ভুত কম্বিনেশনের মাল্টিভিটামিন-মিনারেলস এবং অ্যান্টিবায়োটিক চলছেও। ডাক্তার পিন্টো সখেদে বলেছেন ‘these drugs, to the best of my knowledge, are included in the guidelines of NO OTHER COUNTRY in the world’.
হেপাটাইটিস সি-র জন্য তৈরি হওয়া ওষুধ ইবোলা এবং মার্স এপিডেমিকে ব্যবহৃত হয়েছে বলেই তা যে করোনাতেও কার্যকরী হবে একথা টেলিওলজি এবং হাইপোথেটিক্যাল ফার্মাকোডিনামিক্স দিয়ে ব্যাখ্যা করে দিলেও, ট্রায়াল ডেটা অগ্রাহ্য করে খেয়ালখুশি মত কেবলমাত্র নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে এমনকি কোন অভিজ্ঞ চিকিৎসকও যে ওষুধ প্রয়োগ করতে পারেন না, Remdesivir নিয়ে আদালতের মন্তব্য তা প্রমাণ করে। একইরকম ভাবে প্লাজমা থেরাপিও প্রথমদিকে কার্যকর বলে ভাবা হলেও ট্রায়ালের পরে তা কিন্তু কোন আশা জাগাতে পারেনি। প্লাজমা প্রয়োগের ঝুঁকিকে তার লাভ অতিক্রম করে যায়নি। বিশ্বের বহু বড় চিকিৎসাকেন্দ্রে প্লাজমা থেরাপি তাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যদিও আমাদের দেশে প্রাণপণে নানা সংশোধিত নির্দেশিকা ও মানদণ্ড যোগ করে নিত্যনতুন নয়া কলেবরে তার প্রয়োগ চলছে, কোনোও RCT-র তোয়াক্কা না করেই।

এতক্ষণ পর্যন্ত যা লিখলাম তা কিন্তু একমাত্র বাস্তব নয়। বলা যেতে পারে প্রধানত শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত উচ্চ মধ্যবিত্তের বাস্তবতা, দেশের বিস্তীর্ণ গ্রামীণ এলাকার মানুষের কাছে এখনো এসবও দূর অস্ত! নিজের সীমিত অভিজ্ঞতা দিয়ে (গ্রাম, মফস্বল ও শহরকেন্দ্রিক হেলথকেয়ার প্র্যাক্টিস বিষয়ে) এবং বিভিন্ন গ্রাউন্ড রিপোর্ট পড়ার পরে ও মধ্যবিত্ত নন এমন সব মানুষদের সঙ্গে কথাবার্তায় যা জানছি তা হল তাদের প্রথম দিন থেকেই ‘ওরাল স্টেরয়েড’ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে ‘ভিটামিন-অ্যান্টিবায়োটিক ককটেল’সহ। বহু পাশ করা ডাক্তারই এমনটা করেছেন, করেই থাকেন। প্রান্তিক অঞ্চলে এবং প্রান্তিক মানুষের মধ্যে চিকিৎসা করা ডাক্তারবাবুরা জানেন যে তাঁদের সর্বরোগহর সম্পদ হলো ওই ‘ওরাল স্টেরয়েড’, এবং জ্বরজারী থাকলে ‘অ্যান্টিবায়োটিক-প্যারাসিটামল কম্বিনেশন’ সমেত সস্তার ওই ‘ওরাল স্টেরয়েড’ই তাঁদের ভরসা।
মুশকিল হল তাঁরা যা জানেন না বা খেয়াল করছেন না, তা হল কোভিড-১৯-এ অক্সিজেন ঘাটতি হয়ে অক্সিজেন যখন দেওয়া হচ্ছে কেবলমাত্র তখনই কিন্তু (SpO2≤90-92%) ‘ওরাল’ বা ‘ইন্ট্রা-ভেনাস’ স্টেরয়েড (মানে ‘সিস্টেমিক স্টেরয়েড’) ফলপ্রসূ হবে, নচেৎ তা ক্ষতিকারকও হয়ে উঠতে পারে। বোঝার জন্যে একটা সহজ উদাহরণ দিই। সব আনাজ মশলা একসঙ্গে কড়াইতে দিয়ে জল না দিয়ে রান্না চাপিয়ে দিলে যেমন রান্না পুড়ে যাবে, ‘সাপ্লিমেন্টাল’ অক্সিজেন ছাড়াই স্টেরয়েড দিয়ে দিলে ঠিক তেমনটাই হবে। সহজ করে বললে ‘ইনফ্ল্যামেশন’ কমার পাশাপাশি ‘লাংস-ভেন্টিলেশন-পারফিউসন’ ও কমে যাবে যদি অক্সিজেন বাদে শুধুমাত্র স্টেরয়েড দেওয়া হয়। বিভিন্ন ট্রায়ালেও একথা প্রমাণিত হয়েছে এবং বিনা অক্সিজেনে ‘ওরাল স্টেরয়েড’ প্রয়োগ না করার কথা বলা হয়েছে বারবার।
সবচেয়ে মজার কথা, এই লেখা জমা দেওয়ার সময় হাতে এলো ৩রা মে তারিখের AIIMS এর মেডিসিন বিভাগের করা একটি সিন্ড্রোমিক অ্যাপ্রোচ, যেখানে এই চূড়ান্ত ভুল ব্যাপারটাকে আংশিক বৈধতা দিয়ে অক্সিজেনের কোন উল্লেখ না করেই বলা হয়েছে বেশি জ্বরে বাড়িতেই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সিস্টেমিক স্টেরয়েড দেওয়া যেতে পারে। ঐ একই নির্দেশিকাতে বরাবরের মত Ivermectin-ও আছে। আরো অনেক সচেতন চিকিৎসক-গবেষকের মতন আমেরিকার মেয়ো ক্লিনিকের প্রখ্যাত চিকিৎসক প্রিয়া সম্পথকুমারও সাম্প্রতিককালে কেবলমাত্র সামাজিক মাধ্যমেই নয়, সরাসরি ভারতীয় সংবাদপত্রে, টিভি চ্যানেলে এসে চেষ্টা করেছেন এইসব ‘ডিস্-ইনফরমেশন’কে কাউন্টার করতে, বারবার করে তাঁরা সহজ ও স্পষ্ট ভাষায় দ্বিধাহীনভাবে জানাচ্ছেন যে মাইল্ড/ মডারেট কোভিডে ওরাল স্টেরয়েড ক্ষতিকারক হতে পারে , কিন্তু তারপরেও হুশ ফিরছে না আমাদের স্বাস্থ্য-নির্দেশিকা প্রণয়নকারীদের। AIIMS -এর এই নতুন নির্দেশিকার পর একটা কথা এখানে আরোও স্পষ্ট করা দরকার: অনেক চিকিৎিসকই এই প্রাক্টিসকে জাস্টিফাই করতে এমনকি একথাও বলছেন যে, কেন? আমরা তো নানা অন্য অসুখেও (যেমন ত্বকের সমস্যায় বা আর্থ্রারাইটিস বা আর কোনো ইনফ্ল্যামেটরি কন্ডিশনে) ‘ওরাল স্টেরয়েড’ খেয়ে থাকি, তখন কি আমরা মারা যাই? বুঝতে হবে দুটি বিষয় এখানে, ১. এটি কোভিড, অন্য কিছু নয়, অন্য রোগের ওষুধ প্রয়োগবিধি দিয়ে এখানে কোনো ওষুধ প্রয়োগ করা যাবে না, ট্রায়াল রিপোর্ট ফলো করতে হবে, এবং ট্রায়াল রিপোর্ট স্পষ্টভাবে বিনা সাপ্লিমেন্টাল অক্সিজেনে কোভিডে ‘ওরাল স্টেরয়েডের’ ব্যবহার অনুমোদন করছে তো নাই, বরং তা দিলে ক্ষতির সম্ভাবনা বলে জানাচ্ছে; এবং ২. এখানে একটি অলরেডি কম্প্রোমাইজড ফুসফুস বর্তমান যা প্রদাহসংকুল এবং অক্সিজেন সংকটে আছে, বিনা সাপ্লিমেন্টাল অক্সিজেনে, ‘ওরাল স্টেরয়েড’ পেলে প্রদাহ কমার পাশাপাশি তার কার্যক্ষমতা হ্রাস পেয়ে অক্সিজেন-সংকট আরো তীব্র হতে পারে যেমন, তেমনই শরীরের সামগ্রিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যেতে পারে, জটিল হয়ে উঠতে পারে যেকোনো মাইল্ড/ মডারেট কোভিড সংক্রমণ। সবচেয়ে বড়ো কথা এই যে, নানা হাইপোথেটিক্যাল প্যাথও-ফিজিওলোজিক্যাল মডেল বা টেলিওলজিক্যাল ব্যাখ্যা দিয়ে যে ওষুধ প্রয়োগের সিদ্ধান্ত করা যায় না, একথা আধুনিক বায়ো-মেডিসিনের চিকিৎসকদের সর্বাগ্রে বুঝতে হবে, নচেৎ তাঁদের সঙ্গে লজিকাল-জ্যোতিষচর্চার ফারাক থাকবে খুব সামান্যই। ট্রায়াল রিপোর্ট অমান্য করে দেওয়া এইসব অদ্ভুত ও ক্ষতিকারক চিকিৎসা-টোটকার নিদান যে জীবনদায়ী অক্সিজেন ও ন্যূনতম প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরিকাঠামোর অভাবের ঘাটতিকে ধামাচাপা দিতে পারে না, তা কিন্তু দেখাই যাচ্ছে দেশজুড়ে, অসহায় মানুষের হাহাকারে। গ্রামাঞ্চলে এবং শহরাঞ্চলে স্বল্প আর্থিক সম্বলের মানুষদের covid19-র ‘সিম্পটমস’ থাকলেই বহুদিন ধরেই কিন্তু দেওয়া হয়েছে, হচ্ছে দু’রকম এন্টিবায়োটিক ও ‘ওরাল- স্টেরয়েড’ (এমনকি যাদের কোভিড টেস্ট-ও হয়নি এবং কোন ‘কো-মর্বিডিটি’ও নেই তাদেরকেও)। এ যে কি ভয়ানক কম্বিনেশন তা শারীরবিদ্যা ও চিকিৎসাশাস্ত্রের সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তি মাত্রেরই আন্দাজ করতে পারার কথা।
শুধুমাত্র এরকম সব নানানরকম মারাত্মক কম্বিনেশনের জন্যই হয়তো অনেকের স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে, যাঁরা অন্যথায় ঠিক থাকতেন। ফাহিম ইউনুস এবং অন্যান্য সচেতন ও সক্রিয় চিকিৎসক-গবেষকরা প্রথম থেকেই বারবার জানাচ্ছেন কোভিড-১৯ একটি “self-limiting disease in more than 85% of cases”। আমাদের দেশের এই প্রবল সংক্রমণের মুখে ১৫% সিরিয়াস কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যাও অনেক। আর সেই সিরিয়াস কোভিড-১৯-এর মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সিস্টেমিক স্টেরয়েড (‘অক্সফোর্ড রিকভারি ট্রায়াল’ ডেটা অনুযায়ী যা কেবলমাত্র ‘সাপ্লিমেন্টাল’ অক্সিজেনের সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় ফুসফুসের প্রদাহ জরুরি ভিত্তিতে কমানোর জন্য দেওয়া যেতে পারে) । অন্যান্য নানা জরুরি ওষুধের সঙ্গে তা কিন্তু যথেষ্ট সস্তা এবং সহজলভ্য (অনেকসময়ই একটি আন্টি-কোয়াগুলেন্ট হেপারিন বা এনোক্সাপারিন এবং অন্য সিস্টেমিক আন্টিবায়োটিক ইত্যাদির সাথে এটির প্রয়োগ তেমন ব্যয়সাপেক্ষ নয়)।
সরকার চাইলে হয়ত এই অতিমারী এমন বিশ্রী সমস্যাবহুল ইনফোডেমিক হয়ে উঠত না। একদিকে নন-কমপ্লিকেটেড কোভিডে Flavipiravir, Ivermectin, Hydroxychloroquine-এর মত অদ্ভুত সব হাতুড়ে টোটকা, অন্যদিকে Remdesivir-এর মত অকারণে ফাঁপিয়ে তোলা ড্রাগ বা প্লাজমা থেরাপির নিদান দিয়ে অসহায় রোগীর বাড়ির লোককে বিড়ম্বনায় ফেলে, সর্বস্বান্ত করে, ভুয়ো তথ্যে দিশাহারা করে, ফুলে ফেঁপে ওঠা স্বাস্থ্য ব্যবসার এই অন্যায় রমরমা সরকার চাইলে আটকাতে পারতেন।
অতএব কোভিড-১৯ মোকাবিলার যে কোনো ‘ওয়ান্ডার ড্রাগ’ বা ‘স্পেসিফিক কম্বিনেশন’ হয় না, সে কথা একজন নন-স্পেশালিস্ট মানুষ বুঝবেন বা জানবেন কীভাবে? বিশ্ব জুড়ে চলা বিভিন্ন লার্জ স্কেল ট্রায়াল রিপোর্টের তথ্য নিয়ে সাম্প্রতিককালে শতাধিক গবেষক চিকিৎসকের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে https://www.indiacovidsos.org ওয়েবসাইট। তাঁরা সহজভাবে ইনফোগ্রাফিকের মাধ্যমে কিছু গাইডলাইন দিয়েছেন ইংরেজি এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় (বাংলা সমেত)। @mygovindia, মানে ভারত সরকার তাঁদের পরামর্শ ও ইনফোগ্রাফিককে মান্যতা দিয়ে তা রিটুইট করে ছড়িয়েও দিয়েছেন। কিন্তু তারপরেও ইনফোডেমিক অব্যাহত। এই পরিস্থিতি হতাশাব্যঞ্জক হলেও একেবারেই অভাবনীয় নয়। এরকম চিরকালই হয়। কেন এমন হয়, কীভাবে হয়, ইনফোডেমিক, প্যানিক, গুজব ইত্যাদি নিয়ে নানা আকর্ষণীয় গবেষণাও হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। সমস্যা একটাই, এই সময়ে দাঁড়িয়ে শুধু গবেষণা ও উপলব্ধি করে স্থিতধী থাকার নির্লিপ্তি আর সম্ভব হচ্ছে না।
৯২%-এর উপর অক্সিজেন স্যাচুরেশন থাকলে এবং সঙ্গে কোভিডের লক্ষণ থাকলে শুধুমাত্র প্যারাসিটামল খান, প্রচুর জল খান, বিশ্রাম নিন। ৯২%-এর উপর স্যাচুরেশন, কিন্তু শ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে বা স্যাচুরেশন কমছে (<৯৬%) দেখলে Budesonide 200 ইনহেলার নিতে শুরু করতে পারেন, দুটো করে ‘পাফ’ দিনে দুবার। খুব বেশি জ্বর থাকলে (প্যারাসিটামলেও জ্বর নামছে না এমন অবস্থা হলে) একটা অ্যন্টিবায়োটিক খেতে পারেন চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে, যদি ভাইরাল ইনফেকশনের সুযোগে অন্য ‘সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন’ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে আপনার। খুব সর্দি কাশি থাকলে ‘সিম্পটমেটিক রিলিফ’-এর জন্য কোনো একটি অ্যান্টি-অ্যালার্জিক খেতে পারেন, বারে বারে ‘স্টিম’ নিতে পারেন কিন্তু Ivermectine বা Hydroxychloroquine বা Flavipiravir বা immunity booster cocktails বা ‘ওরাল স্টেরয়েড’ খাবেন না। কোভিড-১৯ চিকিৎসার কোনো ‘ওয়ান্ডার ড্রাগ’ নেই। ভাইরাল জ্বরের মত এ ক্ষেত্রেও ‘সিম্পটম কন্ট্রোল’ এবং ‘সাপোর্টিভ থেরাপি’-ই প্রধান ব্যাপার (যে সময়ে শরীর নিজের মত করে আস্তে আস্তে সাড়া দেবে)। সবসময় সবরকম সমস্যায় সমাধান বাতলে দেওয়ার মত কোভিডেরও নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ আছে — কোনো ট্রায়াল রিপোর্টই এমনটা বলছে না। এটা স্রেফ ‘মেডিকো-ব্যুরোক্র্যাটিক’ ব্যাপার।
যদি স্যাচুরেশন ৯২%-এর কম থাকে (কোভিডের লক্ষণ থাকলে পালস অক্সিমিটার যন্ত্রে অক্সিজেন স্যাচুরেশন মাপতে পারলে ভালো হয়, এই দুঃসময়ে নিজের কাছে তা না থাকলে, প্রতিবেশীর থেকে বা ফার্মেসি থেকে চেয়ে এনে যদি মাপা যায়), তাহলে হাসপাতালে ভর্তি হতে চেষ্টা করুন। যাঁরা শ্বাসকষ্টের পুরনো রোগী (সিওপিডি ইত্যাদি, যাঁদের স্বাভাবিক সময়ে অক্সিজেন স্যাচুরেশন থাকে ৯৩-৯৫%) তাঁদের জন্য এই কাট-অফ আরেকটু কম, অক্সিজেন ৮৯% বা তার কম হলে তাঁদেরও চেষ্টা করা উচিত ভর্তি হওয়ার। যদি শ্বাসকষ্ট, নীলাভ ঠোঁট বা মুখ, কথা বলার সময় শ্বাস নিতে সমস্যা, কাশির সময় মুখ থেকে রক্ত পড়া, বুকে চাপ অনুভব করা (কাশি বাদে অন্য সময়েও), ঘুম ঘুম ভাব কিংবা বিমূঢ় অবস্থার মত পরিবর্তিত মানসিক পরিস্থিতি, খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ ও চলাফেরায় সমস্যা অথবা স্বাভাবিক অবস্থার যে কোন বড়সড় পরিবর্তন ইত্যাদি যেকোন একটিও লক্ষণ যদি দেখা দেয়, তাহলেও অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করার চেষ্টা করা উচিৎ।

যদিও আমি পালমোনোলজিস্ট নই, ইন্টার্নিস্ট বা জিপি-ও নই, এমনকি সংক্রামক ব্যাধি বা ভাইরোলজিতেও আমার কোন ‘স্পেশালিস্ট’ ট্রেনিং নেই, তৎসত্ত্বেও চিকিৎসাবিদ্যার সাধারণ ধারণা ও ইংরেজি এবং সাইন্টিফিক লিটারেচার পড়ে বুঝতে পারার সুবাদে যেটুকু মনে হয়েছে তা বললাম। বিশেষজ্ঞরা যখন প্রায় সবাই নির্বাক এবং কেউ কেউ ভুয়ো তথ্য প্রচার করছেন, তেমন অসহায় পরিস্থিতিতে এইটুকু বলতেই হত।
সবশেষে এই সমস্ত প্রেক্ষাপটের অন্য একটা দিকও খুব ছোট করে উল্লেখ না করলেই নয়। ষড়যন্ত্র তত্ত্বের নানা রকম প্রবক্তারা, গেরুয়া থেকে ঘন লাল, সকলেই একের পর এক মিথ্যা কথা প্রচার করে, সম্পূর্ণ মনগড়া যুক্তি দিয়ে, ‘পপুলিস্ট’ কৌশলে কোভিড-এর ব্যাপক মৃত্যুহার ও ভয়াবহতাকে অস্বীকার করছেন, ভ্যাক্সিন নিতে বারণ করছেন। এমনকি করোনাকে “সামান্য ফ্ল্যু” বলে তাচ্ছিল্য করছেন, কিংবা আমাদের দেশে টিবি এবং সংক্রামক ব্যাধির ব্যাপক মৃত্যুহারের কাছে “করোনা বাতুলতা” বলে বৈপ্লবিক ফ্যান্টাসির ছেলেমানুষি ফানুস ওড়াচ্ছেন। এর ফলে জাতীয় বিপর্যয় কী ও কেন সে সম্পর্কে ন্যূনতম সিরিয়াস ভাবনার পরিসরও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। এইসবের মধ্যে দিয়ে আজ আবার একটা সর্বনাশা ‘লকডাউন’ এর দিকে চলেছি আমরা। মনে পড়ছে শোপেনহাওয়ারের সেই বিখ্যাত কথা, “All truth passes through three stages; first, it is ridiculed, second, it is violently opposed, third, it is accepted as being self-evident”।
অথচ এমনটা না-ও হতে পারত যদি আমরা আরেকটু সিরিয়াস হতাম। যদি এই প্রবল ইনফোডেমিক এই প্যানডেমিককে প্রায় অপরাজেয় না করে তুলত। আসলে পরিচিতদের প্রায় সবাই খুব খারাপ আছেন, থাকছেন এবং কেউ কেউ আর নেই। বিনা চিকিৎসায়, ভুল চিকিৎসায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন অগণিত মানুষ। কোভিড কমপ্লিকেশনে ‘সাইটোকাইন স্টর্ম’ হলে প্রায়শই তা সামলানো সম্ভব হচ্ছে না। স্বজন হারানো এই সময়ে সবাই সবার পাশে থাকাটাই সবচেয়ে বড় কাজ। আর সবাই অবশ্যই মাস্ক পরুন, টিকা পেলে টিকা নিন, সচেতন ও সজাগ থাকুন। এই অতিমারী ও তথ্যমারীর হাত থেকে বাঁচুন। আমরা করব জয় নিশ্চয়।

 

[লেখক চিকিৎসক-গবেষক, অন্য নানা কাজের পাশাপাশি বর্তমানে ICSSR-এর কোভিড-১৯ সংক্রান্ত একটি interdisciplinary project-এর co-PI. তথ্যসমূহ Creative Commons license অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়েছে। মতামত ব্যক্তিগত। যোগাযোগ/ মতামত জানাতে পারেন ইমেইলে talk2pradipto@gmail.com এই ঠিকানায়।]

 

সহযোগি তথ্যসূত্র :

[১] https://twitter.com/FaheemYounus/status/1386895493289107460?s=20
[২] https://science.thewire.in/the-sciences/favipiravir-glenmark-open-label-trial-primary-endpoints-efficacy-cure-timesmisleading-press-release/
[৩] https://science.thewire.in/the-sciences/cmc-vellore-covid-19-guideline-development-evidence-based-medicinedrugs-policy/
[৪] https://scroll.in/article/992553/interview-remdesivir-doesnt-save-lives-but-desperate-families-demand-that-doctorsprescribe-it
[৫] আগ্রহী পাঠক ফাহিম ইউনিসের এর The Wire পত্রিকাকে দেওয়া আধ ঘণ্টার এই সাক্ষাৎকার ভিডিওটি দেখতে পারেন, যেখানে তিনি সহজ হিন্দিতে এই নিয়ে বিশদে বলেছেন: https://www.youtube.com/watch?v=nxg-9NP_JHM
[৬] https://indianexpress.com/article/india/gujarat-high-court-questions-data-raises-remdesivir-myths-7275517/
[৭] https://www.wbhealth.gov.in/uploaded_files/corona/Document_26.pdf
[৮] https://scroll.in/article/992553/interview-remdesivir-doesnt-save-lives-but-desperate-families-demand-that-doctorsprescribe-it
[৯] Priya Sampathkumar একজন Infectious Disease physician এবং Chair of Infection Prevention and Control, Mayo Clinic, Minnesota, U.S.; ইনি https://www.indiacovidsos.org/ প্রয়াসের সঙ্গেও যুক্ত।
[১০] https://www.thehindu.com/opinion/op-ed/a-pragmatic-approach-for-covid-19/article34425675.ece
[১১] https://www.recoverytrial.net/
https://www.nejm.org/doi/full/10.1056/NEJMoa2021436
https://www.thelancet.com/journals/lanres/article/PIIS2213-2600(20)30503-8/fulltext
[১২] https://www.indiacovidsos.org/home-care/covid-management-at-home-banglain

অতিমারীর সংকটে বিপজ্জনক ওষুধ ও ভাইরাল পরামর্শের ইনফোডেমিক: ছবি Wikipedia, Japan Times ও Penn Medicine এর website থেকে।

পাঠকের উদ্দেশ্যে নাগরিক ডট নেটের তরফ থেকে সচেতনতা বার্তা: এই নিবন্ধ একজন অভিজ্ঞ এবং দক্ষ চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার, আপনার পরিবার বা প্রিয়জনের মধ্যে কারোর COVID-১৯/কোরোনার উপসর্গ দেখা দিলে অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.