কাব্যি করবেন না। এই মৃত্যু উপত্যকাই আমার দেশ, এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চের প্রত্যেকটা বাঁশ আমাদের নিজের হাতে পোঁতা। এখন চোখ বড় বড় করে বিস্ময় প্রকাশ করলে চলবে না। যখন বেসরকারিকরণকে সর্বসন্তাপহর বটিকা বলেছিলেন, যখন সিগারেটে সুখটান দিয়ে বলেছিলেন “ফেলো কড়ি মাখো তেল”, তখন ভেবেছিলেন হাসপাতালে শয্যা খালি থাকলে তবে আপনার মেডিক্লেম কাজে লাগবে? মনে ছিল না অক্সিজেন কম পড়লে আপনি কোটিপতি হলেও লাভ হবে না?

ডাক্তার কাফিল খান নিজের পকেটের পয়সা দিয়ে অক্সিজেন আনিয়ে শিশুদের প্রাণ বাঁচাতে গিয়েছিলেন। সেই অপরাধে উত্তরপ্রদেশ সরকার তাঁকে হাজতবাস করাল দীর্ঘদিন। আজ সেই রাজ্যে শ্মশানে জায়গা নেই বলে ফুটপাথে পোড়ানো হচ্ছে মৃতদেহ।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

 

অথচ সরকার বলছে এপ্রিল মাসে কোভিডে মৃতের সংখ্যা মাত্র দুই!

 

কে নির্বাচিত করেছিল এমন সরকারকে? ক্রেনিয়াস গ্রহের অ্যাং আর তার জাতভাইরা? এখন সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ নিজেও কোভিডাক্রান্ত। কিন্তু গত বছর যখন প্রধানমন্ত্রীর বিধানে ভাইরাস তাড়াতে থালা বাজিয়েছিলেন, সে দৃশ্য যারা হাঁ করে টিভিতে দেখেছে, নিজেও সোৎসাহে থালা বাজিয়েছে — তারা তো এই দেশেরই মানুষ। পথে ঘাটে ঝগড়া করেছে, হোয়াটস্যাপ ফরোয়ার্ডকে বেদবাক্য বলে ধরে নিয়ে আওয়াজের চোটে করোনা ভাইরাস মরে যাবে, এই তত্ত্ব প্রচার করেছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীরা — তারা সবাই এ দেশের মানুষ। এর বিপরীতে করোনা অতিমারী আসলে এক পাহাড়প্রমাণ ফাঁকি, লড়াই আন্দোলন দমন করার জন্য সরকারের তৈরি এক ধাপ্পা, করোনা সাধারণ সর্দিকাশি, ফ্লু-এর চেয়ে বেশি কিছু নয় — প্রবল আত্মবিশ্বাসে এসব বলে গেছে যারা, তারাও কেউ ভিনগ্রহের বাসিন্দা নয়।

ইন্ডিয়ান মেডিকাল অ্যাসোসিয়েশন জানাচ্ছে এখন অব্দি চলতি অতিমারীতে অন্তত ৭৩৯ জন এম বি বি এস ডাক্তার মারা গেছেন, এই দ্বিতীয় ঢেউতেই তিনজন। আই এম এ না বললেও আমরা নিজেদের অভিজ্ঞতায় জানি — ডাক্তার, নার্সরা বারো ঘন্টা, ষোল ঘন্টা ডিউটি করছেন সেই গত বছরের মার্চ থেকে। খাওয়ার সময় নেই, বাথরুমে যাওয়ার সময় নেই, ঋতুমতী মহিলারা ন্যাপকিন বদলানোর সময় পর্যন্ত পাচ্ছেন না। তাঁদের ধন্যবাদ জানানোর জন্যই নাকি মহামতি নরেন্দ্র মোদী থালা বাসন বাজাতে বলেছিলেন দেশের সকলকে। এ দেশের অনুগত মানুষ তাঁর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামণ ঘটা করে ১.৭ লক্ষ কোটি টাকার কোভিড-১৯ ত্রাণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন। তাতে সাফাই কর্মচারী, ওয়ার্ড বয়, নার্স, আশা কর্মী, প্যারামেডিক, টেকনিশিয়ান, ডাক্তার, বিশেষজ্ঞ প্রমুখের জন্য ৫০ লক্ষ টাকার বিমা প্রকল্প ছিল। ২৬শে মার্চ, ২০২০ তারিখে মন্ত্রী বলেছিলেন এতে নাকি প্রায় ২২ লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী উপকৃত হবেন। এ বছরের ২৪শে মার্চ কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক সার্কুলার জারি করে সেই বিমা প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছে। [১]

‘দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ জানাচ্ছে এই এক বছরে মাত্র ২৮৭ জন এই বিমার টাকা দাবি করেছেন। এই ধূর্ত, নির্দয় সরকারকে গদিতে বসিয়েছে কি পাকিস্তানের মানুষ? রাজ্যে রাজ্যে (পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই) এদেরই ক্ষমতায় আনতে উদগ্রীব কি বাংলাদেশের মানুষ?

পশ্চিমবঙ্গে তো আবার আজকাল বাংলাদেশ বাদ দিয়ে কোন আলোচনা চলে না। ওটা যে আলাদা দেশ তা গুলিয়ে যায় অনেকসময়। ও দেশের ধর্ষিতাকে এ রাজ্যের নির্বাচনে ইস্যু করার চেষ্টা হয়। ও দেশের লোকে পশ্চিমবঙ্গ ভরে গেছে বলে যারা ভীষণ চিন্তিত, তাদের স্বভাবতই এ দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অব্যবস্থা নিয়ে ভাবার সময় নেই। মুশকিল হল আমরা এ দেশে ভ্যাক্সিন পাঠাচ্ছি, সে দেশে ভ্যাক্সিন পাঠাচ্ছি বলে প্রধানমন্ত্রী আস্ফালন করছেন, এদিকে ওষুধের জন্য বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর কাছে হাত পাততে হচ্ছে। ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছেন। মোদী সরকারের কাছে বাংলাদেশ থেকে এই ওষুধ আমদানি করার অনুমতিও চেয়েছেন।

 

অনুমতি পাবেন কিনা কে জানে? মোদীর অনুমতি দেওয়ার সময় হবে কি? উনি তো গোড়াতেই বলেছিলেন উনি প্রধানমন্ত্রী নন, প্রধান সেবক। ফলে ওঁর অনেক কাজ। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে নাকি অতিমারীর জরুরি পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে ফোন করে শুনেছেন তিনি পশ্চিমবঙ্গে ভোটের প্রচারে ব্যস্ত, ফিরলে উত্তর পাবেন। ইতিমধ্যে কত মানুষ আর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরবেন না, সে খবরে প্রধানমন্ত্রীর দরকার নেই। এমন নয় যে তিনি এই প্রথম অযোগ্যতার বা নৃশংসতার পরিচয় দিচ্ছেন। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ই তিনি নিজের জাত চিনিয়েছেন। সেসব জেনেশুনে বিষ পান তো আমরাই করেছি। এখন বিষের জ্বালায় এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না বললে চলবে কেন?

পৃথিবীর সব দেশে কোভিডের প্রকোপে লকডাউন হয়েছে, কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষকে কয়েক শো মাইল পায়ে হেঁটে বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করতে হয়নি, পথে ক্ষিদে তেষ্টায় মরতে হয়নি। এ দেশে হয়েছে। যখন তারা মরেছে, তখন আমরাই তো অসন্তোষ প্রকাশ করেছি, লকডাউন সত্ত্বেও এরা হাঁটছে কেন? অবৈজ্ঞানিক হলেও পোকামাকড় জ্ঞানে মানুষগুলোকে পথে বসিয়ে গায়ে স্প্রে করে স্যানিটাইজ করা হয়েছে। ওতেই নাকি কোভিড ছড়ানো বন্ধ হবে। তাতেই বা আমাদের কজনের আপত্তি হয়েছে? বিদেশ থেকে আসা বড়লোকেরা বেমালুম পরিচিতি বা টাকার জোরে কোয়ারান্টিনের বালাই না রেখে দেশের ভিতর সেঁধিয়ে গেছে আর আমরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছি বাড়ির কাজের লোক, ক্যাটারিং-এর কাজ করা লোক, রিকশাওয়ালা, পথের ভিখারি আর প্রবাসী শ্রমিকরাই ভাইরাস ছড়াচ্ছে। লেখাপড়া শিখে অবিজ্ঞানের চাষ করেছে যারা, অমুক পাঁপড় খেলে করোনা হয় না, তমুক আসন করলে করোনা হয় না, মাথায় গোমূত্র ছেটালে করোনা হয় না — এসব বিশ্বাস করেছে যারা, তারা কোন দেশের লোক?

কত না কালক্ষেপ করেছি গোটা পৃথিবীর দখল নেওয়ার জন্য ভাইরাসটা চীন গবেষণাগারে বানিয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছে কিনা সেই আলোচনায়। অথচ চীন যে কয়েক মাসের মধ্যে একগাদা নতুন হাসপাতাল বানিয়ে ফেলেছিল সেদিকে নজর দিইনি। না দেশ, না রাজ্য — কোন সরকারকে প্রশ্ন করিনি আমাদের একটাও নতুন হাসপাতাল হল না কেন? মুখ্যমন্ত্রী রাস্তায় নেমে গোল কেটেছেন কাকে কোথায় দাঁড়াতে হবে, আমরা হাততালি দিয়ে বলিনি “ওঃ, কি দারুণ লিডার! সামনে দাঁড়িয়ে লড়ছেন।” করোনাকে বালিশ করে শুয়ে পড়তে বলেছেন, আমরা বলেছি “বিজ্ঞানীরাও তো তা-ই বলছেন। এ ভাইরাস তো অনেকদিন থাকবে।” এখন কোথায় গেল কোলবালিশ আর কোথায় গেল প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞান, যা সবদিক থেকে পাশ্চাত্যের চেয়ে উন্নত? কোনটাই পারল না তো বাঁচাতে? এতদিন পরে গণেশের প্লাস্টিক সার্জারির প্রাচীন কৌশলে বিশ্বাসী প্রধানমন্ত্রীর সরকার বলছে একশোটা হাসপাতালে নতুন অক্সিজেন প্ল্যান্ট বানানো হবে পিএম কেয়ারস ফান্ডের টাকায়।[২]

দেড়শো কোটি মানুষের দেশের মোটে একশোটা হাসপাতালে অক্সিজেনের ব্যবস্থা করার টাকার খোঁজ এত দিনে পাওয়া গেল। এদিকে দুর্গাপুজোর টাকা জোগানো রাজ্য সরকার এখনো কোভিডের প্রথম ঢেউয়ের চিকিৎসা বাবদ শ্রীরামপুর শ্রমজীবী হাসপাতালের প্রাপ্য আট কোটি টাকা দেয়নি।[৩]

আহা, নিজ রাজনৈতিক এজেন্ডার স্বার্থে আমরা কত কূট তর্কই না করেছি! কেউ পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা খারাপ বললে বলেছি “গুজরাটের অবস্থা কি ভাল? মধ্যপ্রদেশের অবস্থা কি ভাল?” যেন ঐ রাজ্যগুলোর চেয়ে কম লোক মরলেই এ রাজ্যের সরকারকে মেডেল দিতে হবে, এ রাজ্যের মানুষের জীবনের দাম নির্ভর করে ঐ রাজ্যগুলোর মানুষের জীবনের উপর। সারা দেশে কয়েকটা হাতে গোনা সংবাদমাধ্যম সাহস করে খবর করেছে যে কেন্দ্রীয় সরকার এবং অনেকগুলো রাজ্য সরকার রোগীর সংখ্যা, মৃতের সংখ্যা লুকোচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে অকর্মণ্য সরকারগুলো দারুণ তৎপরতায় গর্জে উঠেছে, মামলা মোকদ্দমার হুমকি দেওয়া হয়েছে। কোন পার্টির সরকার তা দেখে আমরা ঠিক করেছি খবরগুলো বিশ্বাস করব কিনা। যদি কেউ কখনো বলে ফেলে কেরালা করোনা ভাল সামলাচ্ছে, অমনি আমরা তক্কে তক্কে থেকেছি কেরালায় কেস বাড়ে কিনা, মৃত্যু বাড়ে কিনা। বাড়লেই সে কি উল্লাস! “বাঃ বাঃ! কেরালায় লোক মরেছে। হল তো? কেরালা মডেল?” এই শকুনবৃত্তি যে দেশের মানুষ করে, সে দেশই তো মৃত্যু উপত্যকা। এখন আমার দেশ না বলে এড়িয়ে গেলে হবে?

যখন সরকার বলেছিল করোনা তেমন চিন্তার ব্যাপার নয়, তখন আয়োজিত তবলিগী জামাতের মর্কজকে দেশের করোনা ছড়ানোর জন্য দায়ী করে কত না চেঁচিয়েছি। হিন্দু এলাকায় মুসলমান ফলওয়ালা, সব্জিওয়ালাকে ঢুকতে দিইনি কারণ নিশ্চিত খবর ছিল, কোভিড-১৯ ওদের বাধ্য ছেলে। ওদের শরীরে থেকে অসুস্থ করছে না, কিন্তু ওদের কথায় হিন্দুদের দেহে ঢুকে পড়ছে। এখন লক্ষ লক্ষ লোক কুম্ভমেলায় গা ঘেঁষাঘেঁষি করলেও চিন্তা নেই, কারোর করোনা হবে না। এ কথা বলছে কোন দেশের মন্ত্রীসান্ত্রীরা?[৪]

তাদের মন্ত্রী বানিয়েছে কারা? টিমবাকটুর লোকেরা?

নেতা মন্ত্রীরা নাহয় সাধারণ মানুষের জীবনের তোয়াক্কা করেন না, ভোটের জন্য লালায়িত — তাই সমাবেশ করেই চলেছেন। সে সমাবেশ বন্ধ করার দাবি তুলছে না যে সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী — তারা কিসের জন্য লালায়িত? কোন দেশের লোক তারা?

এই মৃত্যু উপত্যকাই আমার দেশ, কারণ কেবল মানুষ মরছে না। কয়েক কোটি জীবন্ত মানুষের বিবেক মরে গেছে, মরে যাচ্ছে প্রতিদিন। করোনায় এখনো দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও, যে অতিমারীতে মৃত্যু হয় বিবেকের, তাতে ভারত ইতিমধ্যেই পৃথিবীতে প্রথম স্থানে।

সূত্র:

[১] New Indian Express
[২] LiveMint
[৩] আনন্দবাজার পত্রিকা 
[৪] Firstpost

ছবি Wikipedia, NDTV ও Japan Times এর website থেকে।

Leave a Reply