উমর খালিদ

<< পুর্ববর্তী অংশ

জেলের কার্যপদ্ধতি আর কাঠামো, বন্দীদের ঘনঘন ট্রান্সফার, দীর্ঘকাল আলাদা করে রাখা — এইসব কারণে অন্যদের সাথে ভাল করে সম্পর্কও তৈরি হয় না। ফলে কারাবাসের একাকিত্ব বলে বোঝানো যায় না। কয়েকশো বন্দীর মাঝখানে বাস করলেও একা লাগে, কারণ প্রিয়জনেরা কাছে নেই। তবে কিছু কিছু অভিজ্ঞতায় আমার অন্য বন্দীদের চেয়েও বেশি একা লাগে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে গভীরে প্রোথিত সংস্কার এবং গোঁড়ামি, তার ফলে যে অভিজ্ঞতাগুলো হয় তার কথা বলছি। জেলে এসে আমাকে যতটা এ জিনিসের মুখোমুখি হতে হল তত আগে হয়নি।

একজন আমাকে একগাদা লোকের সামনে আচমকা জিজ্ঞেস করে বসল “আমাদের সবাইকে তো আপনি কাফের ভাবেন, না?” কদিন আগে টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের পর আরেকজন বলল “আরে, কাল তো তোমাদের টিম আমাদের টিমকে হারিয়ে দিল।” একাধিকবার আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে আমার বাবার কটা বউ, বা আমি কজনকে বিয়ে করব ঠিক করেছি। এইসব লোকের যদি মনে হয় আপনি রেগে যাচ্ছেন, সঙ্গে সঙ্গে বলে “আহা ভুলটা কী বললাম? আপনাদের মধ্যে তো এরকমই হয়, তাই না?”

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আমি জেলে এসে আরও বুঝতে পেরেছি যে একজন মুসলমানকে সর্বদা একটা বিরাট জাতি হিসাবে বা জাতীয়তার অতীত একটা গোষ্ঠী হিসাবে দেখা হয়। মুসলমানরা কখনো একজন ব্যক্তি হতে পারে না। একজন মুসলমানকে এমন বহু প্রশ্ন করা হয় যেগুলো তার ব্যাপারে নয়, “আপনাদের” সম্বন্ধে।

“আপনাদের মধ্যে তো এইরকম হয়, না?”

“আপনি ওয়েসির ব্যাপারে কিছু বলেন না কেন?”

“আফগানিস্তানে আপনারা এটা কী করলেন?”

বিভিন্ন সময়ে আমাকে এই প্রশ্নগুলো যারা করেছে তারা কিন্তু সচেতনভাবে ঘৃণা ছড়ায় এমন লোক নয়। বা ঘৃণা তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডাও নয়। বরং এই প্রশ্নগুলো করে সাধারণ লোকেরা, যারা এমনিতে ‘চমৎকার’ লোক। এমন লোক যারা আমার সাথে খাবার ভাগ করে খায়, কী করে জেলে এল সেইসব গল্প বলে, আইনি পরামর্শ চায়। তারপর হয়ত দিনের খবরাখবর নিয়ে কথা বলতে বলতে বলে ফ্যালে:

“যা-ই বলো খালিদ ভাই, মুসলমানরা কিন্তু পাকিস্তানের সাথে খেলায় পাকিস্তানকেই সমর্থন করে।”

“তুমি এরকম কতজন মুসলমানকে চেনো যারা পাকিস্তানকে সমর্থন করে?” আমি জিজ্ঞেস করি।

“আমি কোনো মুসলমানকে চিনি না। কিন্তু আমি জানি ওরা পাকিস্তানকে সমর্থন করে।”

সংস্কারটা এতই গভীর যে এরা ভাবে এরা যেটা বলছে সেটা জানা কথাই। আর কথাটা এমন ‘বেশ করেছি বলেছি’ ভাব নিয়ে বলে যে একটু এগোবার পর আর তর্ক করা খুব শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। চুপ করে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। ‘ট্রিস্ট উইথ ডেস্টিনি’-র কি ৭০ বছর পরে আমাদের এইখানে নিয়ে আসার কথা ছিল? এরাই কি ডেস্টিনি’জ চিলড্রেন?

আমার যে সংস্কার, গোঁড়ামি বা ঘৃণার সাথে এই প্রথম পরিচয় হল তা নয়। গত পাঁচ বছর ধরে বর্তমান শাসক আর তার হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা মিডিয়া আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে যে আমি মুসলমান, আর ‘নতুন ভারতে’ মুসলমানদের জায়গাটা কোথায়। কিন্তু এতদিন আমার দিকে ঘৃণা ধেয়ে আসত একটু দূর থেকে, সাধারণত টিভি আর মোবাইলের পর্দা থেকে। কখনো খুব বেশি অসহ্য হয়ে গেলে আমি সেটা সুইচ অফ করে রাখতে পারতাম। আমার নিজের বৃত্তের লোকজন, মানে যাদের সাথে আমি বাস্তবে সময় কাটাতাম, তারা আমাকে ঘৃণার হাত থেকে আগলে রাখত।

জেল ঘৃণার সাথে ওই দূরত্বটা ঘুচিয়ে দিয়েছে। এখন ঘৃণা আর সংস্কার একেবারে আমার গায়ে এসে পড়েছে। এখন আমাকে আগলে রাখার কেউ নেই, এমন কেউ নেই যাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি। ঘন্টার পর ঘন্টা নীরবতা এবং ভয়াবহ একাকিত্বের মধ্যে কাটাতে কাটাতে আমি নিজেকে বোঝাই যে আমার অবস্থার জন্যে ক্ষেপে যাওয়া চলবে না। ক্ষেপে যাওয়া খুব সহজ। কিন্তু ক্ষেপে থাকলে আমি কোনো গঠনমূলক কাজ করতে পারব না। ঘৃণা আর বিভাজনের শক্তির হাত থেকে আমাদের দেশটাকে পুনরুদ্ধার করার যে লড়াইয়ে আমরা নেমেছি, সে লড়াই তো লড়তে পারবই না। আমি নিজেকে এ-ও বোঝাই যে সবসময় বড় প্রেক্ষিতটা মাথায় রাখতে হবে।

এক বন্ধু সম্প্রতি আমাকে চিলের এক মানবাধিকার কর্মী আইনজীবীর গল্প বলল। উনি পিনোশের শাসনকালে একের পর এক কেস লড়তেন। সবকটাতেই হেরেছিলেন। কিন্তু পিনোশের পতনের পর ওই ভদ্রলোকের পিটিশনগুলো ছিল বলেই পিনোশেকে মানবতার বিরুদ্ধে নৃশংস অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা সম্ভব হয়েছিল। আর এখন এত বছর পরে চিলেতে একজন বামপন্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তাই আমি নিজেকে বলি — কোনো অত্যাচারী চিরকাল টিকতে পারে না। সে সত্যকে হারাতে পারে না। আর ঘৃণা বরাবর ভালবাসাকে হারিয়ে জয়ী হয়ে যাবে, এমনটা হয় না।

আর তারায় ভরা শীতের রাতে যখন আমার প্রিয়তমাকে মিছে খুঁজে বেড়াই, তখন জেলে বসে লেখা ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের লাইনগুলো আমাকে শক্তি দেয়

 

“দিল সে প্যায়হম খয়াল কহতা হ্যায়

ইতনী শীরীন হ্যায় জিন্দগী ইস পল

জুলম কা জহর ঘোলনে ওয়ালে

কামরাঁ হো সকেঙ্গে আজ না কল

জলওয়া-গাহ-এ-উয়িসাল কি শমায়েঁ

উয়ো বুঝা ভি চুকে অগর তো কেয়া

চান্দ কো গুল করেঁ তো হম জানেঁ”

 

[বুকের ভিতর থেকে বলে মন

কী মধুর জীবনের এই পল

এ জীবনে বিষ ঢালে যে শমন

কোনোকালে হবে না তো সে সফল

মিলনের প্রাসাদের সব দীপ

যদি সে নিবিয়ে দেয় দিক না

চাঁদটাকে লুকাবে কোথায়?]

*লেখকের অনুমতিক্রমে আউটলুক পত্রিকায় প্রকাশিত লেখা থেকে ভাষান্তরিত। মতামত ব্যক্তিগত।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.