সাম্প্রতিককালে ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী ভারতীয় এবং বাংলাদেশের সমর্থকদের মধ্যে প্রায়ই একটা আকচা-আকচি আমরা লক্ষ্য করে থাকি। ব্যাপারটা অধিকাংশ সময়েই তিক্ততার পর্যায়ে চলে যায়। শ্রীলঙ্কার সমর্থকদের সঙ্গে খুব সম্ভবত ভারতীয় সমর্থকদের যোগাযোগ ও আদানপ্রদান কম। হয়ত বা ভাষার ব্যবধানের কারণে। তেমন আদানপ্রদান থাকলে হয়ত একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি সেখানেও দেখতে পেতাম। নেপাল এখনো তেমন ক্রিকেট খেলিয়ে নয়। ফলে ক্রিকেট নিয়ে আকচা-আকচির অবকাশ তৈরি হয়নি। কিন্তু এটা শুধু ক্রিকেটের ব্যাপার নয়। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনীতি এবং সেখানকার মানুষের সাধারণ মনোভাব খুঁটিয়ে লক্ষ করলে দেখা যাবে গত তিন-চার দশকে ভারতের সাথে প্রত্যেকটা প্রতিবেশী দেশের সাধারণ মানুষ, অর্থাৎ জনগণের, সম্পর্ক খুব খারাপ জায়গায় চলে গেছে। নজর করার মত ব্যাপার হল, ভারতের সঙ্গে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর শাসকদের সম্পর্ক কিন্তু বেশ মাখো মাখো। একদিকে শাসকদের সঙ্গে ভারতের শাসকদের সম্পর্ক বেশ প্রেমময়, অন্যদিকে দেশগুলোর জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক তিক্ত এবং সংঘাতপূর্ণ। এই অদ্ভুত ঘটনার কারণ কী?
প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা যাঁদের আছে তাঁরাই কমবেশি জানেন, যে একসময় ভারত থেকে গেলে ওই দেশগুলোতে বাড়তি খাতির পাওয়া যেত। ভারত সম্পর্কে নানা কারণে একটা মুগ্ধতা এঁদের ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই বাংলাদেশের কাছে ভারত ছিল বন্ধুরাষ্ট্র। নেপালের সঙ্গে তো ভারতের সম্পর্ক অতি প্রাচীনকাল থেকেই অত্যন্ত গভীর। শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও নানা কারণে ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই ছিল। কিন্তু ইদানীং প্রতিবেশী দেশগুলোর জনগণ ভারতের উপর প্রবলভাবে রুষ্ট। এর পিছনে একটা বড় কারণ হল গত তিন-চার দশকে এই অঞ্চলে ভারতের সম্প্রসারণবাদী কার্যকলাপের তীব্রতা বৃদ্ধি। ২০১৪ সালে ভারতে নরেন্দ্র মোদীর সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই পরিস্থিতি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে মোদী সরকারের চূড়ান্ত আগ্রাসী, বিস্তারবাদী রাজনীতির কারণে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
নেপালের কথাই ধরুন। নেপালের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত চিরকালই হস্তক্ষেপ করে আসছে, কিন্তু বর্তমানে তা ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে রাজতন্ত্রের পতনের পর থেকেই নেপালের সংবিধানে কী লেখা হবে, কারা ক্ষমতায় বসবে, কী নীতি হবে তা নিয়ে আমেরিকা, ভারত এবং চীন সবথেকে বেশি মাথা ঘামিয়েছে। ইতিমধ্যে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক সম্পর্ক একটা অদ্ভুত জায়গায় পৌঁছেছে। আমেরিকা ভারতকে তার নীতিগত অংশীদার (‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার’) ঘোষণ করে ২০১৬ সালে। মোদী ক্ষমতায় আসার পরই ভারতের শাসকশ্রেণির সঙ্গে আমেরিকার শাসকদের গলাগলি চরমে ওঠে। ভারত প্রায় আমেরিকার স্বার্থরক্ষাকারী আঞ্চলিক চৌকিদারের ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকা ও চীনের প্রতিযোগিতা এবং দ্বন্দ্ব যতই তীব্র হতে থাকে, আমেরিকা তত বেশি করে ভারতকে এই অঞ্চলে তার রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের উমেদার হিসাবে কাজ করার জন্যে প্রস্তুত করে তোলে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে নেপালের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে।
তিনটে জায়গা নিয়ে ভারতের সঙ্গে নেপালের সীমান্ত বিবাদ প্রথম থেকেই ছিল – কালাপানি, লিম্পাধোরা এবং লিপু লেক। নেপালের রাজা এবং ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে হওয়া ১৮১৫ সালের সুগৌলি চুক্তির ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা থেকেই এই সীমান্ত বিবাদের জন্ম। ২০১৪ সালে মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার আগে পর্যন্ত দুই দেশের সরকারই বিষয়টা মেটানোর চেষ্টা চালাচ্ছিল। বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন, টাস্ক ফোর্স তৈরি আর মাঝে মাঝেই দ্বিপাক্ষিক বৈঠক চলছিল। কিন্তু মোদী ক্ষমতায় আসার পর ভারত সরকার এসব আলাপ আলোচনা বন্ধ করে দেয়। উপরন্তু এই অঞ্চলের উপর দিয়ে তারা রাস্তাও তৈরি করতে শুরু করে। এই তিনটে অঞ্চলই উত্তরাখণ্ডের অংশ বলে ভারত দাবি করে। ওই অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য হল, ভারত থেকে মানস সরোবর ওখান দিয়ে খুব সহজে যাওয়া যায়। ভারত সরকার সম্প্রতি মানস সরোবর যাওয়ার রাস্তা ওই অঞ্চলের উপর দিয়েই তৈরি করেছে। ওখান থেকে চীনের দূরত্ব খুব কম। সুতরাং চীনও ওই অঞ্চলটার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। তারাও তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের রাস্তা ওখানেই করতে আগ্রহী। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, বিভিন্ন বৃহৎ শক্তির ভূ-রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবং পালটা পদক্ষেপে নেপালের মত একটা ছোট দেশ কোণঠাসা। ভারতের উপর নেপালের জনগণের উষ্মা বাড়ার পিছনে এই সীমান্ত বিবাদ গভীর ভূমিকা পালন করেছে।
এর পাশাপাশি নেপালের অর্থনীতিতে উত্তরোত্তর ভারতের বিনিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে। সম্প্রতি নেপাল সরকার চারটে বিমানবন্দর ভারতের আদানি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দর, পোখরা বিমানবন্দর, লুম্বিনী বিমানবন্দর (গৌতম বুদ্ধ বিমানবন্দর) এবং প্রস্তাবিত নিজগড় বিমানবন্দর। ভারতেও আদানি গোষ্ঠী মোদী সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় একের পর এক বিমানবন্দর হস্তগত করছে। বর্তমানে একই ঘটনা প্রতিবেশী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও ঘটছে। নেপাল, বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কার মত দেশের সরকারের সঙ্গে প্রায় অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি অনুসরণ করে ভারত সরকার সরাসরি তার এজেন্ট হিসাবে আদানি গোষ্ঠীর হাতে এই দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ সম্পদ তুলে দিতে বাধ্য করছে। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনা সেখানকার জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী ক্রোধের সৃষ্টি করছে।
আদানি গোষ্ঠীর কাজকর্মের সঙ্গে যাঁরা কমবেশি পরিচিত তাঁরা জানেন, বিদ্যুৎ ব্যবসায় এই গোষ্ঠীর সবিশেষ আগ্রহ রয়েছে। সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে এক বিরাটকায় বিদ্যুৎ সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে এই গোষ্ঠী এগোচ্ছে। এর সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত সরকারের আধিপত্য বিস্তারের ছকটার গভীর সম্পর্ক আছে। আমরা জানি, শিল্পের জগতে তারাই রাজত্ব করে যারা শিল্পের শক্তি-ব্যবসায় একাধিপত্য স্থাপন করতে পারে। বিংশ শতকে সম্প্রসারণবাদী তথা সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতি নিয়ে কমিউনিস্ট, অকমিউনিস্ট যাঁরাই মাথা ঘামিয়েছেন – সে লেনিন হোন বা হবসন অথবা হিলফেরডিং, সকলেই একবাক্যে একথা স্বীকার করেছেন। সুতরাং আদানির অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং মোদীর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পরস্পরের পরিপূরক হিসাবে ভারতসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিয়াশীল। এই যে মোদী এবং আদানিকে একসাথে আজকাল ‘মোদানি’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে, তা মোটেই কেবল একটা চটকদারি কথা নয়।
ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান এবং শ্রীলঙ্কায় প্রথমে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড গড়ে তোলা এবং তারপর এই গ্রিডগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা ভারত সরকারের অনেকদিনের। বর্তমানে আদানিকে মোদী এই কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ার এই সংযুক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে নেপালের বড় ভূমিকা আছে। পাহাড়ি এলাকা হওয়ার কারণে ওই দেশে জলের তোড়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক। সুতরাং আদানি নেপালে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বিকল্প শক্তির ব্যবসায়। আর নেপাল সরকারকে বশীভূত করে মোদানি কোম্পানি নেপালকে জলবিদ্যুৎ শক্তির কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই নেপালে ভারতবিরোধী জনরোষ বাড়ছে।
শ্রীলঙ্কার কথায় আসুন। সেদেশের পূর্বতন রাষ্ট্রপতি গোটাবায়া রাজাপক্ষের সময় থেকেই মোদানি কোম্পানি শ্রীলঙ্কায় ভয়ঙ্করভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। শ্রীলঙ্কার গোটা বিদ্যুৎ ব্যবসাকে দখলে আনার জন্যে আদানি পাওয়ার উঠে পড়ে লাগে। ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার বিদ্যুৎ গ্রিডকে যুক্ত করার জন্যে সমুদ্রের তলা দিয়ে কেবল পাতার কাজ দ্রুতগতিতে শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। নেপালে যেমন আদানির লক্ষ্য জলবিদ্যুতের দিকে, শ্রীলঙ্কায় তেমনি নজর বায়ুশক্তির দিকে। উত্তর শ্রীলঙ্কায় দুটো বায়ুশক্তি উৎপাদনকেন্দ্র আদানির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। একটা মান্নারে ২৫০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র, অন্যটা পুনিরিনে ১০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র। এ ব্যাপারে ২০২২ সালের মার্চ মাসে প্রাথমিক চুক্তি হয়েছিল, যা ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে চূড়ান্ত রূপ পায়।
শ্রীলঙ্কায় আদানিরা দ্বিতীয় যে ক্ষেত্রে মনোনিবেশ করেছে তা হল বন্দর ব্যবসা। কলম্বো বন্দর ইতিমধ্যেই তাদের হাতে তুলে দিয়েছে শ্রীলঙ্কার সরকার। সেখানে নতুন টার্মিনাল তৈরির বরাতও তাদের দেওয়া হয়েছে। এমনকি আদানিদের জন্যে স্পেশাল ইকোনমিক জোন (সেজ) তৈরি করে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে আদানিদের। কেরালায় বাম, ডান, বিজেপি সকলের সহযোগিতায় ভিজিঞ্জামে আদানি বন্দর তৈরি করে তাকে কলম্বো বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করে ভারত মহাসাগরে সমুদ্র বাণিজ্যের উপর একচেটিয়া দখলদারি গড়ে তোলার চেষ্টায় আছে। শ্রীলঙ্কার ত্রিঙ্কোমালি বন্দরও আদানিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৭,০০০ একর জমিতে আদানিদের জন্যে সেজ তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে ৭,০০০-এর বেশি পরিবার উচ্ছেদের মুখোমুখি। এর আগের রাজাপক্ষের সরকার উচ্ছেদের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ব্যাপক গণআন্দোলনের কারণে তা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে গণআন্দোলন থেকে উঠে আসা রনিল বিক্রমসিঙ্ঘের সরকার একই পদক্ষেপ নিয়েছে, যাকে আটকানোর ক্ষমতা লড়াইয়ে থাকা শক্তিগুলোর নেই।
আরো পড়ুন আদানির বন্দর নির্মাণ: কমিউনিস্ট উন্নয়ন-ভাবনার সংকট
প্রকৃতপক্ষে রাজাপক্ষের সরকারের থেকেও রনিলের সরকার অনেক বেশি আগ্রাসী হয়ে মোদানি কোম্পানির হাতে শ্রীলঙ্কার গুরুত্বপূর্ণ শিল্পশাখাগুলোকে তুলে দেওয়ার কাজ চালাচ্ছে। মনে রাখতে হবে, এই রনিলই ২০০৩ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ত্রিঙ্কোমালি তৈল মজুতক্ষেত্রের ৯৯টা ট্যাঙ্ক ভারত সরকারকে ৩৭ বছরের জন্যে লিজ দিয়েছিল এবং এক তৃতীয়াংশ তেল ব্যবসার ছাড়পত্র ভারতীয় তেল কোম্পানিকে দিয়েছিল। ২০২১ সালে রাজাপক্ষে আরও দুটো চুক্তি করে আরও ৮০টা ট্যাঙ্ক ৬৬ বছরের জন্যে ভারতকে দিয়েছিল। এই লক্ষ্যে ভারত ও শ্রীলঙ্কা সরকারের এক জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানিও খোলা হয়। সাইলন পেট্রোলিয়ম কোম্পানি ২০০টা তেলপাম্পের (oil filling stations) মালিক ছিল। এই কোম্পানিকে ভারতীয় তেল কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বর্তমানে শ্রীলঙ্কার তেলপাম্পের দুই তৃতীয়াংশই ভারতের হাতে। এর আগে রাজাপক্ষের সময়ে, ২০২১ সালে, মুথুরাজায়ালে তেলট্যাঙ্কের মালিকানা ভারতীয় তেল কোম্পানিকে দেওয়া হয়। বর্তমানে নাগপট্টম থেকে ত্রিঙ্কোমালি পর্যন্ত একটা তেলের পাইপলাইন পাতার পরিকল্পনা হচ্ছে যা সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় মালিকানায় থাকবে। সুতরাং তেল, বিদ্যুৎ ও বন্দর ব্যবসার মত নীতিগতভাবে এবং ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসাক্ষেত্র যে মোদানি কোম্পানির একচেটিয়া অধিকারে চলে এসেছে তাতে কারোর সন্দেহ নেই।
প্রকৃতপক্ষে ২০২১ সালে শ্রীলঙ্কার বিদ্রোহ, যা আরাগালিয়া নামে পরিচিত, তা ভারতের পক্ষে শাপে বর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ভারত সরকারের মনে শ্রীলঙ্কার বিদ্রোহ আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। ভারতে সেইসময় চলছিল কৃষক আন্দোলনের ঢেউ। কৃষকরা রাজধানী অবরোধ করে রেখেছিলেন। শ্রীলঙ্কার বিদ্রোহ যেভাবে রাজাপক্ষেকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেছিল তা ভারতেও সংক্রমিত হতে পারে — এই আশঙ্কা মোদী সরকারের ছিল। কিন্তু রাজাপক্ষে পদত্যাগ করার পর শ্রীলঙ্কার ভেঙে পড়া আর্থিক ব্যবস্থার দায়িত্ব নিতে যখন প্রায় কেউই রাজি ছিলেন না, তখন সরাসরি ভারত সরকারের অভয়বাণী শিরোধার্য করে এগিয়ে আসেন ভারতের পুরনো বিশ্বাসভাজন রাজনীতিবিদ রনিল। ভারত সরকার রনিলকে বিপুল আর্থিক সাহায্য দেয়। বিনিময়ে একের পর এক শর্ত চাপিয়ে শ্রীলঙ্কার গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও ব্যবসাক্ষেত্রগুলোর দখল নিতে শুরু করে। এ কাজে ভারত সরকার প্রধান প্রতিনিধি নির্বাচন করে আদানিকে। বর্তমানে পরিস্থিতি এমনই যে, শ্রীলঙ্কার বিদ্যুৎক্ষেত্রের পূর্ণ দখল নেওয়ার পর আদানির কাছ থেকে শ্রীলঙ্কা সরকার যে দামে বিদ্যুৎ কিনতে চলেছে তা বাজার দরের দ্বিগুণ। এতে যে শুধু আদানিদের অর্থনৈতিক লাভ তা নয়, শ্রীলঙ্কার সংগ্রামী মানুষদের আশঙ্কা, অতঃপর শুধুমাত্র একটা বোতাম টিপেই শ্রীলঙ্কাকে শক্তিশূন্য করার ক্ষমতা পেয়ে যাবে ভারত। এখানে ‘শক্তি’ কথাটা দুভাবেই প্রযোজ্য। একদিকে বিদ্যুৎ, তেল ইত্যাদি; অন্যদিক রাজনৈতিক ক্ষমতা। স্বাভাবিকভাবেই ভারতবিরোধী মনোভাব এবং বিদ্বেষ সেদেশে বাড়ছে।
একই ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশেও। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ গ্রিডকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার কাজ অনেকাংশে সম্পূর্ণ। বাংলাদেশের সরকারকে পকেটে পুরে মোদানি কোম্পানি অনেক বেশি দামে বিদ্যুৎ বেচার একের পর এক চুক্তি করে চলেছে। সুন্দরবনে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করছে। অন্যদিকে তারা বাংলাদেশকে নদীর জল থেকে বঞ্চিত করে চলেছে। ভারতে মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর শুধু যে প্রতিবেশী দেশগুলোর জল, জঙ্গল, জমিন হাতে নেওয়ার জন্যে তারা আগ্রাসী হয়ে উঠেছে তাই নয়, নানাভাবে এই দেশগুলোর আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ ঘটিয়ে এক বশংবদ শাসন গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকার সরাসরি ভারতের মদতে এক স্বৈরতান্ত্রিক অবস্থা কায়েম করেছে বলে বাংলাদেশের বহু মানুষের বিশ্বাস।
নেপাল কংগ্রেস এবং পুরনো রাজার পার্টিকে ক্ষমতায় এনে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানোর অভিযোগ আছে ভারতের বিরুদ্ধে। এমনকি ভারত থেকে গৈরিক বাহিনী পাঠিয়ে সাম্প্রদায়িক বাতাবরণ তৈরি করার অপচেষ্টা ভারত চালিয়ে যাচ্ছে বলেও বারবার অভিযোগ করেছে সেদেশের একাধিক কমিউনিস্ট পার্টি। শ্রীলঙ্কাকে আজকাল রামরাজ্যের অখণ্ড অংশ হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টাও শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর জনগণের কাছে ভারত বর্তমানে এক মূর্তিমান আতঙ্ক। মোদানি কোম্পানির দাপটে অস্থিরতা বাড়ছে দক্ষিণ এশিয়ায়, ঘনাচ্ছে ভারতবিরোধী জনরোষ। এখন ভারতের শ্রমিকশ্রেণি তথা গণতান্ত্রিক জনগণের দায়িত্ব – নিজেদের ভারত সরকারের ফ্যাসিবাদী স্বার্থ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে, ফ্যাসিবাদী মোদী সরকারের প্রকৃত স্বরূপ শুধু ভারতেই নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের কাছে উন্মোচন করে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের ব্যাপক সম্মিলনের মধ্যে দিয়ে যৌথ মুক্তি আন্দোলনের নয়া দিগন্তের সন্ধান করা।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








