শ্রীরূপা বন্দ্যোপাধ্যায়
গাজায় ইজরায়েলের নির্বিচার হত্যালীলা রুখতে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভায় ১২ জুন সংঘর্ষ বিরতির প্রস্তাবে ভোট দেয়নি ভারত। অথচ ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ১৪৯টিই এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে।
গাজার মর্মান্তিক পরিস্থিতির কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিপুল সাহায্য নিয়ে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে একনাগাড়ে হামলা চালিয়ে গাজা ভূখণ্ডকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে ইজরায়েল। ইতিমধ্যেই হত্যা করেছে ৫৫,০০০-এর বেশি নিরপরাধ মানুষকে। এর মধ্যে ১২,০০০-এর বেশি শিশু। সীমান্ত অবরোধ করে বেঁচে থাকার নিতান্ত প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রীটুকু পর্যন্ত গত কয়েকমাস ধরে গাজায় ঢুকতে দিচ্ছে না ইজরায়েল। অবিরাম বোমাবর্ষণে প্রাণহানি, পঙ্গুত্ব, ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রাণের দায়ে ক্রমাগত এক ত্রাণশিবির থেকে অন্য ত্রাণশিবিরের দিকে ছুটে চলার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র অনাহার ও ওষুধের অভাব আজ গাজার আরব বাসিন্দাদের জীবন নরক করে তুলেছে। এই অবস্থায় সংঘর্ষ বিরতির প্রস্তাবে ভোট না দিয়ে মানবিকতার আহ্বানও উপেক্ষা করল ভারত।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
অথচ প্যালেস্তাইনের পাশে চিরকাল দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে ভারত। সেই ১৯৭৪ সালে আরব দুনিয়ার বাইরের প্রথম রাষ্ট্র হিসাবে ভারত প্যালেস্তাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)–কে প্যালেস্তাইনের মানুষের প্রতিনিধি হিসাবে মেনে নেয়। ১৯৮৮ সালে ভারত প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রকেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। ১৯৮৩ সালে দিল্লিতে সপ্তম জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের শীর্ষ সম্মেলনে পিএলও নেতা ইয়াসের আরাফতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তাছাড়া দীর্ঘকাল ধরেই এদেশের মানুষ প্যালেস্তাইনের উপর ইজরায়েলের হামলার বিরোধিতা করে আসছে। গোটা দেশ জুড়ে আজও ইজরায়েলের হানাদারির তীব্র বিরোধিতায় বিক্ষোভে সোচ্চার হচ্ছেন মানুষ। এই মানুষের ভোটে জিতে দেশের বিজেপি সরকার সম্মিলিত জাতিপুঞ্জে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাবে ভোট না দিয়ে জনমতকে নির্লজ্জভাবে উপেক্ষা করল।
আসলে ইজরায়েলের বিরোধিতা করা আজ আর নরেন্দ্র মোদীদের পক্ষে সম্ভব নয়। বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারে আসার পর থেকে আমেরিকা-ইজরায়েল সাম্রাজ্যবাদী চক্রের সঙ্গে ভারতের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক, কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্রমাগত ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হয়ে চলেছে। গত দশ বছরে ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের ব্যবসা, বিশেষ করে অস্ত্রশস্ত্রের আমদানি রফতানি বিপুল পরিমাণে বেড়েছে। মোদীর অতি ঘনিষ্ঠ দুই ধনকুবের অনিল আম্বানি ও গৌতম আদানি ইজরায়েলের সঙ্গে নানা ব্যবসায়িক সম্পর্কে লিপ্ত। বেশকিছু ব্যবসায় মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে ইজরায়েলের বড় বড় কোম্পানি জোড় বেঁধেছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে আদানি পোর্টস অ্যান্ড স্পেশাল ইকোনমিক জোন লিমিটেড ইজরায়েলের হাইফা বন্দর কেনে সেদেশের গ্যাদো গ্রুপের সঙ্গে হাত মিলিয়ে। ওই বন্দরের ৭০% অংশীদারিত্ব এখন আদানির হাতে। গত কয়েকদিনের ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধে হাইফা বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অর্থাৎ আদানির ক্ষতি হয়েছে।
আরো পড়ুন আদানি থেকে মাস্ক: গণতন্ত্র নয়, চলছে কর্পোরেটতন্ত্র
পহলগাম পরবর্তী ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষের বিরতি ঘোষণার ক্ষেত্রে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা থেকে ভারতের উপর মার্কিন প্রভাব কতখানি তা স্পষ্ট হয়েছে। ট্রাম্প এখন পর্যন্ত মোট ১৪ বার বুক ফুলিয়ে বলেছেন যে তিনিই ভারত-পাক লড়াই থামিয়েছেন। এদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বলছে, মোদী নাকি ফোনে ট্রাম্পকে বলেছেন যে ভারত স্বেচ্ছায় সংঘর্ষ থামিয়েছে, মার্কিন রাষ্ট্রপতি বলেছেন বলে নয়। অথচ মোদী নিজে কিন্তু প্রকাশ্যে বলছেন না একথা। তেমনই গাজায় সংঘর্ষ বিরতির প্রস্তাবে ভারত ভোট না দেওয়ার পর ইরান আক্রমণে সমর্থন পেতে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করা থেকেও পরিষ্কার, মোদী সরকার গণহত্যাকারী রাষ্ট্র ইজরায়েলের পাশেই আছে।
আসলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজের আধিপত্য কায়েম করার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতা ভারত সরকারের এখন অতি প্রয়োজন। অন্যদিকে আদানি-আম্বানি নিয়ন্ত্রিত মোদী সরকার আমেরিকার স্যাঙাত ইজরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে রাজি নয়। গাজায় সংঘর্ষ বিরতির প্রস্তাবে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্তের পিছনে এই কারণও রয়েছে।
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভায় গাজায় ইজরায়েলি হামলা বন্ধের প্রস্তাবে ভোট না দিয়ে ভারত সরকার কেবল দেশের মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করেনি, বিশ্বের কাছে ভারতের ভাবমূর্তিকেও কালিমালিপ্ত করেছে। এই লজ্জার ভার ভারতবাসী হিসাবে আমাদের সকলকেই বহন করতে হবে।
লেখক প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। একাধিক পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








