পূর্ব বাংলার রাজপথ গণবিক্ষোভের আঁচে গনগন করছে। শহিদ ছাত্রনেতার লাশ নিয়ে রাজপথে তাঁর সহযোদ্ধারা। মিছিলের পুরোভাগে ৮৯ বছরের এক বৃদ্ধ। সাদা দাড়ি, পরনে সাদামাটা পোষাক। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী রাজপথে ব্যারিকেড তুলেছে। নির্দেশ দিচ্ছে লাশ সরিয়ে ফেলার। সারে সারে সৈন্য উদ্যত রাইফেল হাতে তৈরি। মিছিল থমকে দাঁড়িয়ে রয়েছে, মাঝ সমুদ্রে বিভ্রান্ত জাহাজের মত।

উননব্বই বছরের বৃদ্ধ এক পা এক পা করে এগোতে থাকছেন রাইফেলের সারির দিকে। তাঁর এক কথা, রাজপথেই পড়া হবে শহীদের জানাজার নমাজ। পূর্ব বাংলার বীর তরুণকে শেষ বিদায় জানানো হবে রাজপথেই। বৃদ্ধের পিছনে হাজারে হাজার ছাত্র-যুব জনতা। তিনি এগোচ্ছেন, তাঁর দাড়ি উড়ছে হাওয়ায়। সামনে দাঁড়ানো সেনাবাহিনী বন্দুক তুলল, তাক করল মিছিলের বুকের দিকে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কয়েক লহমার জন্য রাজপথ স্তব্ধ। একদিকে শহিদের লাশ। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় বন্দুক। মাঝখানে অতিবৃদ্ধ মওলানা ভাসানী। যাঁকে পশ্চিমের সংবাদমাধ্যম আখ্যা দিয়েছে, ‘প্রফেট অফ ভায়োলেন্স’। যিনি এক আশ্চর্য মওলানা, যাঁর চোখ সৌদি আরবের দিকে নয়, নিবদ্ধ সমাজতন্ত্রের স্বপ্নে। যাঁর কাছে ধর্ম মানে জালিমের বিরুদ্ধে লড়াই; মজলুম জনতার, নিপীড়িত জনতার গণঅভ্যুত্থান। ৮৯ বছরের ভাসানী বুকটান করে তাকালেন রাষ্ট্রীয় রাইফেল সারির দিকে। তারপর আঙুল তুলে গর্জন করে উঠলেন, “খামোশ!”

ভাসানীর সেই “খামোশ” ছড়িয়ে গেল ঢাকা থেকে রংপুর, নাটোর থেকে নোয়াখালি, সিরাজগঞ্জ থেকে খুলনা। টলমল করে উঠল পূব বাংলা। সাভারের শ্রমিক জনতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জনতা, সমস্ত পূর্ব বাংলার কোটি কোটি কৃষক গর্জন করে উঠল “খামোশ!” মজলুম মানুষ জালিমের দিকে তুলল প্রতিরোধের আঙুল, বলে উঠল “খামোশ!”

এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখল ঢাকার রাজপথ। বৃদ্ধ ভাসানী এক পা এক পা করে এগোচ্ছেন আর এক পা এক পা করে পিছোচ্ছে সামরিক বাহিনী। অবশেষে এক সময় পিঠটান দিল তারা। রাস্তায় বসে পড়লেন মওলানা ভাসানী। প্রফেট অফ ভায়োলেন্স তাঁর বিশ্বাস মতো শেষ বিদায় জানালেন শহিদ তরুণকে। তাঁর শেষ বিদায়ের সুরে মিলে গেল হাজার হাজার “লাল সালাম”।

আজ মওলানা ভাসানীর মৃত্যুদিন। ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ৯৬ বছর বয়সে ভাসানী মারা যান। তাঁকে কেউ বলেন, ‘দ্য রেড মওলানা’, কেউ আবার তা মানতে নারাজ। আমার কাছে ভাসানী মানে এই উপমহাদেশের কৃষক জনতা, হতদরিদ্র প্রান্তিক লড়াকু মানুষ। তিনি কৃষকের মতো চঞ্চল, কৃষকের মতো একরোখা, কখনও কখনও গোঁয়ার মনে হবে তাঁকে। ভাসানী এই উপমহাদেশের সেই কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধি,যাঁরা পশ্চিমি নবজাগরণ থেকে উদ্ভুত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে অবস্থান করেন, যাঁরা আবহমান কাল ধরে জুলুম, নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছেন, অথচ কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের ছকে সে লড়াইকে বাঁধা যায় না। সেই লড়াইয়ের শিকড় গাঁথা রয়েছে লোকসমাজের সংস্কৃতিতে, যাপনে। ভাসানী লাল না সবুজ আমি জানি না। মতবাদের খুপরিগুলোয় তাঁকে বাঁধা মুশকিল। তাঁর উচ্চারণে চেনা শব্দগুলি নিজেদের পুরনো অর্থ হারিয়ে ফেলে, হয়ে ওঠে নতুন সময়ের প্রতিরোধের দ্যোতক। ভাসানী মজলুম জননেতা, মজলুম জনতার নেতা, নির্যাতিত মানুষের নেতা। এর বাইরে তাঁর কোনো পরিচয় নেই।

পশ্চিমবাংলায় ভাসানীকে নিয়ে তেমন চর্চা নেই। আমাদের বাংলাদেশ পাঠের ভরকেন্দ্রে মূলত একজন ব্যক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের ঠিকাদারি নেওয়া একটি দলের ইতিহাস। এ বড় লজ্জার, বড় দুঃখের। ভাসানীর মৃত্যুদিন শামসুর রাহমানের একটি কবিতা ভাগ করে নিতে ইচ্ছে করছে। কবিতাটির নাম ‘সফেদ পাঞ্জাবি’। তার আগে ছোট করে কবিতাটির প্রেক্ষাপট বলে নিই।

১৯৭০ সাল। ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে পূর্ব বাংলা ছারখার হয়ে গিয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহীন, অনেকে মৃত। এদিকে সামনেই নির্বাচন। মওলানা ভাসানী সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁর দল ন্যাপ নির্বাচনে অংশ নেবে না। ৯০ বছরের বুড়ো মওলানা ত্রাণ নিয়ে ছুটে বেড়ালেন পূর্ববঙ্গের দুর্গত এলাকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। ‘পিপলস মওলানা’র বাজপাখির ডানার মতো প্রসারিত দুই হাতের ছায়ায় আশ্রয় নিল বাংলার জনতা। দুর্গত এলাকা থেকে ফিরে এসে পল্টনের জনসভায় ভাসানী শোনালেন তাঁর অভিজ্ঞতা। শামসুর রাহমানের মনে হয়েছিল এই ভাসানী কোনও রাজনৈতিক নেতা নন, এক অলৌকিক স্টাফ রিপোর্টার। তিনি লিখলেন:

শিল্পী, কবি, দেশী কি বিদেশী সাংবাদিক,

খদ্দের, শ্রমিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, সমাজসেবিকা,

নিপুণ ক্যামেরাম্যান, অধ্যাপক, গোয়েন্দা, কেরানি,

সবাই এলেন ছুটে পল্টনের মাঠে, শুনবেন

দুর্গত এলাকা প্রত্যাগত বৃদ্ধ মৌলানা ভাসানী

কী বলেন। রৌদ্রালোকে দাঁড়ালেন তিনি, দৃঢ়, ঋজু,

যেন মহাপ্লাবনের পর নূহের গভীর মুখ

সহযাত্রীদের মাঝে ভেসে ওঠে, কাশফুল-দাড়ি

উত্তুরে হাওয়ায় ওড়ে। বুক তাঁর দক্ষিণ বাংলার

শবাকীর্ণ হু হু উপকূল, চক্ষুদ্বয় সংহারের

দৃশ্যাবলীময়; শোনালেন কিছু কথা, যেন নেতা

নন, অলৌকিক স্টাফ রিপোর্টার। জনসমাবেশে

সখেদে দিলেন ছুঁড়ে সারা খাঁ-খাঁ দক্ষিণ বাংলাকে।

সবাই দেখল চেনা পল্টন নিমেষে অতিশয়

কর্দমাক্ত হ’য়ে যায়, ঝুলছে সবার কাঁধে লাশ।

আমরা সবাই লাশ, বুঝি-বা অত্যন্ত রাগী কোনো

ভৌতিক কৃষক নিজে সাধের আপনকার ক্ষেত

চকিতে করেছে ধ্বংস, প’ড়ে আছে নষ্ট শস্যকণা।

ঝাঁকা-মুটে, ভিখিরী, শ্রমিক, ছাত্র, সমাজসেবিকা,

শিল্পী, কবি, বুদ্ধিজীবী, দেশী কি বিদেশী সাংবাদিক,

নিপুণ ক্যামেরাম্যান, ফিরিঅলা, গোয়েন্দা, কেরানি,

সমস্ত দোকান-পাট, প্রেক্ষাগৃহ, ট্রাফিক পুলিশ,

ধাবমান রিকশা, ট্যাকসি, অতিকায় ডবল ডেকার,

কোমল ভ্যানিটি ব্যাগ আর ঐতিহাসিক কামান,

প্যান্ডেল, টেলিভিশন, ল্যাম্পোস্ট, রেস্তোরাঁ, ফুটপাথ

যাচ্ছে ভেসে, যাচ্ছে ভেসে ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ বঙ্গোপসাগরে।

হায়, আজ একী মন্ত্র জপলেন মৌলানা ভাসানী!

বল্লমের মতো ঝলসে ওঠে তাঁর হাত বারবার

অতি দ্রুত স্ফীত হয়, স্ফীত হয় সফেদ পাঞ্জাবি,

যেন তিনি ধবধবে একটি পাঞ্জাবি দিয়ে সব

বিক্ষিপ্ত বেআব্রু লাশ কী ব্যাকুল ঢেকে দিতে চান!

………

মওলানা ভাসানী বলে যাঁকে গোটা উপমহাদেশ চেনে, তাঁর প্রকৃত নাম কিন্তু তা নয়। তাঁর আসল নামে এই দুই শব্দের কোনোটিই ছিল না। ‘মওলানা’ ও ‘ভাসানী’ এই দুটো শব্দই পরবর্তী সময়ে তাঁর অর্জিত পদবি বা বিশেষণ। ‘মওলানা’ তাঁর ধর্মবিশ্বাস ও চর্চার পরিচয়, আর ‘ভাসানী’ সংগ্রাম ও বিদ্রোহের স্মারক। তাঁর জীবন ও সংগ্রাম এমনভাবে দাঁড়িয়ে ছিল, যাতে পদবি আর বিশেষণের আড়ালে তাঁর আসল নামই হারিয়ে গেছে। আসলে তাঁর নাম ছিল আবদুল হামিদ খান। ডাক নাম ছিল চ্যাগা, শৈশবে এই নামই ছিল তাঁর পরিচয়।

আবদুল হামিদ খান ভাসানী জন্মেছিলেন ১৮৮০ সালের ১২ই ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার ধানগড়া গ্রামে। অল্প কিছুদিন স্কুল ও মাদ্রাসায় পড়া ছাড়া তিনি অন্য কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেননি। শৈশবে ছেলেটির পিতামাতা প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার কড়াকড়ি পছন্দ করতে পারেননি। ১৯০৭ সাল থেকে দুবছর তিনি দেওবন্দ মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন। কিন্তু সেখানে বিদ্যাশিক্ষার চেয়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামী রাজনৈতিক চেতনায় বেশি দীক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। সেই শিক্ষা ঠিক বামপন্থীদের মনের মত, তাঁদের ঘরানায়, তা নয়। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভাসানীর ঘৃণা ছিল নিখাদ।

ভাসানীর কর্মজীবন শুরু হয় টাঙ্গাইলের কাগমারি স্কুলের শিক্ষক হিসাবে ১৯০৯ সালে। কিন্তু তাঁকে টানত রাজনীতি। বিশেষ করে কৃষক সমাজের অশেষ দুর্গতি। চিত্তরঞ্জন দাশের সাহচর্যে তিনি প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯১৯ সালে কংগ্রেসের প্রাথমিক সদস্য হন। কিছুদিনের মধ্যেই জেলযাত্রা। মুক্তির পর গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে বেড়ানো।

আসামের ধুবড়ী জেলার ভাসানচরে মওলানা ভাসানী এক বিশাল কৃষক সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। যার পর লোকমুখে তিনি “ভাসানচরের মওলানা” বা “ভাসানীর মওলানা” হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। পরবর্তীকালে “ভাসানী” শব্দটি তাঁর নামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে যুক্ত হয়ে যায়। এমন নির্দশন খুব বেশি নেই, যেখানে একজন রাজনৈতিক নেতার নাম আর তাঁর কর্মস্থল একাকার হয়ে গিয়েছে।

১৯৩৭ সালে মওলানা আসাম প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদের বাইরে রাজপথে তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এপার বাংলার ইতিহাসচর্চায় এসব তথ্য মেলে না। নিম্মবর্গের ইতিহাসচর্চাও ভাসানীকে নিয়ে উদাসীন। সৈয়দ আবুল মকসুদের মতে, আসামের কুখ্যাত ‘লাইন প্রথা’র বিরুদ্ধে তাঁর যে সংগ্রাম, তা দক্ষিণ আফ্রিকায় মহাত্মা গান্ধীর বর্ণবৈষম্যবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে তুলনীয়।

মওলানা ভাসানী ১৯৩২ সালের ডিসেম্বরে সিরাজগঞ্জের কাওয়াখালিতে বঙ্গ-আসাম প্রজা সম্মেলন নামে এক ঐতিহাসিক কৃষক সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন। ওই সম্মেলনে জমিদারি উচ্ছেদ, খাজনার নিরীখ হ্রাস, নজর-সেলামি বাতিল, মহাজনের সুদের হার নির্ধারণসহ বহুবিধ প্রস্তাব গৃহীত হয়। মূলত এর ফলেই ১৯৩৬ সালে বঙ্গীয় কৃষি খাতক আইন পাশ হয়েছিল এবং ১৯৩৭ সালে ঋণ সালিশী বোর্ড স্থাপিত হয়েছিল।

“মজলুম জনতার” মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ১৯৩০ সালে মওলানা ভাসানী মুসলিম লিগে যোগদান করেছিলেন। কিন্তু দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্মের দু বছরের মধ্যেই তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের সূচনা ওই সময়েই। তাঁর উদ্যোগেই মুসলিম লিগ ভেঙে তৈরি হয় আওয়ামী মুসলিম লিগ। তিনি ছিলেন সভাপতি। পরে, তাঁর উদ্যোগেই ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। মনে রাখা দরকার, একজন মওলানা এই কাজটি করেছিলেন। তার কারণ, নিজে মওলানা হলেও ভাসানী ছিলেন আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক একজন রাজনৈতিক নেতা।

কার্যত নিজের হাতে গড়া দল আওয়ামী লিগ থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। কারণ, নেতৃত্বের একাংশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান নিতে চাননি। বস্তুত, গোটা পাকিস্তান আমলে তাঁর রাজনীতির দুটি বড় উপাদান ছিল স্বাধীনতা অর্জন এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা। এই দুই প্রশ্নেই আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে তাঁর সঙ্গে আওয়ামী লীগের মূল নেতৃত্বের বিরোধ তৈরি হয়। এই কারণেই পরবর্তীকালে তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আর থাকতে পারেননি।

মওলানা ভাসানী এরপর সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা এবং আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনকে প্রধান গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় করে ১৯৫৭ সালে একটি নতুন দল গঠন করেন, যার নাম দেন ন্যাশানাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপ। বাংলাদেশের প্রায় সব গোষ্ঠীর কমিউনিস্টরা এই ‘ওপেন প্ল্যাটফর্মে’ সমবেত হন।

পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে ভাসানী ছিলেন প্রতিরোধের মুক্তিসূর্য। তিনিই প্রথম স্বাধীন পূর্ব বাংলার ডাক দেন। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের প্রতি উচ্চারণ করেন সাবধানবাণী। গোটা ছয়ের দশক তাঁর লড়াই থরথর করে কাঁপিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রকে। উনসত্তর সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের প্রধান কারিগর তিনি। তখন থেকেই তিনি ‘প্রফেট অফ ভায়োলেন্স’। স্বাধীন বাংলাদেশেও যখন প্রতিষ্ঠিত হল একদলীয় স্বৈরাচার, একজন ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হল যাবতীয় ক্ষমতা, মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন রক্তাক্ত হল বারবার, তখনও পথে নেমেছেন, প্রতিরোধ করেছেন মওলানা ভাসানী।

ভাসানী একদিকে ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ। অন্যদিকে সমাজতন্ত্রের প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। তাঁকে বোঝা কঠিন। বামপন্থী বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আনু মহম্মদ লিখছেন, “মানুষ তাঁর কাছে ভরসা চাইতেন, তাঁদের দুর্গতির কথা বলতেন, কিংবা জীবন্ত স্বাক্ষর হিসাবে হাজির হতেন অবর্ণনীয় অন্যায় এবং অবিচারের। এই জীবন নিয়তির বিধান, আল্লাহ এভাবেই বেশিরভাগ মানুষের জীবন নরক করে নির্ধারণ করেছেন, আর সব ক্ষমতা সম্পদ দান করেছেন লম্পট জালেমদের হাতে — এই বিশ্বাস চর্চা থেকে তিনি সরে এসেছিলেন অনেক আগেই। বরঞ্চ তাঁর অবস্থান ছিল এই, যে এই নারকীয় অবস্থা নিয়তি নয়, এটা আল্লাহ প্রদত্ত বিধান নয় আর সর্বোপরি মানুষ ঐক্যবদ্ধ হলে এই অবস্থা পরিবর্তন করতে সক্ষম। এই ভিন্ন অবস্থানের কারণেই তিনি তরুণ বয়স থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী অবস্থান নিয়েছিলেন। “অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায়সঙ্গত” এটা তাঁর জীবনের বাণী হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

তাই শাসকদের প্রিয় অন্য প্রতিষ্ঠিত পীর মওলানাদের থেকে ইসলাম ধর্ম সম্পূর্ণ ভিন্ন বিশ্লেষণে উপস্থিত হয়েছিল মওলানা ভাসানীর জীবনে, উচ্চারণে এবং সংগ্রামে। যা ইসলাম ধর্মের মালিকানায় অধিষ্ঠিত তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্র, সামরিক শাসক, জোতদার মহাজন সামন্তপ্রভু, তাদের পেয়ারের পীর মওলানাদের ক্ষিপ্ত করেছিল। তিনি অভিহিত হয়েছিলেন ‘ভারতের দালাল’, ‘লুঙ্গিসর্বস্ব মওলানা’ এমনকি ‘মুরতাদ’ হিসাবে। শাসক শোষকদের এই ক্ষিপ্ততা আসলে ছিল শ্রেণিগত রোষ। সবদিক থেকেই, পোশাক জীবনযাপন বয়ান আওয়াজ সবদিক থেকেই, ভাসানী ছিলেন নিম্নবর্গের মানুষ। এবং লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই অভিজাত ইসলামের বিপরীতে তাঁর কাছে অন্য ইসলামের ভাষা তৈরি হয়। ধর্ম যেখানে শাসক জালেমদের একচেটিয়া মালিকানাধীন নিরাপদ অবলম্বন, সেখানে মওলানা ভাসানী সেই নিরাপদ দুর্গকেই হুমকির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিলেন।

সুতরাং অন্যায় অবিচার আর দুঃখ দুর্দশা থেকে মানুষের মুক্তির জন্য দোয়া দরুদ নয়, দরকার সমষ্টিগত লড়াইয়ের রাস্তা তৈরি করা — এই উপলব্ধি মওলানাকে একই সঙ্গে সক্ষম করেছিল সংগ্রামের প্রতীক ভাসানী হয়ে উঠতে। যে ভাসানী সবরকম জালেমদের প্রবল দাপট আর আগ্রাসনের সামনে লক্ষ মানুষের স্বর নিজের কন্ঠে ধারণ করে পাল্টা ক্ষমতার প্রবল শক্তিতে রুখে দাঁড়াতেন, এক কন্ঠে জনতার ভেতর থেকে উঠে আসা অসীম শক্তিকে মূর্ত রূপ দিতেন। ক্লান্ত বিবর্ণ ক্লিষ্ট মানুষ শুধু নয়, প্রকৃতিকেও প্রাণবন্ত তরতাজা করে তুলত জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের হুঁশিয়ারি: ‘খামোশ’!”

ভাসানীর বক্তৃতা ছিল অসামান্য। পূর্ব পাকিস্তানের বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বয়স্কদের কাছে সেই আশ্চর্য বক্তৃতার কথা কিছু শুনেছি। ইউটিউবে তেমন পাইনি। ভাসাভাসা কিছু আছে। শ্রদ্ধেয় অশোক মিত্র কয়েক বছর আগে একটি সংবাদপত্রে তাঁর অসামান্য গদ্যে এই প্রসঙ্গে কিছু কথা লিখেছিলেন। সেই লেখার একটি অংশও ভাগ করে নিতে ইচ্ছে করছে।

… পূর্ববঙ্গের কৃষক নেতা মৌলানা ভাসানী জনমোহিনী বক্তৃতার জন্য বহুবিদিত। গত শতকের ষাট-সত্তরের দশক, শীতের মরসুমে পূর্ববঙ্গের বড় গঞ্জে সপ্তাহব্যাপী হাট বসেছে, মৌলানাসাহেব এসেছেন, পড়ন্ত বিকেলে তিনি বলা শুরু করলেন ধর্মকথা দিয়ে। নীতির কথা বললেন, নীতির ব্যাখ্যার জন্য কোনও মজার কাহিনি জুড়লেন, তার সূত্র ধরে ইতিহাসে চলে যাওয়া, ইতিহাস-বিবরণ শেষ হতে না হতেই সান্ধ‍্যকালীন নামাজের সময়, এক প্রহরের বিরতি, ফের সভা শুরু, মৌলানাসাহেব ইতিহাসে ক্ষান্ত দিয়ে সমকালীন রাজনীতিতে চলে এলেন। রাজনীতি থেকে দেশের আর্থিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ, কৃষকরা কেন ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, কোন নেমকহারামরা তাঁদের বঞ্চিত করছে, পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের দিকে স্পষ্ট ইঙ্গিত, সে সব কাহনের পর কাহন। কখনও আবেগে কাঁপছেন, কখনও রাগে ফুঁসছেন, কখনও শ্লেষাত্মক রসিকতা করে নিজে হাসছেন, কয়েক হাজার শ্রোতাকেও হাসাচ্ছেন। ফের নামাজের মুহূর্ত সমাগত, নৈশাহারের তাগিদও, পুনরায় সভার বিরতি। রাত একটু গভীর হয়ে এলে নির্মল আকাশে তারাগুলি উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছে, শব্দরাজি স্তব্ধ, মৌলানা ভাসানীর ভাষণের নৈশ কিস্তি, আরব্য উপন্যাসের একটি-দুটি উপাখ্যানের প্রসঙ্গ, সেখান থেকে অবলীলাক্রমে রামায়ণ-মহাভারতে অথবা কোনও চৈতন্যলীলায়, পরক্ষণে ইসলামি ধর্মকথায়, ফের কৃষক-জীবনের রূঢ় বাস্তবে। ধ্বনিতরঙ্গ উঠছে, নামছে, খাঁটি প্রাকৃত বাঙাল ভাষা, তদৈব উচ্চারণ ভঙ্গিমা। যাঁরা শুনছেন, তাঁরা সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। সবচেয়ে যা তাজ্জব, সপ্তাহব্যাপী হাট বসেছে, হাটের প্রতিটি দিন মৌলানাসাহেবের ভাষণ পড়ন্ত বিকেল থেকে, হাটুরেরা রুদ্ধশ্বাস আগ্রহে শুনেছেন। বিষয়বৈচিত্র্যের গুণে তথা বাগ্মিতার কলাকুশলতায় অতিকথন অতিসহজিয়ায় রূপান্তরিত হয়েছে।

এই ছিলেন ভাসানী। মজলুম জননেতা, মার খাওয়া মানুষের নেতা। বামপন্থী বন্ধুরা তাঁকে ‘লাল মওলানা’ বলতে পছন্দ করেন। যদিও আমার এখন তাঁকে রামধনুর মতো মনে হয়। অনেক রং, একটার সঙ্গে আর একটা মিশে যাচ্ছে। কখনও আবার মিশছে না, পাশাপাশি ছুঁয়ে আছে একে অন্যকে।

ভাসানীকে ভাললাগে, কারণ তাঁর লিনিয়ার পাঠ সম্ভব নয়। ভাসানী বহুমাত্রিক। মানুষের মত, এই উপমহাদেশের মত। এই মাটিকে আত্মস্থ না করে, এই মাটির কৃষক চেতনা এবং কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসের নিবিড় পাঠ ব্যতিরেকে তাঁকে বোঝা অসম্ভব।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.