মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটা। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে এখন সারে সারে তাঁবু। দশদিনেরও বেশি হল, সেইসব তাঁবুর নীচে ঠায় বসে রয়েছেন ছাত্রছাত্রীরা। কারোর গলায় জড়ানো সাদাকালো ফিলিস্তিনি কেফিয়া, কেউ রয়েছেন মুখ ঢেকে, কেউ ঢাকাঢুকির তোয়াক্কা না করে জোর গলায় বলছেন ‘আমরা চাই না আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গণহত্যায় মদত দিক।’

ইজরায়েলি বাণিজ্যিক সংস্থা এবং ইজরায়েলকে সাহায্যকারী বা ইজরায়েলে অস্ত্র সরবরাহকারী আন্তর্জাতিক বা মার্কিনী বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো থেকে যাবতীয় আর্থিক বিনিয়োগ সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে সরব হয়েছেন আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষাকর্মীরা। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে শিবির তৈরি করে ক্রমাগত প্রতিবাদ করে চলেছেন তাঁরা। পুলিস নামিয়েও দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না তাঁদের। বরং ক্যাম্পাস কর্তৃপক্ষের পুলিস ডাকার প্রতিবাদে আন্দোলন আরও জোরদার হচ্ছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

গত ১৭ এপ্রিল সকালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ছাত্রছাত্রী বিশবিদ্যালয় চত্বরে জড়ো হয়ে গাজায় ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর অত্যাচারের প্রতিবাদ করছিলেন। ঘটনাচক্রে এই সময়েই ক্যাম্পাসে ইহুদিবিদ্বেষ ঠেকাতে কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে তা নিয়ে কংগ্রেসের জেরার মুখে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মিনুশে শফিক। তৎপরতা দেখতে পরদিন বিকেলে তিনি ক্যাম্পাসে পুলিস ডেকে বসেন। একশো জনের বেশি ছাত্রছাত্রীকে গ্রেফতার করা হয়। গত শতকের ছয়ের দশকের ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর এই প্রথম এমন গণগ্রেফতারির ঘটনা কলাম্বিয়ার ক্যাম্পাসে। ছাত্রদের প্রতিবাদ এরপর দাউ দাউ করে ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে

সোমবার নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজির হয় সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ এবং রাজনৈতিক আন্দোলন দমনে নিউইয়র্ক পুলিসের বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত শাখা। একশো কুড়ি জনের বেশি আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষককে গ্রেফতার করে তারা, ৪৫ জন গ্রেফতার হন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে। জর্জিয়ার এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন মহিলা অধ্যাপককে টেনে হিঁচড়ে মাটিতে ফেলে হাতকড়া পরানোর ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়।

বুধবার, ২৪ এপ্রিল, প্রতিবাদ শিবির তৈরি হয় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। শনিবার, ২৭ এপ্রিল, বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষোভ থেকেও প্রায় ১০০ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গত এক সপ্তাহের মধ্যে কলাম্বিয়া, ইয়েল, হার্ভার্ড, বার্কলে, নিউ ইয়র্ক, বোস্টন, এমোরি, মিনেসোটা, ওহায়ো, টেক্সাস অস্টিন প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রেফতার হয়েছেন বহু আন্দোলনকারী। প্যালেস্তাইনের মৃত্যুমিছিলের প্রেক্ষাপটে আমেরিকার ক্যাম্পাসগুলোতে যেন ১৯৬৮ সালের যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের ছায়া।

আমেরিকার উত্তর-পূর্বের আটটা বড় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে একত্রে বলা হয় আইভি লিগ। সবকটাই পঠনপাঠন, গবেষণায় চূড়ান্ত উৎকর্ষের অধিকারী। মেধাবী, স্বচ্ছল ছাত্রছাত্রীদের শীর্ষ গন্তব্য। প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতেই রয়েছে বিপুল সম্পদ, যার আয় থেকে বছরের পর বছর উৎকৃষ্টতম মানের গবেষণা ও শিক্ষাক্রম চালিয়ে নিয়ে যেতে পারে তারা। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৮,৩০৮ কোটি ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে ধনী হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ ছিল ৪,৯৫০ কোটি ডলার। এই বিপুল সম্পদের উৎস কী?

শিক্ষাক্ষেত্রে দান করা অর্থের উপর আয়কর ছাড় পাওয়া যায়। তাছাড়া সরকার এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সরাসরি লাভবান হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ফলে। তাই প্রতি বছর মোটা অঙ্কের অনুদান পায় আমেরিকার নামী দামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। সরকারি-বেসরকারি নানা সংস্থা থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত প্রাক্তনী, বিভিন্ন শুভানুধ্যায়ী ও ধনী ব্যক্তিদের থেকে আসা সেই অনুদানের অর্থ বাজারে খাটিয়ে যে মুনাফা হয়, তা দিয়েই চলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানান কার্যক্রম। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এইরকম বিনিয়োগজাত লাভের পরিমাণ যেমন বছরে প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার।

বিনিয়োগ সংক্রান্ত সমস্ত খুঁটিনাটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রকাশ না করলেও, প্রকাশ্যে উপলব্ধ বিভিন্ন তথ্য ঘেঁটে একদল ছাত্রছাত্রী দেখেছেন যে ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন সংঘর্ষে সহায়ক বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংস্থায় মোটা টাকা বিনিয়োগ করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। অর্থাৎ আমেরিকার সরকারের পাশাপাশি, আর্থিক বিনিয়োগের সূত্রে এই যুদ্ধের সহায়ক হয়ে উঠছে মার্কিন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিপুল আর্থিক সম্পদ কোথায় কোথায় বিনিয়োগ করা হয় তা প্রকাশ করা এবং ইজরায়েলের সহায়ক হয় এমন বিনিয়োগ অবিলম্বে বন্ধ করাই আন্দোলনকারীদের প্রাথমিক দাবি।

যুদ্ধ-সহায়ক বিনিয়োগ বন্ধের দাবি আধুনিক আমেরিকার ইতিহাসে এই প্রথম নয়। ১৯৬৫ সালে কিছু ছাত্র সংগঠন মিলিতভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় চেস ব্যাঙ্কে বিনিয়োগ বন্ধ করার ডাক দেয়। সাত এবং আটের দশক জুড়েও অনুরূপ দাবি ওঠে নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

কিন্তু বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংস্থা ও ধনী ব্যক্তিদের অনুদানে চলা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষে চাইলেই ইজরায়েলের সঙ্গে যুক্ত যাবতীয় প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসা থেকে বিনিয়োগ তুলে নেওয়া সম্ভব নয়। তাতে তাদের অনুদান হারানোর ভয় থাকে এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দিক থেকে চাপে পড়ারও আশঙ্কা থাকে। তাছাড়া এইসব যুদ্ধ-সহায়ক বিনিয়োগের তালিকায় যেখানে মাইক্রোসফট বা গুগলের মত প্রতিষ্ঠানের নামও রয়েছে, সেখানে এই বিনিয়োগ তুলে নিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়েও বড় রকম ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এইসব কারণ দেখিয়ে ছাত্রছাত্রীদের দাবি ইতিমধ্যেই নাকচ করেছে ক্যালিফোর্নিয়া বা ওহিও স্টেটের মত কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়।

মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন এই আন্দোলনকে ইহুদীবিদ্বেষী বলে দেগে দিয়েছেন। তবে আমেরিকার ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন সাড়া ফেলছে কানাডা, অস্ট্রেলিয়াতেও। ইংল্যান্ডের প্যালেস্তাইন সলিডারিটি নেটওয়ার্ক আরও আগেই ইংল্যান্ডের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্যের তালিকা তৈরি করে ছাত্রছাত্রীদের ডাক দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে চাপ দেওয়ার জন্য। আমেরিকার আন্দোলন ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও অচিরেই পৌঁছবে বলে আশঙ্কা করছে ডেইলি মেল জাতীয় দক্ষিণপন্থী সংবাদমাধ্যম।

ক্যাম্পাসে পুলিস ডাকলে যা হয়। ছাত্রদের সংহতির প্রশ্নে আসলে পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর, দিল্লির জেএনইউ, আর আমেরিকার কলাম্বিয়ার মধ্যে চরিত্রগত ফারাক খুব একটা থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পদত্যাগের দাবি থেকে ছাত্রছাত্রীদের ভিড়ে বহিরাগতদের উস্কানির অভিযোগ, কোনোকিছুই বাদ পড়েনি এক্ষেত্রেও। ছাত্রদের আন্দোলন বিভিন্ন দেশেই বারবার সরকারকে ভয় পাইয়ে দেয়। দেখা যাক, প্যালেস্তাইনে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে বাইডেনের সরকারকে কতটা চাপে ফেলতে পারে আমেরিকার ছাত্রছাত্রীরা।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.