ত্রিয়াশা লাহিড়ী

২০১৩ সালের ঘটনা। নিধির বয়স মাত্র ২০, আর ধর্মেন্দরের ২৩। নিধিকে যখন ওর পরিবারের লোকেরা মাটিতে ফেলে বেধড়ক মারধর করছিল, ছেলেটাকে শুধু দেখে যেতে হয়েছিল, কিচ্ছু করতে পারেনি। ওর সামনে নিধিকে গ্রামের লোকজন দল বেঁধে মেরে ফেলে। তারপরেই ধর্মেন্দরের হাত দুটো কেটে, পা দুটো টুকরো টুকরো করে, মাথাটা দেহ থেকে আলাদা করে দেয়। কাদের জন্য তৈরি করা হয় এই উদাহরণ? যারা জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে ভালবাসবে, তাদের জন্য। এই নৃশংস দৃশ্য যেন প্রত্যেকের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়, তার জন্যই আয়োজিত হয়েছিল এই হত্যালীলা। হরিয়ানার একটা ছোট্ট গ্রাম, যার দূরত্ব দেশের রাজধানী থেকে ১০০ কিলোমিটারও নয়, সেখানে নিধি আর ধর্মেন্দর ভালবেসে বিয়ে করতে চাওয়ার অপরাধে নিধির পরিবারের লোকেদের হাতে খুন হয়েছিল।

এই একবিংশ শতাব্দীতেও ভারতে ‘অনার কিলিং’-এর হার উদ্বেগজনক। অনার কিলিংয়ের মূল উদ্দেশ্য হল, পরিবারের সম্মানরক্ষার নামে এমন যে কোনো ব্যাপারে চরম পদক্ষেপ নেওয়া, যা সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করতে পারে বলে মনে হয়। এই প্রবণতার শিকড় রয়েছে বর্ণাশ্রম ব্যবস্থার মধ্যে। তথ্য বলছে, প্রতি বছর প্রায় ১,০০০ তরুণ-তরুণী ভিন জাতে অথবা ভিন ধর্মে প্রেম করার অপরাধে খুন হচ্ছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর রিপোর্ট অনুযায়ী, গোটা ভারতে ২০১৯ সালে ২৫টি অনার কিলিং হয়েছে। ২০২০ সালে ২৫টি এবং ২০২১ সালে ৩৩টি। এই সংখ্যা অত্যন্ত কম। কারণ অধিকাংশ ঘটনা পুলিসের কাছে পৌঁছয় না, অথবা আত্মহত্যা বা দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বহু বছর ধরে উত্তর ভারতে, অর্থাৎ হরিয়ানা, পাঞ্জাব, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ইত্যাদি রাজ্যে ঝুড়ি ঝুড়ি অনার কিলিং হত। ইদানীং দক্ষিণ ভারতেও এই অসুখ ছড়িয়ে পড়ছে। গত পাঁচ বছরে তামিলনাড়ুতে অনার কিলিংয়ের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এভিডেন্স নামক একটা বেসরকারি সংগঠন ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল যে তার আগের পাঁচ বছরে কেবল তামিলনাড়ুতেই ১৯৫টি অনার কিলিং হয়েছে।

কন্নগি আর মুরুগেসন তামিলনাড়ুর কুড্ডালোর জেলার পুথুক্কূড়াইপেট্টাই গ্রামের বাসিন্দা ছিল। কন্নগি বি কম পাশ করে, আর মুরুগেসান কেমিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং। কন্নগি প্রভাবশালী ভান্নিয়ার সম্প্রদায়ের মেয়ে, আর মুরুগেসন দলিত। কন্নগি ও মুরুগেসন ২০০৩ সালের ৫ মে কন্নগির বাবা-মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করে। এই ঘটনার দুমাস পর ৭ জুলাই, ওই দম্পতিকে কান্নাগির ভাই মারুদুপান্ডিয়ান ও অন্যান্য আত্মীয়রা প্রকাশ্য দিবালোকে জোর করে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলে। পরে তাদের মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়।

এবছরের ঘটনা। তামিলনাড়ুর তিরুনেলভেলির সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার কভিন সেলভাগনেশ স্কুলজীবনে ভিন জাতের মেয়ে সুভাষিণীকে ভালবেসেছিল, তাকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল। মেয়েটির দাদা সুরজিৎ, কভিনের উপর বর্বরোচিত হামলা করে এবং শেষপর্যন্ত তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন করে।

তিরুপতিতে এক মা তাঁর কিশোরী মেয়েকে হত্যা করেন মেয়েটির ভিন্ন জাতের এক পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠার কারণে। এসব খবরের তালিকার করতে বসলে ফুরোবে না। সময় বদলেছে, ক্যালেন্ডারের তারিখ বদলেছে, অথচ সমাজের ব্যাধি আর তার সংক্রমণ দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছড়িয়েছে।

সম্প্রতি সিপিএম তামিলনাড়ুতে অন্য জাতে বিয়ে করার জন্য নিজেদের পার্টি অফিসগুলোকে খুলে দেওয়ার ঘোষণা করে নজির তৈরি করেছে। তিরুভারুর জেলার তিরুথুরাইপুন্ডিতে সিপিএম দফতরে ইতিমধ্যেই এমন একটা বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিরুথুরাইপুন্ডির কাছে ভারাম্বিয়ামের বাসিন্দা অমৃতা আর সঞ্জয় কুমারের সাত বছরের সম্পর্ক। সঞ্জয় পুদুক্কোট্টাই জেলার মাদুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ত্রিচির এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। নবদম্পতি ভিন্ন জাতির হওয়া সত্ত্বেও শুরুতে দুই পরিবারই এই বিয়েতে সম্মতি জানায় এবং ২৭ আগস্ট তিরুভারুরের এক মন্দিরে বিয়ের আয়োজন করা হয়। নেমন্তন্নের কার্ড ছাপিয়ে আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে বিলিও করা হয়। কিন্তু সঞ্জয়ের কাকা এই সম্পর্কের বিরোধিতা করে তাঁকে অপহরণ করেন বলে অভিযোগ। এরপর তিরুথুরাইপুন্ডি থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। যেদিন পুলিশ সঞ্জয়কে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে, সেই সন্ধ্যাতেই তিরুথুরাইপুন্ডির সিপিএম দফতরে অমৃতা-সঞ্জয়ের বিয়ে হয়।

তামিলনাড়ু সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক পি সন্মুগমের এক্স পোস্ট থেকে এই তথ্য জানা যায়। একই সঙ্গে নবদম্পতির সুরক্ষার আবেদন জানিয়ে পার্টির তরফে তিরুথুরাইপুন্ডি থানায় লিখিত আবেদন জানানো হয়। এর ঠিক দুদিন আগে সন্মুগম এক সভায় ঘোষণা করেছিলেন যে, পারিবারিক বিরোধিতার মুখে পড়া ভিন জাতের বিয়ের জন্যে সারারাজ্যের সিপিএম দফতরের দরজা খোলা থাকবে। তিনি আরও বলেন, শুধু তিরুনেলভেলি জেলা থেকেই এক বছরে ২৪০টি জাতপাতের কারণে হত্যার খবর পাওয়া গেছে। লাল ঝান্ডার উপর আস্থা রাখলে ভালবাসার জয় হবে – এই বার্তাই বুঝি পাওয়া গেল তামিলনাড়ু থেকে।

জাতিভেদ ভারতীয় সমাজের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। স্বাধীনতার পর সাংবিধানিকভাবে অস্পৃশ্যতা, জাতিগত বৈষম্য, বর্ণভিত্তিক নিপীড়ন নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে বৈষম্য এবং দলিত ও আদিবাসীদের উপর শোষণ-নিপীড়ন অব্যাহত থেকেছে। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ, ভূমি সংস্কার, শ্রমিক অধিকার ও শিক্ষার প্রসারে বামপন্থী শক্তিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিলেও জাতিভেদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের অবস্থান নিয়ে বহু বিতর্ক আছে। জাতিগত বৈষম্য রোখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এইরকম দাঁড়াতে পারে:

ক. সিপিআই: স্বাধীনতার পর জমিদারি উচ্ছেদ ও ভূমি সংস্কার আন্দোলনে সিপিআই সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল। ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক সভা, ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে দলিত ও নিম্নবর্ণের শ্রমিকদের সংগঠিত করার সক্রিয় প্রচেষ্টা চালায়।

খ. সিপিএম: পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও কেরালায় সিপিএম দীর্ঘদিন শাসন করেছে। জমি সংস্কার, ভাগচাষি আন্দোলন এবং শিক্ষা সংস্কারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। পশ্চিমবঙ্গে ভূমি সংস্কারের ফলে বহু দলিত ও আদিবাসী কৃষক জমির অধিকার পেয়েছেন। কেরালায় বাম জমানায় শিক্ষার অগ্রগতি সমাজে জাতিগত অসাম্য অনেকাংশে কমিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের অপারেশন বর্গা এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল, যা গ্রামীণ সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ভাগচাষি বা বর্গাদারদের আন্দোলন চলে। ভাগচাষিদের যাতে জমির মালিকরা উচ্ছেদ করতে না পারে, তার জন্য তাঁদের আইনি সুরক্ষা প্রদান করা হয়। উৎপাদিত ফসলে তাঁদের ন্যায্য ভাগ নিশ্চিত করা হয়।

গ. লিবারেশন: নকশালবাড়ি আন্দোলনের উত্তরসূরি হিসাবে গড়ে ওঠা এই ধারা বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশে জাতিভিত্তিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই করেছে। সন্ত্রাস-দরদি, চিনের মদতপুষ্ট মাওবাদী ইত্যাদি অপপ্রচার সামলে বিহারে লিবারেশন সবচেয়ে গরিব মানুষের দল হয়ে উঠেছে। দলিত এবং মুশাহার মহাদলিতদের পরিবার ১৯৯০-এর দশকে উচ্চবর্ণের লোকেদের কুখ্যাত সশস্ত্র বাহিনি রণবীর সেনার গণহত্যার শিকার হয়েছিল। রণবীর সেনার বিরুদ্ধে পালটা সশস্ত্র সংগ্রামও চালিয়েছে লিবারেশন। নিম্নবর্ণের ভূমিহীন কৃষকদের আসনে, বিছানায় বসার অধিকার; সকলের জল নেওয়ার জায়গা থেকে জল নেওয়ার অধিকার, ন্যায্য মজুরি পাওয়ার অধিকার এবং ভোটাধিকারের জন্য লড়াই করেছে এই দল। গরিবের সম্মান ও মর্যাদার জন্য লড়াই করেই আজ বিহারের রাজনীতিতে লিবারেশন গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠেছে। মজদুর কিষান সংঘর্ষ কমিটি, ইন্ডিয়ান পিপলস ফ্রন্ট ইত্যাদি সংগঠনের মাধ্যমে দলিত ও নিম্নবর্গীয় কৃষক, শ্রমিকদের সংগঠিত করেছে। লিবারেশন জাতি ও শ্রেণিকে আলাদা অথচ আন্তঃসম্পর্কিত প্রশ্ন হিসাবে তুলে ধরে। শহরে দলিত ও আদিবাসী শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও মহিলাদের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছে।

ঘ. সিপিআই (এম-এল) রেড স্টার: রেড স্টারকে জাতিভেদের প্রশ্নে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে দেখা গেছে। বিভিন্ন রাজ্যের ভূমি আন্দোলন, কৃষক-শ্রমিক সংগ্রামে দলিত ও আদিবাসীদের অংশগ্রহণকে রেড স্টার অগ্রাধিকার দেয়। জাতিভেদ প্রথাকে ভারতীয় সামন্ততন্ত্র ও পুঁজিবাদের যৌথ ভিত্তি হিসাবে ব্যাখ্যা করে। বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকরের চিন্তাকে মার্কসবাদী বিশ্লেষণের সঙ্গে জুড়ে নেওয়ার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে এই দল।

ভারতীয় সংবিধানে বলা হয়েছে, আইনের চোখে সব নাগরিক সমান। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ – কোনোকিছুর ভিত্তিতেই তাদের মধ্যে বৈষম্য করা চলবে না। অর্থাৎ ভিন্ন জাতে বিয়েতে কোনো আইনগত বাধা নেই। এও বলা আছে যে প্রত্যেক ব্যক্তির নিজের ইচ্ছামত জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকার আছে। এছাড়াও দেশে লাগু আছে স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট বা বিশেষ বিবাহ আইন, ১৯৫৪। এই আইন অনুযায়ী, যে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষ জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায় ভিন্ন হলেও আইনত বিয়ে করতে পারেন। এই আইন মূলত ভিন জাতে বা ভিন ধর্মে বিয়ে করাকে বৈধতা দেওয়ার জন্যই তৈরি করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টও একাধিক রায়ে নিশ্চিত করেছে যে অন্য জাতে বিয়ে করা সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। বরং যারা এমন বিয়ে করে, তাদের সামাজিক বা পারিবারিকভাবে হেনস্থা করাই অসাংবিধানিক।

আম্বেদকর তাঁর অ্যানাইহিলেশন অফ কাস্ট বইতে লিখেছিলেন, জাতিভেদের শৃঙ্খল ভাঙার সবচেয়ে কার্যকর সামাজিক অস্ত্র হল ভিন্ন জাতে বিয়ে। বর্ণবাদ টিকে থাকে এন্ডোগ্যামির (অর্থাৎ নিজের জাতের মধ্যেই বিয়ে) মধ্য দিয়ে। অন্য জাতে বিয়ে আটকানোই হল জাতিভেদের সারবস্তু। সকলে যদি এই নিয়ম ভেঙে অন্য জাতে বিয়ে করতে শুরু করে, তাহলেই জাতিভেদ প্রথা ভেঙে পড়বে।

তিনি নিজে দ্বিতীয় বিয়ে করেন ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেওয়া সবিতার সঙ্গে। তামিলনাড়ুর যুক্তিবাদী নেতা পেরিয়ার স্বয়ং ভিন জাতে বিবাহকে উৎসাহ দিয়েছিলেন এবং এমন বহু দম্পতির বিয়ে নিজে সম্পন্ন করিয়েছেন। তাঁর নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী মণিয়াম্মাই ভিন্ন জাতির ছিলেন। ভারতের বহু কমিউনিস্ট নেতাও এমন বিয়ে করেছেন।

পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের জোরালো বক্তব্য ছিল ‘জাতপাত নয়, শ্রেণি রাজনীতি।’ তাই প্রকাশ্যে জাতপাত নিয়ে রাজনীতি হয়নি বললেই চলে। কিন্তু গ্রামীণ বাংলায় বৈষম্যের বীজ যে ছিল, সেকথা অনস্বীকার্য। দক্ষিণবঙ্গে মতুয়া ও নমশূদ্র, উত্তরবঙ্গে রাজবংশী, দলিত কৃষকদের সমস্যা দূর হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে জাতিপ্রথা অদৃশ্য মনে করার প্রবণতাও বামফ্রন্টের ছিল, ফলে দলিত ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মনে অসন্তোষ জমেছিল।

ত্রিপুরায় জাতপাতের প্রথানুযায়ী হিন্দু সামাজিক বিভাজন তুলনামূলকভাবে কম প্রভাবশালী ছিল, কারণ সেখানকার সমাজে বাঙালি উদ্বাস্তু ও উপজাতির মানুষ মিশে আছেন। তবে উদ্বাস্তু দলিত সম্প্রদায়, বিশেষত নমশূদ্র ও মতুয়া জনগোষ্ঠী, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনার মুখে পড়েছিল।

অন্যদিকে কেরালা বামপন্থী আন্দোলনের আগে থেকেই সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল। বাম শাসনে সেই আন্দোলন রাজনৈতিক আন্দোলনের চেহারা পেয়েছে। শিক্ষার প্রসারের ফলে কেরালায় জাতপাতজনিত বৈষম্য তুলনামূলকভাবে দ্রুতগতিতে কমে যায়। তবে আজও কেরালায় জাতিগত পরিচয়ের গুরুত্ব পুরোপুরি মুছে যায়নি, বিশেষত নির্বাচনে প্রার্থী ঠিক করার ক্ষেত্রে বা বিয়ের ক্ষেত্রে। তবে অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় সামাজিক অগ্রগতি অনেক বেশি।

বামপন্থী দলগুলোর নেতৃত্বে নিম্নবর্গের মানুষের প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি নিয়ে দলিত সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটিগুলোতে দীর্ঘদিন উচ্চবর্ণের আধিপত্য বজায় ছিল। দলিত, আদিবাসী, মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব তুলনায় কম ছিল। পূর্ণ সমর্থন থাকলেও ভিন জাতে বিয়েকে সামাজিক সুরক্ষা দিতে যতটা সক্রিয় ভূমিকা দেশের প্রত্যেক রাজ্যে, প্রত্যেক জেলায় নিতে হত, কমিউনিস্ট পার্টিগুলো ততটা নেয়নি। অনেক সময়ে অনার কিলিংয়ের বিরুদ্ধে বাম সংগঠনগুলোর প্রতিরোধও দুর্বল ছিল।

অতএব সংক্ষেপে বামপন্থী পার্টিগুলোর ভূমিকা বোঝাতে গেলে বলতে হবে, বামপন্থীরা জাতিগত বৈষম্যের প্রশ্নে নীতিগতভাবে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে, বাস্তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনও এনেছে। তবে সংগঠনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যথেষ্ট প্রতিনিধিত্ব না থাকা এবং সাংস্কৃতিক-সামাজিক লড়াইয়ে দুর্বলতার কারণে তাদের প্রতিরোধ খুব বেশি সফল হয়নি।

শুধুমাত্র জাত নয়, অন্য ধর্মে বিয়ে করাও সংবিধানস্বীকৃত। অথচ বাস্তবে বড়সড় অপরাধ। রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারে বড় হওয়া কন্যাসন্তানদের ছোট থেকে পইপই করে বলে দেওয়া হয় ‘মুসলমান আর নমশূদ্রদের ঘরে যেও না।’ বাঙালিরা যে এই ব্যাধি থেকে মোটেই মুক্ত নয় তার জলজ্যান্ত প্রমাণ কদিন আগেই পাওয়া গেছে। নদিয়ার হাঁসখালি এলাকায় জীবিত মেয়ের শ্রাদ্ধ করেছে তার পরিবার, কারণ সে বাড়ির অমতে এক মুসলমান ছেলেকে বিয়ে করেছে। এই ঘোরতর অপরাধের শাস্তি হিসাবে পরিবারের লোকেরা মেয়ের যাবতীয় নথি, জামাকাপড়, বইপত্র পুড়িয়ে দেয়। বীরভূমে ২০২১ সালে ভিন ধর্মে বিয়ে করা দম্পতিকে গ্রামবাসী ও তাদের পরিবার বাড়ি থেকে বের করে দেয়, এমনকি বারবার প্রাণহানির হুমকিও দিতে থাকে।

ভারতে ধর্ষকদের বাঁচাতে শাসক দল সরাসরি মাঠে নেমে পড়ে, অথচ মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে – এই সহজ বাস্তবটুকু মানতে পারে না। বৈচিত্র‍্যের মধ্যে ঐক্যের যে আদর্শের উপর ভিত্তি করে ভারত তৈরি হয়েছে, আরএসএস-বিজেপি তা ভেঙে ফেলতে ‘লাভ জিহাদ’-এর মত তত্ত্বও বাজারে এনেছে। এর মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমানের প্রেম এবং বিয়েকে মুসলমানদের ষড়যন্ত্র হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে। এটা একইসঙ্গে প্রেম-বিয়ের স্বাধীনতা, নারী স্বাধীনতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপর আক্রমণ।

আরো পড়ুন দ্য কেরালা স্টোরি: আষাঢ়ে গল্প বনাম জেহাদি বাস্তব

উগ্র হিন্দুত্ববাদের জিগির তুলতে আরএসএস-বিজেপি সোশাল মিডিয়া, সিনেমা, টিভি সিরিয়াল, ওয়েব সিরিজ সর্বত্র লাভ জিহাদের প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে দিয়েছে। বামপন্থীরা তার পালটা প্রচার চালাতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের প্রচারের ভাষা এখনো চিরাচরিত সভা সমিতি বা লেখালিখিতে সীমাবদ্ধ, যা যুবসমাজকে আকর্ষণ করছে না।

আমরা জানি, আন্দোলনই বামপন্থীদের জোরের জায়গা। সিপিএম যে উদ্যোগ তামিলনাড়ুতে নিয়েছে, সেই উদ্যোগ ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। প্রত্যেকটা বামপন্থী দল এই উদ্যোগ নিক। ভিন্ন জাতি বা ধর্মের মানুষকে ভালবাসলে সামাজিক বয়কটের সম্মুখীন হতে হয় না, এমন সমাজ গড়তে ঐক্যবদ্ধ লড়াই প্রয়োজন।

নিবন্ধকার বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.