শুধু মূলধারার রাজনীতি কেন? যারা বরাবর সভ্যতার মূল স্রোতের বাইরে থেকেছে, তাদের রাজনৈতিক অধিকারের কথা স্রেফ উচ্চারণ করলে বা সামান্য কিছু প্রতীকী ব্যবস্থা নিলেই কোনো রাজনৈতিক দলের আভ্যন্তরীণ লিঙ্গসাম্যের মজবুত ভিত তৈরি হতে পারে না। আবার এ-ও দেখা যায়, এলজিবিটিকিউ অধিকারের পক্ষে কথা বলা রাজনৈতিক দল ঋতুমতি নারীকে অশুচি মনে করে। অর্থাৎ তারা ধর্মীয় গোঁড়ামির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে জোর গলায় সমস্ত মন্দির, মসজিদে নারীর প্রবেশাধিকার চাইতে পারে না। ধর্মীয় নিয়মকানুনকে অস্বীকার করে লিঙ্গসাম্যের লড়াই গড়ে তুলতে গিয়ে অনেক রাজনৈতিক দলই থতমত খেয়ে যায়। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ঈশ্বর বিশ্বাসের প্রসঙ্গ আলাদা, কিন্তু ঈশ্বরকে কেন্দ্র করে যারা রাজনৈতিক মতবাদ গড়ে তোলে এবং সেই মতবাদের পরিপ্রেক্ষিতে সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতির বয়ান তৈরি করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে যদি মতাদর্শগত অবস্থান গ্রহণ না করা গেলে লিঙ্গসাম্যের লড়াইয়ের বড়াই করা সাজে না।

সিপিএমের অভ্যন্তরে সমস্ত লিঙ্গের ও যৌন পরিচয়ের মানুষের জন্য জায়গা তৈরি করার লড়াই আজকের নয়। আমাদের পার্টির চিরকালীন লক্ষ্য সমস্ত অংশের শোষিত মানুষের জন্য সমতা প্রতিষ্ঠা। এছাড়া ধর্মীয় নিষ্পেষণ, যা মানুষে মানুষে বিভাজন তৈরি করে, সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো বজায় রেখে বৃহৎ পুঁজির বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষের দুর্নিবার লড়াইকে দুর্বল করতে চায়, তার বিরুদ্ধেও আমাদের পার্টির চিরকালীন অবস্থান। যে কোনো শোষণ ও বিভাজনের বিরুদ্ধে মানুষকে এক করতে পার্টি অবিচল। নয়া উদারবাদী ব্যবস্থায় সচ্ছল জীবন কাটাতে হিমসিম খাচ্ছেন সকলেই। ফ্যাসিবাদ যত শক্তিশালী হচ্ছে, তত মৌলবাদী পুরুষতান্ত্রিক আগ্রাসন বাড়ছে আমাদের ব্যক্তিগত পরিসরে। রাষ্ট্র সরাসরি আমাদের রুচি ও স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। ফলে লিঙ্গবৈষম্যও বাড়ছে। এমন নয় যে বিংশ শতকে নারীকে নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে আর একবিংশ শতাব্দীতে এসে নারীমুক্তি ঘটেছে। বরং শোষণ, বঞ্চনার একটা পথ বন্ধ করা গেলে তৎক্ষণাৎ আরেকটা পথ তৈরি হয়েছে। তাই নারী আন্দোলন চলছে অবিরাম।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এখানেই আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ এসে যায়। তৃতীয় লিঙ্গের ও প্রান্তিক যৌনতার মানুষের উপর রাষ্ট্রীয় আক্রমণের প্রসঙ্গ এবং তাদের অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রসঙ্গ। ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট যখন দিল্লি হাইকোর্টের রায়কে খারিজ করে দেয়, তখন আমাদের পার্টি প্রকাশ্যে সেই রায়ের নিন্দা করেছিল। পরের বছর সুপ্রিম কোর্ট যখন মানুষের নিজ লিঙ্গ পরিচয় নির্ধারণের অধিকার এবং সমতার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়, কিংবা ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট যখন সংবিধানের ৩৭৭ ধারা বাতিল করে সমকামিতা অপরাধ নয় বলে রায় দেয়, তখন সেই রায়কে স্বাগত জানিয়েছিল সিপিএম এবং পার্টির গণসংগঠন ভারতের ছাত্র ফেডারেশন ও সারা ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি। ট্রান্সজেন্ডার অ্যাক্টের বিরুদ্ধে বা স্ক্রিনিং কমিটির বিরুদ্ধে বারবার গলা ফাটিয়েছে ছাত্র ফেডারেশন। কারণ এই আইনে তৃতীয় ও প্রান্তিক লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়নি। এমনকি জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-তে লিঙ্গ নিরপেক্ষ শিক্ষা এবং লিঙ্গবৈষম্যজনিত হিংসা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। কোনো বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়াই ট্রান্সজেন্ডার অ্যাক্টে ভিক্ষা চাওয়াকে অপরাধের আওতায় আনতে চেয়েছে বিজেপি সরকার। লিঙ্গের দিক থেকে সংখ্যালঘুদের জন্য যে সংরক্ষণ প্রয়োজন তাকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি।

বাকি রইল এ রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস সরকার। ওই দলের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পুরুষতন্ত্রের বীজ। ট্রান্সজেন্ডার বোর্ড নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু সেই বোর্ডের কাজ শূন্য। এ রাজ্যে কতজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ আছেন, রাজ্য সরকারের কাছে সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য পর্যন্ত নেই। ভোটার তালিকা সংশোধন থেকে কোভিড ভ্যাক্সিন দেওয়া, সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি দানা বেঁধেছে। আন্তঃলিঙ্গ জনগোষ্ঠীর ‘হিজড়ে’ পেশাভিত্তিক মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা ও বাসস্থান নির্মাণ নিয়ে সুদৃঢ় পরিকল্পনা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে এই রাজ্য সরকার।

এই অবস্থায় সারা দেশ ও রাজ্যে লিঙ্গবৈষম্যজনিত সমস্যাগুলোর সার্বিক মূল্যায়ন ও নিরসনের পথ প্রশস্ত করতে পার্টি অঙ্গীকারবদ্ধ। শোষণের হাত থেকে সামগ্রিক মুক্তির জন্য তীব্র গণসংগ্রাম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। এবারের ২৫তম কলকাতা জেলা সম্মেলনে এলজিবিটিকিউআইএ+ গোষ্ঠীর মানুষকে নিয়ে গণসংগঠন গড়ে তোলার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সম্মেলন একটা গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। সেখানেই সব কাজ শেষ হয় না, পার্টি সচল থাকে অত্যাচারিত মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে।

মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

বাম ছাত্র-যুবদের নবান্ন অভিযানে অংশ নেবেন প্রান্তিক যৌন পরিচয়ের অনেকেও

Leave a Reply