অর্ণব সাহা
প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় খবরের শিরোনামে এসেছিলেন সেদিনই, যেদিন তিনি হাইকোর্টের জজের চাকরি থেকে আগাম অবসর নিয়ে বিজেপি প্রার্থী হিসাবে তমলুক থেকে লোকসভা নির্বাচনে দাঁড়ালেন। সংবাদমাধ্যমে কখনো বলেছেন “গান্ধী না গডসে, কে বেশি গ্রহণযোগ্য? ভাবতে হবে”। কখনো আবার বলেছেন “নিজেকে একসময় লেনিন মনে করতাম”। কিন্তু কয়েকদিন আগে তিনি যে মন্তব্য করেছেন দেশের একমাত্র মহিলা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সম্পর্কে, তা অভাবনীয়। বলেছেন “মমতা ব্যানার্জি, তুমি কত টাকায় বিক্রি হও? মমতা ব্যানার্জি মহিলা তো? আমার [মনে] প্রশ্ন জাগে মাঝে মাঝে”।
কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে, অভিজিৎবাবুর এই মন্তব্য আদৌ অভাবনীয় নয়। যে রাজনৈতিক শিবিরে যোগ দিয়েছেন অভিজিৎ, সেই সংঘ পরিবার নারী সম্পর্কে একেবারে গোড়া থেকেই অত্যন্ত হীন মানসিকতা পোষণ করে। সংঘ একটি মনুবাদী, ব্রাহ্মণ্যবাদী, উচ্চবর্ণীয় বাস্তুতন্ত্র পরিচালনা করে যা ভারতীয় সমাজে বহু যুগ ধরে চলে আসা পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্যের ধারাটিকেই নতুন সময়ের প্রেক্ষিতে ভারতের মাটিতে স্থাপন করতে চায়। তাদের পুরনো লেখাপত্র থেকে উদ্ধৃতি বেশি দেব না, কারণ সেগুলো অধিকাংশেরই জানা। সরসংঘচালক গোলওয়ালকর তাঁর বাঞ্চ অফ থটস নামক কুখ্যাত বইতে লিখেছেন, তাঁদের প্রস্তাবিত হিন্দুরাষ্ট্রে নারী মূলত বিশ্বস্ত মাতা, যে তার সন্তানসন্ততিকে যত্নের সঙ্গে লালনপালন করে এবং বিনাশকারী পশ্চিমি প্রভাব থেকে রক্ষা করে। গোলওয়ালকর লিখছেন, নারীর পালনীয় হল ‘সাবিত্রীর আদর্শ, যার সামনে এমনকি মৃত্যুদেবতা পরাজয় মেনে নিয়েছিলেন, তা (নারীর) সামনে উপস্থিত। সব নারী যেন তার আদর্শের এমন একাগ্র নিষ্ঠা, চরিত্রের এমন পবিত্রতা এবং অতুলনীয় নির্ভীকতা প্রার্থনা করে।’ তাঁর মতে, পুরুষের কাজ হল নারীকে ‘শৃঙ্খলাবদ্ধ’ ও ‘সুরক্ষিত’ রাখা, ‘মর্যাদা’ রক্ষার জন্য তাকে অন্তঃপুরেই আবদ্ধ রাখা। সংঘের পূর্বসূরী আর্য সমাজের দয়ানন্দ সরস্বতী এমন এক ‘নিয়োগ’ প্রথার কথা বলে গেছেন, যাতে নারীর যৌন সম্পর্ককে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং তাকে বংশবৃদ্ধি করার যন্ত্র হিসাবে দেখা হবে। মোদ্দাকথা, নারীকে হয়ে উঠতে হবে এমন পুত্রসন্তানের জন্মদাত্রী যারা ভবিষ্যতের হিন্দুরাষ্ট্রের মতাদর্শবাহী এবং তার জন্য নিবেদিতপ্রাণ, যার মধ্যে হিন্দু ঐতিহ্য, হিন্দু সভ্যতার আধ্যাত্মিকতা অটুট থাকবে। এমনকি গোলওয়ালকর বলেছেন, গোমাতার চেয়েও নারীর স্থান নিচে, কারণ নারীর আছে বিপজ্জনক যৌন আকর্ষণ, যা পুরুষকে প্রলুব্ধ করতে পারে এবং এর ফলে নারী অশুচি হয়ে যেতে পারে। তাই প্রকৃত অর্থেই নারী হল পুরুষের যৌনদাসী।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সংঘ পরিবার বহু আগে থেকেই স্বাধীন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান বদলে মনুস্মৃতিকে সেই জায়গায় বসানোর দাবি জানিয়ে এসেছে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নারীদের অবস্থান শীর্ষক একটি রিপোর্ট পেশ করতে গিয়ে সংঘের বর্তমান প্রধান মোহন ভাগবত বলেছিলেন ‘নারীরা সমস্ত বিরোধগুলিকে খেয়াল রেখে ঘরের যত্ন নেয়, ঘরকে মসৃণ ও শান্তিপূর্ণভাবে চালায়। এই ক্ষেত্রে নারীর বিপুল ভূমিকা রয়েছে…প্রকৃতি পুরুষকে যে গুণাবলী দিয়েছে তার মাধ্যমে সে শিকার করে, শ্রম করে। কিন্তু (প্রকৃতি) তাদের ঘরের বিষয়গুলির যত্ন করার সামর্থ্য দেয়নি।’
১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ একটি পুরুষতান্ত্রিক সংগঠন। এতে মেয়েদের প্রবেশাধিকার নেই। লক্ষ্মীবাঈ কেলকরের নেতৃত্বে ১৯৩৬ সালে রাষ্ট্র সেবিকা সমিতি গড়ে তোলা হয়, যাতে সংঘের পিতৃতান্ত্রিক বনিয়াদের ধাঁচেই মেয়েদের হিন্দুত্ব ও নারীত্বের শিক্ষা দেওয়া যায়। এই নারী সংগঠনের সঙ্গে আধুনিক নারীবাদী দর্শনের দূরদূরান্ত পর্যন্ত কোনো সম্পর্ক নেই। নারীদের আলাদা সংগঠনে নিয়ে আসার আসল কারণ অবশ্য বিভিন্ন সময়ে সংঘের নেতা, নেত্রীরাই খোলসা করেছেন। রাষ্ট্র সেবিকা সমিতির এক বরিষ্ঠ নেত্রীর কথায়, অত ভোরে মেয়েদের পক্ষে শাখায় আসা অসম্ভব। কারণ ‘পরিবারের দায়িত্ব ছেড়ে ওই সময়ে শাখায় আসা অনুচিত’। তৃতীয় সরসংঘচালক বালাসাহেব দেওরস বলেছিলেন ‘নারীদের যেখানে গৃহস্থালির দায়িত্ব রয়েছে, সেখানে কী করে তারা শাখায় অংশগ্রহণ করবে?’ ২০১৩ সালে ইন্দোরে এক সভায় ভাগবত বলেন ‘একজন স্বামী ও স্ত্রী পরস্পর এক চুক্তিতে আবদ্ধ যেখানে স্বামী বলে তুমি আমার ঘরের যত্ন নেবে এবং আমি তোমার প্রয়োজনগুলির যত্ন নেব। আমি তোমাকে নিরাপদে রাখব…তাই স্বামী চুক্তির শর্ত অনুসরণ করে চলে। যখন পর্যন্ত স্ত্রী চুক্তি অনুসরণ করেন, স্বামী তার সঙ্গে থাকে, কিন্তু যদি স্ত্রী চুক্তির খেলাপ করেন, স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যায়।’
আরো পড়ুন হিন্দুরাষ্ট্র ঠিক কেমন দেখতে?
১৯৮৭ সালে রাজস্থানে রূপ কানোয়ারের সতী হওয়াকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী প্রতিবাদ ধ্বনিত হলেও সতীর সমর্থনে সংঘ পরিবারের নেতা, নেত্রীরা নেমে পড়েন। বিজেপি নেত্রী, গোয়ালিয়রের রাজমাতা বিজয়রাজে সিন্ধিয়া প্রকাশ্যে সতী প্রথাকে সমর্থন করে বলেছিলেন, সতী প্রথা হল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এক ঐতিহ্য এবং একজন হিন্দু নারী সতী হবেন কিনা, তা বেছে নেবার অধিকার তাঁর আছে। তিনি বলেছিলেন ‘যারা সতী প্রথার বিরোধিতা করছে, তারা বাজারি মহিলা। তারা জানে না পাতিব্রত্য কাকে বলে। এদের হিন্দু ধর্মের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা নেই, এরা পশ্চিমি মতাদর্শে বিশ্বাসী। এরাই ক্লাবে যায়, মাতাল হয়’। কয়েকবছর আগে কেরালার শবরীমালা মন্দিরে ঋতুমতী নারীদের প্রবেশাধিকার রুখতে সংঘ বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ২০১৮ সালে ভাগবত শবরীমালা রায় প্রসঙ্গে বলেছিলেন ‘সুপ্রিম কোর্ট সমাজ কর্তৃক গৃহীত ঐতিহ্যের প্রকৃতি ও যুক্তিকে বিচার না করে রায় দিয়েছে। ২০১৯ সালে আরএসএস পরিচালিত অখিল ভারতীয় প্রতিনিধি সভা সিদ্ধান্ত নেয়, কিছু কায়েমি স্বার্থ অভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ‘হিন্দু বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে অপমান ও আঘাত দেবার পরিকল্পিত ছক’ অনুযায়ী শবরীমালা নিয়ে জল ঘোলা করছে। নারীর উপর পিতৃতান্ত্রিক শোষণের অন্যতম অস্ত্র হিসাবে ধর্ষণও বহু ক্ষেত্রে হয়ে উঠেছে সংঘ পরিবারের হাতিয়ার। গুজরাট গণহত্যায় মুসলমান মেয়েদের গণধর্ষণ তার প্রমাণ। জম্মুর কাঠুয়ায় নাবালিকা মেয়েকে ধর্ষণের পর বিজেপির কর্মী, সমর্থকরা ধর্ষকদের সমর্থনে মিছিল করে। উত্তরপ্রদেশের উন্নাওতে বিজেপি ধর্ষণে অভিযুক্ত বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গারকে ফুলমালা দিয়ে বরণ করে নেয় বিজেপির কর্মীরা। সংঘের স্বামী চিন্ময়ানন্দ ধর্ষণে অভিযুক্ত হলে উত্তরপ্রদেশের বিজেপি সরকার সেই মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়।
বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে কদর্য নারীবিদ্বেষী মন্তব্য করে অভিজিৎ বুঝিয়ে দিলেন, তিনি আপ্রাণ হিন্দুত্ববাদী পিতৃতন্ত্রের ভাষায় কথা বলে বিজেপির কাছে আরও গ্রহণযোগ্য হতে চাইছেন। বাংলা বরাবরই এক ব্যতিক্রমী জনপদ। উত্তর ভারতের হিন্দুরা যখন মূলত পুরুষ দেবতার পূজারী, বাংলা সেখানে প্রধানত মাতৃপূজার জায়গা। মমতা সরকারকেও প্রাণ ঢেলে সমর্থন করে চলেছেন মেয়েরা। ফলে আজও বাংলায় বিজেপির মত নারীবিদ্বেষী দল রাজনৈতিক সাফল্য পায়নি। অভিজিৎ সম্ভবত তাঁর কুৎসিত মন্তব্যের মাধ্যমে বাংলার মাটিতে নিজের রাজনৈতিক কেরিয়ারের কবর নিজেই খুঁড়লেন।
নিবন্ধকার শেঠ আনন্দরাম জয়পুরিয়া কলেজের শিক্ষক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







