আমরা সবাই কাঁটাতার পেরোলাম
আমরা সবাই, ঘাড় নীচু, মাথা নীচু
খাতা পেরোলাম, ইমিগ্রেশন খাতা
লঞ্চ পেরোলাম, তারপর ট্রেনপথ
কোনো এক দেশে আমরা যাচ্ছিলাম
যত গেছি তত ছিঁড়ে ছিঁড়ে গেছে পথ
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কোথায় সে দেশ? অতীতে? ভবিষ্যতে?
জয় গোস্বামী যখন এই কবিতা রচনা করছেন, তখন ‘নাগরিকত্ব’ কাগজের একটি টুকরোমাত্র হয়ে ওঠেনি, ‘দেশ’ তখনো ধর্মীয় ভিত্তিতে বসতের অধিকার প্রদানকারী নয়। তবুও, এ লেখা ছিল স্মৃতিচারণ, এক কাঁটাতার পেরনো মানুষের জবানবন্দি। অথচ, শেষ পংক্তির প্রশ্নটিই আজ আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতর্কের মূল। আমরা কোন স্থানাঙ্কে, কোন কালখণ্ডে বিচরণ করছি, অতীতে না ভবিষ্যতে, তা ক্রমশ ধূসর হয়ে আসছে।
২০১৯ সালে প্রণীত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ও ঠিক ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এই আইন লাগু হওয়া সংশয়মুখর আমজনতার, বিশেষত উদ্বাস্তু জীবনের পারিবারিক ইতিহাস বহনকারীদের নাগরিকত্বকে আরও বেশি করে টানাপোড়েনের কৃষ্ণগহ্বরে নিক্ষিপ্ত করছে। তার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ নেতাজিনগরের যুবক দেবাশিস সেনগুপ্তের ঝুলন্ত দেহ। তাঁর পরিবার জানিয়েছে, গত কয়েকদিন ধরে তাঁকে সিএএ-এনআরসি আতঙ্ক গ্রাস করেছিল। নাগরিকত্ব খোয়ানোর ভয় তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল। তাঁর আশঙ্কার কারণ, তাঁর কাছে সিএএর জন্য প্রয়োজনীয় কাগজ ছিল না। বারংবার পরিবারের সদস্যদের কাছে দেবাশিস আশঙ্কা প্রকাশ করছিলেন, তাঁকে দেশ থেকে বার করে দেওয়া হলে তিনি কোথায় যাবেন, কোথায় হবে তাঁর ভবিষ্যতের মাথা গোঁজার ঠাঁই। প্রতিটি আত্মহননের মত এটিও একটি সামাজিক-রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড।
এর দায় কে নেবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক চাপান উতোর চলবে। ইতিমধ্যেই রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিভিন্ন মুখপাত্র এ বিষয়ে সোশাল মিডিয়ায় বিজেপিবিরোধী বিবৃতি দিতে শুরু করেছেন। কিন্তু এখানে প্রশ্নচিহ্নের মতো ঝুলে রয়েছে এই ‘উদ্বাস্তু’ অবধারণাটি। ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত একটি রাজ্য, যেখানে পূর্ববাংলা থেকে একবার নয়, দুবার আছড়ে পড়েছে মানুষের ঢেউ, সেখানে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের মত বিভেদমূলক ও অবিবেচক আইন যে জনমানসে এক ধরনের সামগ্রিক প্যারানোইয়ার জন্ম দেবে তা বলাই বাহুল্য। ঠাকুমা-ঠাকুর্দার, বাবা-মায়ের জন্মের প্রমাণপত্র দূরস্থান, অনেক অ-উদ্বাস্তু পরিচয় বহনকারী মানুষেরই সিএএর জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত কাগজপত্র নেই। কেনই বা অযথা নাগরিকত্বের সমস্ত উপযোগিতাভোগী কোনো মানুষ নিজেকে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশের নাগরিক ঘোষণা করবে? তারও কোনো যথাযথ যুক্তিশৃঙ্খল খুঁজে পাওয়া ভার। তবে সঙ্ঘ-বিজেপির এই রাজনৈতিক ‘মাষ্টারস্ট্রোক’-এর প্রায়োগিক দৃষ্টিভঙ্গিটি ঠিক কী? এর উত্তর পেতে আমাদের খানিক অতীতচারণার প্রয়োজন রয়েছে। রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে ‘উদ্বাস্তু’ আগমনের ঠিকুজি-কুলুজি পুনর্বার পাঠ করবার প্রয়োজনীয়তা।
১৯৪৬ থেকে ১৯৬০-এর দশকের শেষদিক পর্যন্ত, শিয়ালদহের প্ল্যাটফর্মগুলি পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা বাঙালি হিন্দু শরণার্থীদের ভিড়ে নিয়মিত ঠাসা থাকত। কিছু উদ্বাস্তু পরিবার হয়ত সেখানে কয়েকদিন থেকেছে। কিন্তু অনেকে কয়েকমাস, এমনকি কয়েকবছর ধরে থেকেছে। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, আত্মজীবনীমূলক বিবরণ এবং সরকারি মহাফেজখানার উপর নির্ভর করে, বিশদভাবে বর্ণনা করা যায়, কীভাবে একটি ব্যস্ত রেলওয়ে স্টেশন দেশভাগের ফলে উদ্ভূত উদ্বাস্তুদের ঠাঁই দিয়েছিল। গুরুতর পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শিয়ালদহের প্ল্যাটফর্মগুলি এই উদ্বাস্তু বাসিন্দাদের বসবাসের কিছু সীমিত সুযোগ দিয়েছিল। অনেকে সরকারি বন্দোবস্তের ক্যাম্পে যাওয়ার পরিবর্তে শিয়ালদহে থাকাই ভাল মনে করেছিলেন। যা-ই হোক, শিয়ালদহে আগত এইসব উদ্বাস্তু বাসিন্দাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদিদের জন্য এটি অস্থায়ী বাড়িই হয়ে উঠেছিল। ব্যস্ত রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম, শিয়ালদহের তৎকালীন পরিকাঠামো শরণার্থীদের দৈনন্দিন প্রয়োজনের জন্য স্পষ্টতই অপর্যাপ্ত ছিল, চোখে লাগার মত লিঙ্গবৈষম্যের আয়োজনও সেখানে ছিল। কিন্তু শিয়ালদহ স্টেশন তাঁদের ‘ওয়েটিং স্পট’ হয়ে উঠেছিল। দীর্ঘমেয়াদী সেই যূথবদ্ধ অপেক্ষার কাজটি কৌমগত শক্তিহীনতা, জীবনের অনিশ্চয়তা অথবা সব হারানোর হতাশাকে কিন্তু প্রতিফলিত করেনি। শরণার্থীরা দ্রুত পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাতে এই অপেক্ষার সময়কে ব্যবহার করেছেন, পাশাপাশি চাকরি ও বাসস্থানের সন্ধান করেছেন। নিজেদের ব্যবস্থা নিজেরাই ধীরে ধীরে করে নেওয়ার জন্য স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করার এই কৌশল পদ্মাপাড়ের উদ্বাস্তুদের ভাঙা জীবন পুনর্গঠনের তাগিদে এক নতুন রাজনৈতিক পর্ব হিসাবে এপার বাংলার সামাজিক ইতিহাসে জায়গা করে দিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, তাঁরা শিয়ালদহের প্ল্যাটফর্মগুলিতে নিজস্ব আইন প্রণয়ন করেছিলেন বলা যেতে পারে। রাষ্ট্র নির্মিত আইনের বাইরে এমন কিছু পথ তাঁরা কেটেছিলেন যেগুলি একবিংশ শতাব্দীতেও কীভাবে উদ্বাস্তু-বিদ্বেষের প্রেক্ষাপটে ভিটেছাড়া মানুষকে সংগঠিত করতে হয় তার উল্লেখযোগ্য পাঠ হতে পারে।
আগ্রহী পাঠক যদি সমাজতাত্ত্বিক-ইতিহাস গবেষক অন্বেষা সেনগুপ্তের ‘বেঙ্গল পার্টিশন রিফিউজিস অ্যাট শিয়ালদহ স্টেশন, ১৯৫০-৬০’ নিবন্ধটি পাঠ করেন, তবে দেখবেন তৎকালীন সাময়িক পত্রে এই উদ্বাস্তু সমাহারের কী বিপুল হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়া হয়েছিল।
জনৈকা এলা সেন, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া কাগজের ১৪ জুলাই ১৯৫৭ সংখ্যায় যা লিখেছিলেন, তা হুবহু তুলে দিচ্ছি
Calcutta has its own Frankenstein—the four and a half million refugees … are now holding the city at ransom. It is impossible to enter from any direction without climbing over their heads. They are in possession of the railway stations.… At Sealdah station, on the east side of the city, the counter marked ‘Reservation’ is like some island in a vast sea of ragged, filthy destitution… Desperate and despairing this is a classless society. Each one has been ground down to an identical face — a face from which all distinguishing marks of education, culture or occupation have been effaced. No longer is it possible to tell the schoolmaster from the artisan, the postman from the peasant.
আরো পড়ুন আসামের মুখ্যমন্ত্রী বদল কিসের ইঙ্গিত?
সুতরাং একথা এ ধরনের জনপ্রিয় বয়ান থেকেই পরিষ্কার, যে শহর কলকাতার তদানীন্তন উচ্চবর্গীয়রা এই ‘ভুঁইফোঁড়’ উদ্বাস্তুদের সংসার পেতে বসাকে বিন্দুমাত্র ভাল চোখে দেখছিলেন না। স্টেশনটিকে তাদের গার্হস্থ্যে পরিণত করে, এই উদ্বাস্তুরা আদপে এলা সেনের মত ভদ্রজনের চলাফেরায় বাধা সৃষ্টি করছিল এবং তাদের এতকালের গৃহসংস্থান, সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস এবং জনপরিসরে মালিকানা স্বত্ব সম্পর্কে ধারণাগুলিকেও জোর ধাক্কা দিচ্ছিল। সমসাময়িক সংবাদপত্র, সরকারি প্রতিবেদন এবং মৌখিক বর্ণনায় শরণার্থীদের বারবার নোংরা এবং রোগাক্রান্ত হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। শিয়ালদহে মৃত্যুর উচ্চ হার এবং শহরে ক্রমবর্ধমান কলেরা ও গুটিবসন্তের ঘটনা কারণ হিসাবে এই পূর্ববঙ্গীয় উদ্বাস্তুদের চিত্রিত করা হয়েছে। শরণার্থীদের দারিদ্র্য এবং অপর্যাপ্ত পরিকাঠামোর কারণে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধির সুচারু পালনের অভাব তাদের শহুরে অভিজাতদের কাছে নোংরা ও ঘৃণ্য করে তুলেছিল। ঔপনিবেশিক এবং জাতীয়তাবাদী – উভয় চেতনাতেই এই ময়লায় ভাসা অঞ্চল এবং বিশৃঙ্খলাময় মানবজটলাকে তাই আজও ‘ভারতের অনুন্নয়নের দুটি প্রধান দিক’ হিসাবে দেখা হয়ে থাকে। কিন্তু যখন একটি রেলস্টেশন শতাধিক উদ্বাস্তু পরিবারের আবাসস্থল হয়ে ওঠে, তখন ভিতরের এবং বাইরের মধ্যে যে ভেদাভেদ, বাড়ি ও রাস্তার যে খণ্ডিত সীমানা, তা অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই জনপরিসর ও ব্যক্তিপরিসরের সীমারেখা ক্ষীণ হয়ে আসা সবসময়েই ব্রাহ্মণ্যবাদী মনকে বিচলিত করে। যেমন করেছিল সেদিনের কলকাতার নাগরিকমনস্ক বাসিন্দাদের, শিয়ালদহের ‘নোংরা’ উদ্বাস্তুরা যাদের চক্ষুশূল ছিল এবং শহরের পৌর-জনস্বাস্থ্যের জন্য ছিল জলজ্যান্ত বিপদ।
আজকের কেন্দ্রীয় সরকারও এই ভাবনার ব্যতিক্রম নয়। শাসকদের প্রতিটি ভাষণে আছড়ে পড়ে স্বাধীনতার পরে ভারতে আগত উদ্বাস্তু জনতার প্রসঙ্গে ‘উইপোকা’, ‘ঘুসপেটিয়া’ ইত্যাদি শব্দবন্ধ। যে যৌথতা থেকে কলোনি শব্দটির অর্থ বদলে প্রায় গিয়ে বাঙালি জীবনে বেঁচে থাকার প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছিল, সেই যৌথতা আজ দেবাশিসের মত তরতাজা যুবকের মৃত্যুতে এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতায় পর্যবসিত হচ্ছে। আমরা জানি, আমরা দেখেছি সেই দিব্যদৃষ্টিসম্পন্ন শিল্পদ্রষ্টা – ঋত্বিককুমার ঘটক – তাঁর সিনেমায় দেখিয়েছিলেন, উদ্বাস্তু পাড়ায় গান্ধীজির মৃত্যুসংবাদ কীভাবে নামিয়ে এনেছিল এক দৃশ্যে একশো বছরের শোক। আমরা এও জানি, নেতাজিনগর অথবা গড়ফা, টালিগঞ্জ থেকে বেহালার অলিগলি কিভাবে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন পূর্ববঙ্গীয়রা। উদ্বাস্তু সংহতির ধ্বজা কীভাবে তাঁরা তুলে দিয়েছিলেন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির মূলাধার গড়তে। তাই এই সদর দফতরেই সঙ্ঘের হানাদারি ত্বরান্বিত করতে সিএএ-এনআরসি-এনপিআর প্রকল্পের তোড়জোড়, শোরগোল। এর বিপ্রতীপে আবার যদি দক্ষিণ কলকাতা থেকে বারাসাত, দুই ২৪ পরগণার কলোনি অঞ্চল এখনই জেগে না ওঠে, হয়ত এরকম কয়েকশো দেবাশিসের শহিদ বেদী বানানোর প্রস্তুতি নিতে হবে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








