গত কয়েক সপ্তাহ ধরে খবরের চ্যানেলে চ্যানেলে এখন থেকেই নরেন্দ্র মোদীকে জিতিয়ে দেওয়ার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। বলে দেওয়া হচ্ছে দেশের কত শতাংশ মানুষ বিজেপিকে আবার ক্ষমতায় আনতে চান। বিভিন্ন মিডিয়া সংস্থার কনক্লেভেও মোদী ও অমিত শাহদের এনে তাঁদের গুণকীর্তন চলছে।

নিউজ১৮-র সমীক্ষায় এনডিএ জোট ৪১১টি আসন জিতবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে বিজেপি একাই ৩৫০টি আসনে জিতবে। পশ্চিমবঙ্গেও আসন সংখ্যা ১৮ থেকে বেড়ে ২৩ হবে। এই সমীক্ষাটি কিন্তু করা হয়েছে মাত্র এক লাখ ভোটারের মধ্যে। ৫৪৩টি লোকসভা আসনের মধ্যে সমীক্ষকরা পৌঁছেছেন ৫১৮টি লোকসভা কেন্দ্রে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

টিভি নাইন ভারতবর্ষের সমীক্ষা বলছে বহরমপুরে কংগ্রেসের অধীর চৌধুরী তৃতীয় স্থানে রয়েছেন। বিজেপি ও তৃণমূলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে এই সমীক্ষার পূর্বাভাস। ভিআইপি আসনগুলির মধ্যে রাহুল গান্ধীর ওয়ায়নাড় ছেড়ে দিলে সব আসনে বিজেপিকে এগিয়ে রেখেছে এই সমীক্ষাটি। এই সমীক্ষা নাকি আইভিআর পদ্ধতির মাধ্যমে হয়েছে। অর্থাৎ ভোটারদের ফোন করা হয়েছে একটি মেশিন দিয়ে, তাঁদের শুধু পছন্দের বোতাম টিপতে বলা হয়েছে।

ইন্ডিয়া টুডের ‘মুড অফ নেশন’ সমীক্ষায় বলা হচ্ছে বিজেপি ও কংগ্রেস যে ২০০টি আসনে মুখোমুখি লড়ছে, সেখানে বিজেপি কংগ্রেসের থেকে ২০% বেশি ভোট পেয়েছিল ২০১৯ সালে। যে সংস্থা এই সমীক্ষা করেছে, সেই সি ভোটারের যশবন্ত দেশমুখ বলে দিচ্ছেন এটি কোনোভাবে ২০২৪ সালে বদলাবে না। একইসঙ্গে তিনি বলছেন, বিজেপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে আঞ্চলিক দলগুলি।

এই সমীক্ষার সাম্প্রতিকতম পর্বে দাবি করা হয়েছে, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির পরে দিল্লিতে আপ-কংগ্রেস জোট প্রায় সব লোকসভা আসনও জিততে পারে, ৫-২ তো হতেই পারে। মজার কথা, পর্দায় সমীক্ষার ফলাফল যা-ই দেখানো হোক, চ্যানেলের প্যানেলিস্টরা কিন্তু সেই পরিসংখ্যানকে ক্রমাগত সন্দেহ করে যাচ্ছিলেন।

আবার এই চ্যানেলের কনক্লেভে এসেই শাহ দাবি করেছেন যে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ৩৫টির বেশি আসন জিতবে। সমীক্ষকরাও বলেন বাংলায় প্রতিটি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। এই রাজ্যে কে কতগুলি আসন পাবে তা এখনই বলা মুশকিল।

সত্যিই কতটা কী হবে, তা ভোটগণনার দিনই জানা যাবে। কিন্তু জনমত সমীক্ষার প্রভাব যে ভোটারদের উপরে পড়ে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ২০১৪ সালে সিএসডিএস-এর করা ন্যাশনাল ইলেকশন সার্ভেতে দেখা গিয়েছিল দেশের প্রায় ৪৫% মানুষ নির্বাচনী হাওয়া বুঝে ভোট দেন। বাকিরা আগে থেকেই ঠিক করে রাখেন কাকে ভোট দেবেন।

কর্পোরেট মিডিয়ার এই প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা যতটা না রাজনৈতিক দলগুলিকে সতর্ক করে, তার থেকেও বেশি ভোটারদের প্রভাবিত করে। পশ্চিমি দুনিয়ার প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষায় দেখা যায় কোন নেতার ভোটারদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কোন ইস্যুতে মানুষ কোন নেতাকে সমর্থন করছে। তাতে সেইসব নেতারা বুঝে যান, তাঁদের দিকে পাল্লা কতটা ঝুঁকে রয়েছে বা নেই। সেই মত তাঁরা নির্বাচনী কৌশল ঠিক করেন। কিন্তু ভারতীয় রাজনৈতিক পরিকাঠামোয় রাজনৈতিক দলগুলিই এখন নিজের পকেট থেকে টাকা খরচ করে এই ধরনের সমীক্ষা করিয়ে থাকে নির্বাচনের অনেক আগে এবং নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে। তারা কর্পোরেট মিডিয়ার এই সমীক্ষাকে পাত্তাও দেয় না।

তবু যেন নির্বাচনের ঠিক আগে এই ধরনের সমীক্ষার মাধ্যমে জনগণের মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তুমি যাকেই ভোট দাও, ‘আয়েগা তো মোদী হি’। আর যারা মোদীভক্ত তাদের মনোবলও বাড়িয়ে দিচ্ছে টিভি চ্যানেলের জনমত সমীক্ষা। এই সমীক্ষাগুলি কতটা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কিন্তু সমীক্ষার নম্বরের ছটায় সেই প্রশ্নগুলি অন্ধকারে চলে যাচ্ছে। দিনের শেষে কয়েকটি নম্বর বলে দিচ্ছে কোন রাজ্যে কে কতগুলি আসন পাবে। কিন্তু কোন কোন আসনগুলি কে পাবে তার হিসাব কিন্তু বিশদে দিচ্ছে না সমীক্ষাগুলি।

পরিসংখ্যানের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিশ্চয়ই রয়েছে। কিন্তু কতটা নিরপেক্ষভাবে টিভি চ্যানেলের জন্য এই সমীক্ষা চালানো হয়, তা নিয়ে সন্দেহ বহুদিন ধরেই। এমনটাও শোনা যায়, কোনো একটি চ্যানেলে পছন্দমত সমীক্ষার রিপোর্ট না আসায় সেই চ্যানেল বুথফেরত সমীক্ষা দেখাতে অস্বীকার করে। যে সংস্থা সেই সমীক্ষাটি করেছিল, তাদের উপর নম্বর বদলে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়।

রাজনীতির বেশিরভাগটাই দৃষ্টিকোণ তৈরি করে দেওয়ার খেলা। এই প্রাক-নির্বাচনী জনমত সমীক্ষাগুলি সে কাজই করছে। যাঁরা টিভি চ্যানেল নিয়মিত দেখেন না, তাঁরাও সোশাল মিডিয়ার দৌলতে ছোট ছোট ক্লিপের মাধ্যমে দেখে নিচ্ছেন কোন চ্যানেল কাকে কতগুলি আসন দিচ্ছে। এর থেকে ভোটাররা সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন, আমার ভোটটি ‘হেরে যাওয়া’ দলের প্রার্থীকে কেন দেব? হেরে যাবে ধরে নিয়েই তিনি ‘জেতা’ দলের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে যখন জনমত সমীক্ষা ভুল প্রমাণিত হয়েছিল, তখন থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে এই ধরনের সমীক্ষা আসলে ভোটারদের প্রভাবিত করার জন্যই ব্যবহার করা হয় কিনা। তখনই দাবি উঠেছিল প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা বন্ধ হোক। বুথফেরত সমীক্ষা তো ভোটের মাঝখানে দেখানো নিষিদ্ধই করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

পরিসংখ্যান ব্যবহার করে ভোটারদের মন বোঝার কাজটি ভারতে সেই ১৯৫০-এর দশক থেকেই শুরু হয়েছিল, তবে তা জনপ্রিয় হয় ১৯৯০-এর দশকে। ২০১৩ সালে এইরকমই এক প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষার ফল প্রকাশ করে দিয়ে আম আদমি পার্টি দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। পরে আপের নেতারা স্বীকার করেছিলেন, ভোটারদের প্রভাবিত করার জন্যই এই কৌশল নিয়েছিলেন তাঁরা। তবে সেই নির্বাচনে জিততে পারেনি আপ।

একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আজকাল ভোটারদের মন বোঝা খুবই কঠিন। আগে একটি গ্রামের দু-তিন জন ভোটারের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যেত কোন দলের পক্ষে বা বিপক্ষে রয়েছেন সেই গ্রামের মানুষ। আজকাল একই পদ্ধতিতে তা বোঝা কঠিন। তবুও কয়েকটি ভয়ঙ্কর ব্যতিক্রম হলেও, বেশ কয়েকটি সংস্থা সাম্প্রতিক সময়ে বুথফেরত সমীক্ষার ফলের সঙ্গে আসল ভোটের ফল মিলিয়ে দিয়েছে। একদম এক না হলেও হাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া গেছে সমীক্ষার মাধ্যমেই।

আরো পড়ুন ওপিনিয়ন, এক্সিট পোলের জন্য উর্বর নয় এ দেশের জটিল সমাজ ও পরিবর্তনশীল রাজনীতির মাটি

কিন্তু ভোটের আগে যেভাবে চ্যানেলে চ্যানেলে টাকা খরচ করে সমীক্ষা চালানো হচ্ছে এবং তা নিয়ে সন্ধের পর সন্ধে টিভি স্টুডিওতে আলোচনা চলছে, তাতে এই সমীক্ষাগুলির আসল উদ্দেশ্য নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। একদিকে মানুষ এই নম্বর দেখে মজা পাচ্ছেন, অন্যদিকে হয়ত কেউ কেউ দুঃখও পাচ্ছেন। মাঝামাঝি যাঁরা রয়েছেন তাঁরা নিজেদের মন ঠিক করে নিচ্ছেন।

বিশেষত এই নির্বাচনে বিজেপি ও এনডিএ জোটকে ৪০০ পার করতে গেলে বা তার কাছাকাছি পৌঁছতে গেলে নতুন ভোটারদের ভোট দরকার হবে। নিজেদের মূল ভোটব্যাঙ্কের উপর ভরসা করে বসে থাকলে হবে না। বিশেষত দক্ষিণ ভারতে বিজেপিকে অনেক বেশি আসন জিতে আসতে হবে। এই পরিস্থিতিতে প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা শাসক দলের প্রচার করে দিচ্ছে না তো?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.