“আমাদের বিড়ি বাঁধা যেন বন্ধ না হয়। আমরা সঠিক মজুরি চাই” – একথা রাহুল গান্ধীকে বলেছেন মুর্শিদাবাদের সুতির এলিমা খাতুন। বৃহস্পতিবার সকালে বিড়ি বাঁধছিলেন তিনি। ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রার মাঝে তাঁর কাছে পৌঁছে গিয়েছেন রাহুল। তিনি চলে যাওয়ার পর সাংবাদিকরা ঘিরে ধরেন এলিমাকে। এলিমা বলেন, তিনি একজন মুসলিম নারী। এই পরিচয় তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
সংখ্যালঘু মানুষের উপর বেড়ে চলা আক্রমণ নিয়ে বারবার সরব হয়েছে ন্যায় যাত্রা, বার্তা দিয়েছে মহব্বতের। রাহুলের সঙ্গে কথা বলে তাই ভরসা পেয়েছেন এলিমারা। শুধু তাই নয়, রাহুল খোঁজ নিয়েছেন তাঁদের রুটিরুজিরও। বিড়ি বেঁধে কত মজুরি পান? তাতে সংসার চলে? বিড়ি শ্রমিকদের কাছে জানতে চেয়েছেন রাহুল। আরেক বিড়ি শ্রমিক রিমা খাতুন জানিয়েছেন, বিড়ি বেঁধে সংসার চলে না। সেকথা রাহুলকে তিনি বলেছেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
রাহুল কেন বিড়ি মহল্লায়? নেহাত নেতাসুলভ পরিদর্শন? ছবি তোলা, নাকি সত্যিই ভারতের খোঁজ? ন্যায় যাত্রায় যে পাঁচ ন্যায়ের কথা বারবার রাহুল বলছেন, তার মধ্যে রয়েছে শ্রমিকদের ন্যায়ের কথা। রয়েছে নারীদের জন্যে ন্যায়ের কথা। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২২ লক্ষ বিড়ি শ্রমিকের বেশিরভাগই নারী। তবে বহুবছর হল বিড়ি শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে বামপন্থী দলগুলোর নেতা ছাড়া আর কোন দলের শীর্ষনেতা সরব হননি। সাগরদীঘি বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনের আগে বিড়ি শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি। কিন্তু মজুরি বাড়েনি। বিড়ি শ্রমিকদের আশা, এবার তাঁদের কথা স্থান পাবে রাজনীতির আলোচনাতেও।
আরো পড়ুন বিড়ি শ্রমিক: যার কাজ আছে তার ভাত নেই
শ্রমিকদের দাবি, কৃষকদের দাবি বামপন্থী রাজনীতির প্রতিদিনের বিষয়। এদিন রাহুল গান্ধী প্রায় ২০ মিনিট কথা বলেছেন বিড়ি শ্রমিকদের সঙ্গে। তাহলে কংগ্রেস কি বামদিকে ঝুঁকছে? এদিন রাহুলের এই সফর নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেন “কংগ্রেস দল স্বাধীনতা আন্দোলনের আগে এবং পরে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। যখনই তারা আদিবাসী, তফসিলি জাতি-উপজাতি, শ্রমিক, বিড়ি শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়েছে, গঙ্গার ভাঙনের শিকার মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, তখন বামপন্থীদের সমর্থন পেয়েছে। যখন কয়লাখনি, ব্যাঙ্কের জাতীয়করণ হয়েছে, বামপন্থীরা সমর্থন করেছে। পুরনো কংগ্রেসীদের বিরুদ্ধে যখন ভিভি গিরিকে দাঁড় করিয়েছে, বামপন্থীরা সমর্থন করেছে।” তবে সেলিম মনে করিয়ে দিয়েছেন, জরুরি অবস্থার সময়ে বামপন্থীরা কংগ্রেসের বিরোধিতা করেছে। আজ, এই সময়ে দাঁড়িয়ে বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের সমর্থনের ভিত শক্ত করতে চাইছে বামপন্থীরা।
ন্যায় যাত্রার মাঝে এর আগে বিহারে রাহুল কথা বলেছেন কৃষকদের সঙ্গে, কথা বলেছেন সেনাবাহিনীতে কাজ খোঁজা যুবকদের সঙ্গে। এবার মুর্শিদাবাদের বিড়ি শ্রমিকদের সঙ্গে রাহুলের সাক্ষাৎ কার্যত নতুন আঙ্গিক যোগ করেছে বিড়ি মহল্লায়। এদিন ন্যায় যাত্রা রঘুনাথগঞ্জে দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্র পণ্ডিতের মূর্তির সামনে পৌঁছনোর আগে একটানা উঠেছে “রোজগার চাই” স্লোগান।
বৃহস্পতিবার কংগ্রেস ন্যায় যাত্রা এগিয়েছে, ভালবাসা কুড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল আটটা নাগাদ শুরু হয় যাত্রা। ফরাক্কা এনটিপিসি মোড়, আখুরা ব্রিজ, সামশেরগঞ্জের জামিয়াকাটান হয়ে সুতির মধুপুরে পৌঁছে যান রাহুল। সেখানে বিড়ি শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে রওনা দেন জঙ্গিপুরের দিকে। চাঁদের মোড়, আহিরণ, ওমরপুর – প্রতিটি মোড়েই সকাল থেকে মানুষ ছিলেন অপেক্ষায়।
জঙ্গিপুর শহর পরিক্রমার পর পিয়ারাপুরে বিশ্রাম নেয় যাত্রা। তারপর লালগোলা, ভগবানগোলা, বাগডহরা, চুনাখালি, পঞ্চাননতলা হয়ে বহরমপুর পৌঁছয়। রাস্তা যত এগিয়েছে তত যাত্রা ঢুকেছে কংগ্রেসের গড়ে, বেড়েছে মানুষের ভিড়ও। ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তার দুপাশে মানুষ দাঁড়িয়ে থেকেছেন যাত্রা দেখবেন বলে। কারোর হাতে ছিল ফুল, কারোর হাতে পোস্টার। পোস্টারেও ঘৃণার বিরুদ্ধে ভালবাসার স্পষ্ট বার্তা।
কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত হলেও বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্রে কংগ্রেসের মাথাব্যথা বিজেপির বাড়বাড়ন্ত। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে খোদ বহরমপুর বিধানসভা দখল করেছিল বিজেপি। বেশিরভাগ আসনেই কংগ্রেসকে ঠেলে দিয়েছিল তিন নম্বরে। তবে পৌরসভা আর পঞ্চায়েত নির্বাচনে মাঠে নামতে পারেনি বিজেপি। কিন্তু ধর্মীয় উৎসব থেকে শুরু করে ক্লাব, পুজো মণ্ডপকে চাঁদমারি করেছে বিজেপি। এদিন ন্যায় যাত্রা দেখতে বহরমপুর শহরে উপচে পড়া ভিড় অবশ্যই সাহস জোগাবে কংগ্রেসকে। বহরমপুরের প্রাক্তন বিধায়ক মনোজ চক্রবর্তী বললেন “ন্যায়যাত্রায় রাজ্য প্রশাসনের বাধা দেখেই সাধারণ মানুষ আরও মরিয়া হয়ে এই যাত্রাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। মানুষের সমর্থনে আমরা আশাবাদী।”
লালগোলা, ভগবানগোলায় মানুষের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মত। যে রুটে ন্যায় যাত্রা এগিয়েছে সেই রুটে পঞ্চায়েত সমিতিতেও বোর্ড গড়েছে কংগ্রেস। কংগ্রেসের কর্মীরা নজর রাখছেন লোকসভা ভোটের দিকে। গোটা রাজ্যেই ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন কংগ্রেসের পক্ষে ছিল বেশ কঠিন। সেই ভোটেই বড় শক্তি হিসাবে উঠে আসে বিজেপি। রাজ্যের ৪২ আসনের মধ্যে ১৮টি আসনে তারা জয়ী হয়। তৃণমূল কংগ্রেস জেতে ২২ আসনে, বামেরা একটি আসনও পায়নি। কেবল বহরমপুর ও মালদা দক্ষিণে জেতে কংগ্রেস। দুটি আসনেই কংগ্রেসকে সমর্থন করেছিল সিপিএম, হেরেছিলেন তৃণমূল ও বিজেপি প্রার্থীরা। জঙ্গিপুর ও মুর্শিদাবাদ আসনে বেশ শক্তিশালী কংগ্রেস ও সিপিএম। দুই দলের রাজ্য নেতারাও লোকসভা ভোটে বোঝাপড়ার পক্ষে। পঞ্চায়েত নির্বাচনে মুর্শিদাবাদ জেলায় বোঝাপড়া করেই লড়েছিল এই দুই দল। জেলার নেতাদের আশা, লোকসভার ভোটের আগেই সমঝোতা হয়ে যাবে শীর্ষ নেতৃত্বে মধ্যে।
ন্যায় যাত্রার মাঝেই কংগ্রেসের সঙ্গে সখ্য বাড়াতে রাস্তায় নেমেছেন সিপিএম নেতারাও। সংহতি জানাতে কলকাতা থেকে এসেছেন রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, সুজন চক্রবর্তী। সঙ্গে ছিলেন সিপিএমের মুর্শিদাবাদের জেলা সম্পাদক জামির মোল্লা ও অন্য নেতৃবৃন্দ। রাহুলের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ে তাঁদের সঙ্গে ছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরীও। এই ছবি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে সব মহল।

বুধবার বহরমপুরে প্রশাসনিক সভা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। সেই সভা থেকে তৃণমূল ও কংগ্রেসের সম্পর্কের অবনতির জন্যে দোষ দিয়েছেন সিপিএমকেই। বলেছেন “কংগ্রেসের সাথে আমাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভাল ছিল। যদি কেউ খারাপ করে থাকে তার নাম সিপিএম পার্টি। সিপিএম আজকে সব থেকে বড় দালাল হয়েছে ওদের। আমি তো দুটো সিট দিতে চেয়েছিলাম মালদায়।”
এই মন্তব্যের ঠিক পরেরদিনই রাহুলের সঙ্গে সেলিমদের সাক্ষাৎ হল। তার আগে সেলিম বলেন, “এই লড়াই ন্যায় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে। আমরা ন্যায়ের পক্ষে, তাই এসেছি”। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের পরিস্থিতি ২০১৯ বা ২০১৮ সালের থেকে আলাদা। মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেন “মমতা ব্যানার্জি সিপিএমের ঘাড়ে বন্দুক রেখে কংগ্রেসকে গাল দিচ্ছেন, বিজেপির কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। বিজেপিবিরোধী কারা কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে সেটাই এখন বিষয়”।
একই সুর শোনা গিয়েছে স্থানীয় সিপিএম ও কংগ্রেস কর্মীদের গলাতেও। যদিও তৃণমূলের সঙ্গে বোঝাপড়া নিয়ে এখনো আশাবাদী কংগ্রেসের একাংশ। এদিন জয়রাম রমেশ বলেছেন, ইন্ডিয়া ব্লকের সব দলের নেতাদের সামনাসামনি বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এরাজ্যে কে কটা আসনে লড়বে। সবাইকে মাথায় রাখতে হবে, এখানে লোকসভার জন্য জোট, বিধানসভার জন্য নয়।
তবে ভোটের সমীকরণ যা-ই হোক, ন্যায় যাত্রা জুড়ে বারবার দেখা গেছে মানুষের উচ্ছ্বাস যা স্পষ্টত মহব্বতের পক্ষে। সামনে লোকসভা ভোট হলেও শক্তি পরীক্ষার মেজাজ ছিল না রাহুলের শারীরিক ভাষাতেও।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








