একটা দেশ। একটা মানচিত্র। কিন্তু ভাষা, সংস্কৃতিও কি একটাই? দেশের নেতা কি একজনই? দেশের সরকার অন্তত তেমনটাই মনে করছে। তেমনটাই প্রতিফলিত হচ্ছে শাসক দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে, ভাষ্যেও। মূলধারার সংবাদমাধ্যম থেকে সোশাল মিডিয়া – সর্বত্র একটাই প্রচার। এককথায়, “এক হি নারা (স্লোগান)”। ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রার মাঝে এর বিকল্প ভাবনা শোনা গেল কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর কথায়।

বুধবার সন্ধ্যায় মালদার সুজাপুরে স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন রাহুল। সেই আলোচনায় উঠে এসেছে বহুত্ববাদী ভারত ভাবনার কথাই। মতাদর্শ, সংস্কৃতি থেকে দেশের কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়েও বিজেপির বিকল্প ভাবনাই তুলে ধরতে চেয়েছেন রাহুল। কথা বলার জন্যে স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমকে বেছে নিয়েছেন কেন? কী ভাবছেন ডিজিটাল মিডিয়া নিয়ে – রাহুলও জানতে চাইলেন সাংবাদিকদের কাছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তাঁর মতে, আসলে একটা মতাদর্শগত লড়াই চলছে। এই লড়াইয়ে যদি কেউ ভারতকে এক ভাষা, এক নেতা, এক মতাদর্শ, এক ধর্মের দেশ বলে তাহলে তাকে কেউ আক্রমণ করবে না। কিন্তু ভারতকে এক বহুত্ববাদী দেশ হিসাবে দেখলে, বহু ভাষাভাষী মানুষের দেশ হিসাবে দেখলে, দেশকে আন্তঃরাজ্য বোঝাপড়ার বিষয় হিসাবে দেখলেই আক্রান্ত হতে হচ্ছে। এমনকি বাংলায় কথা বললেও আক্রমণ নেমে আসতে পারে। বিজেপি আসলে সকলের সংস্কৃতি, ইতিহাস, ধর্মবিশ্বাসকেই আক্রমণ করতে চায়। তবে শুধু বিজেপিই এই কাজ করছে বলে মনে করেন না তিনি। শুধু আরএসএসও নয়। রাহুলের দাবি, এই আক্রমণ নামিয়ে আনতে বিভিন্ন রকমের শক্তি একত্রিত হয়েছে। কিছু শক্তি দেশের ভিতরকার, কিছু শক্তি দেশের বাইরেরও। রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পিছনে আবার বেশকিছু অর্থনৈতিক শক্তিও রয়েছে। রাহুল জানিয়েছেন, তাঁর নিজের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলগুলোর আওতা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। খোদ কোম্পানিগুলোই এই কাজ করছে। ডিজিটাই মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে এ থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায় তা নিয়ে ভাবার প্রস্তাব দিয়েছেন রাহুল।

এই ন্যায় যাত্রায় অন্যতম বিষয় হিসাবে উঠে এসেছে শ্রমিকের জন্য ন্যায়। রাহুলের দাবি, শুধু কথার কথা নয়, কর্ণাটক এবং তেলেঙ্গানায় হাতে কলমে গিগ ওয়ার্কারদের পাশে দাঁড়িয়েছে কংগ্রেস পরিচালিত সরকার।

যখন বিজেপি এবং আরএসএসের রাজনৈতিক কার্যকলাপে বিজেপি নেতাদের প্রবল পরাক্রমশালী পুরুষের প্রতিমূর্তি হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে, সেইসময় রাহুল সওয়াল করেছেন মহিলাদের আরও বেশি করে রাজনীতিতে আসার পক্ষে, সমাজের সব ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্বের পক্ষে। নেতাসুলভ উচ্চতা থেকে নেমে এসে বলেছেন, ঘর থেকে রাজনীতির আঙিনা – সর্বত্রই ভারতীয় নারী দুর্ব্যবহারের শিকার।

 

হিমন্তর রাজনীতি কংগ্রেসের রাজনীতির থেকে আলাদা। তিনি নিয়মিত যেসব মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্য করে থাকেন তা কংগ্রেসি সংস্কৃতির পরিপন্থী।

 

কথায় কথায় পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের ইতিহাসও স্মরণ করাতে চেয়েছেন রাহুল। তাঁর আশা, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পশ্চিমবঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতির মধ্যেই সেই লড়াইয়ের উপাদান রয়েছে। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের কথা। রবীন্দ্রনাথ শুধু লিখেই ক্ষান্ত হননি, সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন ব্রিটিশবিরোধী লড়াইয়ে। রাহুলের কথায়, বাংলার মানুষের বিরাট অংশ আরএসএসের ভাবনারই বিরুদ্ধে। আজকাল কথায় কথায় স্বামী বিবেকানন্দের বাণী উদ্ধৃত করে বিজেপি। অথচ রাহুলের মতে, বিবেকানন্দ বিজেপির ভাবনার সম্পূর্ণ উলটো মেরুতে ছিলেন।

ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা
ন্যায় যাত্রায় উপহার পাওয়া নেতাজির ছবি হাতে রাহুল গান্ধী। ছবি এক্স থেকে

রাহুল আরও বলেন, এবারের ভোটের আগে মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরির উপকরণ হিসাবে আবার নাগরিকত্ব আইনকে ব্যবহার করছে বিজেপি। দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে একটা উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। আরও নানারকম বিভেদ উস্কে দেওয়ার চেষ্টা চলছে – আঞ্চলিক বিভেদ, ভাষাগত বিভেদ, জাতিগত বিভেদ।

বিজেপি যখন কর্পোরেট সংস্থার মুনাফায় দেশের বিকাশের ছবি দেখছে, তখন রাহুল প্রশ্ন তুলেছেন সরকারের ছোট শিল্প উদ্যোগী, শ্রমিক, কৃষকদের পাশে না থাকা নিয়ে। তিনি বলছেন, একুশ শতকে উৎপাদন শিল্প ছাড়া ভারতের মত দেশের অর্থনীতি এগোতে পারে না, কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে না। ভারতের মত বড় দেশে উৎপাদন শিল্প অপরিহার্য। সংবাদমাধ্যমের একটা অংশ প্রচার করছে যে ভারতে নাকি মোবাইল ফোন তৈরি হচ্ছে। অথচ সত্যিটা হল ফোনের সমস্ত উপকরণই চীনে তৈরি হচ্ছে, সেগুলো এদেশে জোড়া হচ্ছে (assemble) মাত্র। দেশের সরকার ভাবছে উৎপাদন শিল্প ছাড়াই দেশ চলবে। যারা বিভিন্ন সামগ্রী উৎপাদন করেন দেশের সরকার তাঁদের অসম্মান করছে, তাঁদের সঙ্গে অসহযোগিতা করছে। ব্যাঙ্কের দরজা তাঁদের জন্য বন্ধ। কোনো কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষকে ব্যাঙ্ক ঋণ দেয় না। দেয় তিন-চারটে বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে। আক্ষেপের সুরে রাহুল বলেন, বৃষ্টি বা খরায় ফসল নষ্ট হলে কিম্বা কোনো বিড়ি শ্রমিকের সমস্যা হলে কোনোভাবেই তার ঋণ মকুব করবে না ব্যাঙ্ক। যদিও উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত নয় এমন সংস্থার ৪০-৫০ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ সহজেই মকুব হয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য, দেশে উৎপাদনশীল শিল্পের দিন ফেরানো। রাহুলের কথায়, শেষ দশ বছরে কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের উপর ভয়ঙ্কর আক্রমণ নেমে এসেছে।

 

নেতাসুলভ উচ্চতা থেকে নেমে এসে বলেছেন, ঘর থেকে রাজনীতির আঙিনা – সর্বত্রই ভারতীয় নারী দুর্ব্যবহারের শিকার।

 

আলোচনায় উঠে এসেছে কীভাবে বারবার কংগ্রেসের ঘর ভেঙেছে বিজেপি। জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া থেকে হিমন্ত বিশ্বশর্মা – কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে যাওয়া নেতাদের তালিকা বেশ লম্বা। তবে দলত্যাগকে একেবারে অন্য নজরে দেখছেন রাহুল। তিনি মনে করেন না এতে কংগ্রেস দুর্বল হয়েছে। তিনি স্পষ্ট বললেন “আমি চাই মিলিন্দ (মিলিন্দ দেওরা), হিমন্তরা দল ছাড়ুক”। কিন্তু কেন? তাঁর ব্যাখ্যা, হিমন্তর রাজনীতি কংগ্রেসের রাজনীতির থেকে আলাদা। তিনি নিয়মিত যেসব মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্য করে থাকেন তা কংগ্রেসি সংস্কৃতির পরিপন্থী। এসব নেতা দলত্যাগ করলেও স্থান ফাঁকা থাকে না। একজন চেয়ার থেকে উঠে গেলে সেই চেয়ারে অন্য কেউ বসে। হিমন্তদের জায়গায় কাদের আনতে চাইছেন রাহুল? তা অবশ্য তিনি স্পষ্ট করেননি।

লোকসভা নির্বাচন এবং ইন্ডিয়া জোটের এজেন্ডার বিষয়ে বলতে গিয়ে দেশের মানুষের প্রতি তিনি আস্থা জ্ঞাপন করেন। তাঁর মতে, একথা দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট যে পাঁচ-ছয় জনের কাছেই দেশের যাবতীয় সম্পদ জমা হচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধিতে জেরবার সকলেই। সব রাজ্যেই বেকারত্ব বড় সমস্যা। ইন্ডিয়া জোটের এজেন্ডা মানুষের কাছে পরিষ্কার। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, কীভাবে বিজেপির বিরোধিতা করলেই কেন্দ্রীয় এজেন্সি দিয়ে জেরা করানো হচ্ছে। সেই আতঙ্কেই নীতীশ ইন্ডিয়া জোট ছেড়েছেন বলে ইঙ্গিত করেন রাহুল। তৃণমূল কংগ্রেস প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য “মমতা ব্যানার্জি বা আমরা – কেউই জোট ভাঙিনি। অর্থাৎ দুই পক্ষই বলছে জোটে আছি। আসন নিয়ে আলোচনা এখনো চলছে, সমাধান হয়ে যাবে”।

যদিও গত ৪৮ ঘন্টায় সেই বোঝাপড়ায় বড়সড় পরিবর্তন এসেছে। শুক্রবার মমতা নাম না করে নিশানা করেছেন রাহুলকে। সেই আক্রমণের ঝাঁজালো আক্রমণে ছিল অবজ্ঞা, বেশকিছুটা দম্ভের প্রদর্শনও।

রাহুল ঝাড়খণ্ডে পৌঁছেছেন শুক্রবার দুপুরে। পাকুড়ের সভা থেকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন রাজ্যের মানুষকে। সেখানেও বলেছেন মহব্বতের কথা। বলেছেন, “রোজগারের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে বিজেপি। তাই দেশে কোটি কোটি যুবক যুবতী থাকলেও চল্লিশ বছরের কম বয়সের মানুষের মধ্যে বেকারত্ব এখন সবথেকে বেশি”। আরও বলেছেন, তাঁর যাত্রায় মানুষের যন্ত্রণার কথা মানুষের সামনে রাখতে চান তিনি। তাই বলবেন কম, শুনবেন বেশি।

আরো পড়ুন কতটা পথ পেরোলে পরে ভারত পাওয়া যায়?

রাহুলের কথা, যাত্রার মেজাজ থেকেই পরিষ্কার যে শুধু বিজেপির বিকল্প ভাষ্য নয়। কংগ্রেসের রাজনীতিরও নতুন ভাষা তৈরি করতে চাইছেন তিনি।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.