অর্ক মুখার্জি
বছর পনেরো আগেও বাঁকুড়ার লাল মাটি বামেদের, অর্থাৎ সিপিএমের, শক্ত ঘাঁটি ছিল । ২০০৯ সালের লোকসভা ভোটে যখন দাপুটে সিপিএম নেতা তড়িৎ তোপদার ব্যারাকপুরে হেরেছেন, সুবক্তা সুজন চক্রবর্তী যাদবপুরে হেরেছেন এবং ডাকসাইটে সাংসদ মহম্মদ সেলিম উত্তর কলকাতায় হেরেছেন, তখনো কলকাতা থেকে এসে তৃণমূল এবং জাতীয় কংগ্রেস জোটের প্রার্থী তৎকালীন কংগ্রেস নেতা সুব্রত মুখার্জি, বাসুদেব আচারিয়ার কাছে প্রায় ১,০৮,০০০ ভোটে হারেন। সিপিএম নেতারা জেতার ব্যাপারে এত আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে যখন প্রার্থী হিসাবে সুব্রতর নাম ঘোষণা করা হয়, তখন সাংবাদিকরা লড়াই কঠিন হবে কিনা প্রশ্ন করলে জেলার এক নেতা উত্তর দেন – উনি খেজুর গাছে পিঠ ঘষতে আসছেন, পিঠ ঘষা হয়ে গেলে আবার কলকাতায় ফিরে যাবেন।
কিন্তু সেই শক্ত ঘাঁটি থেকে ধসতে শুরু করে ২০১১ সালে। বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা কাশী মিশ্র বিধানসভা নির্বাচনে বাঁকুড়া কেন্দ্রে সিপিএম প্রার্থী প্রতীপ মুখোপাধ্যায়কে ২৯,০০০-এর বেশি ভোটে পরাস্ত করেন। ২০১২ সালে বাঁকুড়া লোকসভার অন্তর্গত বাঁকুড়া জেলার অন্যান্য বিধানসভা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে শালতোড়া এবং ছাতনায় জেতে তৃণমূল। কেন্দ্রের বাকি বিধানসভাগুলো, অর্থাৎ জঙ্গলমহলের রানিবাঁধ, রাইপুর এবং তালড্যাংরা, জিতে নেয় সিপিএম। ২০১২ সালে কাশীর মৃত্যুতে বাঁকুড়া বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হলে তাঁর স্ত্রী মিনতি মিশ্রের কাছে প্রায় ১৫,০০০ ভোটে হারেন এবারের লোকসভায় সিপিএম প্রার্থী নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে আবার বহিরাগত প্রার্থী হিসাবে নায়িকা সুচিত্রা সেনের কন্যা মুনমুনকে দাঁড় করায় তৃণমূল কংগ্রেস। বাংলার রাজনীতির সঙ্গে নায়ক, নায়িকাদের সম্পৃক্ত হওয়ার সেই শুরু। সেবার টানা নবারের বাঁকুড়া কেন্দ্রের সাংসদ বাসুদেব মুনমুনের কাছে পরাস্ত হন। মুনমুন পান ৪,৮৩,৪৫৫ ভোট, বাসুদেব পান ৩,৮৪,৯৪৯ ভোট, বিজেপি প্রার্থী সুভাষ সরকার পান ২,৫১,১৮৩ ভোট। ফলাফলের পর বাসুদেববাবু আপেক্ষ করেছিলেন, বিজেপি প্রার্থী প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি ভোট কেটে তৃণমূলের জয় নিশ্চিত করেছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ছবি সম্পূর্ণ পালটে যায় ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে। সেবার আবার সুব্রতকে প্রার্থী করে তৃণমূল, বাসুদেব বাবু আর দাঁড়াননি। বদলে প্রার্থী হন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অমিয় পাত্র। কিন্তু আরএসএস সৃষ্ট চোরাস্রোত এবং মোদী হাওয়া – দুইয়ের উপর ভর করে বিজেপি প্রার্থী ৬,৭৫,৩১৯ ভোট পান। সুব্রত মুখার্জি ৫,০০,৯৮৬ ভোট এবং সিপিএম প্রার্থী মাত্র ১,০০,২৮২। নিচুতলার বাম কর্মী, সমর্থকদের বেশকিছু ভোট বিজেপিতে যায়। গ্রামীণ এলাকায় বিজেপি বেশ ভাল ফল করে। জঙ্গলমহলের অংশে বিজেপি বেশ ভাল পরিমাণ ভোট দখল করে।
২০২৪ লোকসভা ভোটে বাঁকুড়া কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী গতবারের বিজয়ী সুভাষ, তৃণমূল প্রার্থী ভোট রাজনীতিতে তুখোড়, তালড্যাংরা কেন্দ্রের বিধায়ক অরূপ চক্রবর্তী আর বামেদের নতুন বাজি আইনজীবী নীলাঞ্জন। প্রার্থী ঘোষিত হওয়ার পর তিনজনকেই জোরালো প্রচার করতে দেখা যাচ্ছে। বাঁকুড়া লোকসভায় বাঁকুড়া জেলার বাইরে পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর বিধানসভা কেন্দ্রটি বাঁকুড়া লোকসভার অন্তর্গত। বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্রে ৩০.৮১% তফসিলি জাতি এবং ১১.৪৮% তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের ভোট অনেক ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা নেয়। এর মূল কারণ – এই ভোট পাড়াগতভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে একই দিকে পড়ে। দু-একটা পরিবার বা কোনো কোনো পরিবারের দু-একজন সদস্য অন্য চিহ্নে ভোট দিলেও বেশিরভাগ ভোট একই প্রতীকে জমা হয়। পাড়াগত ভোট যাঁরা দেন, তাঁদের বেশিরভাগ কিন্তু প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ। এঁদের জীবনে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের প্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে। এক্ষেত্রে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মত সরাসরি হাতে টাকা দেওয়ার প্রকল্প উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। তৃণমূল কংগ্রেস সেকথা ভালই জানে। তাই দেখা যাচ্ছে প্রায় প্রত্যেক প্রচার কর্মসূচিই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারকে সামনে রেখে হচ্ছে। এই মানুষগুলোর উপর শিক্ষক নিয়োগ বা অন্যান্য নিয়োগ দুর্নীতি তেমন প্রভাব ফেলবে না। তবে পঞ্চায়েতের দুর্নীতি বা সরকারি পরিষেবা ক্ষেত্রে দুর্নীতি এঁদের কাছে বড় ইস্যু।
বিজেপি সাংসদ সুভাষ আগেরবার সাড়ে ছয় লক্ষের বেশি ভোট পেলেও এবার তার কতটা ধরে রাখতে পারবেন তা দেখার বিষয়। সুভাষবাবুর প্রথম কাঁটা হল গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। বিশেষ করে গত এক বছরে বাঁকুড়ার বহু জায়গায় তাঁকে ঘিরে বিজেপির কর্মী, সমর্থকরা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। সেপ্টেম্বর মাসে তাঁকে দলীয় কার্যালয়ে আটকে রাখার মত ঘটনা ঘটে। এছাড়া ছাতনায় বর্তমান সাংসদকে কেন্দ্র করে বিজেপির লোকেরা বিক্ষোভ দেখিয়েছিল। শালতোড়াতেও সুভাষকে ঘিরে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ হয়। সুভাষের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ – তিনি নাকি কর্মী সমর্থকদের সঙ্গে সেভাবে যোগাযোগ রাখেননি ২০১৯ নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পর। তাছাড়া বাঁকুড়া লোকসভা জুড়ে আলো, নলকূপ, হল্ট স্টেশন নির্মাণ ছাড়া সেভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ করেননি। এমনকি বাঁকুড়া-মশাগ্রাম ট্রেন লাইন নিয়ে বাসুদেব যেমন উদ্যোগী ছিলেন, সুভাষ বাঁকুড়া-কলকাতা ভায়া মশাগ্রাম নিয়ে সংসদে পাঁচ বছরে সেভাবে সোচ্চার হননি। তিনি মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী হলেও তাঁর কেন্দ্র বাঁকুড়ার জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে সেভাবে কোনোকিছুর দরবার করেননি। উল্টে জঙ্গলমহলে যখন আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের হোস্টেল একের পর এক বন্ধ হচ্ছে, তখনো সরব হননি। নিজে ডাক্তার হলেও বাঁকুড়া কেন্দ্রের জন্য কোনো চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বা পরিষেবা অথবা কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প করার কথা ভাবেননি, বিশেষ করে জঙ্গলমহলের মানুষের জন্য তেমন কিছুই ভাবা হয়নি। সংসদে সুভাষের উপস্থিতি ৮২%, ২৭টি বিতর্কে অংশ নিয়েছেন এবং ৫২টি প্রশ্ন (জাতীয় গড় ৭৭) জিজ্ঞাসা করেছেন। কোনো প্রাইভেট মেম্বার বিলও আনেননি। এদিকে পাঁচ বছরে যে নিজের কেন্দ্রে নিবিড় জনসংযোগ করেছেন তাও নয়। তাঁর বিরুদ্ধে বহুবার দুর্ব্যবহারের অভিযোগ এনেছেন তাঁরই দলের কর্মীরা। এছাড়া প্রচারে বেরিয়ে জল না পাওয়া মহিলাদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে।
গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত সুভাষের বিরুদ্ধে গোঁজ প্রার্থী হিসাবে দাঁড়িয়ে পড়েছেন বাঁকুড়া জেলা বিজেপির প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক জীবন চক্রবর্তী। নেতা হিসাবে নিজের অঞ্চলে ভালই জনপ্রিয় তিনি। এইসব দেখে শুনে হাসি চওড়া হবার কথা আরেক চক্রবর্তী, এবারের তৃণমূল প্রার্থী অরূপের। ২০১৯ লোকসভা আর ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে বহিরাগত প্রার্থী দেবার পর এবার তৃণমূল ২০০৪ সালের পর প্রথমবার বাঁকুড়ার এক ভূমিপুত্রকে দাঁড় করিয়েছে। এমনিতেই অরূপ দক্ষ সংগঠক। জঙ্গলমহলের বিধানসভা ক্ষেত্রগুলোর অধিকাংশ তৃণমূল নেতা, কর্মীর সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক। এলাকা চেনেন ভাল, জানেন ভোট কীভাবে করাতে হয়। ২০২১ সালে টলমলে ভোটে নিজে তালড্যাংরা থেকে জিতেছিলেন এবং রাইপুর ও রানিবাঁধ কেন্দ্র থেকে দলের জয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাই এবার লোকসভা পুনরুদ্ধারের বিষয়ে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী তৃণমূল।
আরো পড়ুন মুর্শিদাবাদ জেলায় বাইনারি ভেঙে দিয়েছে সেলিম-অধীর রসায়ন
সিপিএম প্রার্থী নীলাঞ্জন ছুটে বেড়াচ্ছেন, ভোট বাড়ার ব্যাপারেও আত্মবিশ্বাসী। তবে সিপিএম এখনো পুরো বাঁকুড়া লোকসভায় সাংগঠনিকভাবে অনেক দুর্বল। স্বাভাবিকভাবেই প্রচারও ফিকে। গ্রামীণ ভোটাররা বোধহয় এখন পর্যন্ত নির্বাচনী বন্ড কী – সে ব্যাপারেও অবগত নন। তাই সিপিএম জেতার জায়গায় নেই। কিন্তু সিপিএমের ভোট জঙ্গলমহলে খুব বেশি বাড়লে তৃণমূলের পক্ষে মুশকিল। ছাতনা বা শালতোড়ায় বিজেপি বিক্ষোভ কেমন করে সামলায়, ভোট বাড়াতে পারে কিনা, বিজেপি সমর্থকরা ব্যক্তি না দেখে পদ্মে ভোট দেন কিনা – এসবের উপর সুভাষের আবার সংসদে যাওয়া নির্ভর করছে। রঘুনাথপুর বিধানসভায় বিজেপি কত ভোট পায় সেটাও দেখার। প্রধানমন্ত্রীর সভা হলে হালকা বা জোরালো হিন্দুত্বনির্ভর প্রচার বিজেপির শক্ত ঘাঁটিতে কতটা প্রার্থী সম্পর্কে ক্ষোভ ভোলাতে পারে সেটাও দেখার। চারণকবি বৈদ্যনাথের বর্ণনায় ‘শাল মহুয়ায় জঙ্গলে ঘেরা পোড়ামাটি রাঙা তোমার ভূমি। তীরে ভাঙ্গা তরী গন্ধেশ্বরী, দ্বারকেশ্বর এবং কংসাবতি’। নদীর পাড়ে ঘাস জন্মাবে, না পদ্ম ফুটবে – সেটাই এখন দেখার। কাস্তে আগেরবারের চেয়ে ধারালো আর তীক্ষ্ণ। নিশ্চিতভাবেই বেশি কাটবে। কাটলে কার ক্ষতি, কার লাভ তার উত্তর মিলবে ৪ জুন।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








