কৃষক আন্দোলন এবারের লোকসভা নির্বাচনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। বিরোধীদের প্রচারে বারবার উঠে আসছে কৃষকদের আন্দোলন, মোদীজির মিথ্যা প্রতিশ্রুতির কথা। এমএসপি আইন নিয়ে মোদীজির গ্যারান্টি যে পূরণ করা হয়নি তা প্রচারে আনা হচ্ছে। অপরদিকে মোদী সরকারও কৃষকদরদি সাজার চেষ্টায় কোনো কসুর করছে না।
মোদী সরকার আগেই দাবি করেছিল যে কৃষকদের আয় নাকি দ্বিগুণ হয়েছে। এবারের অন্তর্বর্তী বাজেটেও অন্নদাতাদের নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। যদিও ২০১৪ সাল থেকেই মোদী সরকারের কৃষকবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে দেশের নানা প্রান্তে কৃষক আন্দোলন সংগঠিত হয়ে চলেছে। কৃষি ঋণ মকুব, ফসলের ন্যায্য দামসহ নানা দাবিতে এবং কৃষক আত্মহত্যার বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলন রাজনৈতিক সমীকরণের চেনা বৃত্তটাকে ভেঙে এগিয়ে চলেছে। সেই আন্দোলনে লাল ঝাণ্ডার সঙ্গে মিলে গেছে নীল সমেত নানা রঙের ঝাণ্ডা। দেশের নানা প্রান্তের কৃষক আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল রাজধানী দিল্লিতে। কৃষক ও শ্রমিকরা গড়ে তোলেন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আত্মহননকারী কৃষকদের নিয়ে বিজেপির বিভিন্ন নেতাদের অপমানজনক বক্তব্য ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। ২০১৮ সালে বাম কৃষক সংগঠনের ডাকে নাসিক থেকে মুম্বাই ঐতিহাসিক লং মার্চ সারা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই বছরেই মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিসগড় ও রাজস্থানের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির পরাজয়ের বড় কারণ ছিল কৃষক আন্দোলন। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী কংগ্রেসের জেতার জন্য বাম কৃষক আন্দোলনের অবদানের কথা উল্লেখ করেছিলেন। যদিও তার পরের বছরেই ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তার প্রতিফলন ঘটেনি।
করোনা অতিমারীর সুযোগ নিয়ে বিজেপি সরকার তিনটি কৃষি আইন আনার পর কৃষক আন্দোলনে উত্তাল হয় সারা দেশ।।ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য, তিনটি কৃষি আইন, নয়া বিদ্যুৎ আইন প্রত্যাহারের দাবিতে গড়ে ওঠা এই ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন কৃষিতে কর্পোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। কেন্দ্রের হাতে থাকা দিল্লি পুলিস, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানার বিজেপি সরকারের দমন নীতিকে তোয়াক্কা না করে কৃষক আন্দোলন ক্রমশ সংঘবদ্ধ হয়েছিল। গোমাংস নিয়ে বিতর্ককে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, বিভেদ – সব অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়ে কৃষকদের ন্যায্য দাবি চলে এসেছিল সামনের সারিতে।
করোনার আগে দেশজোড়া এনআরসি-সিএএবিরোধী আন্দোলন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। দিল্লিতে দীর্ঘদিনের গণ অবস্থানে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ, গুরুদ্বার থেকে অবস্থানকারীদের সহায়তা এমনিতেই বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। সরাসরি সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়ার পরেও ২০২০ সালের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি শোচনীয়ভাবে হেরে যায়। বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার কয়েকদিন পরেই দিল্লিতে বাধানো হল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। যদিও একে হিন্দুত্ববাদীদের উদ্যোগে সংগঠিত গণহত্যা বলাই ভাল। দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে হেরে সারা দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি, এনআরসি-সিএএবিরোধী আন্দোলনকে দমন করার লক্ষ্যেই এই গণহত্যা সংগঠিত করা হয়েছিল। তার একমাসের মধ্যেই দেশজোড়া লকডাউন।
বিজেপির ধারণা ছিল, করোনা অতিমারীর সুযোগে প্রতিবাদকে স্তব্ধ করে দেওয়া গেছে। লকডাউনের সুযোগে তাই নয়া শ্রম কোড চালু করার পাশাপাশি তিনটি কৃষি আইন প্রণয়নের চেষ্টা হয়। কিন্তু কৃষক আন্দোলনের তীব্রতা তাদের ভাবনাকে ভুল প্রমাণিত করে। এনআরসি-সিএএবিরোধী আন্দোলনের মতই কৃষক আন্দোলন সম্প্রীতির অনন্য নজির স্থাপন করে।
আন্দোলনের চাপে কৃষি আইন প্রত্যাহারে বাধ্য হয় বিজেপি সরকার। চরম স্বৈরাচারী সরকারও যে আন্দোলনের চাপে পিছু হটতে বাধ্য হয় তা প্রমাণিত হয়েছিল। সরকার কৃষি আইন প্রত্যাহার করে, ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের জন্য আইন তৈরি করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। যদিও সেই আইন নিয়ে বিজেপি সরকার আজ পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এর আগে স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ অনুসারে খরচের দেড় গুণ ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের প্রতিশ্রুতি দিলেও বিজেপি তা রক্ষা করেনি। কমিশনের সুপারিশ অনুসারে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইন ঘোষণার দাবিতে কৃষক আন্দোলন কিন্তু থেমে নেই। এবছরেই কৃষকদের দিল্লি অভিযানকে প্রতিরোধ করতে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানার পুলিশ দমন নীতি প্রয়োগ করেছে। নিরাপত্তার নামে দিল্লিতে ঢোকার সব পথ রুদ্ধ করা হয়েছিল। আর হার না মানা কৃষকদের জেদ বেড়ে গেছে। ড্রোন আটকাতে ঘুড়ি, ব্যারিকেড ভাঙতে ট্রাক্টর কৃষকদের হাতিয়ার হয়েছে।
কৃষক আন্দোলনে উঠে এসেছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা থেকে ভারতের বেরিয়ে আসার দাবি। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা কৃষি ব্যবস্থার বাজারিকরণ ও কর্পোরেটায়নের বড় মাধ্যম। দেশের কৃষি ব্যবস্থায় পুঁজির অনুপ্রবেশ সংকট বাড়িয়েছে। পরবর্তীকালে দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব, বীজ আইন প্রভৃতির মধ্য দিয়ে সংকট আরও বাড়ানো হয়েছে। কৃষক আন্দোলনে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা থেকে ভারতের সরে আসার দাবি ওঠার অর্থ হল, কৃষিতে পুঁজির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি জেহাদ ঘোষণা। একদিকে কৃষক আন্দোলন দমন করা, আন্দোলনকারীদের দেশদ্রোহী বলে সাজানোর চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে সরকার কত কৃষক দরদি তা প্রমাণ করার অপচেষ্টা চলছে। অথচ কৃষিতে, খাদ্যে ভর্তুকি কমিয়ে, কর্পোরেট আগ্রাসনের সুযোগ করে দিয়ে কৃষকদের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে মোদী সরকার।
২০২৪-২৫ সালের অন্তর্বর্তী কেন্দ্রীয় বাজেটে অন্নদাতা কৃষকদের নিয়ে সুন্দর সুন্দর কথা বলা হলেও, বাজেটে কৃষি মন্ত্রকের বরাদ্দ ১,০০০ কোটি টাকাও বাড়েনি। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিচারে প্রকৃত বরাদ্দ কমেছে। কৃষকদের অর্থ দেওয়ার জন্য গৃহীত পি এম কিষাণ প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়েনি। সারে ভর্তুকি ২৫,০০০ কোটি টাকা কমেছে। বরাদ্দ কমেছে প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনাতেও।
কৃষকের ফসলের দামের সঙ্গে গণবণ্টন ব্যবস্থার সম্পর্ক রয়েছে। কৃষকের থেকে ন্যায্য মূল্যে ফসল কিনে সরকার রেশনের মাধ্যমে তা বণ্টন করলে ফসলের দামের নিশ্চয়তা থাকে। অথচ সরকার ফসল কেনার পরিমাণই দিচ্ছে কমিয়ে। অন্তর্বর্তী বাজেটে গতবারের সংশোধিত বরাদ্দের থেকে খাদ্য ও গণবণ্টন দপ্তরের বরাদ্দ ৯,০০০ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। ফসল বিক্রি, গুদামে রাখার জন্য কর্পোরেটগুলিকে সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। কৃষক আন্দোলনের নেতাদের অভিযোগ, আইন না করতে পেরে ঘুরপথে কৃষিতে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চাইছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। এবছরের মার্চ মাসে দিল্লির রামলীলা ময়দানের ঐতিহাসিক কিষাণ মহা পঞ্চায়েতে মোদীর গ্যারান্টিকে কটাক্ষ করে সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালনের দাবি তোলা হয়। সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা লোকসভা ভোটে বিজেপিকে হারানোর আবেদন জানিয়ে প্রচারেও নেমেছে।
২০২৪-২৫ সালের অন্তর্বর্তী কেন্দ্রীয় বাজেটে অন্নদাতা কৃষকদের নিয়ে সুন্দর সুন্দর কথা বলা হলেও, বাজেটে কৃষি মন্ত্রকের বরাদ্দ ১,০০০ কোটি টাকাও বাড়েনি। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিচারে প্রকৃত বরাদ্দ কমেছে। কৃষকদের অর্থ দেওয়ার জন্য গৃহীত পি এম কিষাণ প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়েনি।
পশ্চিমবঙ্গেও কৃষকদের অবস্থা করুণ। এই রাজ্যে ধান ও পাট ছাড়া কোনো ফসল কৃষকদের থেকে সরাসরি কেনার ব্যবস্থা নেই। পাশাপাশি এমনিতেই জোত ক্ষুদ্র। চাষের খরচ বেড়ে যাওয়ায় ছোট ও প্রান্তিক কৃষক জমি ধরে রাখতে পারছেন না। অনেকেই জমি বিক্রি করে দিচ্ছেন অথবা ভাড়া বা বন্ধক দিচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে, একজন কৃষক হয়ত অল্প জমির মালিক, তিনি অন্যের জমিতে ভাগে বা ভাড়ায় চাষ করছেন। আবার অন্যের জমিতে মজুর হিসাবেও খাটছেন। চাষের মরশুম না থাকলে অনেকে অন্য রাজ্যে কাজ করতেও চলে যাচ্ছেন। একই ব্যক্তি একাধারে নিজের জমির কৃষক, ভাগচাষি বা ভাড়াটে চাষি, আবার ক্ষেতমজুর বা মরশুমী প্রবাসী শ্রমিক।
জমি বন্ধক বা ভাড়া নিলেও পাকা কাগজে কোনো চুক্তি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় না। জমির মালিকও আইনমাফিক চুক্তি করেন না, পাছে বর্গা রেকর্ড হয়ে যায়। পাট্টা যাঁদের আছে, তাঁরাও সরকারি সব সুযোগ পান না।
অন্যের জমিতে নানা পদ্ধতিতে চাষ করা কৃষকের সংখ্যা বাড়ছে। তার সঙ্গে দ্রুত বদলে যাচ্ছে ভূমি সম্পর্ক। সরকারি নিয়ম অনুসারে জমির মালিকই কৃষক। কৃষকের পরিচয় হয় কৃষিকাজ দিয়ে নয়, জমির নথি দিয়ে। অনেকেই কাগজে পাকাপাকি চুক্তি না করে অথবা মৌখিক চুক্তিতে অন্যের জমিতে চাষ করেন। জমি বন্ধক বা ভাড়া নিলেও পাকা কাগজে কোনো চুক্তি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় না। জমির মালিকও আইনমাফিক চুক্তি করেন না, পাছে বর্গা রেকর্ড হয়ে যায়। পাট্টা যাঁদের আছে, তাঁরাও সরকারি সব সুযোগ পান না।
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে জমির মালিক কাগজ দেখিয়ে কৃষি ঋণ, কৃষক বন্ধু, শস্য বিমা ইত্যাদির সুযোগ পাচ্ছেন। অনেকক্ষেত্রে মালিক কৃষিকাজ না করেও এইসব সুযোগ পান আর তাঁর জমিতে ভাগে, চুক্তি, ভাড়া বা জমি বন্ধক নিয়ে যিনি চাষ করছেন, তিনি কিছুই পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, জমির মালিক কৃষি ঋণ নিয়ে সেই অর্থ বেশি সুদে ধার দিচ্ছেন। প্রকৃত কৃষক উচ্চ সুদের হারে মহাজন বা ক্ষুদ্র ঋণ কোম্পানিগুলি থেকে ধার নিচ্ছেন। শস্য বিমা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে নিয়মের জটিলতায় অনেকেই তা পাচ্ছেন না। কৃষিতে সংকট যত বাড়ছে, তত মহাজনী ও ক্ষুদ্র ঋণ কোম্পানিগুলির ব্যবসা বাড়ছে। কৃষি ঋণ, শস্য বিমা বা ক্ষতিপূরণ ইত্যাদির দাবি কৃষক আন্দোলনে গুরুত্ব পায়। অথচ অধিকাংশ প্রকৃত কৃষকই সরকারি নিয়মের জন্য এসবের সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের ক্ষেত্রেও এই অনিয়ম চলে। সরকার চাষের খরচ সঠিকভাবে হিসাব করে না। বীজ, সার, কীটনাশকসহ নানা কৃষি উপকরণ কালোবাজারে বেশি দামে কিনতে হয়। সরকার তা মানে না। অন্যের জমি ভাগ, ভাড়া, চুক্তিতে বা বন্ধক নিয়ে চাষ করলে তার বাড়তি খরচ সরকারি হিসাবে ধরা হয় না। উচ্চ সুদের হারে ঋণ তো ধরাই হয় না। ফসলের দাম নির্ধারণে স্বামীনাথন কমিশনের ফর্মুলা মানা হয় না। তাই ধানের যে সহায়ক মূল্য ধরা হয়, তাতে বিক্রি করেও অনেক কৃষকের লাভ হয় না। পাটের ক্ষেত্রেও তাই। তারপর আছে ফসল বিক্রিতে নিয়মের জটিলতা। নাম নথিভুক্ত করতে চাই নানা নথি। নাম নথিভুক্ত করাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দালাল চক্র। সরকারি ক্রয় কেন্দ্রও অনেক জায়গায় দূরে থাকে। ধান কেনার সময়ে কিছু ধান বাদ দেওয়া হয়। মহাজনের থেকে ধার নিলে তাকে কম দামে বিক্রি করতেও অনেকে বাধ্য হন। ফলে সরকারি কেন্দ্রে যত ধান বিক্রি হয়, তার সবটা প্রকৃত কৃষক বিক্রি করতে পারেন না। বাস্তবে ব্যবসায়ীরা নিয়ম ভেঙে বিক্রি করেন। সরকার কতখানি ধান কিনেছে তার হিসাব দেয়। বিক্রেতাদের মধ্যে কতজন প্রকৃত কৃষক তার হিসাব মেলে না।
ধানের দাম ঠিক করার ক্ষেত্রে সব প্রজাতির ধানেরই এক দর। অপেক্ষাকৃত উন্নত প্রজাতির, দেশি ধান সরকারি দামে বিক্রি করলে কৃষকের লোকসান। তাই বাজার অর্থনীতির নিয়ম মেনে কৃষকরা বিক্রি করতে বাধ্য হন। এই মরশুমেও তাই রাজ্য সরকারের ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। ভোটের আগে নতুন করে কেনার প্রচার চলছে। আসলে ধান কেনা নিয়ে সরকার যতই প্রচার করুক না কেন, অধিকাংশ কৃষককেই নির্ভর করতে হয় বাজারের উপর। পাট কেনে জুট কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া। রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থাটি পাট কেনার বন্দোবস্ত ধীরে ধীরে গুটিয়ে ফেলছে। পাটের বাজার ফাটকা কারবারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। পাটচাষীরাও এই নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ থাকতে বাধ্য হন। কেন্দ্রের নীতিতে জুট কর্পোরেশন আজ প্রায় নিষ্ক্রিয়।
অন্যান্য ফসল তো বাজার অর্থনীতির পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। এই কারণেই ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিয়ে এই রাজ্যের কৃষকরা বিশেষ আগ্রহী নন। এমএসপি আইনে পরিণত হলেও যে অধিকাংশ কৃষক অভাবী বিক্রিতে বাধ্য হবেন সে কথা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়। কৃষক আন্দোলনের অনেক দাবির সঙ্গেই এ রাজ্যের অধিকাংশ কৃষক একাত্মবোধ করেন না। তৃণমূল সরকারের আমলে আইন সংশোধন করে চুক্তি চাষ, কৃষিজ পণ্য বিক্রিতে কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে সুযোগ করে দিয়েছে। বলা যেতে পারে, মোদীজি কৃষি আইন প্রত্যাহারে বাধ্য হয়ে যা করতে পারলেন না, তার অনেকখানি তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় এসেই করে দিয়েছে। রাজ্যে কৃষকদের বাঁচাতে সরকারি নিয়ম বদলে প্রকৃত কৃষকদের চিহ্নিত করা এবং সরকারি সুযোগগুলি তাদের দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। সেই গ্যারান্টি কিন্তু তৃণমূল দিচ্ছে না।
আরো পড়ুন নবান্নের মরশুমে পশ্চিমবঙ্গের কৃষক ভাল নেই
কৃষি কৃষকের পক্ষে যত অলাভজনক হচ্ছে তত জমি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে, দ্রুত বদলে যাচ্ছে জমির চরিত্র। কৃষি জমিতে রাতারাতি হচ্ছে মাছের ভেড়ি, বাস্তু জমি। সরকারি দফতরের একাংশের যোগসাজশে জমি মাফিয়ারা রাতারাতি জমির চরিত্র বদলে দিচ্ছে। মাটি বিক্রি হচ্ছে। বহু ক্ষেত্রে কৃষকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে পেশিশক্তিতে এই কাজ হয়ে চলেছে। তৃণমূলের আমলে বর্গা রেকর্ডের কাজ প্রায় বন্ধ। অনেকের পাট্টা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, পাট্টা দেওয়ার কাজও ঠিকমত হচ্ছে না। দিলেও জমির নথিতে গোলমালের অভিযোগ উঠছে। জমির নথির গুরুত্ব কৃষকরা মর্মে মর্মে জানেন। এইসব বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, সুযোগ পেলে কীভাবে প্রতিরোধে রূপান্তরিত হয় তার সাম্প্রতিক উদাহরণ সন্দেশখালি। ট্র্যাজেডি এটাই যে এখন তার ফায়দা তুলতে চাইছে বিজেপি।
পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও পড়ছে কৃষিক্ষেত্রে। এ যেন এক দুষ্টচক্র। অল্প বৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি, আবার অসময়ে অতিবৃষ্টিতে বাড়ছে রাসায়নিক সার, কীটনাশকের ব্যবহার। মাটির তলার জলের ব্যবহারও বাড়ছে। এর ফলে শুধু চাষের খরচই নয়, পরিবেশ দূষণও বাড়ছে। যার পরিণাম জলবায়ু পরিবর্তন।
জমির নথির গুরুত্ব কৃষকরা মর্মে মর্মে জানেন। এইসব বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, সুযোগ পেলে কীভাবে প্রতিরোধে রূপান্তরিত হয় তার সাম্প্রতিক উদাহরণ সন্দেশখালি। ট্র্যাজেডি এটাই যে এখন তার ফায়দা তুলতে চাইছে বিজেপি।
কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের এই নীতির সুযোগে কৃষিতে বাড়ছে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ। বীজ, সার, কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণের ব্যবসা চালাচ্ছে হাতে গোনা কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি। তারা ফসল বণ্টন, গুদামে রাখা, বিক্রির বাজারে নিয়ন্ত্রণও বাড়াচ্ছে। এই রাজ্যেও আদানি গোষ্ঠী চালকল কিনতে শুরু করেছে। কৃষকদের দূরবস্থা যত বাড়বে, তত কর্পোরেট দুনিয়ার থাবা বসানোর সুযোগ বাড়বে। কৃষিতে কর্পোরেট আধিপত্যের পরিণাম খাদ্য সংকট। খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলেছে। মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যত নেই। কৃষক ফসলের দাম পাবেন না আর জিনিসের দাম বেড়ে চলবে – এটাই আজ স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
গ্যারান্টি নিয়ে ভোটে বিজেপি-তৃণমূল তরজা চলছে। বাস্তবে বিজেপির সব কা সাথ সব কা বিকাশ আর তৃণমূলের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা উন্নয়ন কর্পোরেট বিকাশের বিনিময়ে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ – সবকিছুই ধ্বংস করছে।
ধর্মীয় বিভাজন, পরিচয় সত্তার রাজনীতি রুটিরুজির লড়াইকে গুরুত্বহীন করে দিতে চাইছে। কৃষক আন্দোলন ও মহিলা কুস্তিগীরদের আন্দোলনকে পেছনের সারিতে ফেলে ধর্মীয় রাজনীতির আস্ফালন ভোট প্রচারে প্রাধান্য পাচ্ছে। বিজেপি এটা করবেই, এটাই তাদের রাজনীতি। কিন্তু নরম হিন্দুত্ব বা পালটা পরিচয় সত্তার রাজনীতি দিয়ে বিরোধীরা এসবের মোকাবিলা করতে চাইছে।
বিজেপি পুনরায় ক্ষমতায় এলে কেবল বাতিল কৃষি আইনগুলিই আবার আনবে না, কর্পোরেট স্বার্থে আরও মারাত্মক কৃষি নীতি আনবে। জল, জমি, জঙ্গল, খনিতে কর্পোরেট হানার সুযোগ বাড়াতে আরও ভয়ঙ্কর আইন বা চলতি আইন সংশোধন করবে। কৃষক আন্দোলন ময়দান ছাড়েনি। এই নির্বাচন তার কাছে বাঁচার লড়াই। এই আন্দোলনকে বিরোধীরা কতটা কাজে লাগাতে পারে, তার উপর তাদের সাফল্য অনেকখানি নির্ভর করছে। কৃষি সমস্যাকে প্রচারে আনলে এই রাজ্যেও বাম-কংগ্রেস বর্তমানের বিজেপি-তৃণমূলের মেরুকরণের রাজনীতিকে মোকাবিলা করতে পারবে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।









Delusion of net -nagorik…
Indian politics is not so simple to be explained by corporate-communal-imperialism framework which typical marxists with no knowledge( or deliberate ignoring) of political economy ( except ofc Marxist vocabularies) …
কৃষির সমস্যা ভোগীরা “middle castes” …. it is better to enforce some Corpoate influence there
আর , ভূমিহীন বা স্বল্পভূমির মালিক peasants দের কে pull দিয়ে manufacturing sector আওতায় নিয়ে আসতে হবে ।
আর কি করে manufacturing sector র investment আসবে without corporate money ? Only after Corporate capitalism, you can sensibly expect to have genuine “communist / working class” politics .. without even entry of Corporate capitalism, there is no need for ” working class” politics..
Hey Comrades, please read & embrace How Vietnum is transforming …..rather than bookish & cult loyalty to Marx & Lelin