‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’ নামে আমেরিকাভিত্তিক একটি সংস্থা আছে যাদের কাজ হল ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে যে সমস্ত ঘৃণাভাষণ দেওয়া হয় তা লিপিবদ্ধ করা। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৩ সালে ভারতে ৬৬৮ বার ঘৃণাভাষণ দেওয়া হয়েছে মুসলমানদের লক্ষ্য করে। এই ঘৃণাভাষণ দিয়েছে কারা? বলাই বাহুল্য, বিজেপির নেতারা। তিন-চতুর্থাংশ এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বিজেপিশাসিত রাজ্যে। যে ঘটনাগুলি অবিজেপিশাসিত রাজ্যে ঘটেছে, সেখানেও এই ঘৃণাভাষণগুলি দিয়েছেন বিজেপির নেতারাই। কারণ বোঝা কঠিন নয়। বিজেপির গোটা রাজনীতিই দাঁড়িয়ে রয়েছে মুসলমান বিদ্বেষের ওপর। মুসলমানদের শত্রু বানিয়ে তোলাই তাদের রাজনীতি। ভারতে আরএসএসের প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকে আজ একশো বছর ধরে তারা সংগঠিতভাবে এই কাজটাই করছে। সুতরাং এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে ২০২৪ সালের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের প্রাক্কালে গত দেড় বছরে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর কথাবার্তা বলতে শুরু করে দেবেন বিজেপির নেতারা। প্রায় ৪০% ক্ষেত্রে এই ধরণের কথাবার্তায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে সরাসরি হিংসাত্মক অভিযান করার ডাক দেওয়া হয়েছে। বিজেপির নেতারা বিশ্বাস করেন, এভাবে যত উত্তেজনার পারদ চড়ানো যাবে ততই ধর্মীয় মেরুকরণ বাড়ানো যাবে। আর হিন্দু-মুসলমানের এই ধর্মীয় মেরুকরণের উপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে বিজেপির নির্বাচনী সাফল্য।

রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ২০২৩ সালে ৬৬৮ বার এই যে ঘৃণাভাষণ দেওয়া হল, তার মধ্যে ২৫৫ বার দেওয়া হয়েছিল বছরের প্রথমার্ধে আর ৪১৩ বার দ্বিতীয়ার্ধে। প্রায় ৬২% বৃদ্ধি ঘটল। বছরের এই সময়েই (অগাস্ট থেকে নভেম্বর) রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, ছত্তিসগড় রাজ্যে নির্বাচন ছিল। অর্থাৎ নির্বাচন যখন এগিয়ে আসছে তখন তখনই ঘৃণাভাষণের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাৎ একথা পরিষ্কার, যে মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানো বিজেপির রাজনৈতিক হাতিয়ার, যা তাকে তার রাজনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়িত করার কাজে সুবিধা করে দিচ্ছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ঘৃণাভাষণ থেকে যদি এগিয়ে যাওয়া যায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে সরাসরি হিংসাত্মক ঘটনায়, তাহলে মেরুকরণ আরও বেশি গতি পায়। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অসংখ্য হিংসাত্মক ঘটনা ঘটানো হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ঘটনাগুলির অব্যবহিত আগে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ব্যাপক ঘৃণাভাষণ চালানো হয়েছে। ২০২৩ সালেরই জুলাই মাসে হরিয়ানার নুহতে এমনই ঘটেছিল। সিএসএসএসের রিপোর্ট উদ্ধৃত করে দ্য ওয়্যার যে প্রতিবেদন তৈরি করে তাতে বলা হয়

The communal riots in Nuh on July 31 and in Sohna and Gurugram on August 1, 2023, wherein six people were killed, was the result of an ecosystem built on frequent hate speech targeting the minority communities and that has been nurtured in the country in the recent past, concluded the fact-finding report of the Centre for Study of Society and Secularism (CSSS).

নুহতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে টানা ঘৃণাভাষণ ছড়ানো হয় পরিকল্পনা করেই। হরিয়ানার এই জেলায় মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে জায়গাটি বিজেপি-আরএসএসের কাছে বেশ কিছুদিন ধরেই আকর্ষণীয়। ২০১৪ সালে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার আসার পর থেকেই হরিয়ানায় বিজেপির সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের খেলা জোর কদমে শুরু হয়ে যায়। নুহ জেলা মেওয়াত অঞ্চলে পড়ে, যা হরিয়ানা ও রাজস্থানে ছড়ানো। এই অঞ্চলের মুসলমানরা প্রধানত কৃষিজীবী এবং পশুপালক। ২০১৫ সালে হরিয়ানা সরকার গোরক্ষা আইন চালু করার সঙ্গে সঙ্গে নুহতে একাধিক গোরক্ষা বাহিনী গজিয়ে ওঠে। শুরু হয়ে যায় গোহত্যা বন্ধের নামে মুসলমানদের উপর অত্যাচার। জরিমানা করা, শারীরিক নিগ্রহ করা, এমনকি তুলে নিয়ে গিয়ে গুমখুনও শুরু হয়ে যায়। ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয়ের অধিক হিংস্র ঘটনা ঘটে, যাতে সাতজন মুসলমানকে হত্যা করা হয়। কয়েক বছর আগে বিজেপি হিন্দু ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের নামে নুহতে শুরু করে ব্রজমণ্ডল যাত্রা। মুসলমান অঞ্চলগুলির মধ্যে দিয়ে আগ্রাসী মিছিল করা হতে থাকে। ২০২৩ সালে ঘোষণা করা হয় সে বছরের যাত্রায় অংশগ্রহণ করবে কুখ্যাত গোরক্ষা পান্ডা মনু মানেসর, যার নামে নাসির এবং জুনেইদ নামের দুজন মুসলমান যুবককে গোরক্ষার অজুহাতে খুন করার অভিযোগ ছিল। এই ঘোষণায় প্রচণ্ড উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এভাবে কয়েক বছর ধরে পরিকল্পনা করে নুহতে সংঘাত বাধানো হয় এবং গণহত্যা সংগঠিত হয়।

এ বছরের নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে ততই বিজেপির দাঙ্গা ছড়ানোর প্রচেষ্টা তীব্র হয়ে উঠছে। উত্তরাখণ্ডের হলদোয়ানিতে এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দাঙ্গা বাধানো হয় এবং পুলিসের গুলিতে পাঁচজনের প্রাণ যায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র উত্তর ভারতে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়। সমস্তটাই পরিকল্পিত। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, ২০১৪ পরবর্তী সময়ে যেভাবে বিজেপি ভারতের রাজনীতিতে জাঁকিয়ে বসতে শুরু করেছে, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে তাদের কব্জা বাড়ছে, তাতে তাদের এই ঘৃণ্য পরিকল্পনাগুলিকে রূপায়ণ করার জন্যে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠানগুলিকে কাজে লাগাতে সমর্থ হচ্ছে। আইন, আদালত, বিচারব্যবস্থাও ক্রমশ বিজেপির হাতের পুতুলে পরিণত হচ্ছে।

হলদোয়ানিতে কী ঘটল? হলদোয়ানি স্টেশনের কাছে রেলের জমিতে প্রায় ৪,০০০ মুসলমান ধর্মের মানুষের বসবাসকে উত্তরাখণ্ড হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে। এরপর শুরু হয়ে যায় প্রশাসনিক তৎপরতা এবং বস্তি উচ্ছেদ অভিযান। একটি মসজিদ এবং একটি মাদ্রাসা ভাঙা হতেই আগুনে ঘি পড়ে এবং উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পুলিস গুলি চালায়। হলদোয়ানিকে কেন্দ্র করে বিজেপির প্রচার খেয়াল করে দেখুন। বলা হতে লাগল, অবৈধ মুসলমান অনুপ্রবেশকারীরা সেখানে বসতি, মসজিদ, মাদ্রাসা ইত্যাদি নির্মাণ করছে। বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী এবং মায়ানমার থেকে রোহিঙ্গারা এসে এখানে অবৈধ নির্মাণকাজ চালাচ্ছে, ইত্যাদি। এমনকি উইকিপিডিয়ার পাতাতেও এই ধরণের প্রচার ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। যে কেউ হলদোয়ানির সংঘর্ষ নিয়ে উইকিপিডিয়ার পেজে গেলেই দেখতে পাবেন। অথচ কংগ্রেস নেতারা, যাঁরা বস্তিবাসীদের হয়ে লড়াই করছেন, তাঁদের বক্তব্য অন্য। কংগ্রেস নেতা কাজি নিজামুদ্দীন বলেছেন যে, ৭০ বছর ধরে এই দুই কিলোমিটার এলাকায় গফুর বস্তি, ঢোলক বস্তি, ইন্দিরা নগর, বনভুলপুরা অঞ্চলে সংখ্যালঘু মানুষের বসবাস। স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘদিনের মানুষের বসবাসস্থল এই এলাকায় ঘরবাড়ি, মাদ্রাসা, মন্দির, মসজিদ, এমনকি ব্যাঙ্কও রয়েছে। ভারতের মত দেশে সমস্ত রাজ্যে রেলের দখলীকৃত বিস্তৃত জমিতে বস্তি নির্মাণ, এমনকি লোকালয় পত্তন কোনো নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু এই মানুষগুলিকে উচ্ছেদ করার আগে তাঁদের উপযুক্ত পুনর্বাসন দেওয়া সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার একদিকে মুখে বড় বড় কথা বলছে, যে মোদী নাকি সবার মাথার উপর ছাদ দিচ্ছেন, সেটাই নাকি তাঁর ধ্যানজ্ঞান। অন্যদিকে নির্বাচন এগিয়ে আসতেই সংখ্যালঘু মুসলমান বস্তিকে অবৈধ ঘোষণা করে বুলডোজার নিয়ে প্রশাসন সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভাঙচুরে মত্ত হয়ে পড়ছে। ইচ্ছাকৃতভাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, সংঘাত এবং প্রাণহানির পরিস্থিতি তৈরি করছে। গত ডিসেম্বর মাস থেকেই উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ২০ ডিসেম্বর উত্তরাখণ্ড হাইকোর্ট ওই জমিকে দখলমুক্ত করার নির্দেশ দেয়। এরপর মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে। এইসব কোর্ট কাছারি চলার মধ্যেই আচমকা এবছর ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখ কর্পোরেশন বিরাট বাহিনী নিয়ে মরিয়ম মসজিদ এবং আব্দুল রজ্জাক জাকারিয়া মাদ্রাসা ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয়। মুহূর্তে গুজব রটে যায় যে মসজিদ এবং মাদ্রাসায় রাখা পবিত্র গ্রন্থ কোরান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এলাকায় প্রবল উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ইঁট পাথর বৃষ্টি হতে থাকে। পুলিস গুলি চালিয়ে পাঁচজনকে হত্যা করে, শতাধিক লোক আহত হয়। এরপর ব্যাপক ধরপাকড় চলে। রাষ্টদ্রোহিতার মামলায় অভিযুক্ত করা হয় বহু মানুষকে।

এদিকে আবার কাল রামনবমী। গত কয়েক বছরে রামনবমী হয়ে দাঁড়িয়েছে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর মঞ্চ। গতবছরও পশ্চিমবঙ্গ এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় রামনবমীর মিছিল ঘিরে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও উত্তেজনা তৈরি করেছিল হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি। আর এবছর তো দেশের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বিহারের নওয়াদায় নির্বাচনী জনসভায় রামনবমীতে ‘ধর্মবিরোধীদের পাপ মনে রাখার’ হুমকি দিলেন। মোদী খোলাখুলি নির্বাচনী প্রচারে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য রেখে নওয়াদায় বলেছেন, কংগ্রেস এবং বিরোধী দলগুলি সনাতন ধর্মের বিরোধী। রামনবমী আসছে। এদের উচিত শিক্ষা দিতে হবে। বিরোধী দলগুলির পাশাপাশি মুসলমানদের কথা উহ্য রেখেছেন মোদী সাহেব। ‘সনাতন ধর্মের বিরোধী’ এই বাক্যবন্ধ ব্যবহার করে খুব পরিষ্কার দাঙ্গায় উস্কানি দেওয়া হয়েছে, হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং প্ররোচিত করা হয়েছে। তাঁর নিশ্চয়ই একথা অজানা নয়, যে ১৯২৫ সালের রামনবমীর দিনে প্রতিষ্ঠিত আরএসএস বিগত পাঁচ দশক ধরে এই রামনবমীর দিনেই সারা ভারতের বিভিন্ন স্থানে অজস্র ছোট বড় উত্তেজনা ও সংঘর্ষ তৈরি করে থাকে।

আরো পড়ুন পরিকল্পিত দাঙ্গা: কীভাবে এবং কেন?

এর খুব পরিচিত ছক হল মুসলমান এলাকার মধ্যে দিয়ে মিছিল নিয়ে যাওয়া, উত্তেজক ও আপত্তিকর স্লোগান দেওয়া, মুসলমানদের ধর্মস্থানগুলির সামনে বেলেল্লাপনা করা এবং এসবের মাধ্যমে উত্তেজনা সৃষ্টি করা এবং সর্বতোভাবে সংঘর্ষ বাধানোর চেষ্টা করা। গতবছর এ রাজ্যের হাওড়া, ডালখোলা প্রভৃতি স্থানে এবং মুম্বাই, ভদোদরা, হরিয়ানার সোনিপত, বিহারের নালন্দা, সাসারাম, ঔরঙ্গাবাদ এবং মহারাষ্ট্রের অন্যান্য অঞ্চল সমেত দেশের বহু জায়গায় ছোট বড় উত্তেজনা এবং অশান্তি সৃষ্টি করে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো। একইরকমভাবে ২০২২, ২০১৯, ২০১৮, ২০১৬, ২০১৪, ২০০৯, ২০০৬ এবং তার আগে ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৩ – এই বছরগুলিতে রামনবমীর দিনে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, সংঘাত প্রভৃতি তৈরি করা হয়েছে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। এবছর রামনবমী পড়েছে ১৭ এপ্রিল। তার দুদিন পরেই রাজ্যে প্রথম দফার ভোট। স্বাভাবিকভাবেই এবছর আমাদের রাজ্যেও এই ঘৃণ্য পরিকল্পনার আশঙ্কা থাকছেই।

মুসলমানরা ভারতের জনসংখ্যার ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। সমস্ত সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ মিলিয়ে ২০ শতাংশের সামান্য বেশি হবেন। অর্থাৎ প্রায় ৮০% মানুষ হিন্দু। রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদী একটি দল গত দশবছর দেশের শাসক। তারপরেও হিন্দুরা নাকি ভয়ানক বিপদের মধ্যে রয়েছে – এই প্রচার চালিয়ে ঘৃণা, বিদ্বেষের চাষ করে চলেছে বিজেপি। তারা জানে, ভোটে জেতার মত কোনো কাজই তারা গত দশবছরে করতে পারেনি। সুতরাং মুসলমানদের শত্রু বানিয়ে, তাঁদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে, দাঙ্গা করে, গণহত্যা করে, গোটা দেশজুড়ে বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক হাওয়া তৈরি করেই একমাত্র তারা আবার ক্ষমতায় ফিরতে পারে। এছাড়া অন্য কিছু তাদের হাতে নেই। মোদীর নেতৃত্বে ভারত নাকি ‘বিশ্বগুরু’ হয়ে উঠেছে। একথা তিনি নিজেই একাধিকবার বলেছেন। এই কথা বলে আসলে তিনি নিজেই নিজেকে ‘বিশ্বগুরু’ হিসাবে চিহ্নিত করে দিয়েছেন। কিন্তু বিষয় হল ‘বিশ্বগুরু’-র উন্নয়ন সূচকের রেকর্ড অত্যন্ত খারাপ জায়গায় আছে, একথা সকলেই বুঝতে পারছেন। মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি যখন ক্ষমতায় আসে, অর্থাৎ ২০১৪ সালে বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ভারত ছিল বিশ্বে ৫৫তম দেশ, আর ২০২৩ সালে হয়েছে ১১১তম দেশ। বিশ্ব সুখ সূচক (Global Happiness Index) অনুযায়ী ২০১৪ সালে ভারত ছিল ১১১তম দেশ। ২০২৩ সালে সেখান থেকে নেমে হয়েছে ১২৬তম। বিশ্ব লিঙ্গবৈষম্য সূচকে ২০১৪ সালে ছিল ১১৪তম আর ২০২৩ সালে হয়েছে ১২৭তম। নির্বাচনী গণতন্ত্রের সূচকে ২০১৪ সালে ভারত ছিল ২৭তম আর ২০২৩ সালে বিরাট বিপরীত যাত্রা ঘটিয়ে হয়েছে ১০৮তম। এভাবেই সমস্ত বিশ্ব সূচকে নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বের দশ বছরে ভারতের বিরাট অধঃপতন ঘটেছে। বর্তমানে ভারতের মাথাপিছু রোজগার বাংলাদেশের সমান, ২৬১২ ডলার – অত্যন্ত গরিব বললে অত্যুক্তি হবে না।

সুতরাং বিজেপির মানুষকে ভোট দিতে বলার কোনো মুখ আজ আর নেই। ২০১৪ সালের উন্নয়নের গুজরাট মডেল, ২০১৯ সালের ‘আচ্ছে দিন’ স্লোগান আসলে যে লোক ঠকানো জুমলা, তা আজ দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি নির্বাচনী বন্ডের বিরাট আর্থিক কেলেঙ্কারি ফাঁস বিজেপির বিশ্বাসযোগ্যতাকে তলানিতে নামিয়ে এনেছে। সুতরাং এক সর্বব্যাপ্ত ঘৃণা, বিদ্বেষের বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক হাওয়া ছাড়া বিজেপিকে অন্য কিছু বাঁচাতে পারবে বলে বিজেপি-আরএসএসের থিঙ্কট্যাঙ্কও আর মনে করছে না। ঘৃণার পাঁকেই একমাত্র বিজেপির পদ্ম ফুটতে পারে। এছাড়া অন্য কোনো উপায় বিজেপির সামনে খোলা নেই।

সূত্র
১. https://scroll.in  – এর বিভিন্ন ইন্টারনেট সংস্করণ
২. বিশ্বগুরুর বিশ্বরেকর্ড – প্রতিভাস

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.