শিবপ্রসাদ মিত্র
আমরা সবাই জানি, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে অখণ্ড ভারতকে ভাগ করে সৃষ্টি হয়েছিল ভারত ও পাকিস্তান। এই দ্বিজাতিতত্ত্বের উদ্গাতা ছিলেন হিন্দু মহাসভার নেতা বিনায়ক দামোদর সাভারকর, যিনি ১৯২৩ সালে প্রকাশিত তাঁর হিন্দুত্ব বইতে বলেছিলেন, হিন্দু আর মুসলমান দুটো আলাদা জাতি। তারা কখনোই একসঙ্গে থাকতে পারে না। একই তত্ত্ব কাজে লাগিয়ে পরবর্তীকালে মুসলিম লীগ নেতা মহম্মদ আলি জিন্না পাকিস্তানের দাবি তুলেছিলেন এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তাতে মদত জুগিয়েছিল। কংগ্রেসের আপসমুখী নেতৃত্ব এই দাবির কাছে আত্মসমর্পণ করে, ফলে দেশভাগ হল এবং সৃষ্টি হল লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু। তাঁরা ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে গেলেন। সর্বস্ব হারিয়ে পাকিস্তান থেকে ভারতে এবং ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে যেতে বাধ্য হলেন। তাঁদের জীবনে এই যে ভয়াবহ সর্বনাশ নেমে এল তার জন্য তাঁরা নিজেরা দায়ী ছিলেন না। দায়ী ছিল হিন্দু ও মুসলিম সাম্প্রদায়িক শক্তি – হিন্দু মহাসভা, আরএসএস, মুসলীম লীগ আর ক্ষমতালোভী আপসমুখী কংগ্রেস নেতৃত্ব। দেশভাগের সেই সময়ে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারতের সংসদে দাঁড়িয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রীয় সীমানার দ্বারা যেসব ভাইবোনেরা আজ আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন এবং দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে যাঁরা এই স্বাধীনতাকে উপভোগ করতে পারছেন না, আমরা তাঁদের কথাও ভাবছি। তাঁরা আমাদেরই লোক এবং যা-ই ঘটুক না কেন তাঁরা আমাদেরই লোক থাকবেন এবং তাঁদের ভালমন্দের সবকিছুরই আমরা অংশীদার।’
পণ্ডিত নেহরুর এই ঘোষণা তো একটা জাতীয় দায়বদ্ধতা। তিনি তো সেদিন কোনো সময়ের সীমারেখা বেঁধে দেননি। এটা ইতিহাস যে দেশভাগের পর কোটি কোটি মানুষ ওপার বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এদেশে এসেছেন। নতুন করে ঘরবাড়ি তৈরি করেছেন, লেখাপড়া শিখেছেন, চাকরিবাকরি, ব্যবসাবাণিজ্য করেছেন, চাষবাস করেছেন, এককথায় একটা নতুন জীবনধারা গড়ে তুলেছেন। তাঁরা ১৯৫২ সাল থেকে ভোট দিয়েছেন, তাঁদের সন্তানসন্ততি নাতি নাতনিরা ভোট দিয়েছেন। সেই ভোটে কেন্দ্রে ও রাজ্যে সরকার তৈরি হয়েছে, সেই সরকার নিত্যনতুন আইন তৈরি করেছে, সেই আইন মেনে তাঁরা জমির খাজনা, পৌরকর সহ প্রত্যক্ষ অপ্রত্যক্ষ নানা কর দিয়েছেন। এককথায় নাগরিকের যা যা দায়িত্ব সবই পালন করেছেন, দেশের নাগরিকে পরিণত হয়েছেন এবং তাঁদের এই নাগরিকত্ব নিয়ে কোনো প্রশ্নই ওঠেনি। ওঠার কথাও নয়। কারণ আমরা আগেই দেখিয়েছি, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যার ভোটার কার্ড আছে সে-ই দেশের নাগরিক বলে গণ্য হবে। এখন মোদী-শাহরা কী বলছেন? বলছেন, তোমরা নাগরিক নও, তোমরা শরণার্থী। তোমাদের নতুন করে নাগরিক হওয়ার জন্য দরখাস্ত করতে হবে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এর অর্থ কী? এর অর্থ হল বহুবছর আগে যাঁরা বাংলাদেশ থেকে এসে এদেশে বসবাস শুরু করেছেন, যাঁদের ভোটার কার্ড আছে, রেশন কার্ড আছে, জমির দলিল আছে, আধার কার্ড আছে, ব্যাঙ্কের পাসবই আছে, তাঁরা নাগরিক হিসাবে গণ্য হবেন না। অর্থাৎ বিজেপি সরকার এই কোটি কোটি মানুষকে অনাগরিকে পরিণত করতে চাইছে এবং অনাগরিকে পরিণত করার পর বলছে এবার তোমরা নতুন সিএএ আইন অনুযায়ী নাগরিক হওয়ার জন্য দরখাস্ত করো। এই সিএএ কী, এই আইনে দরখাস্ত করলেই নাগরিকত্ব মিলবে কিনা বা এই আইনে দরখাস্ত করার জন্য কী কী কাগজপত্র লাগবে, তার পন্থা পদ্ধতি কী, তা আমরা পরে আলোচনা করব। কিন্তু এই আইন যাদের কাজে আসবে বলে বিজেপি নেতারা প্রচার করছেন, তাদের অন্যতম হল ইতিমধ্যেই এনআরসি থেকে বাদ পড়া আসামের বাঙালি হিন্দুরা। তাঁরা কি সত্যিই এই আইনের দ্বারা উপকৃত হবেন?
এই আইনের ফলে যেসব বাঙালি হিন্দুদের নাম এনআরসি থেকে বাদ গিয়েছে, তাঁদের যে সুবিধা হবে তা বলা যাচ্ছে না। কারণ যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে (এদেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও) তাঁরা এর আগে কাগজপত্র সহযোগে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন যে তাঁরা এদেশেরই নাগরিক।
এখন নতুন আইনে যদি আবেদন করতে হয় তবে তা করতে হবে নাগরিকত্ব আইনের ‘ন্যাচারালাইজেশন’ ধারা মেনে। অর্থাৎ তাঁকে প্রথমেই ঘোষণা করতে হবে যে তিনি বিদেশি। এই স্ববিরোধের সমাধান কী করে হবে? ফলে নতুন আইন আসামের এনআরসি ছুট হিন্দু বাঙালিদের যে কতটুকু উপকারে আসবে সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। সন্দেহ আসামের বরাক উপত্যকার মানুষের মনেও দেখা দিয়েছে। সংবাদে প্রকাশ, ‘আসামের এনআরসি ছুট হিন্দু বাঙালিরা এতে উপকৃত হবেন, একথা বলা হলেও তাদের বড় অংশই শরণার্থী পরিচয়ে নাগরিকত্বের পক্ষপাতী নন। তাদের কেউই নতুন করে নাগরিকত্বের আবেদন করবেন না।’ (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২০ ডিসেম্বর ২০১৯)
সিএএ–র ফলে সব সম্প্রদায়ের মানুষই বিপন্ন হবেন
সমস্ত বিজেপি নেতা, এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ পর্যন্ত বলেছিলেন, কোনো কাগজপত্র লাগবে না। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে পাকিস্তান, বাংলাদেশ বা আফগানিস্তান থেকে এলেই আর পাঁচবছর এ দেশে বাস করা হয়ে থাকলেই হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ ইত্যাদি ধর্মাবলম্বী মানুষ নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন। তাঁদের এই বক্তব্য কাগজে ফলাও করে প্রকাশিতও হয়েছিল। ফলে এখন মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছেন। ভাবছেন হবেও বা, ওঁরা যখন বলছেন তখন হয়ত এমনি এমনিই নাগরিকত্ব পাওয়া যাবে।
কিন্তু শাহ যা-ই বলুন না কেন, এই প্রসঙ্গে তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক তখন বলেছিল, ‘The Union Home Ministry on Monday said, no migrant from the six non-Muslim communities from Afghanistan, Pakistan and Bangladesh will become Indian citizen automatically. A migrant should apply online and the competent authority would see whether he or she fulfilled all the qualifications for registration or naturalisation as an Indian citizen.’ অর্থাৎ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তর তখন জানিয়েছিল, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বাংলাদেশের ছটি অমুসলিম ধর্মীয় গোষ্ঠীর শরণার্থীরা আপনা আপনি ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন না। একজন শরণার্থীকে অনলাইনে দরখাস্ত করতে হবে এবং উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ বিচার বিবেচনা করে দেখবে যে তিনি রেজিস্ট্রেশন বা ন্যাচারালাইজেশনের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তাবলী পূরণ করেছেন কিনা (দ্য হিন্দু, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯)। এই শর্তাবলী কী? একজন শরণার্থীকে কোন কোন শর্ত পূরণ করতে হবে? নতুন গৃহীত আইনে সেকথাও পরিষ্কার করে বলা হয়েছে। এই আইনের ৩(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘Subject to fulfillment of the conditions specified in section 5 or the qualifications for the naturalisation under the provisions of the Third Schedule.’
অর্থাৎ যে শরণার্থী নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করবেন তাঁকে ভারতের নাগরিকত্ব আইনের পাঁচ নম্বর ধারায় যেসব শর্ত আছে তা পূরণ করতে হবে অথবা ন্যাচারালাইজেশন প্রক্রিয়ার তৃতীয় তফসিলে যেসব শর্ত আছে তা পূরণ করতে হবে। কী বলা আছে পাঁচ নম্বর ধারায়? বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়েও বলা যায়, এই ধারা মতে একজন শরণার্থীকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত। নিজেকে ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রমাণ করার জন্য কী করতে হবে? আইনে বলা হচ্ছে, ‘A person shall be deemed to be of Indian origin if he or either of his parents was born in undivided India.’ অর্থাৎ তাঁকে প্রমাণ করতে হবে তিনি বা তাঁর পিতামাতার একজনের জন্ম অবিভক্ত ভারতে হয়েছিল। পাঁচ নম্বর ধারার এই শর্ত কজন শরণার্থী পূরণ করতে পারবেন?
কী আছে বর্তমান সিএএ নিয়মাবলীতে?
এবার গত ১১ মার্চ মধ্যরাত্রে ঘোষিত বর্তমান সিএএ নিয়মাবলীতে বিজেপি সরকার আমাদের দেশের এতদিনকার বঞ্চিত দেশবাসীকে কী উপহার দিয়েছেন সে বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া যাক। আমরা এবার এক এক করে আলোচনা করে দেখব।
এদেশের গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন মানুষ যে সিএএ-র বিরোধিতা করছেন তার অন্যতম প্রধান কারণ হল, এই প্রথম দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার শর্ত হিসাবে ধর্মীয় পরিচয়কে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা আগেই দেখিয়েছি, দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে ক্রমাগত আইন কঠোর করা হয়েছে, মানুষের অধিকার সংকুচিত করা হয়েছে। কিন্তু নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে কখনো ধর্মকে জুড়ে দেওয়া হয়নি। এবার সেই কাজটাই করল বিজেপি সরকার। ফলে মরতে মরতে যতটুকু গণতান্ত্রিকতার অবশেষ ছিল তারও সলিল সমাধি রচনা করা হল। তাই এই আইন কোনো মতেই মেনে নেওয়া যায় না।
কিন্তু সে প্রশ্ন বাদ থাক। বিচার করে দেখা যাক, এই আইন বলে বিজেপি যাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছে, বাস্তবে তাঁদের অবস্থা কী দাঁড়াবে। তাঁরা কি সত্যিই নাগরিকত্ব পাবেন? তাঁরা নতুন করে কোনো সর্বনাশের মুখে পড়ে যাবেন না তো? বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে বিচার করে দেখা দরকার।
সিএএ নিয়মাবলী প্রকাশের আগে এই আইন আলোচনা করে আমরা অনেক আগেই যে সব আশঙ্কার কথা বলেছিলাম, রুল প্রকাশের পর দেখা গেল তার পুরোটাই শুধু সত্য নয়, এই আইন আরও অনেক কঠিন,আরও অনেক কঠোর।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী একজনকে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে হলে কোন কোন নথি জমা দিতে হবে? বলা হয়েছে ‘A copy of any document in schedule 1A.’ অর্থাৎ 1A তফসিলে যে সমস্ত ডকুমেন্টের কথা বলা আছে তার যে কোনো একটা দরখাস্তের সঙ্গে জমা দিতে হবে।
কোন কোন নথির কথা বলা আছে 1A-তে?
‘Copy of passport issued by the government of Bangladesh’
‘Birth certificate issued by a government authority in Bangladesh’
‘School or educational certificate issued by the school or college or board or university authorities in Bangladesh’
‘Identity document of any kind issued by the government of Bangladesh’
‘Land or tenancy records in Bangladesh’
এই ধরনের আরও কিছু সরকারি তথ্য যা বাংলাদেশের সরকারের কাছ থেকে আনতে হবে (আমরা যাঁরা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন শুধু তাঁদের কথাই এখানে উদাহরণ হিসাবে বলছি)। অর্থাৎ দরখাস্ত করার জন্য চাই বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত পাসপোর্ট, বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত জন্মের শংসাপত্র, বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা দফতর প্রদত্ত শংসাপত্র, বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত যে কোন লাইসেন্স বা সার্টিফিকেট, বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত ভূমি স্বত্বের রেকর্ড – এর মধ্যে কোনো একটা।
কেন এগুলো দরকার? বলা হয়েছে এই নথিগুলো প্রমাণ করবে যে আবেদনকারী বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। যদি কেউ এগুলোর যে কোনোটাই জোগাড় করতে না পারেন, তাহলে তিনি যে বাংলাদেশ থেকে এসেছেন সেকথা প্রমাণ করা যাবে না। সুতরাং তিনি এই আইন বলে নাগরিকত্বের জন্য আবেদনও করতে পারবেন না।
এখন প্রশ্ন হল, যাঁরা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন তাঁরা কজন এই সব সরকারি নথি সংগ্রহ করতে পারবেন? এতদিন এঁরা বিজেপি নেতাদের মুখে শুনে এসেছেন, কোন কাগজপত্র লাগবে না। দরখাস্ত করলেই নাগরিকত্ব পাওয়া যাবে। নতুন নিয়মাবলী জারি হওয়ার পর তাঁরা হতবাক হয়ে গিয়েছেন। ধীরে ধীরে তাঁরা উপলব্ধি করতে পারছেন যে বিষয়টা অত সহজ নয়। বিজেপি নেতারা এতদিন তাঁদের ভুল বুঝিয়ে এসেছেন, প্রতারিত করে এসেছেন।
এসব কাগজপত্র ছাড়াও কিন্তু জমা দিতে হবে আরও অনেক প্রমাণপত্র। সে কথায় আর যাচ্ছি না।
এবার ধরে নেওয়া যাক, দু-চারজন কোনো মতে এইসব কাগজপত্র জোগাড় করতে পারলেন। তারপর? তাঁদের আদালতের কাছে হলফনামা দিয়ে জানাতে হবে ‘That I am a Bangladeshi national belonging to ____ community.’ অর্থাৎ আমি বাংলাদেশি। অতএব ভারতীয় নই।
এই হলফনামাও দরখাস্তের সঙ্গে জুড়ে দিতে হবে। অর্থাৎ এদেশে ৪০-৫০ বছর ধরে বাস করা মানুষকে দিয়ে বলিয়ে নেওয়া হল যে তিনি ভারতীয় নাগরিক নন, বাংলাদেশের নাগরিক। এরপর যদি নাগরিকত্ব না জোটে, তিনি হয়ে যাবেন রাষ্ট্রহীন মানুষ। ভারতীয় নাগরিক থাকলেন না, আবার বাংলাদেশ সরকারও তাঁদের নাগরিক বলে স্বীকার করবে না। এই মানুষগুলোর জীবনে, তাঁদের সন্তান সন্ততির জীবনে কী ভয়ংকর অভিশাপ নেমে আসবে একবার ভাবুন তো? তাঁরা সমস্ত নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। এদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি – কোনো কিছুতেই এঁদের কোনো অধিকার থাকবে না। ভারতে বর্তমানে ৪০ লক্ষ রাষ্ট্রহীন মানুষ আছেন। সিএএ আরও রাষ্ট্রহীন নাগরিক তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে – একথা জোর দিয়ে বলা যায়। তাই সিএএ নাগরিকত্ব দেওয়ার আইন, না নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার আইন – তা আমাদের ভেবে দেখা উচিত। বিজেপি নেতাদের প্রতিশ্রুতিতে ভুলে পতঙ্গের মত আগুনে ঝাঁপ দিলে চলবে না।
মাঝে মাঝেই কিন্তু ঝুলি থেকে বিড়াল বেরিয়ে পড়ছে। বুক ফুলিয়ে শাহ যতই নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলুন, আসামের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা কিন্তু বলে দিয়েছেন ‘কে নিজেদের বিদেশি ঘোষণা করে নাগরিকত্বের জন্য দরখাস্ত করতে যাবে?’ (দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ১৩ মার্চ ২০২৪)। অর্থাৎ তাঁর মতে কেউ যাবে না। এই হল আসল কথা – কেউ যাবে না।
তাহলে প্রশ্ন হল, বুঝে শুনে মানুষকে এমন প্রতারণা করা কেন? চাপে পড়ে, নানা দিক থেকে প্রশ্ন ওঠার পর এখন শাহ বলছেন, যাদের কোন নথি নেই তারা যাতে দরখাস্ত করতে পারে তার জন্য একটা উপায় খুঁজে বের করব (দ্য হিন্দু, ১৫ মার্চ ২০২৪)। কী অদ্ভুত কথা! সিএএ ওঁরা পাস করেছেন ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে। তার নিয়মাবলী জারি করলেন ২০২৪ সালের ১১ মার্চ – চারবছর পর। এত বছর ধরে মাথা খাটিয়েও নথিহীন মানুষের জন্য নাগরিকত্বের ব্যবস্থা করতে পারলেন না? আসলে আবার মানুষকে ধাপ্পা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। যাঁরা এতদিন আশা নিয়ে তাকিয়েছিলেন, তাঁদের মোহভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে বুঝে ভোট হারানোর আশঙ্কায় শাহ এইসব উল্টোপাল্টা কথা বলছেন।
তাই এনআরসিবিরোধী, সিএএবিরোধী সংগ্রামকে তীব্রতর করতে হবে। গণসংগ্রামের চাপেই এই ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পরাস্ত করতে হবে। যে কোনো মূল্যে বাতিল করাতে হবে এনআরসি, সিএএ-র ঘৃণ্য পরিকল্পনা।
নিবন্ধকার এনআরসি-সিএএ বিরোধী নাগরিক কমিটির সদস্য। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







