পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে তৃণমূল বনাম বিজেপির দ্বিদলীয় বৃত্তকে আচমকাই যেন কিছুটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পেরেছে বামপন্থী ছাত্র-যুব সংগঠনগুলির নবান্ন অভিযান। দলবদল আর ব্যক্তিগত কাদা ছোড়াছুড়ির  আবহে হঠাৎ করেই সামনে এসেছে প্রতিদিনের বাঁচামরার বেশ কিছু জ্বলন্ত সমস্যা। নবান্ন অভিযান আদৌ নির্বাচনী পাটিগণিতে কোনও প্রভাব ফেলতে পারবে কিনা তার উত্তর দেবে সময়। কিন্তু *নাগরিক ডট নেট* মনে করে, অনেকদিন পর রাজ্যের রাজনৈতিক পরিসরে কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কিছুটা হলেও তুলে আনতে পেরেছেন বামপন্থী ছাত্র-যুবরা। তাই নবান্ন অভিযানে অংশ নেওয়া কয়েকজনের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা।

ঋতম মিত্র, সদস্য, ভবানীপুর আঞ্চলিক কমিটি, এসএফআই

আপনারা সবাই টিভির পর্দায় ও বিভিন্ন সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন গতকাল এসএফআই-ডিওয়াইএফআইএর সাথে দশটি বামপন্থী ছাত্র যুব সংগঠনের নবান্ন অভিযানে কী বীভৎস পুলিশি নির্যাতন হয়েছে। আমি সংক্ষেপে আমার অভিজ্ঞতার কথা বলছি। মিছিল শুরু হওয়ার কথা ছিল বেলা বারোটায়। কিন্তু দুপুর দু’টো বেজে গেলেও স্রোতের মতন বিভিন্ন জেলা থেকে একের পর এক মিছিল আসতে থাকে কলেজ স্ট্রিটে। শেষ পর্যন্ত যখন দুপুর দুটো পনেরো নাগাদ ধীরে পায়ে মূল মিছিল হাঁটা শুরু করল,তখনও কলেজ স্কোয়ারের গেটের সামনের মঞ্চ থেকে নেতৃবৃন্দ ঘোষণা করে যাচ্ছেন শিয়ালদা স্টেশন চত্বরে একটি মিছিল আটকে আছে। কাতারে কাতারে মানুষ, চারিদকে কেবল কালো মাথার ভিড়। কলেজ স্ট্রিট থেকে মিছিল শুরু হয়ে মেডিকেল কলেজ, নির্মল চন্দ্র স্ট্রিট হয়ে ওয়েলিংটন, জানবাজার পেরিয়ে যখন যাওয়া হচ্ছে তখনই আমরা দেখছি কর্পোরেশন অফিস ও রিগাল সিনেমার পাশের দুটো রাস্তা লোহার ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে। এটা করার পিছনে কারণ ছিল, সে প্রসঙ্গে নিয়ে পরে আসছি।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মূল মিছিলের মাথা যখন এস এন ব্যানার্জি রোডের সামনে এল, তখন সামনে এক বিশাল ব্যারিকেড। তার পেছন দিকে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ আর জলকামান। মিছিলের সামনে থাকা কমরেডরা আছড়ে পড়েন ব্যারিকেড উপরে। উল্টোদিক থেকে পুলিশ সেই ঢেউকে আটকানোর চেষ্টা করতে থাকে। পুলিস যখন দেখছে বিপুল সংখ্যক কমরেড এগিয়ে এসেছে ব্যারিকেডের সামনে, তারা তখন জলকামান দিয়ে প্রবল গতিতে ব্লিচিং মেশানো জল আমাদের দিকে ছেটানো শুরু করে। কেবল জলের তোড়ে আমাদের কারওকে রুখে দিতে পারবে না জেনে জলের মধ্যে কেমিক্যাল মিশিয়ে৷ দিয়েছিল। ওই বিষাক্ত জল যখন আমাদের মুখে চোখে ঢুকে যায় তখন অনেকেই রাস্তার মধ্যে শুয়ে পড়ে একটুখানি পরিষ্কার জল খুঁজতে থাকে, যাতে সেই দিয়ে অন্তত মুখ চোখ ধুয়ে নিতে পারে। এরই মধ্যে একের পর এক  টিয়ার গ্যাসের শেল উড়ে আসতে থাকে আমাদের দিকে। সামনের দিকে যারা ছিল তারা প্রত্যেকে অসুস্থ হয়ে গেলে। ধোঁয়ার চারদিক অন্ধকার। পিছন দিক থেকে এগিয়ে আসা কমরেডরা যেই আহত কমরেডদের তুলে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে গেল, তখন সঙ্গে শুরু হলো নির্বিচারে লাঠিচার্জ। জলকামানের বিষাক্ত জল ও টিয়ার গ্যাসের ধাক্কায় যারা অসুস্থ হয়ে রাস্তায় কাতরাচ্ছে,তাদের উপরও নেমে এল লাঠির আঘাত। প্রতিরোধ গড়তে গড়তেই ভিড় পিছু হটতে লাগল। সেই ভিড়ের মধ্যে আমিও ছিলাম। এবার বুঝলাম পুলিশ কেন কর্পোরেশন বিল্ডিং ও রিগাল সিনেমার পাশের রাস্তায় ব্যারিকেড করেছিল। যাতে আমরা আহত অবস্থায় কাউকে ওই রাস্তাগুলো দিয়ে নিয়ে  যেতে না পারি। যারা পারল ছুটল, যারা পারল না তাদের ওপর অনবরত পুলিশের লাঠি এসে পড়তে লাগল। দৌড়ে পালাতে গিয়ে আমার জুতোটা গেল ছিঁড়ে। সেই অবস্থায় কোনওমতে আমি অনেকের সাথে একটা গলির মধ্যে আশ্রয় নিলাম। ভাবছিলাম এই গলির মধ্যে হয়তো পুলিশ ঢুকে আমাদের মারবে না। কিন্তু হলো ঠিক উল্টো। পুলিশ তো ওই গলির মধ্যে ঢুকে প্রত্যেককে মারলই, সেই সঙ্গে যারা বাড়ির ভেতরে পর্যন্ত ঢুকে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের কলার ধরে বের করল মারতে মারতে।এর আগের বহু আন্দোলনে আমি গিয়েছি, এমনকি শেষ যে নবান্ন অভিযান করা হয়েছিল সেখানেও উপস্থিত ছিলাম৷ কিন্তু এবারের বীভৎসতার তুলনাহীন। আমার নিজের কব্জিতে পুলিশের লাঠি এমনভাবে পড়েছে যে কব্জি নাড়ানোর মতন ক্ষমতা নেই। কারও মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে, কারও নাক ফেটে গলগল করে রক্ত পড়ছে। ৫০০-র ওপর কমরেডকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছে। আমি নিজে ইরান সোসাইটিটে উপস্থিত ছিলুম আরও বহু আহত কমরেডের সাথে।

আরো পড়ুন :