ভোটের অন্তত এক সপ্তাহ আগে এক সর্বভারতীয় চ্যানেলের সাংবাদিকের সঙ্গে প্রাতরাশ সারতে সারতে তিনি বলেছিলেন “আপনি ৯ ডিসেম্বর আসুন, সেদিন ১০টা ৩০ মিনিটে শপথগ্রহণ হবে। সকালের দিকটা আমি ব্যস্ত থাকব। আপনাকে সাক্ষাৎকার দেব আর দুপুরে একটার মধ্যে ফাঁকা হয়ে যাব। আপনাকে সেদিন লাঞ্চ খাওয়াব।” তিনি রেবন্ত রেড্ডি। তেলেঙ্গানা প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি ও ভাবী মুখ্যমন্ত্রী। দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্যে কংগ্রেসের জয়ের ব্যাপারে তিনি এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে সাংবাদিককে আগে থেকেই নিজের শপথগ্রহণের দিন মধ্যাহ্নভোজের নেমন্তন্ন করে রেখেছিলেন। টিভি ক্যামেরার সামনেই!
কী করে কংগ্রেসের এই জয় সম্ভব হল? একবার দেখে নেওয়া যাক কোন প্রধান কারণগুলির জন্য তেলেঙ্গানায় প্রথমবার ক্ষমতায় এল কংগ্রেস।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
নেতৃত্বের দৃঢ়তা
অন্য রাজ্যগুলিতে যা সম্ভব হয়নি, তেলেঙ্গানায় সেটিই সম্ভব হয়েছে। গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সরিয়ে রেখে এক মনে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি রেবন্তর নেতৃত্বে লড়াই করে গেছে কংগ্রেস। নির্বাচন কৌশলী সুনীল কানুগুলু যা যা বলেছেন, সবটা মেনে চলেছেন রেবন্ত। সরকার গড়াকে পাখির চোখ করে সারা রাজ্য চষে ফেলেছেন তেলুগু দেশম পার্টি থেকে কংগ্রেসে আসা, এক সময়ের অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের নেতা রেবন্ত। প্রার্থী বাছাইয়ে কোনো গাফিলতি করেননি তিনি। দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্বও সবসময় রেবন্তের পাশে থেকেছেন। খোলা হাতে খেলার সুযোগ দিয়েছেন। রেবন্তও নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। নয়ত কোনো সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্রে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন? কামারেড্ডি আসনে যদিও তেলেঙ্গানার বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও আর রেবন্ত রেড্ডি – দুজনেই বিজেপি প্রার্থীর কাছে হেরে গেছেন, তবু রেবন্তের লড়াকু মনোভাব কর্মীদের সাহস জুগিয়েছে। তাঁরা বিশ্বাস করতে শিখেছেন যে কংগ্রেস জিততে পারে।
মুসলমান ভোট একজোট
গত দুটি বিধানসভা নির্বাচনে তেলেঙ্গানার মুসলমান সম্প্রদায় (পুরনো হায়দরাবাদ বাদ দিয়ে) কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের ভারত রাষ্ট্র সমিতির (যেটি আগে তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি নামে পরিচিত ছিল) পাশে দাঁড়িয়েছিল। রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখার ব্যাপারে কোনো গাফিলতিও কেসিআর করেননি। কিন্তু বিআরএসের সঙ্গে বিজেপির সখ্য নিয়ে সন্দেহ এবং জাতীয় স্তরে মুসলমানদের সুরক্ষার ব্যাপারে কেসিআরের অবস্থান ভাল চোখে দেখেননি তেলেঙ্গানার মুসলমান ভোটাররা। বিকল্প হিসাবে তাঁরা বেছে নিয়েছেন কংগ্রেসকে। যেমন পশ্চিম ওয়ারাঙ্গল আসনটি গত চারটি নির্বাচনে একবারও জিততে পারেনি কংগ্রেস। এবারে আসনটি তাদের দখলে এসেছে। এই কেন্দ্রে মুসলমান ভোটারের সংখ্যা ৬০ হাজারের উপরে। একইভাবে মেহবুবনগর, হুজুরনগর, পূর্ব ওয়ারাঙ্গল, খাম্মাম, বোধান, ইব্রাহিমপুর, শাদনগর, নিজামাবাদ, নালগোন্ডার মতো মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলে বিআরএস বিধায়কদের হারিয়ে দিয়েছেন কংগ্রেস প্রার্থীরা। বৃহত্তর হায়দরাবাদে অল ইন্ডিয়া মজলিস এ ইত্তেহাদ উল মুসলিমীন (এআইএমআইএম) তাদের প্রভাব ধরে রাখতে পেরেছে। তবে এইআইএমআইএম নেতা আসাদউদ্দিন ওয়েইসি যতই কেসিআরের দলকে ভোট দেওয়ার কথা বলুন, রাজ্যের অন্যান্য অংশের সংখ্যালঘু মানুষ সেই আবেদনে সাড়া দেননি। কংগ্রেসও সংখ্যালঘুদের জন্য বিশেষ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল ভোটের আগে।
কৃষকদের ও পিছিয়ে পড়া জাতির সমর্থন
বিআরএস সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ছিল – রায়থু বন্ধু বা কৃষক বন্ধু। কিন্তু কৃষকদের প্রতি একর জমির জন্য ৫,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার এই প্রকল্প থেকে গরীব কৃষকরা লাভবান হননি বলে কেসিআর সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। তেলেঙ্গানায় আবার অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশের মত বড় চাষীদের ‘জমিদারি’ ফিরে আসছে বলেও অভিযোগ ওঠে। জমির মালিক নন বলে বর্গাদাররাও এই প্রকল্পের সুবিধা পাননি। উল্টোদিকে কংগ্রেস এই অভিযোগকে হাতিয়ার করে কৃষকদের জন্য একর পিছু ১৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করে। কৃষক শ্রেণির কংগ্রেসের দিকে ফিরে আসাও এই জয়ের একটি বড় কারণ বলে ধরা হচ্ছে। অন্যদিকে পিছিয়ে পড়া জাতিদের একজোট করতে কংগ্রেসের চালও কাজে এসেছে। একদিকে যেমন জাতিগণনা বা কাস্ট সেনসাসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কংগ্রেস, তেমনই বিসিদের জন্য বিশেষ ঘোষণাপত্রও প্রকাশ করেছে রাহুল গান্ধীর দল। তাতে বিসিদের জন্য সংরক্ষণ বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে। রাজ্যের প্রায় ৫৬% ভোটারই পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন জাতি বা সাব-কাস্টের মধ্যে পড়েন। এঁদের সমর্থনও কংগ্রেসের দিকে গেছে। দলিতরাও কেসিআরের উপরে ক্ষুব্ধ ছিলেন। কারণ তেলেঙ্গানা রাজ্য তৈরির দাবি নিয়ে আন্দোলনের সময় কেসিআর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাঁরা সরকারে এলে কোনো দলিত বিধায়ককে মুখ্যমন্ত্রী করা হবে। তিনি কথা রাখেননি। এবার সুযোগ পেয়ে দলিতরাও কেসিআরের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন।
আরো পড়ুন বর্ণশুমারি কৌশল থেকে মতাদর্শ হয়ে উঠলে তা বিজেপির শেষের শুরু
কেসিআরের দুর্নীতি ও বিজেপি-প্রীতি
২০১৪ সালে তেলেঙ্গানা রাজ্য তৈরি হওয়ার পর থেকে দুটি নির্বাচনেই জয়ী হন কেসিআর। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ জমা হয়েছে। একেই তিনি অসুস্থ হয়ে নিজের ফার্ম হাউসের বাইরে আসেন না বলে অভিযোগ উঠেছিল একসময়। তাঁর ও তাঁর পরিবারের বিপুল সম্পত্তি নিয়েও বিস্তর অভিযোগ উঠেছে বারবার। কেসিআর-কন্যা কবিতার নামও দিল্লির মদের দোকানের লাইসেন্স সংক্রান্ত দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু অভিযোগ ওঠে বিজেপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে কেন্দ্রের সরকার কবিতার বিরুদ্ধে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যায়নি। এছাড়াও চাকরির পরীক্ষায় দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ হয়েছে বিআরএস সরকার। এই সমস্ত অভিযোগই বড় করে নির্বাচনী প্রচারে নিয়ে এসেছে কংগ্রেস। মানুষের মধ্যে কেসিআর সরকারের বিরুদ্ধে এবং বিআরএসের নিচুতলার বিধায়ক-নেতাদের নিয়ে ক্ষোভ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে রেবন্তের দল। সরকারবিরোধী এই মনোভাবেরই ফায়দা ভোটবাক্সে তুলেছে কংগ্রেস।
কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচনের ফল
গত নির্বাচনগুলিতে তো নয়ই, এমনকি এবারের বিধানসভা নির্বাচনের ছমাস আগে পর্যন্তও কংগ্রেস তেলেঙ্গানার লড়াইয়ে পিছিয়ে ছিল। একদিকে যেমন বিজেপি হিন্দুত্ব না রাজ্যের ইস্যু – কোনটিকে নির্বাচনের অভিমুখ করবে তা ঠিক করতে করতে খেই হারিয়ে ফেলেছে তেলেঙ্গানায়, তেমনই কংগ্রেস কর্ণাটক নির্বাচনে বিজেপিকে হারানোয় যেন তেলেঙ্গানা কংগ্রেস আত্মবিশ্বাসী হয়। শুধু কংগ্রেস নেতা বা কর্মীরাই নন, তেলেঙ্গানাবাসীও বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে কর্ণাটকে সম্ভব হলে এখানেও কংগ্রেস জনমোহিনী প্রকল্প রূপায়ণে সফল হতে পারে। বিআরএসকে নিয়ে ক্ষুব্ধ তেলেঙ্গানাবাসী কংগ্রেসকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন কর্ণাটকের ফলাফলের পরেই। প্রতিবেশী রাজ্য কর্ণাটক থেকে তেলেঙ্গানায় তাঁবু খাটান সে রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী ডিকে শিবকুমার। যা যা তেলেঙ্গানা কংগ্রেসের দরকার হয়েছে, তা জুগিয়ে গেছেন কর্ণাটকের নেতারা। এমনকি ত্রিশঙ্কু বিধানসভা হলে তেলেঙ্গানার নির্বাচিত কংগ্রেস বিধায়কদের বিজেপি ও বিআরএসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য বাস ও রিসর্ট তৈরি করে রাখার কাজও করে রেখেছিলেন শিবকুমার। যদিও তার আর দরকার পড়েনি। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই সরকার গড়তে চলেছেন রেবন্ত।
এই নির্বাচনে তেলেঙ্গানা রাজ্য তৈরির আন্দোলন করে উঠে আসা কেসিআর প্রথমবার পদচ্যুত হলেন। কংগ্রেস রেবন্তকে মুখ্যমন্ত্রী করে দক্ষিণ ভারতে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে চায়। লোকসভা নির্বাচনের আগে তেলেঙ্গানাই রাহুল গান্ধীর একমাত্র সাফল্য। এবার রেবন্ত কেমন করে সরকার পরিচালনা করেন, তার উপরই অনেকটা নির্ভর করবে কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








