পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে হিন্দি বলয়ে কার্যত ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে কংগ্রেস। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ছত্তিসগড়ে জিতেছিল শতাব্দীপ্রাচীন রাজনৈতিক দলটি। এবছরও মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেলের নেতৃত্বে ছত্তিসগড় ধরে রাখার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন কংগ্রেস নেতারা। অন্যদিকে বিজেপি লড়েছিল কোনো মুখ ছাড়াই, কেবলমাত্র প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে সামনে রেখে। কেন ছত্তিসগড় হারাল কংগ্রেস? দেখে নেওয়া যাক গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়।

নরম হিন্দুত্ব

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

লিখলাম বটে নরম, কিন্তু ছত্তিসগড়ে বাঘেলের কংগ্রেস কি আদৌ নরম হিন্দুত্বের পথে হেঁটেছিল? গোটা নির্বাচনী প্রচার পর্বে বাঘেল নিজের হিন্দুবান্ধব ভাবমূর্তি তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন। শুরুটা অবশ্য অনেক আগেই হয়েছিল। ২০২১ সালের ডিসেম্বরেই বিজেপির থেকে হিন্দুত্বের আলেখ্য কেড়ে নিতে তিনি রামের বনগমন পথ উদ্বোধন করেছেন। দাবি করেছেন, এই পথ ধরেই শ্রীরামচন্দ্র বনবাসে গিয়েছিলেন। এই উদ্বোধনের জন্যও বেছে নেওয়া হয়েছিল চাঁদকুড়ি নামক একটি জায়গা, যেটিকে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের মা কৌশল্যার জন্মস্থান বলে মনে করা হয়। সেখানে কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী রামের এক বিরাট মূর্তিও তৈরি করিয়েছিলেন।

রাজ্যজুড়ে অসংখ্য মন্দির তৈরি করেছে বাঘেলের সরকার। হিন্দু তীর্থস্থানগুলির উন্নয়ন করা হয়েছে, গোমূত্র কিনতে খরচ করা হয়েছে কোটি কোটি টাকা। গোরক্ষা নিয়েও প্রচার করা হয়েছে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে। মধ্যপ্রদেশের কমলনাথের মত বাঘেলও নিজেকে বিরাট হিন্দু হিসাবে তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই দুটি হিন্দু দলের মধ্যে অধিকতর হিন্দু বিজেপিকে বেছে নিয়েছেন ভোটাররা।

সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ

ছত্তিসগড় নির্বাচনের আগে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ তীব্র হয়ে উঠেছিল। মধ্য ছত্তিসগড়ের বেমেতারা জেলায় ২০১৮ সালের নির্বাচনে সবকটি আসন জিতেছিল কংগ্রেস। চলতি বছরের শুরুতে গোটা জেলায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। তিনজন মারা যান – দুজন মুসলমান, একজন হিন্দু। মৃত হিন্দু ব্যক্তির পরিবারের জন্য কংগ্রেস সরকার ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করে, কিন্তু মৃত মুসলমানদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি।

কংগ্রেস যতই সংখ্যাগুরু তোষণের চেষ্টা করুক, রবিবারের ফলাফল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল তাতে কোনো ফল হয়নি। এই ঘটনার সম্পূর্ণ ফায়দা তুলেছে বিজেপি। সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে মৃত হিন্দু ব্যক্তির বাবাকে বিজেপি বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী করেছিল। অমিত শাহ ওই এলাকায় প্রচারে গিয়ে উচ্চকণ্ঠে বলেছেন, গোটা জেলা লাভ জিহাদের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

কংগ্রেসের হিন্দুত্ব আদতে সুবিধা করে দিয়েছে বিজেপির। কাওয়ার্ধায় রাজ্যের একমাত্র মুসলিম বিধায়ক হেরে গিয়েছেন। তাঁকে যিনি হারিয়েছেন, তিনি বেমেতারা দাঙ্গায় অভিযুক্ত।

আরো পড়ুন পশ্চিমবঙ্গ প্রতিষ্ঠা দিবস পালন: হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা

বিপুল দুর্নীতি

ছত্তিসগড় রাজ্যে কংগ্রেসের পরাজয়ের অন্যতম বড় কারণ বিপুল দুর্নীতির অভিযোগও। প্রধানমন্ত্রী মোদী বারবার মহাদেব বেটিং অ্যাপসহ একাধিক দুর্নীতির কথা তুলে ধরেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, স্বয়ং বাঘেল এই দুর্নীতিতে জড়িত। মহাদেব বেটিং অ্যাপ ছাড়াও সরকারি চাকরিতে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। ভোটাররা যে সেই অভিযোগ বিশ্বাস করেছেন, ভোটের ফলই তার প্রমাণ।

যদিও এখানে প্রশ্ন উঠবে, মধ্যপ্রদেশেও শিবরাজ সিং চৌহানের সরকারের বিরুদ্ধে বিপুল দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। সেখানে কেন পাশা উল্টে দিতে পারলেন না বিরোধীরা?

আদিবাসীদের বঞ্চনা এবং ক্ষোভ

২০১৮ সালের নির্বাচনে আদিবাসীরা দুহাত উপুড় করে ভোট দিয়েছিলেন কংগ্রেসকে। রাজ্যের আদিবাসী এলাকা চিরকালই তাদের শক্ত ঘাঁটি। এবার সেখানে বড় ধাক্কা খেয়েছে কংগ্রেস।

রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের খনিজ সমৃদ্ধ সুরগুজা অঞ্চলে পাঁচ বছর আগে ১৪টি আসনের সবকটিতে জিতেছিল কংগ্রেস। এবার সেখান থেকে মুছে গিয়েছে। রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলের বস্তার এলাকায় তুলনায় কিছুটা ভাল ফল করেছে কংগ্রেস – ১২টি আসনের মধ্যে চারটি জিতেছে। ২০১৮ সালে জিতেছিল ১১টি।

আদিবাসীরা কেন মুখ ঘুরিয়ে নিলেন কংগ্রেসের থেকে? অভিযোগ, পাঁচ বছর আগে নির্বাচনে জিতে কংগ্রেস যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার কিছুই রক্ষা করেনি। আদিবাসী এলাকাগুলির ভিলেজ কাউন্সিল বা গ্রামসভাগুলির আপাত স্বায়ত্তশাসনের জন্য সদর্থক পদক্ষেপ নেয়নি। আদিবাসী সংগঠনগুলির অভিযোগ, কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছিল আদিবাসীদের জমি এবং জঙ্গলের উপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির কথা বলে। কিন্তু আদতে কংগ্রেস সরকার কর্পোরেট স্বার্থই রক্ষা করেছে।

কিন্তু বিজেপি কি তাঁদের স্বার্থ রক্ষা করতে চায় বলে আদিবাসীরা মনে করেন? নির্বাচনের ফলে প্রমাণিত, ছত্তিসগড়ের আদিবাসী এলাকায় আরএসএসের দীর্ঘদিনের কার্যকলাপ আদিবাসীদের কংগ্রেসবিরোধিতাকে ভোটবাক্সে বিজেপির পক্ষে নিয়ে যেতে পেরেছে।

খ্রিস্টান ভোট

ছত্তিসগড়ের আদিবাসী খ্রিস্টানদের বিরাট অংশ কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তির হামলা নিয়ে বারবার অভিযোগ জানানো হলেও বাঘেলের সরকার কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ আদিবাসী খ্রিস্টান সংগঠনের। খ্রিস্টানদের বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। উত্তর ছত্তিসগড়ের যশপুরের আদিবাসী খ্রিস্টান সমাজকর্মী জোসেফ সিংয়ের কথায়, “এই নির্বাচনের ফলাফল বিজেপির পক্ষে নয়, কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। কারণ গত পাঁচ বছরে কংগ্রেস সরকার আমাদের প্রতারণা করেছে। এই বছরের শুরুতে একজন খ্রিস্টান নানকে গ্রেফতার করে কংগ্রেস সরকার। এমন পদক্ষেপ বিপুল ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।”

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.