দেবাদিত্য রায়চৌধুরী
ভিক্টর হুগো বলেছিলেন, ‘যে ধারণার সময় এসেছে, তাকে পৃথিবীর কোনো শক্তিই থামাতে পারে না (No force on earth can stop an idea whose time has come)’। এই কথাটি রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক বা অন্য যে কোনো ধারার ধারণার ক্ষেত্রেই পুরোপুরি প্রযোজ্য। যে রাজনীতিবিদরা অত্যন্ত বাস্তববাদী এবং মাটির সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা বর্তমান সময়ের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুগুলো নিয়ে জনমানসে তৈরি হওয়া চাপ ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা অনুভব করতে পারেন।
ভারতে জাতিভিত্তিক জনগণনার বা বর্ণশুমারির দাবি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক-রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই দাবির মূল ভিত্তি হল সামাজিক ন্যায়বিচার, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং প্রমাণভিত্তিক নীতি নির্ধারণ। বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার এবং তাদের আদর্শগত মূল সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ঐতিহাসিকভাবেই বর্ণশুমারির ঘোর বিরোধী ছিল। কিন্তু সময়ের দাবি এতটাই স্পষ্ট যে তারা অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই ধারণাকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। কৃষি আইন প্রত্যাহারের পর এটি বিজেপির জন্য আরেকটি বড় রাজনৈতিক ও আদর্শগত পরাজয়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বর্ণশুমারি ও তার ইতিহাস
জনগণনা বা আদমশুমারি হল দেশের জনসংখ্যার দশ বছর অন্তর পরিসংখ্যান সংগ্রহের প্রক্রিয়া। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশের সমস্ত ব্যক্তির গণতাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক তথ্য সংগ্রহ, সংকলন, বিশ্লেষণ এবং প্রচারের পূর্ণ প্রক্রিয়া। এই তথ্য সরকার প্রশাসন, পরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়ন, বিভিন্ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের জন্য ব্যবহার করে। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পক্ষেত্রগুলির জন্যও এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং পূর্বে অচিহ্নিত অঞ্চলে প্রবেশের কৌশল নির্ধারণে সহায়ক। অর্থ কমিশন রাজ্যগুলিকে জনগণনার তথ্য অনুসারে জনসংখ্যার ভিত্তিতে অনুদান প্রদান করে। এইভাবে জনগণনা জাতীয় স্তরে সম্পদের সুষম বণ্টন, সুবিধাপ্রাপ্তদের তালিকা প্রস্তুত করা এবং সরকারি প্রকল্প পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এদেশে সর্বশেষ জনগণনা হয়েছিল ২০১১ সালে। ২০২১ সালের জনগণনা প্রথমে কোভিড অতিমারীরা কারণে এবং পরে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও আইনগত কারণে স্থগিত হয়ে যায়। বর্তমানে আশা করা হচ্ছে যে ২০২৫-২৬ সালে জনগণনা হবে।
বর্ণশুমারি মানে হল দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে বিভিন্ন জাতিভিত্তিক গণনা। এটি সামাজিক-অর্থনৈতিক ও জাতিভিত্তিক জনগণনা (SECC) নামেও পরিচিত। ভারতে প্রথম বর্ণশুমারি হয় ১৮৮১ সালে। তখন ভারতের মোট জনসংখ্যা ছিল ২৫.৩৮ কোটি। এরপর দশ বছর অন্তর জনগণনার সঙ্গে সঙ্গে বর্ণশুমারিও হত। স্বাধীনতার আগে শেষ বর্ণশুমারি হয় ১৯৩১ সালে, যেখানে ৪,১৪৭টি জাতি নথিভুক্ত হয়েছিল। ১৯৪১ সালে বর্ণশুমারি করা হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে শেষ করা যায়নি এবং ফলাফলও প্রকাশিত হয়নি।
স্বাধীনতার পর প্রথম জনগণনা হয় ১৯৫১ সালে, যেখানে সিদ্ধান্ত হয় কেবলমাত্র তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতিদের তথ্যই সংগ্রহ করা হবে। ১৯৯১ সালে মন্ডল কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (ওবিসি) জন্য সংরক্ষণের নীতি মেনে নিয়ে সমস্ত রাজ্যকে ওবিসি তালিকা তৈরি করার জন্য জরিপ করার অনুমতি দেওয়া হয়। এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন শ্রেণির ক্ষমতায়ন করা। তবে স্বাধীনতার পর থেকে কখনো জাতীয় স্তরে বর্ণশুমারি করা হয়নি।
ভারতে সর্বশেষ জনগণনা হয়েছিল ২০১১ সালে। সেইসময় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার বর্ণশুমারি নিয়ে প্রথমে অনাগ্রহ দেখায়, পরে ওবিসি ও দলিত নেতাদের চাপের মুখে ২০১২-১৩ সালে জাতিভিত্তিক সামাজিক-অর্থনৈতিক জনগণনা চালানো হয়। কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে সেই রিপোর্ট আজও প্রকাশিত হয়নি।
এরপর বর্ণশুমারি কয়েকটি রাজ্যে করা হয়েছে, যেমন বিহার (জেডিইউ, আরজেডি এবং বামপন্থীদের মহাগঠবন্ধনের সরকার দ্বারা), কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানা (কংগ্রেস সরকার)। বিজেপি-আরএসএস প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ওই রাজ্যগুলির বর্ণশুমারির বিরোধিতা করেছে।
বর্ণশুমারির যুক্তি, কারণ এবং সামাজিক ন্যায়ের রাজনীতি
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সমাজকর্মী এবং অর্থনীতিবিদদের মধ্যে অনেকেরই বিশ্বাস – বর্ণশুমারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। ১৯৩১ সালের জনগণনার পর থেকে এ ধরনের কোনো গণনা সম্পূর্ণভাবে করা হয়নি। অথচ এখন পর্যন্ত বহু সরকারি নীতি, প্রকল্প এবং সম্পদের বণ্টন ১৯৩১ সালের তথ্যের আনুপাতিক হারেই নির্ধারিত ও বাস্তবায়িত হচ্ছে। আজকের জাতিভিত্তিক জনসংখ্যা নিয়ে কেউই নিশ্চিত নয়, ফলে ১৯৩১ সালের তথ্যই একমাত্র সূচক হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে চলেছে। বলা বাহুল্য, এটি একটি চরম ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা এবং বিরাট ভুল। কারণ দেশভাগের ফলে বিশাল সংখ্যক জনগণের স্থানান্তর হয়েছে, অন্যান্য আর্থসামাজিক কারণে জাতিভিত্তিক জনসংখ্যায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
সাংবিধানিক ও আইনি যুক্তি
তফসিলি জাতি ও উপজাতি ছাড়াও অন্যান্য জাতির গণনা করার পিছনে সংবিধানিক ও আইনি যুক্তি রয়েছে। ভারতের সংবিধানের ১৫(৪) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে অনগ্রসর শ্রেণি একটি আলাদা শ্রেণি এবং তাদের উন্নয়নের জন্য সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। মন্ডল কমিশনের রিপোর্টেও উল্লেখ করা হয়েছিল যে ‘জাতি’ আসলে একটি শ্রেণি, এবং কোনো জাতি যদি সামগ্রিকভাবে সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে অনগ্রসর হয়, তবে সংরক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। কারণ এটি ১৫(৪) ধারার অন্তর্গত অনগ্রসর শ্রেণির সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে। ১৯৯০ সালে সরকার মন্ডল কমিশনের সুপারিশ গ্রহণের পরে সুপ্রিম কোর্ট মন্তব্য করেছিল যে কোনো গোষ্ঠীকে শুধুমাত্র জাতি নয়, পেশা, সামাজিক, শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক মাপকাঠির সমন্বয়ে জাতির মাধ্যমে চিহ্নিত করাও অবৈধ নয়। এরপর থেকেই সরকারি চাকরি ও শিক্ষাক্ষেত্রে সংরক্ষণ একটি জাতীয় নীতি হিসাবে কার্যকর করা হয়।
জাতিভিত্তিক জনগণনার রাজনৈতিক যুক্তি
বর্ণশুমারির রাজনৈতিক যুক্তিও রয়েছে। একটি সমাজ যেখানে জাতিভিত্তিক বৈষম্য, শোষণ ও বঞ্চনা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, সেখানে এ জিনিস অপরিহার্য। জাতির প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া মানেই ঐতিহাসিকভাবে চলে আসা সামাজিক অবিচার অব্যাহত রাখার পথ তৈরি করা। আজও দেশের নানা প্রান্তে তফসিলি জাতি, উপজাতি এবং ওবিসি তালিকাভুক্ত সম্প্রদায়গুলির বিরুদ্ধে অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ সালে তফসিলি জাতিভুক্ত মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধ ১৩% এবং তফসিলি উপজাতিভুক্ত মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধ ১৪.৩% বেড়েছে। উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান এবং মধ্যপ্রদেশে দলিতদের বিরুদ্ধে অপরাধ সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। এই জাতিভিত্তিক বৈষম্য ও নির্যাতন বোঝার জন্য নির্ভরযোগ্য এবং যাচাই করা জাতিভিত্তিক তথ্য থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। এখানেই বর্ণশুমারির মূল প্রয়োজন নিহিত।
আরো পড়ুন বঙ্গে দলিতদের মন্দিরে ঢুকতে না দেওয়া আকস্মিক ঘটনা নয়
বাবাসাহেব আম্বেদকর, জ্যোতিবা ফুলে, রামস্বামী পেরিয়ার, ইএমএস নাম্বুদ্রিপাদ, কর্পুরি ঠাকুর প্রমুখ নেতা জাতিগত ও সামাজিক তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় নীতি নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে লালুপ্রসাদ, মুলায়ম সিং যাদব, শরদ যাদব, সিদ্দারামাইয়া, দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, সীতারাম ইয়েচুরি, রাহুল গান্ধী, নীতীশ কুমার, স্ট্যালিন প্রমুখ নেতা জাতিভিত্তিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে সামাজিক ন্যায় ও সমতা নিশ্চিত করার দাবিতে জোরালো সওয়াল করেছেন। বর্ণশুমারির ধারণাটি সামাজিক ন্যায়, মর্যাদা, স্বীকৃতি ও অধিকারের বৃহত্তর সংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
সংক্ষেপে, জাতিভিত্তিক জনগণনা সামাজিক বৈষম্য নিরসনের জন্য, সম্পদের সুষম ও ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে, সংরক্ষণ নীতির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে এবং ভারতীয় সমাজের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১০২তম সাংবিধানিক সংশোধনী এবং এনসিবিসি-র ভূমিকা
সংবিধান (১০২তম সংশোধনী) আইন, ২০১৮ অনুযায়ী জাতীয় অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন (এনসিবিসি)-কে সংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তার দায়িত্ব হল সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে অনগ্রসর শ্রেণির অভাব অভিযোগ এবং তাদের জন্য নেওয়া কল্যাণমূলক পদক্ষেপ বিশ্লেষণ করা। সংবিধানের ৩৪০ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে এই শ্রেণিগুলিকে চিহ্নিত করতে হবে, তাদের পিছিয়ে পড়ার কারণ বুঝতে হবে এবং তাদের সমস্যা দূর করার জন্য ব্যবস্থা সুপারিশ করতে হবে। কিন্তু নির্ভরযোগ্য জাতিভিত্তিক তথ্য না থাকায় এনসিবিসির ক্ষমতা ও কার্যক্রম আজও সীমাবদ্ধ। শুধুমাত্র একটি সঠিকভাবে সংগঠিত ও পরিকল্পিত বর্ণশুমারিই ওবিসিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল্যায়নে এনসিবিসিকে সক্ষম করে তুলতে পারে।
যে দেশ বর্ণশুমারি করতে অস্বীকার করে, সে দেশ আসলে জাতিভিত্তিক অসমতা ও ঐতিহাসিক অবিচারের মোকাবিলা করতে অস্বীকার করে। বর্ণশুমারি এখন আর পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়, বরং সামাজিক ন্যায়ের পথে একটি গণতান্ত্রিক অপরিহার্যতা।
বর্ণশুমারি সম্পন্ন হওয়ার পরের রাজনৈতিক পথ
দলিত আন্দোলনের অন্যতম পথপ্রদর্শক কাঁসিরাম স্লোগান তুলেছিলেন ‘যার যত সংখ্যা ভারি, তার তত অংশদারি’। অর্থাৎ জাতিগত জনসংখ্যার অনুপাতে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। কংগ্রেস নেতা এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গত কয়েক বছর ধরে বারবার এই নীতি সামনে রেখে বর্ণশুমারির দাবি তুলে ধরেছেন। ওটিই গত কয়েক বছরে তাঁর অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক বক্তব্য হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিককালে একাধিক সমাজবাদী, কমিউনিস্ট, পেরিয়ারপন্থী, আম্বেদকরপন্থী, লোহিয়াপন্থী বিরোধী নেতাও এই নীতিকে দেশের নাগরিকদের মধ্যে সম্পদ ও সুযোগ বণ্টনের মূল ভিত্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার দাবি জানিয়েছেন।
বিরোধী শিবির স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে বর্ণশুমারির দাবি সূচনামাত্র। গণনা থেকে উঠে আসা তথ্য সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করতে হবে। প্রতিটি রাজ্য ও অঞ্চলের সামগ্রিক সামাজিক চিত্র দেশের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরতে হবে। তথ্য যদি জাতীয় নীতি নির্ধারণে প্রয়োগ না করা হয়, তবে তা অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। তাই বিরোধীদের দাবির রূপরেখা খুবই স্পষ্ট
১. বর্ণশুমারি সম্পন্ন করতে হবে।
২. রাজ্যভিত্তিক ও জাতিভিত্তিক তথ্য জনগণের সামনে আনতে হবে।
৩. সেই তথ্যের ভিত্তিতে চাকরি, শিক্ষা ইত্যাদিতে জাতীয় সম্পদের বরাদ্দ নতুনভাবে বিশ্লেষণ ও নির্ধারণ করতে হবে।
রাহুল এবং বৃহৎ অংশের বিরোধী নেতৃত্ব বারবার দাবি করেছেন, জাতীয় সম্পদের যে কোনো বণ্টন এবং সংরক্ষণ সংক্রান্ত নীতি পরিবর্তনের আদর্শগত ভিত্তি হওয়া উচিত কাঁসিরামের সেই বক্তব্য।
আরএসএস-বিজেপির বর্ণশুমারির আদর্শগত বিরোধিতা এবং এখন অবস্থান বদলের কারণ
বিজেপি ও তার মতাদর্শগত অভিভাবক আরএসএস ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু উচ্চবর্ণের রাজনৈতিক সংগঠন। এদের বর্ণশুমারির বিরোধিতার মূল কারণ হল ক্ষমতাবান উচ্চবর্ণগুলির পক্ষ থেকে বর্ণশুমারির চিরকালীন বিরোধিতা। ঐতিহাসিকভাবে প্রভাবশালী ও সম্পদে বলীয়ান জাতিগুলি তাদের প্রাপ্ত অন্যায্য ও অন্যায়ভাবে অর্জিত সুবিধা হারানোর আশঙ্কাতেই বর্ণশুমারির বিরোধিতা করে এসেছে।
আরএসএসের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি মূলত সংঘের মনুবাদী ও ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজনীতিরই প্রকাশ। ভিপি সিং সরকারের সময়ে মন্ডল কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ওবিসি সংরক্ষণ চালু হওয়ার পর থেকেই বিজেপি সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য গড়ে ওঠার মন্ডল রাজনীতির বিপরীতে মন্দির রাজনীতি বা হিন্দুত্ববাদকে দাঁড় করাতে চেয়েছে। অতীতে বহুবার বিজেপি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বর্ণশুমারির ধারণাকে উপেক্ষা, নিরুৎসাহিত, প্রত্যাখ্যান এবং নিন্দা করেছে। যেমন
১. ২০২১ সালে মন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই লোকসভায় জানান ‘এসসি/এসটি ছাড়া অন্যান্য জাতির গণনা না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
২. একই বছর সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া হলফনামায় সরকার বর্ণশুমারিকে ‘প্রশাসনিকভাবে জটিল ও দুর্বহ’ বলে আখ্যা দেয়।
৩. বিহারের মহাগঠবন্ধন সরকারের বর্ণশুমারির উদ্যোগের বিরোধিতা করে মোদিবিরোধী দলগুলি দেশের ঐক্য নষ্ট করার পাপ করছে বলে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অভিযোগ করেছিলেন।
৪. ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময়ে মোদী ‘যিতনি আবাদি, উতনা হক’ (যতটা জনসংখ্যা ততটা অধিকার) স্লোগানকে আরবান নকশাল মতাদর্শ বলে আক্রমণ করেন।
একথা আজ সর্বজনবিদিত যে আরএসএস- বিজেপি বর্ণশুমারির বিরোধী। কিন্তু এতদিন প্রত্যাখ্যান করার পর মোদীর মন্ত্রিসভার রাজনীতি বিষয়ক কমিটি শেষপর্যন্ত তা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। এর পিছনে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কারণ রয়েছে, যা মোদী সরকারের আগের অবস্থানের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। গত ১২ মাসে এমন কী ঘটল যা এই পরিবর্তন ঘটাল?
১. ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির ভরাডুবি। রামমন্দির ইস্যু মুখ থুবড়ে পড়ে আর বিরোধীদের বর্ণশুমারির জোরালো দাবি এবং সংরক্ষণের অধিকার রক্ষার প্রচার জনপ্রিয়তা পায়।
২. বিহারে নীতীশ কুমারের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে কমছে, এদিকে ২০২৫ সালের অক্টোবর নাগাদ সেখানে বিধানসভা নির্বাচন। জাতি সেখানে বড় বিষয়।
৩. রাহুলের অবিচল ও ধারাবাহিক বর্ণশুমারির দাবি ও লড়াই।
৪. কংগ্রেস পরিচালিত কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানায় ইতিমধ্যেই সফলভাবে বর্ণশুমারি সম্পন্ন হওয়া।
৫. ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে ওবিসি এবং তফসিলি জাতির মানুষের বড় অংশ বিজেপিবিমুখ হন। মোদীর তোলা ‘অব কি বা চারশো পার’ স্লোগান সংবিধান পরিবর্তন করে সংরক্ষণ তুলে দেওয়া হবে – এই আশঙ্কা তৈরি করে।
এইসব রাজনৈতিক বাস্তবতা মিলে মোদী সরকারকে তাদের আদর্শগত অহং ত্যাগ করতে এবং বর্ণশুমারিতে সম্মতি দিতে বাধ্য করেছে। এটি সংঘ পরিবারের বড় রাজনৈতিক ও আদর্শগত পরাজয় এবং বিরোধীদের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক জয়। এতে প্রমাণ হয়, জনগণের চাপ এবং নির্বাচনী প্রয়োজন আদর্শগত গোঁড়ামিরও প্রতিষেধক হতে পারে।
বর্ণশুমারি নিয়ে কংগ্রেসের অবস্থান
ঔপনিবেশিক যুগ থেকেই কংগ্রেস ছিল হিন্দি বলয়ের ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণ হিন্দুদের রাজনৈতিক দল। ঐতিহাসিকভাবে কংগ্রেস বর্ণশুমারিবিমুখ। স্বাধীনতার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু জাতীয় ঐক্যের নামে ১৯৫১ সালের জনগণনা থেকেই জাতি অনুযায়ী গণনা বন্ধ করে দেন।
কেন্দ্রের প্রথম অকংগ্রেসি সরকার, অর্থাৎ মোরারজি দেশাইয়ের নেতৃত্বাধীন জনতা পার্টি সরকার ১৯৭৯ সালে মন্ডল কমিশন গঠন করে, যার কাজ ছিল ভারতের সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণিগুলিকে চিহ্নিত করা। মন্ডল কমিশন ১৯৮০ সালে তাদের রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর পরবর্তী কংগ্রেস সরকারগুলি – ইন্দিরা গান্ধী এবং তাঁর পুত্র রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন – রিপোর্টটিকে কার্যত ঠাণ্ডা ঘরে ফেলে রেখে দেয়। তার প্রায় এক দশক পরে আরেকটি ভিপি সিংয়ের নেতৃত্বাধীন আরেকটি অকংগ্রেসি সরকার ১৯৯০ সালে মন্ডল কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করে।
একদিকে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান আর অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় জনতা দল, লোক জনশক্তি পার্টি, জেডিইউ, সমাজবাদী পার্টির মত দলগুলির দ্বারা প্রস্তাবিত সামাজিক ন্যায়নীতির মন্ডল রাজনীতি – এই দুই বিপরীত ধারার মধ্যে কংগ্রেস হিন্দি বলয়ের রাজনীতিতে গত কয়েক দশক ধরে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বর্ণভিত্তিক, জাতিভিত্তিক বৈষম্য ও অবিচারের পৃষ্ঠপোষকতার চরম মূল্য কংগ্রেসকে দিতে হয়েছে। এখন রাহুলের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস বুঝতে পারছে যে নিজেদের পুনরুজ্জীবিত করতে হলে বহু দশক ধরে সমাজের বৃহদংশের উপর চলা ঐতিহাসিক, সামাজিক অবিচারের মোকাবিলা করতে হবে।
রাহুল নিজে এই লড়াইয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন। বর্ণশুমারির দাবি এবং ‘জনসংখ্যার ভাগ অনুযায়ী সম্পদের অধিকার’ নীতির ভিত্তিতে সম্পদ ও সুযোগ বণ্টনের দাবিতে আন্দোলন করছেন। বিজেপির প্রবল বিরোধিতা এবং নিজের দলের কিছু উচ্চবর্ণ নেতার বাধা সত্ত্বেও রাহুল একনিষ্ঠভাবে এই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
বামপন্থীদের অবস্থান
বামপন্থী দলগুলি (অবিভক্ত সিপিআই থেকে শুরু করে তা সমস্ত উত্তরসূরি – সিপিআই, সিপিএম, লিবারেশন এবং অন্যান্য বামপন্থী দলগুলি) ঐতিহাসিকভাবে নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছে। তারা সবসময় সামাজিক ও আর্থিক অবিচারের বিরুদ্ধে লড়েছে।
সাম্প্রতিককালে বিহার ও তামিলনাড়ুর মত রাজ্যে কমিউনিস্টরা আম্বেদকরপন্থী ও লোহিয়াপন্থী সমাজবাদীদের (যেমন সমাজবাদী পার্টি, আরজেডি, ভীম সেনা) এবং পেরিয়ারপন্থী দলগুলির (যেমন ডিএমকে) সঙ্গে জোট গড়ে লড়েছে মনুবাদী হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে। এইসব রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দাবি হয়ে উঠেছে বর্ণশুমারি।
স্বাধীন ভারতের প্রথম আর্থসামাজিক সমীক্ষা (যাতে জাতি অনুযায়ী গণনা অন্তর্ভুক্ত ছিল) পরিচালিত হয়েছিল ১৯৬৮ সালে নাম্বুদ্রিপাদের নেতৃত্বাধীন কেরালার কমিউনিস্ট সরকারের আমলে। ২০২৩ সালে যখন বিহারে নীতীশের সরকার বর্ণশুমারি করে, তখনো তিনি বামপন্থী দলগুলি এবং আরজেডির সঙ্গে জোটে ছিলেন।
অন্যান্য দলের অবস্থান
লোকসভা নির্বাচনের আগে গঠিত ইন্ডিয়া জোটের অধিকাংশ সদস্য – দ্রাবিড় পেরিয়ারপন্থী (ডিএমকে), সমাজবাদী (সমাজবাদী পার্টি, আরজেডি), আম্বেদকরপন্থী (ভীম আর্মি), ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (শরদ পাওয়ার), শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) বর্ণশুমারির দাবিতে প্রচার চালিয়েছে। তারা শুধুমাত্র এতেই দাবি সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং সেই তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় স্তরে নীতি নির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন করার কথাও বলেছে।
অন্যদিকে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের দলগুলির মধ্যে নীতীশের জেডিইউ এবং লোক জনশক্তি পার্টি (প্রয়াত দলিত নেতা রামবিলাস পাসোয়ানের দল, এখন তাঁর পুত্র চিরাগ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী) ঐতিহাসিকভাবে বর্ণশুমারির পক্ষে।
আগামী দিনের রাজনীতি
জাতপাতের প্রশ্নে এখন বিজেপি পড়েছে ফাটা বাঁশের মধ্যে। বর্ণশুমারি মেনে নিয়ে বিজেপি ইতিমধ্যেই তাদের মনুবাদী মতাদর্শ থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু আসল প্রশ্ন হল, জাতি গোষ্ঠীগুলির জনসংখ্যার অনুপাতে জাতীয় সম্পদের বণ্টন নীতিকে কি বিজেপি মেনে নিতে পারবে? এই নীতি মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হবে, কারণ তা সম্পূর্ণভাবে সংঘ পরিবারের দীর্ঘ ৩৫ বছরের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে যাবে। গত তিন দশকে কমণ্ডল (মন্দির রাজনীতি) দিয়ে মন্ডলের (সামাজিক ন্যায়ের রাজনীতি) মোকাবিলা করার যে কৌশল তারা নিয়েছিল – এই নীতি তার বিপরীত।
অন্যদিকে কংগ্রেস, বাম দলগুলি, সমাজবাদী পার্টি, রাষ্ট্রীয় জনতা দল এবং অন্যান্যরা বর্ণশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে সরকারি নীতি বাস্তবায়নের জন্য চাপ সৃষ্টি করতেই থাকবে। ইতিমধ্যেই সংরক্ষণের ৫০% সীমা বাড়ানোর দাবিও জোরালো হচ্ছে। বর্ণশুমারির তথ্য প্রকাশ হলে এই দাবি আরও ন্যায্যতা লাভ করবে।
আগামী দুই বছর, অর্থাৎ এখন থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত সময়কাল নির্ধারণ করে দেবে ভারতের রাজনীতি কোন পথে এগোবে।
নিবন্ধকার সমাজকর্মী এবং সরকারি কলেজের অধ্যাপক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








