দিকে দিকে ছেয়ে গেছে পোস্টার। ফোন করলে শোনা যাচ্ছে তার কথা, আকাশে ঝুলছে তার বিশালকায় হোর্ডিং। প্রত্যেকটিতে প্রধানমন্ত্রী মোদির হাসিমুখ। প্রত্যেকটিতে ভারতের ‘বিশ্বগুরু’ হয়ে ওঠার ঘোষণা। হচ্ছেটা কী? আমজনতাকে বোঝানো হচ্ছে তড়িৎগতিতে বিশ্বের দরবারে এগোচ্ছে দেশ। বিদেশি বহুজাতিক পুঁজি টাকার থলি নিয়ে ভারতে দৌড়ে আসছে।
এই প্রচারযন্ত্রের বিপরীতে দিল্লিতে সিপিএমের দফতর হরকিষেণ সিং সুরজিৎ ভবনে একজোট হয়েছিলেন কিছু ‘আন্দোলনজীবী’। সেখানে রয়েছেন গান্ধীবাদী সমাজকর্মী মেধা পাটকর, হর্ষ মান্দাররা, সিপিআইএমের পলিটব্যুরোর সদস্যা বৃন্দা কারাত, কৃষকসভার নেতা হান্নান মোল্লা, অর্থনীতিবিদ অরুণ কুমার ও জয়তী ঘোষ, আরজেডির রাজ্যসভার সাংসদ মনোজ ঝা, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের অন্যতম শিকার আরেক সমাজকর্মী তিস্তা শেতলবাদ, জিএম শস্যবিরোধী লড়াইয়ের এবং পারম্পরিক বীজ সংরক্ষণের পক্ষে আজীবন লড়ে যাওয়া পরিবেশকর্মী বন্দনা শিবা এবং এদেশের পথব্যবসায়ী ও হকারদের অবিসংবাদী প্রতিনিধি ন্যাশনাল হকার ফেডারেশনের শক্তিমান ঘোষ। আসন্ন জি-২০ বৈঠকের বিপ্রতীপে এঁরা নিজেদের সম্মেলনের নাম দিয়েছেন উই২০ – মহাশক্তিধর রাষ্ট্রজোট ও কর্পোরেট বহুজাতিক কোম্পানিগুলির আঁতাতের বিরুদ্ধে ভারতের আমজনতার বহুস্বরীয় জোট। এই সম্মেলন চলেছে ১৮-২০ অগাস্ট। সম্মেলনের স্লোগান ছিল ‘LET’S PUT PEOPLE BACK ON THE MAP’। পৃথিবীর মানচিত্রে মানুষ কোথায়? এই কূটপ্রশ্নটি তোলা হয়েছে জি২০-র ‘এক পৃথিবী, এক পরিবার’ স্লোগানের বিরুদ্ধে উই২০-র সুরজিৎ ভবনের কনভেনশনে। কনভেনশনের দাবি ছিল – ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, ধর্মবিদ্বেষ, বর্ণবিদ্বেষ, শ্রেণিঘৃণামুক্ত পৃথিবী। দূষণমুক্ত পরিবেশ। দুশোর বেশি সংগঠন এতে অংশ নিয়েছে। ছিলেন কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ। কুখ্যাত দিল্লি পুলিস প্রতিনিধিদের হলে ঢুকতে, বেরোতে বাধা দেয়। সাংবাদিকদেরও ঢুকতে দেয়নি অমিত শাহের পুলিসবাহিনী, পুরো হল ঘিরে রাখা হয়। অর্থাৎ এখন মোদী-রাজত্বে নিজেদের দলীয় দফতরে কথা বলতে গেলেও পুলিসের অনুমতি লাগবে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এখন ভাবতে হবে, কেন মোদী সরকার এই ধরনের সম্মেলন, যা দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে চলা জি২০ বৈঠকের বিরোধিতা করছে, তাকে এভাবে ভয় পাচ্ছে? কী লুকোতে চাইছে সারা পৃথিবীর চোখ থেকে? ১৩ জুলাই ২০২৩ নাগাদ ‘কনসার্নড সিটিজেন্স’ নামক একটি নাগরিক গোষ্ঠী এক ভয়াবহ আশঙ্কা প্রকাশ করে। কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, নাগপুর, উদয়পুর – এইসব শহরে জোরকদমে একইসঙ্গে চলছে সৌন্দর্যায়ন প্রকল্প এবং জনবসতি উচ্ছেদ। উদ্দেশ্য জি২০ সম্মেলনে আগত দেশবিদেশের প্রতিনিধিদের দেখানোর জন্য ঝকঝকে তকতকে দেশনির্মাণ। এই রিপোর্টটি প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন হর্ষ মান্দার, সিমলার প্রাক্তন ডেপুটি মেয়র টিকেন্দর পানওয়ার এবং প্রবীণ সাংবাদিক পামেলা ফিলিপোজ।
দেশব্যাপী বস্তিবাসী মানুষের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে গঠিত বস্তিসুরক্ষা মঞ্চের মতে, জি২০ শীর্ষ বৈঠকের জন্য বাস্তুহারা হয়েছেন প্রায় আড়াই থেকে তিন লক্ষ মানুষ। শুধুমাত্র দিল্লিতে সেপ্টেম্বরের জি২০ বৈঠকের জন্য সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা হয়েছে পঁচিশটি বস্তি। বিশাখাপত্তনমে এএসআর নগরে যখন জি২০-র প্রতিনিধিরা আসেন, তখন তাঁদের যাওয়া আসার রাস্তায় চেঞ্চু আদিবাসী গোষ্ঠীর পরিবারগুলির জনবসতি ঢেকে ফেলা হয়েছিল যাতে এই মালিন্য, দারিদ্র্য প্রতিনিধিদের চোখে না পড়ে।
আরো পড়ুন জি২০ –র বৈঠক শ্রীনগরে : রঙিন পর্দায় রক্তঝরা ক্ষত আড়ালের চেষ্টা
ফাইন্যানশিয়াল এক্সপ্রেস কাগজের ওয়েব সংস্করণে ২০ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে জনৈক প্রণয় কুমার সোম তার Decolonising the Indian mind নিবন্ধে ভারতে আয়োজিত হতে চলা জি২০ শীর্ষ বৈঠককে একটি উপনিবেশবিরোধী উদ্যোগ হিসাবে দেখাতে চেয়েছেন। ইউরোপীয় আলোকপ্রাপ্তির প্রভাবে দূষিত ভারতীয় মস্তিষ্ক নাকি এই বৈঠকের পর স্বনির্ভর, থুড়ি আত্মনির্ভর, হবে। তিনি লিখেছেন “India’s historic presidency of G20 is monumental for the shedding of entrenched coloniality in the Indian psyche.” এরপর উপনিবেশবিরোধী ধর্মযোদ্ধা হিসাবে নরেন্দ্র মোদীর জয়গান গেয়েছেন। এমনকি দু পা বাড়িয়ে দেশ ও দশের স্বার্থে বুদ্ধিজীবীদের সমর্থনও চেয়েছেন “Decolonising the Indian psyche is, however, not an overnight process. It will take time as change in the habits of the people of our great country will be a massive socio-psychological process which will require the support of intellectuals across the political spectrum.” মনে রাখতে হবে, লেখক ডিফেন্স স্টাডিজের একজন সরকারি দিগগজ। সুতরাং মেট্রো স্টেশন থেকে মফস্বল – সর্বত্র এই যে জি২০র ঢাক বাজিয়ে প্রচার চলছে, তা আসলে ভিতরে ভিতরে ক্ষয়ে একটা সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোকে দেশপ্রেমের রঙিন চাদরে মোড়ার সচেতন প্রয়াসমাত্র।
আসলে সার্বিকভাবে জি২০-র উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা পেতে হলে কোভিড-পরবর্তী সময়ে অতিরাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর গতি প্রকৃতি আর এই ধরনের নানা সংস্থাকে দিয়ে শক্তিশালী কর্পোরেট লবির কার্যসিদ্ধি করার গল্পকে এই সামগ্রিকতার নিরিখে দেখতে হবে। গত তিন বছরে অতিমারীর অজুহাতে সারা বিশ্বজুড়ে অতিমারী চুক্তিসহ আর কী কী আইনকানুন, নীতি মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হল তা থেকে আমরা এর খানিক আঁচ পেতে পারি। সেভাবেই আজ পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের নামে একচেটিয়া গ্রীন এনার্জির ব্যবসাকে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ফর্টিফায়েড চাল থেকে জিন বদল করা খাদ্য বাজারে নিয়ে আসার চেষ্টা হচ্ছে খাদ্য সুরক্ষা এবং খাদ্যের আরও ব্যাপক উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে। এর আগে কৃষকরা কর্পোরেটের উপর নির্ভরশীল হয়েছেন বীজ, সার থেকে শুরু করে সমস্ত প্রকৌশলের জন্য এবং হারিয়েছেন নিজের পরম্পরাগত কৃষি পদ্ধতি। আমরা সেই আগ্রাসন রুখতে পারিনি। ডিজিটালাইজেশনের হাত ধরে খুচরো বাজার থেকে শুরু করে সমস্ত ক্ষেত্রে একচেটিয়া কর্পোরেট আগ্রাসন মারাত্মক বেড়ে গেছে। এই কর্পোরেট এজেন্ডাকে সার্বিকভাবে প্রতিরোধ করা, জিন বদল করা শস্য, গবেষণাগারে তৈরি খাবার ইত্যাদির বিরুদ্ধে এখনই সকলকে একজোট করা এবং প্রতিরোধ তৈরি করা জরুরি। গণতন্ত্রের এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতেও কৃষক আন্দোলন কিন্তু আমাদের কিছুটা হলেও আশা জোগায়।
তাই ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ক্লস সোয়াবের “Welcome to 2030. I own nothing, have no privacy, and life has never been better” স্লোগানকে বাস্তবায়িত করার স্বপ্ন যেন আমরা ভেঙে চুরমার করে দিতে পারি সেই অঙ্গীকার করা এবং জি২০-র মত অতিরাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর খবরদারির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা আজকের সময়ের দাবি।
যারা সেই দাবি তুললে সভায় পুলিস পাঠায়, বুলডোজার দিয়ে কর্পোরেট স্বার্থে বস্তি উচ্ছেদ করে, তাদের পূর্বপুরুষরাই ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাটুকার, অন্ধকারে ইংরেজ পুলিশ ডেকে বিপ্লবীদের ধরিয়ে দেওয়া লোক। একটা কথা স্পষ্টভাবে বুঝে নেওয়া দরকার, কর্পোরেটবিরোধিতা ছাড়া, এদেশের চাষি-হকার-মৎস্যজীবী-কারিগরের বিকেন্দ্রীভূত অর্থনীতিকে ধ্বংস করে কোনো উপনিবেশবিরোধিতা, কোনো স্বনির্ভরতার জন্ম হতে পারে না। যারা তেমন বলছে বা করছে তারা উপনিবেশেরই ফসল, কেবল মুখোশটা দেশপ্রেমের।
– মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








