আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুসারে, ভারতে বেকারদের মধ্যে ৮৩ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের কম। বেকারদের ৬৫.৭% মাধ্যমিক বা তার থেকে উঁচু স্তর পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। এই রিপোর্ট থেকে স্পষ্ট, যে নতুন প্রজন্মের জন্য কাজের সুযোগ ক্রমশ কমছে। অথচ ভারতের জনসংখ্যার বড় অংশ যুবক হওয়ায় নাকি দেশের আর্থিক বিকাশের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। এমনটাই বলেন পণ্ডিতের দল। কিন্তু, এই ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ যে মালিকের আশীর্বাদের বিনিময়ে যুবসমাজের সর্বনাশের কারণ তা বলবার অপেক্ষা রাখে না। যথারীতি কেন্দ্রীয় সরকার আইএলওর এই রিপোর্টকে অস্বীকার করেছে। যেমন গত লোকসভা নির্বাচনের আগে সরকারি সমীক্ষার রিপোর্টকেই বেমালুম চেপে দিয়েছিল। সেই রিপোর্টে জানা গিয়েছিল, মোদীজির রাজত্বে দেশে বেকারত্বের হার ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হয়েছে। লোকসভা নির্বাচনে মোদীর গ্যারান্টি নিয়ে প্রচার চলছে। বিজেপির দাবি মোদীজি যা বলেন, তাই করেন। অথচ কর্মসংস্থান, শ্রমিক নিরাপত্তা, অধিকারের নিরিখে মোদী তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতির বিপরীত পথে হাঁটছেন।
বছরে দুই কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি এখন বিজেপি ভুলেও আর উল্লেখ না। সরকারের বিভিন্ন দফতরে লক্ষ লক্ষ পদ শূন্য রেখে অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ চলছে। রেলে শূন্য পদ তিন লক্ষের বেশি। ব্যাঙ্কে স্থায়ী কর্মী কমেছে প্রায় এক লক্ষ। এমনকি সামরিক পোশাক পরে দেশপ্রেমের বিজ্ঞাপন দেওয়া এই প্রধানমন্ত্রীর রাজত্বে সেনাবাহিনীতেও অগ্নিবীর নামে অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মী নিয়োগ হচ্ছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বেকার সমস্যার সঙ্গে শ্রমিকের অধিকার অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বেকার বাড়লে মালিকের সুবিধা। মজুরি কমানো যায়, শ্রমিকের পাওনা নানা সুযোগ কেড়ে নেওয়া যায়। ছাঁটাই করার সুযোগও বাড়ে। অনিয়মিত শ্রমিক কর্মচারীর সংখ্যা যত বাড়ে, তত শস্তা শ্রমের বাজার গড়ে ওঠে।
২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রগুলিতে কর্মী ছিল ১৭.৩ লক্ষ জন। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৪.৬ লক্ষ। পাশাপাশি অস্থায়ী বা অনিয়মিত শ্রমিক কর্মচারীর হার এই সময়কালে ১৯% বেড়ে হয়েছে ৪২.৫%। এখনকার অনিয়মিত কর্মীদের ৬৫ শতাংশই কাজ পেয়েছেন মোদীজির দশ বছরের রাজত্বে।
বিজেপির এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে কর্মসংস্থানের উল্লেখ নেই। চাকরি দেওয়ার গ্যারান্টি ব্যর্থ হওয়ার পর, স্বনিযুক্ত হওয়ার জন্য দেওয়া হয়েছে ঋণসহ নানা সুযোগের গ্যারান্টি। দেশের প্রধানমন্ত্রী, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা এখন সরাসরি বলে দেন, চাকরি দেওয়া সম্ভব নয়। অগ্নিবীর সেনা, সিভিক পুলিশ নিয়োগের পাশাপাশি দেওয়া হয়, পকোড়া বা চপ ভাজার পরামর্শ। এই পরামর্শ দেওয়ার পিছনে কলকাঠি নাড়ে কর্পোরেট দুনিয়া।
সরকারের বিভিন্ন দফতরে কর্মী সংখ্যা কমলে, অস্থায়ী নিয়োগ বাড়লে শ্রমের বাজার নমনীয় হয়। শস্তা মজুরিতে, নানা রক্ষাকবচ কেড়ে নিয়ে শ্রমিকদের খাটিয়ে নেওয়া এবং ইচ্ছে মত ছাঁটাই করার স্বাধীনতা পায় মালিক শ্রেণি। ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রগুলিতে কর্মী ছিল ১৭.৩ লক্ষ জন। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৪.৬ লক্ষ। পাশাপাশি অস্থায়ী বা অনিয়মিত শ্রমিক কর্মচারীর হার এই সময়কালে ১৯% বেড়ে হয়েছে ৪২.৫%। এখনকার অনিয়মিত কর্মীদের ৬৫ শতাংশই কাজ পেয়েছেন মোদীজির দশ বছরের রাজত্বে।
‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, ‘আত্মনির্ভর ভারত’ ইত্যাদি স্লোগানের পর দেখা যাচ্ছে, উৎপাদন শিল্পে বিকাশের হার কমার সঙ্গে সঙ্গে কর্মীসংখ্যাও বিপুল হারে কমছে। শ্রম নিবিড় শিল্পগুলিতে চলছে মন্দা। বাড়ছে অস্থায়ী শ্রমিক এবং তাঁদের কাজের চাপ। নানা নামে শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। তাঁদের কাজের নিরাপত্তা, নানা সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প, অবসরকালীন সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা যায়। কাজের নিরাপত্তা না থাকায় এঁদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগও কম। স্থায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব লাগিয়ে কারখানায় শ্রমিকদের ঐক্য ভাঙতেও মালিক পক্ষের সুবিধা হয়। এইসব অস্থায়ী শ্রমিকদের নিয়োগকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দালাল চক্র। যা সাধারণভাবে শাসক দল ও কিছু ট্রেড ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণে চলে। আমাদের রাজ্যে শ্রম নিবিড় জুটমিলগুলি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। চা বাগানগুলিতে বর্তমানে শ্রমিকদের দৈন্যদশা অনেকাংশে বেড়েছে। বন্ধ চা বাগান খোলা, তাঁদের ন্যূনতম মজুরি, জমির পাট্টা নিয়ে ভোটের সময়ে অনেক কথা বলা হয়। কিন্তু তাঁদের অবস্থা ক্রমশ আরও সঙ্গিন হচ্ছে।
২০১৪ সালে মোদীজি পরিকাঠামোগত ক্ষেত্রে কাজের গ্যারান্টি দিয়েছিলেন। নির্মাণ শিল্পে শ্রমিক সংখ্যা বাড়ছে। প্রায় সাত কোটি শ্রমিক এই ক্ষেত্রে কাজ করেন। কিন্তু তাঁদের না আছে কাজের নিরাপত্তা, না আছে সামাজিক সুরক্ষার যথাযথ ব্যবস্থা। কাজ করতে গিয়ে প্রাণহানি বা অঙ্গহানি হলেও নিরাপত্তার গ্যারান্টি নেই। নির্মাণ শ্রমিকদের ৮৩% অস্থায়ীভাবে নিযুক্ত। আর ১১% স্বনিযুক্ত, যাঁরা কোনো ঠিকাদারের অধীনে কাজ করেন না।
আইএলও রিপোর্ট জানাচ্ছে, ৭০% নির্মাণ শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি পাওয়ার গ্যারান্টি নেই। বেসরকারি প্রকল্পে তো বটেই, এমনকি সরকারি প্রকল্পে কাজ করতে গিয়েও তাঁরা দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। সরকার, ঠিকাদার ব্যক্তি বা সংস্থা – কেউই সেক্ষেত্রে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে না। মিজোরামে রেল সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে মারা যান ২৩ জন শ্রমিক। মোদীর চারধাম প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে ৪১ জন শ্রমিক পাহাড়ের সুড়ঙ্গে আটকে পড়েন। কোনো ক্ষেত্রেই কাজের বরাত পাওয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
নির্মাণ শ্রমিকদের এক বড় অংশ যেমন অদক্ষ শ্রমিক, তেমন অনেকেই উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এঁদের অনেকেই নিজের রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে কাজ করতে যান। অসংগঠিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করা প্রবাসী শ্রমিকরা শস্তা শ্রমের জোগানদার। যাঁদের কাজের বা সামাজিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি নেই। আইএলওর রিপোর্ট জানাচ্ছে, এই প্রবাসী শ্রমিকদের সংখ্যা আগামীদিনে বিপুল হারে বাড়বে।
তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে করোনার পর ছাঁটাই বেড়েছে। এই প্রবণতা বিশ্বজনীন। ২০২২ সালে ছাঁটাই হয়েছিলেন ১,৬৪,০০০-এর বেশি কর্মী। ২০২৩ সালে ছাঁটাই হন ২,৪০,০০০-এর বেশি। গত ২০২৩-২৪ আর্থিক বর্ষে টিসিএস, ইনফোসিস, উইপ্রো – এই তিনটি কোম্পানি মিলে ভারতে ৬৪,০০০ জনের বেশি কর্মী ছাঁটাই করে।
তুলনামূলকভাবে বেশি বেতন পাওয়া ক্ষেত্রগুলিতেও চলছে অবাধে শ্রমিক ছাঁটাই, বাড়ছে কাজের সময় বৃদ্ধির প্রবণতা। শ্রম সময় বাড়লেও, মজুরি সেই হারে বাড়ছে না। তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে করোনার পর ছাঁটাই বেড়েছে। এই প্রবণতা বিশ্বজনীন। ২০২২ সালে ছাঁটাই হয়েছিলেন ১,৬৪,০০০-এর বেশি কর্মী। ২০২৩ সালে ছাঁটাই হন ২,৪০,০০০-এর বেশি। গত ২০২৩-২৪ আর্থিক বর্ষে টিসিএস, ইনফোসিস, উইপ্রো – এই তিনটি কোম্পানি মিলে ভারতে ৬৪,০০০ জনের বেশি কর্মী ছাঁটাই করে। করোনা অতিমারীর পর বাড়ি থেকে কাজ করার নামে কাজের সময় বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে বিভিন্ন কোম্পানি। কর্মীরা বাড়িতে কাজ করলে কোম্পানিগুলির অনেক খরচ কমে। সঙ্গে কমে শ্রমিকদের সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ব্যাপক হারে শ্রমিক সংখ্যা হ্রাস করতে চলেছে। মোদী জমানায় একেই বিকাশ বলে গেলানো হচ্ছে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি হোম ডেলিভারি, ওলা, উবের প্রভৃতি সংস্থার মাধ্যমে ট্যাক্সি চালানোর মত কাজের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই গিগ কর্মীদের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু এদের শ্রমিকের অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। এমনকি কোম্পানি এদের শ্রমিক বা কর্মচারী হিসাবে স্বীকৃতিটুকুও দেয় না। কাজ অনুসারে তাঁদের উপার্জন। অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়। পান থেকে চুন খসলেই উপার্জন কমে যাওয়া, এমনকি কাজ হারানোর আশঙ্কা। কাজের সুযোগ যত কমছে, গিগ কর্মীর সংখ্যা তত বাড়ছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা। যিনি যত আগে অর্ডার সরবরাহ করতে পারবেন তত রেটিং বাড়বে। যত তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করতে পারবেন তত দ্রুত পরের অর্ডার ধরতে পারবেন। ডেলিভারি কর্মী থেকে ট্যাক্সি, মোটরবাইক চালক – সকলেই ছুটতে ব্যস্ত। কাজের নির্দিষ্ট সময় নেই। যত শ্রম সময় ব্যয় করবে, তত রোজগার। কর্মীরা পরস্পরের প্রতিযোগী হওয়ায় সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগও কম। এঁদের শ্রমের বিনিময়ে মুনাফা বাড়িয়ে চলেছে নানা কোম্পানি। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কর্মীদের উপর মালিক পক্ষের আক্রমণ। যেমন এই প্রচণ্ড দাবদাহে একটি খাদ্য সরবরাহকারী কোম্পানি ডেলিভারি কর্মীদের দুপুর বারোটা থেকে চারটের মধ্যে অন্তত পক্ষে পৌনে চার ঘন্টা কাজের নির্দেশ দিয়েছে।
আরো পড়ুন ক্যাম্পাসে শস্তা, বাধ্য শ্রমিক তৈরি করার কল রাজ্য শিক্ষানীতি
অমানুষিক পরিশ্রম করার ফলে বেশিদিন কাজ করার শারীরিক সক্ষমতাও গিগ কর্মীদের থাকে না। এভাবেই অনিয়মিত কর্মীর শস্তা শ্রমের বাজার গড়ে উঠেছে। বিকাশের দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী শপিং মলসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডেড দোকানে পরিপাটি পোশাক পরে কাজ করা কর্মচারী বা বিভিন্ন সংস্থার নিরাপত্তা কর্মীর কাজে নিযুক্ত শ্রমিকদেরও কাজের নিরাপত্তা নেই। এইসব ক্ষেত্রে অল্প কয়েকমাস কাজের পর ছাঁটাই করে নতুন কর্মী নিয়োগই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো শ্রম আইন, সামাজিক সুরক্ষা তাঁদের জন্য কার্যত প্রযোজ্য নয়।
গিগ কর্মীদের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু এদের শ্রমিকের অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। এমনকি কোম্পানি এদের শ্রমিক বা কর্মচারী হিসাবে স্বীকৃতিটুকুও দেয় না। কাজ অনুসারে তাঁদের উপার্জন। অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়। পান থেকে চুন খসলেই উপার্জন কমে যাওয়া, এমনকি কাজ হারানোর আশঙ্কা। কাজের সুযোগ যত কমছে, গিগ কর্মীর সংখ্যা তত বাড়ছে।
নয়া উদারনীতিতে সামাজিক পরিষেবায় সরকারের আর্থিক দায় কমার পাশাপাশি শুরু হয়েছে নানা প্রকল্প। সরকারের বিভিন্ন দফতরের কাজকে প্রকল্পের অধীনে আনা হয়েছে। প্রকল্প কর্মীরা হচ্ছেন সরকারি কাজের শস্তা শ্রম বাহিনী। অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী সহায়িকা, মিড ডে মিল, আশা, পৌরসভার স্বাস্থ্য প্রকল্পের কর্মীদের অত্যন্ত কম অর্থের বিনিময়ে খাটানো হয়। তাঁদের বেতন নেই, আছে সাম্মানিক। সরকারি কর্মচারীর স্বীকৃতিও তাঁদের দেওয়া হয়নি। দেশজুড়ে চলা প্রকল্প কর্মীদের আন্দোলনে সাম্মানিক সামান্য বাড়ানো হয়। অথচ সরকারের বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ এঁদের ছাড়া হয় না। ইদানীং তাঁদের সরকারের অন্যান্য কাজেও ব্যবহার করার প্রবণতা বেড়েছে। এনজিওর মাধ্যমে চলছে প্রকল্পগুলির বেসরকারীকরণ। প্রকল্প কর্মীদের অধিকাংশ মহিলা। সরকারই মহিলাদের শস্তা শ্রমের বাজার তৈরি করেছে।
ভারতে এমনিতেই শ্রমিক কর্মচারীদের মধ্যে মহিলার অনুপাত বেশ কম। করোনা অতিমারীর পর সেই হার আরও কমেছে। কর্মরত মহিলাদের মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি কাজ করেন বিভিন্ন অসংগঠিত ক্ষেত্রে। কায়িক শ্রমের কাজে লিঙ্গভিত্তিক মজুরি বৈষম্য প্রকট। মহিলাদের জন্য থাকা বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা থেকেও অনেকে বঞ্চিত। পেশাগত নানা রোগের শিকার। সারাদিন যাঁদের পথেঘাটে কাজ করতে হয়, তাঁদের শৌচাগারের অপর্যাপ্ততায় নানা রোগে আক্রান্ত হতে হয়।
মহিলাদের মধ্যে একটা বড় অংশ ঘরে বসে মজুরির ভিত্তিতে নানা কাজ করেন। তাঁদের না আছে ন্যূনতম মজুরির গ্যারান্টি, না শ্রমিকের অধিকার। এই শস্তা শ্রম বাহিনীর সংখ্যাও বাড়ছে। স্বনিযুক্ত কর্মীদের শ্রমের মূল্য হিসাবে আনা হয় না। তাঁরাই মালিক, আবার শ্রমিক। স্বনিযুক্ত ব্যক্তিদের সরাসরি উপার্জনটাই হিসাবে আসে। এই বিনা মজুরির শ্রমদানকারীর বড় অংশ হলেন মহিলারা। স্বনিযুক্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির অর্থ হল বিনা মজুরিতে শ্রম শক্তি খরচ করা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি।
কৃষিক্ষেত্রে এই সমস্যা অনেক স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। কৃষকের শ্রম চাষের খরচে ধরা হয় না। কৃষি, পশুপালনসহ নানা কাজে মহিলাদের শ্রমের কোনো দাম দেওয়া হয় না। আবার কৃষিতে সংকট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে নানা অকৃষি ক্ষেত্রে দিনমজুরের সংখ্যা। তাঁদের অধিকাংশই শ্রমিক হিসাবে স্বীকৃতি পান না। নির্দিষ্ট কাজও নেই। অসংগঠিত ক্ষেত্রের সামাজিক সুরক্ষাগুলি নিয়েও তাঁদের মধ্যে সচেতনতা নেই। একদিকে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলি ধীরে ধীরে গুটিয়ে ফেলা হচ্ছে। অপরদিকে ছিটেফোঁটা যে সুযোগ আছে তা নিয়েও শ্রমিকদের সচেতন করার ব্যবস্থা নেই। গ্রাম ও শহরের অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের নিয়ে আন্দোলনের ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়নগুলির মধ্যেও অনীহা কাজ করে।
নয়া উদারনীতিতে শ্রমের বাজারকে শস্তা ও নমনীয় করার লক্ষ্য মোদী জমানায় অনেকখানি বাস্তবায়িত হয়েছে। শ্রম আইনগুলি তুলে দিয়ে চারটি শ্রম কোডের মাধ্যমে মালিক তোষণের নীতিতে মোদী সরকার কয়েক কদম এগিয়ে গেছে। করোনা অতিমারীর সুযোগে বিভিন্ন রাজ্যের সরকার শ্রম আইন শিথিল করে কাজের সময় বাড়িয়েছে, কমানো হয়েছে মজুরির হার। আর এই সুযোগে সংসদে পাশ করানো হয় চারটি শ্রম কোড।
শ্রম কোডের মাধ্যমে বহু লড়াইয়ের ফলে অর্জিত শ্রমিকশ্রেণির আইনি অধিকারগুলি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা হয়নি। দিনে ১২ ঘন্টা কাজ, অস্থায়ী কর্মী নিয়োগকে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে। সংকুচিত হয়েছে শ্রমিকদের সংঘবদ্ধ হওয়া, ধর্মঘট করার সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার। এমনকি ট্রেড ইউনিয়নের স্বীকৃতি, নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও রেজিস্টার, মালিক পক্ষের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। মালিকের দালাল ট্রেড ইউনিয়নকে স্বীকৃতি দিয়ে শ্রমিকদের লড়াইয়ের অধিকার কেড়ে নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শ্রমিকদের ছাঁটাই, লক আউট, লে অফে মালিক পক্ষকে দেওয়া হয়েছে অবাধ স্বাধীনতা।
সংগঠিত ও অসংগঠিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রমিকদের আলাদা আলাদা নানা সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা ছিল। শ্রম কোডে সেগুলি অনিশ্চিত। খনি, বিড়ি শ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা ও আইনি অধিকারগুলি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বিড়ি শ্রমিকদের কল্যাণে তহবিল গড়তে যে সেস ছিল, জিএসটি লাগু করে তা তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন আলাদা তহবিলের প্রশ্নই নেই। নির্মাণ শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষাগুলিও শ্রম কোড লঘু করে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারও বিভিন্ন ক্ষেত্রের শ্রমিকদের আলাদা আলাদা সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলি বন্ধ করে শুরু করেছে সামাজিক সুরক্ষা যোজনা। ধীরে ধীরে এই যোজনার মাধ্যমে সুবিধাগুলি তুলে দেওয়া এবং লঘু করা হচ্ছে।
শ্রমজীবী মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে কর্মী সংকোচন করে মালিক পক্ষের এই দালালিতে আর্থিক বৈষম্য লজ্জাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। প্যারিসের ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাবের এই বছরে প্রকাশিত গবেষণায় ধরা পড়েছে সেই চিত্র। সব কা সাথ সব কা বিকাশের বদলে ভারতে চলছে ধনকুবেরদের রাজত্ব। ভারতের ১% ধনকুবেরের হাতে আছে জাতীয় সম্পদের ৪০.১%, আয়ের ২২.৬% তাদের দখলে। পাশাপাশি আর্থিক দিক থেকে নিচে থাকা দেশের ৫০% মানুষ মোট যা আয় করেন, তা দেশের আয়ের মাত্র ১৫%। ধনকুবের এক শতাংশের বার্ষিক আয় যেখানে ৫৩,০০,০০০ কোটি টাকা, সেখানে নিচের ৫০% মানুষের গড় বার্ষিক আয় ৭১,০০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাসে ৬,০০০ টাকারও কম। গবেষণাটি জানাচ্ছে, মোদীর রাজত্বে আর্থিক অসাম্য ব্রিটিশ আমলকেও ছাড়িয়ে গেছে।
অতিমারীর সময়ে এই বৈষম্য প্রকট হয়েছিল। দেশের ৮৪% মানুষের প্রকৃত আয় যখন কমেছিল, তখন কর্পোরেটগুলির মুনাফা বাড়ে ৭০%। দেশে অর্বুদপতির সংখ্যা অতিমারীর সময়ে ৬৪ জনের থেকে বেড়ে হয় ১৬৬ জন। গত বছর অক্সফ্যামের রিপোর্টেও অসাম্যের চিত্র ধরা পড়ে। সেই রিপোর্ট জানাচ্ছে, দেশের ধনী ১০% মানুষের হাতে রয়েছে জাতীয় সম্পদের ৭৪%। আর নিচের তলার ৫০% মানুষ জাতীয় সম্পদের মাত্র তিন শতাংশের মালিক। দেশের ১০০ জন ধনকুবেরের মোট সম্পত্তি ৫৪,০০,০০০ কোটি টাকা। যা কেন্দ্রীয় বাজেটের মোট ব্যয় বরাদ্দের থেকেও বেশি।
কর্পোরেট সংস্থাগুলি মোদী জমানায় পেয়েছে অবাধ স্বাধীনতা। তাদের নির্দেশেই চলছে সরকার। নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে রাজনীতি। শ্রমের উপর পুঁজির আধিপত্য গড়ে তুলছে ধনকুবেরের রাজত্ব। গণতন্ত্র ধ্বংস হয়ে শক্তিশালী হচ্ছে কর্পোরেটতন্ত্র। যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, কাজের নিরাপত্তার অবলুপ্তি। কর্মহীন মানুষের সংখ্যার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। মোদীজি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসতে কর্পোরেট দুনিয়াকে সেই গ্যারান্টিই দিয়েছিলেন। আর জনতার প্রতি তাঁর গ্যারান্টি? পুরোটাই জুমলা।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








