দিল্লি বিধানসভা নির্বাচন পরিচালনা হয়ত দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসাবে রাজীব কুমারের শেষ কর্তব্য, কারণ ফেব্রুয়ারি মাসেই তিনি অবসর গ্রহণ করবেন। কাজেই রাজধানীতে নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করার আগে মঙ্গলবার যখন তিনি কাব্য কবিতায় অলঙ্কৃত ভাষায় কমিশনের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ খণ্ডন করতে শুরু করলেন, তখন তাঁর সাংবাদিক সম্মেলনের দর্শকরা (সশরীরে উপস্থিত বা টিভি, মোবাইলের পর্দায়) তা নিয়ে তেমন কোনো বিরূপ মন্তব্য করেননি। তবে বিজ্ঞান ভবনে মঙ্গলবারের সেই সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকরা যে প্রশ্নগুলোয় শান দিচ্ছিলেন, সেগুলো তিনি নিজেই করে বসলেন।

গত কদিন দিল্লি তুলকালাম ভারতীয় জনতা পার্টির প্রাক্তন সাংসদ এবং বর্তমানে কালকাজি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী রমেশ বিধুরীর কিছু নারীবিদ্বেষী কটূক্তি নিয়ে। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদরা আর আম আদমি পার্টির নেত্রী ও দিল্লির বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী আতিশীর বিরুদ্ধে এই বিজেপি নেতা অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কালকাজির পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে রমেশ মন্তব্য করেন যে জিতলে এলাকার রাস্তাঘাট তাঁরা ‘প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর গালের মত’ মসৃণ করে দেবেন। মনে পড়ে, ২০০৫ সালে ইউপিএ সরকারের তৎকালীন মন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদবের সেই মন্তব্য, যেখানে তিনি দাবি করেন যে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি ‘হেমা মালিনীর গালের মত’ রাস্তা বানিয়ে দিয়েছিলেন। এ যেন সেই কটূক্তিরই পুনরাবৃত্তি। দল বা মতাদর্শ নির্বিশেষে মহিলাদের সম্পর্কে কটূক্তির এ এক কুরুচির ধারা।

রমেশ অবশ্য এখানেই থেমে থাকেননি। বিজেপির এই প্রার্থী এরপর আতিশীর নাম নিয়েও কুরুচিকর মন্তব্য করেন। বলা হয়ে থাকে, মার্কসবাদে বিশ্বাসী আতিশীর বাবা – দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক বিজয় সিং – তাঁর পদবির বদলে আতিশীকে কার্ল মার্কস আর লেনিনের নামের আদ্যক্ষর যুক্ত করে ‘মারলেনা’ পদবি দিয়েছিলেন। এর জন্যে আতিশীর বাবাকে নিয়ে লেখার অযোগ্য মন্তব্য করেন বিধুরী। উল্লেখ্য, এই আপ নেত্রী ২০১৮ সালেই মারলেনা পদবি বাদ দিয়েছেন, কারণ তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে গিয়েছিল।

এহেন রমেশ বছর দুয়েক আগে, সাংসদ থাকাকালীন, লোকসভায় বহুজন সমাজ পার্টির প্রাক্তন সাংসদ দানিশ আলিকে গালাগালি দিয়েছিলেন। কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, এই কারণেই নাকি রমেশকে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি দক্ষিণ দিল্লি থেকে সরিয়ে রামবীর বিধুরীকে প্রার্থী করে। তবে মনে রাখতে হবে, বিজেপি এবার রাজধানীর সাতটার মধ্যে ছটা আসনেই প্রার্থী বদল করেছিল। যা-ই হোক, রমেশ এর আগে ২০০৩, ২০০৮, ২০১৩ সালে তুঘলকাবাদের বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। এই কেন্দ্রেই কিন্তু তিনি ১৯৯৩ এবং ১৯৯৮ সালের নির্বাচনেও দলের প্রার্থী হিসেবে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফের বিজেপি প্রার্থী হয়ে দক্ষিণ দিল্লি লোকসভা নির্বাচনে ২০০৯ সালে হারের সম্মুখীন হওয়ার পর ২০১৪ ও ২০১৯ সালে পরপর দুবার জেতেন।

কালকাজিতে এবার এহেন বিজেপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন দুই শক্তিশালী মহিলা প্রার্থী। একদিকে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং, অন্যদিকে মহিলা কংগ্রেসের সভাপতি অলকা লাম্বা। এখানে উল্লেখ্য যে ২০ বছরেরও বেশি সময় কংগ্রেসের বিভিন্ন পদে থাকা অলকা ২০১৪ সালে আম আদমি পার্টিতে যোগদান করেন। তারপর ২০১৫ সালে চাঁদনি চক থেকে দিল্লি বিধানসভায় নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০১৯ সালে আবার আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসেই ফিরে আসেন, ফলে বিধায়ক পদ হারান। কালকাজিতে এবার জোর লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা, যদিও সমীক্ষকদের ধারণা আতিশী জনপ্রিয়তায় খানিকটা এগিয়ে। যা-ই হোক, ফল তো ভোটারদের হাতে। ফিরে আসা যাক রমেশের কথায়।

রাজধানীতে জোর খবর যে তাঁকে নাকি এবার বিধানসভা নির্বাচন থেকে না হলেও, কালকাজি কেন্দ্র থেকে সরাতে পারে বিজেপি। কারণ অনেক। এক, বিরোধীপক্ষের নেতারা প্রায়শই দাবি করে থাকেন, বিজেপি নারীবিদ্বেষী দল। তাঁরা আবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পশ্চিমবঙ্গের গত বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বিকৃত গলায় ‘দিদি, ও দিদি’ সম্বোধনও তুলে ধরেন এ প্রসঙ্গে। বিজেপি নেতৃত্ব কিন্তু সে অভিযোগ বরাবর নাকচ করেছেন। এর বিপরীতে নিজেদের নারীদরদি প্রমাণ তাঁরা তুলে ধরেছেন তাঁদের সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, যেমন তিন তালাক নিষিদ্ধ করে মুসলমান মহিলাদের ক্ষমতায়ন, মহিলা সংরক্ষণ বিল সংসদে পাস করানো, কেন্দ্রীয় সরকারের ‘বেটি বচাও বেটি পঢ়াও’ প্রচার ইত্যাদি। আবার মহারাষ্ট্রে ‘লড়কি বহীন’ বা মধ্যপ্রদেশে ‘লাডলি বেহনা’ প্রকল্প বিজেপিকে মহিলা ভোট পেতে সাহায্য করেছে। অন্যদিকে দিল্লিতে ক্ষমতাসীন আপ মহিলাদের বিনামূল্যে বাসে ভ্রমণ বা ভর্তুকি বৃদ্ধির ঘোষণার মাধ্যমে ঠিক নির্বাচনের আগে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করতে চেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিজেপির নেতৃত্বে রমেশের বক্তব্যে মহিলারা হতাশ বোধ করছেন বলে মনে করা হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, দিল্লিতে ভোটার ১.৫৫ কোটিরও বেশি, আর সে তালিকার প্রায় ৭১.৭ লক্ষ মহিলা।

কংগ্রেস আর আপ রমেশের কটূক্তিগুলোকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। দলের কর্মীরা একদিকে রাস্তায় নেমে রমেশের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি করছেন, ওদিকে অসুস্থ বাবার নামে কুরুচিকর মন্তব্যের উপর প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়া আতিশীর ভিডিও এখন ভাইরাল। তাই বিজেপি নেতৃত্ব দোটানায়। উপায় দুটো – দলের বিরুদ্ধে নারীবিদ্বেষী হবার অভিযোগ অগ্রাহ্য করে রমেশকে কালকাজির প্রার্থী করে রেখে তাঁকে পরোক্ষ সমর্থন জানানো, না হলে বিরোধীপক্ষের দাবির সামনে নতিস্বীকার। এখন শিয়রে শমন। কী করবে বিজেপি?

আরো পড়ুন রমেশ কাণ্ডের পর সংসদে ঘৃণাভাষণও কি সয়ে যাবে আমাদের?

রাজীব বলেছেন, নির্বাচন কমিশন কোনোভাবেই এই ধরনের নারীবিদ্বেষী মন্তব্য বরদাস্ত করবে না। শক্ত হাতে এই ধরনের নেতাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা এবং প্রশাসনের অনেকটা এসে গেছে নির্বাচন কমিশনের হাতে। তাই কমিশন চাইলে এমন নেতাদের আইনত শায়েস্তা করতেই পারে। তেমন কিছু করবে কিনা জানা নেই। তবে সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁর নাম না করলেও, রাজীবের এই প্রতিশ্রুতি রমেশকে বিপাকে ফেলতে পারে বৈকি।

অন্যদিকে বিজেপির আপ সম্পর্কে অভিযোগ – তারা জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের নামে রেউড়ি বিতরণ করছে বা হরির লুট চালাচ্ছে। রাজীব বলেছেন যে বিষয়টা আদালতের বিবেচনাধীন, তাই এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না। জনহিতৈষী কাজ আর হরির লুটের মধ্যে ফারাক করা সত্যিই কঠিন। কিন্তু দিল্লি বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণার পরেরদিনই সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য সরকারগুলোকে বিচারপতিদের বেতন ও পেনশন প্রদানে অবহেলা করে এইসব প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ করার জন্য তীব্র সমালোচনা করেছে। বিচারপতি বি আর গাওয়াই ও বিচারপতি এজি মাসিহের বেঞ্চে বুধবার অল ইন্ডিয়া জাজেস অ্যাসোসিয়েশনের এক আবেদনের শুনানি চলছিল। সেখানে দেশের বিচারপতিদের অপর্যাপ্ত বেতন এবং অবসরকালীন সুবিধা দেওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বেঞ্চ। সাম্প্রতিক উদাহরণ তুলে ধরে বেঞ্চ বিজেপি নেতৃত্বাধীন মহারাষ্ট্রের লড়কি বহীন প্রকল্প এবং দিল্লিতে আপ ও কংগ্রেসের দেওয়া একই ধরনের আর্থিক প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে।

এ প্রসঙ্গে বলা হয়ে থাকে যে একটা কমিটি গঠন করা উচিত, যার সদস্যরা বিচার করে দেখবেন, জনকল্যাণমূলক আখ্যা দিয়ে কোনো রাজ্য সরকার এমন কোনো প্রকল্প ঘোষণা করছে কিনা, যা রাজ্যের কোষাগারের উপর চাপ সৃষ্টি করে। একথা আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার।

টানা দশ বছর দিল্লির মসনদে থাকার ফলে রাজধানীর কিছু বাসিন্দার অসন্তোষ, অভাব অভিযোগ চাড় দিয়ে উঠছিল আপের বিরুদ্ধে। তাছাড়া আপের সর্বভারতীয় আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরিওয়ালের একচ্ছত্র নেতৃত্ব, দলীয় দুর্নীতি ইত্যাদি নিয়েও কথা হচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতে রমেশের কটূক্তি আর এই হরির লুটের অভিযোগ হয়ত কেজরিওয়ালের দলকে সুসংহত করবে।

যদিও বিজেপি পরপর লোকসভা নির্বাচনে আপকে উড়িয়ে দিয়েছে, বিধানসভার ক্ষেত্রে কিন্তু তারা অনেক পিছিয়ে। এর অন্যতম কারণ হিসাবে বলা হয়, কেজরিওয়ালের ক্যারিশমাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মত কোনো মুখ না থাকা। লোকসভা নির্বাচনে মোদী ম্যাজিক কাজে লাগিয়ে ২০২৪ সালে বিজেপি প্রায় ৫৪% ভোট পেয়েছে দিল্লিতে। আপ পেয়েছিল ২৪%, কংগ্রেস প্রায় ১৯%। বিধানসভা ভোটে কিন্তু ফল উল্টো। ২০২০ সালে বিজেপি পেয়েছিল ৩৯ শতাংশেরও কম ভোট আর আপ পেয়েছিল ৫৩ শতাংশেরও বেশি। কংগ্রেসের ঝুলিতে মাত্র ৪.২৬% ভোট। তবে এবার নাকি যুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়ে বিজেপি প্রস্তুত। ৮ ফেব্রুয়ারি দেখা যাবে দিল্লিবাসীদের ‘দিল’ কী বলে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.