অপূর্ব রায়
এবারের কলকাতা বইমেলায় পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের কর্তারা গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি (এপিডিআর)-কে স্টল করতে দেবেন না বলে ফতোয়া দিয়েছেন। এপিডিআর আটের দশক থেকে ময়দানের বইমেলায় স্টল দিচ্ছে। প্রথমে কয়েকবছর ছাতা খাটিয়ে টেবিল দিত, তারপরে ছাউনি দেওয়া স্টল। স্টল সেজে উঠত এপিডিআর কর্মীদের লেখা পোস্টারে। গিল্ড কর্তাদের আপত্তি আসলে এই পোস্টারেই। আপনি যতই বইমেলায় কবিতা থেকে মিছিলে কিনুন না কেন, কবিতা না আউড়ে ন্যায়সঙ্গত লড়াইয়ের পক্ষে মিছিল সাজালে শাসকদের তো গোঁসা হবেই, আর শাসকদের বশংবদ গিল্ডকর্তারাও যে প্রভুর সুরেই সুর মেলাবেন – তাতেও আশ্চর্যের কিছু নেই।
গতবছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালের বইমেলায়, যাদবপুর কমিউনের পাঠশালার শিশু শিক্ষার্থীরা গাজায় ইজরায়েলি হানাদার বাহিনীর দ্বারা নির্বিচারে শিশু হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছিল নিজেদের আঁকা পোস্টার নিয়ে। কিছু ‘ভদ্রলোক’ (পড়ুন ইজরায়েলপ্রেমী হিন্দুত্ববাদী মুসলমানবিদ্বেষী ভদ্রবিত্ত) স্টল মালিক এই ‘বস্তির বাচ্চাদের’ পোস্টার নিয়ে আপত্তি জানান, পুলিশ শিশু শিক্ষার্থীদের হেনস্থা করে। এর প্রতিবাদে পরেরদিন লিটল ম্যাগাজিন এলাকায় আবার জমায়েতের ডাক দেওয়া হয়, পুলিশ আন্দোলনের পুরনো কর্মী রঞ্জন সরকারকে মাটিতে ফেলে মারতে থাকে। রঞ্জনদাকে মার খেতে দেখে ছুটে আসা এই লেখককে মারতে মারতে বইমেলার বাইরে বার করে দেয় এবং অন্য গেট দিয়ে ঢুকে লিটল ম্যাগাজিনে এলে এই অধম সহ ১৪ জনকে গ্রেফতার করে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
২০১০ সালে প্রথম একা একা কলকাতা বইমেলায় আসি। সে বছরের ২ ফেব্রুয়ারি ভোরবেলা এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রয়াত হন রাজনৈতিক বন্দি স্বপন দাশগুপ্ত। গড়িয়া অঞ্চলের বাসিন্দা নকশালপন্থী-বামপন্থী ধারার রাজনৈতিক কর্মী স্বপন দাশগুপ্ত বাংলা পিপলস মার্চ নামের একটি বামপন্থী রাজনৈতিক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ওই পত্রিকাটি করার ‘অপরাধে’ স্বপন দাশগুপ্তকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পুলিশ ইউএপিএ আইনে গ্রেফতার করে ২০০৯ সালে। কয়েকমাস পরেই ক্যান্সারাক্রান্ত বন্দি স্বপনদা প্রয়াত হন। তাঁর প্রয়াণের দিন বিকেলে বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নে কালো ব্যাজ পরা হয়েছিল, পুলিশ ঝামেলা করলেও মিছিল হয়েছিল। সে মিছিলে যেমন হেঁটেছিলেন বামফ্রন্টের এক শরিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা, তেমন প্রতিক্ষণের স্টল থেকে বেরিয়ে একজনকে মিছিলে পা মেলাতে দেখেছিলাম। পরে জেনেছিলাম তিনি স্বপ্না দেব। একদা প্রতিক্ষণ পত্রিকার সম্পাদক, তারও আগে কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মী। বইমেলায় হাঁটা সেই প্রথম মিছিল আমাকে দেখিয়েছিল, কীভাবে মাওবাদী ধারার রাজনৈতিক বন্দি স্বপনদার সরকারি হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিবাদে মিছিলে হাঁটতে পারেন আরএসপির মনোজ ভট্টাচাৰ্য আর রাজনৈতিকভাবে মাওবাদীদের সমালোচক স্বপ্না দেব। এসব মিছিলকে আসলে শাসক ভয় পায়, আর ভয় পেয়ে গিল্ডকর্তাদের ফতোয়া হাতে পাঠায় ‘এপিডিআরকে স্টল দেব না’। কারণ এসব মিছিলে এপিডিআরের কর্মীরাও হাঁটেন, অনেক মিছিল শুরুও হয় এপিডিআরের স্টলের সামনে থেকেই।
আরো পড়ুন ভিন্ন স্বরের গলা টিপে কর্পোরেট পুঁজির মুক্তাঞ্চল হবে কলকাতা বইমেলা?
লেখার শুরুতে রঞ্জন সরকারের নাম বলেছিলাম। সেই যে রঞ্জনদাকে মার খেতে দেখে আমরা ছুটে গেলাম। কৃষ্ণনগরের রঞ্জনদা কবিতা লিখত, তবে তার চেয়েও বেশি মিছিলে হাঁটত। এখন বেলঘরিয়া এলাকায় থাকে, খুব ভালো প্রুফ দেখে আর ছোটদের নিয়ে নানারকম কাজকর্ম করে, একটা পত্রিকাও করে। রঞ্জনদা একবার আমাকে প্রসূন বসুর কথা বলেছিল। নবপত্রের প্রকাশক প্রসূন বসুকে আমি কোনদিন দেখিনি, তবে ওঁর প্রকাশ করা অনেক বই দেখেছি, ওঁর লেখা আর অনুবাদও পড়েছি অল্পবিস্তর। একদা কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মী প্রসূন বসু পরবর্তীকালে পেশাদার প্রকাশক হয়েছিলেন, কলকাতা বইমেলার অন্যতম সংগঠকও ছিলেন। তিনি নিজের স্মৃতিকথায় এক নকশালপন্থী রাজনৈতিক কর্মীর কথা লিখেছেন, যিনি এসে ওঁকে খবর দিয়েছিলেন যে সরোজ দত্তের কবিতার বই বেরোচ্ছে। এই রাজনৈতিক কর্মী হয়ত আমাদের রঞ্জনদা, কিম্বা ওঁরই কোনো কমরেড। একদা বইমেলার উদ্যোক্তারা তাঁদের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন, তর্ক করতেন, চা-মুড়ি-তেলেভাজা খাওয়াতেন। এখন ‘অনুপ্রাণিত’ বইমেলার কর্তারা পুলিস লেলিয়ে দিয়ে মিছিলে হাঁটা মানুষকে মেলা থেকে বার করে দেন, মিছিলের ডাক দেওয়া এপিডিআরকে মেলা থেকেই হঠিয়ে দিতে স্টলই দিতে চান না।
প্রসূন বসু, স্বপ্না দেব, রঞ্জন সরকারদের হেঁটে চলার বইমেলা ফিরিয়ে আনতে গিল্ড নেতাদের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের বিরোধিতা করুন, এপিডিআরকে স্টল দেওয়া হল না কেন তা ঝামাপুকুরের গিল্ড কর্তাদের কাছে জানতে চান। ওঁরা অবশ্য কোন উত্তরই দেবেন না, উত্তরটা আমরা জানি। শাসক মিছিলকে ভয় পায় আর গিল্ডকর্তারা শাসকের কথাতেই চলছেন।
লেখক বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








