এবারে সুপ্রিম কোর্টও জাতের মধ্যে জাত খোঁজার নিদান দিল। বলাই বাহুল্য, বিজেপি ঠিক এটাই চাইছিল। দলিতদের মধ্যে বিভাজন ঘটানোর চেষ্টা তাদের পুরনো খেলা। এবার সেই খেলায় তাদের নতুন সহযোগী হল সুপ্রিম কোর্ট। গত বৃহস্পতিবার (১ অগাস্ট, ২০২৪) একটি মামলার রায়ে প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের সাত সদস্যের বেঞ্চ রায় দিয়েছে দলিতদের একটি সমসত্ত্ব গোষ্ঠী হিসাবে দেখা চলবে না। পিছিয়ে পড়াদের মধ্যেও দেখতে হবে কারা বেশি পিছিয়ে পড়া, এবং সেই অনুযায়ী তাঁদের সংরক্ষণের সুবিধা দিতে হবে। এই রায়ের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বিচারপতিরা আরও কিছু কথা বলেছেন যা তাঁদের উচ্চবর্ণীয় দলিতবিরোধী মানসিকতারই প্রকাশ। সে প্রশ্নে আমরা পরে আসব।
প্রেক্ষাপট
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
প্রকৃতপক্ষে সংবিধান লাগু হবার দেড় দশক পর থেকেই তথাকথিত উচ্চবর্ণীয় প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা বলতে শুরু করেন যে সংরক্ষণের সুবিধা অল্প কিছু লোক নিয়ে যাচ্ছে, এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। এর পিছনে তথাকথিত নিম্নবর্ণীয়দের প্রতি প্রকৃত দরদ ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল নিম্নবর্ণীয়দের নিজেদের মধ্যে কে বেশি অবহেলিত আর কে কম অবহেলিত – এই প্রশ্নে ঝামেলা ঝঞ্ঝাট বাড়ানো এবং গোটা সংরক্ষণ ব্যবস্থাটিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেওয়া। এই নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কোর্টকাচারি চলতে থাকে। সুপ্রিম কোর্টের গত ১ অগাস্টের রায়ও আসলে এক দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের অংশ। ১৯৭৫ সালে পাঞ্জাব সরকার এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দলিতদের মধ্যে বাল্মীকি এবং মজহবি শিখ সম্প্রদায়কে সংরক্ষণের বিশেষ সুবিধা প্রদান করে। প্রায় তিন দশক এই ব্যবস্থা চলে। ২০০৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রায় দান করে। সেই সময়ে আরও একটি মামলা সুপ্রিম কোর্টে এসে গিয়েছিল। অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার বনাম ই ভি চিন্নাইয়া মামলা। ওই মামলাগুলির প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোটের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ ২০০৪ সালের রায়ে বলে, সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের মধ্যে স্বতন্ত্র বর্গীকরণ করা সংবিধানের ৩৪১ নম্বর অনুচ্ছেদের বিরোধী। দ্বিতীয়ত, সংবিধান অনুযায়ী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। কোনো সরকারের পক্ষেই কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ অবৈধ এবং সংবিধানবিরোধী। একমাত্র রাষ্ট্রপতি কোনো সূচিকরণ জারি করতে পারেন এবং কেন্দ্রীয় আইনসভা তফসিলের পরিবর্তন করতে পারে। আদালত আরও জানায়, তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের মধ্যে স্বতন্ত্র বর্গীকরণ সংবিধানের সাম্যের অধিকারের (১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ) বিরোধী।
২০০৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের এই রায়দানের পরই পাঞ্জাব সরকারের নোটিফিকেশন প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। ২০০৬ সালে পাঞ্জাব এবং হরিয়ানা হাইকোর্টে ডঃ কিষণ লাল বনাম পাঞ্জাব সরকার মামলায় আদালত ১৯৭৫ সালের পাঞ্জাব সরকারের নোটিফিকেশন বাতিল করে দেয়। কিন্তু এতে না দমে পাঞ্জাব সরকার সেবছরই ‘পাঞ্জাব তফসিলি জাতি ও পশ্চাৎপদ শ্রেণি আইন, ২০০৬’ পাশ করে, যাতে আবার সেই বাল্মীকি এবং মজহবি শিখ সম্প্রদায়কে সংরক্ষণে বিশেষ সুবিধা দেওয়া যায়। বাল্মীকি ও মজহবি শিখ সম্প্রদায়ের বাইরের পশ্চাৎপদ জাতিগুলির পক্ষ থেকে দাভিন্দার সিং হাইকোর্টে যান। হাইকোর্ট ২০১০ সালে আইনটি বাতিল করে দেয়। পাঞ্জাব সরকার সেই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে। ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চের কাছে মামলাটি আসে। এঁরা ২০০৪ সালের ই ভি চিন্নাইয়া কেসটি খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। ২০২০ সালে অরুণ মিশ্রের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ রায় দেয়, ই ভি চিন্নাইয়া মামলার পুনর্বিচার দরকার। যেহেতু ই ভি চিন্নাইয়া মামলায় পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ ছিল, তাই এবার সাত সদস্যের বেঞ্চ গঠন করা হয়। সেই বেঞ্চই গত ১ অগাস্ট সেই মামলার রায় উলটে দিলেন।
সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে এক দীর্ঘ এবং নাছোড় আইনি লড়াই চলছে এবং তাতে নানা বাঁক ঘুরে আজকের এই রায় ঘোষিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি এখানেই থামবে না। ইতিমধ্যেই এই রায়ের বিরুদ্ধে দলিত সংগঠনগুলির এক বড় অংশ এককাট্টা হচ্ছেন। আগামী ৩১ অগস্ট ভারত বনধের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বিজেপি উর্ধ্ববাহু হয়ে এই রায়কে স্বাগত জানালেও এনডিএ জোটের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। কেন্দ্রীয় খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ মন্ত্রকের মন্ত্রী, লোকজনশক্তি পার্টি (রামবিলাস) নেতা চিরাগ পাসোয়ান জানিয়ে দিয়েছেন তাঁরা ফের সুপ্রিম কোর্টে এই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করবেন।
দলিত সংগঠনগুলি রায়ের বিরুদ্ধে কেন?
ফলত এই প্রশ্ন আসা খুব স্বাভাবিক, যে যদি এই রায় সত্যিই পিছিয়ে পড়া তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের স্বার্থ রক্ষা করে থাকে, যেমনটা বিচারপতিরা নিজেরা বলেছেন, তাহলে দলিতদের অধিকাংশ সংগঠন কেন এই রায়ের বিরুদ্ধে? নিজের ভাল তো পাগলেও বোঝে। দলিতরা কি বোঝেন না?
আসলে জাতিবর্ণ ব্যবস্থার মধ্যে কে এগিয়ে আর কে পিছিয়ে – তা নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী সংরক্ষণে অগ্রাধিকার দেওয়া সর্বদাই গোটা সংরক্ষণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যায়। বিষয়টি একটু ভাল করে বুঝে নেওয়া দরকার। ভারতে জাতিবর্ণ ব্যবস্থার ভিত্তিতে সংরক্ষণ চালু হয়েছিল কারণ কয়েক হাজার বছর ধরে এই জাতিবর্ণের উপর নির্ভর করেই বিপুল সংখ্যক মানুষকে শিক্ষা, জীবিকা, মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের মানুষ বলেই মনে করা হয়নি। তাঁদের ছোঁয়া, এমনকি ছায়াও, অপবিত্র বলে গণ্য করা হয়েছে। জাতিবর্ণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সর্বাধিক লড়াই যাঁরা গড়ে তুলেছিলেন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য হলেন পেরিয়ার, ভীমরাও আম্বেদকর, জ্যোতিবা ফুলে প্রমুখ। এর মধ্যে আম্বেদকর সংবিধান রচনার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি চিরকাল লড়াই করেছিলেন জাতিবর্ণ ব্যবস্থার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে। কিন্তু সংবিধান সভার সদস্য হিসাবে তিনি উল্লেখ করেন, যে যতদিন না জাতিবর্ণ ব্যবস্থার উচ্ছেদ হচ্ছে ততদিন বর্তমান ব্যবস্থার খুচরো সংস্কার হিসাবে জাতিবর্ণ ব্যবস্থার ভিত্তিতে সংরক্ষণ চালু করা দরকার। সুতরাং জাতিবর্ণের ভিত্তিতে সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিছক দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচি নয়। সংরক্ষণপ্রাপ্তদের মধ্যে কে অপেক্ষাকৃত বেশি সচ্ছল আর কে কম – এই মাপকাঠি স্থির করলে জাতিবর্ণের ভিত্তিতে সংরক্ষণের ধারণা খারিজ হয়ে গিয়ে অর্থনীতির ভিত্তিতে সংরক্ষণের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। উচ্চবর্ণের লোকেরা এমনটাই চাইছে। এমনিতেই ১০% সংরক্ষণ অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়াদের জন্যে বরাদ্দ হয়েছে। এর উপর যদি জাতিবর্ণের ভিত্তিতে সংরক্ষণকেও বদলে অর্থনৈতিক করে দেওয়া যায় তাহলে গোটা সংরক্ষণ ব্যবস্থাই দাঁড়াবে অর্থনীতির ভিত্তিতে। তাহলে হাজার হাজার বছর ধরে শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতিকে নিজেদের কব্জায় রেখে এগিয়ে যাওয়ার ফল হিসাবে এমনিতেই শিক্ষাদীক্ষা, চাকরি, ব্যবসা ও বিত্তের উপর উচ্চবর্ণীয়দের আধিপত্য নিরঙ্কুশ হবে। তাতে যেটুকু ভাগ বসাচ্ছিলেন পিছিয়ে থাকা মানুষ, তাও মুছে যাবে।
সুতরাং জাতের মধ্যে জাত খোঁজার প্রচেষ্টার মধ্যে উচ্চবর্ণীয় সবর্ণদের যে দরদী অশ্রুর ঝুটা প্রদর্শনী আছে তা কুমিরের কান্না। গোলাপের আড়ালে লুকনো আছে ছুরি। গোটা সংরক্ষণ ব্যবস্থাটাই বানচাল করার এ এক ধূর্ত চক্রান্ত।
তাই অত্যন্ত সঠিকভাবেই দলিত সংগঠনগুলি এই রায়ের বিরুদ্ধে। তাঁদের আশঙ্কা যে অমূলক নয়, বরং যথেষ্ট যৌক্তিক – তা সাত বিচারপতির রায়ে লিখিত বিভিন্ন মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়।
বিচারপতিদের মন্তব্য
প্রথমেই বলে রাখা দরকার সাতজন বিচারপতির বেঞ্চে একজন বাদে বাকি সকলেই উচ্চবর্ণের লোক। সংখ্যাগরিষ্ঠই ব্রাহ্মণ। তবুও একজন বিচারপতি, যিনি এই রায়ের বিরোধিতা করেছেন, তিনিও ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান। উচ্চবর্ণের স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে তিনি অন্তত সংবিধানের মর্মবস্তুর পক্ষ নিয়েছেন। দ্ব্যর্থহীনভাবে তিনি ই ভি চিন্নাইয়া মামলার রায়কে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। তাই নিশ্চিতভাবেই তাঁর অভিনন্দন প্রাপ্য। বাকি বিচারপতিদের পৃথক পৃথক রায়গুলি (মোট ছয়টি পৃথক রায়) একেবারে মণিমুক্তোয় ভরপুর। অন্তত চারজন বিচারপতি বলেছেন ‘ক্রিমি লেয়ার’ খুঁজে বার করে তাদের সংরক্ষণের আওতা থেকে বাদ দিতে হবে। এই ‘ক্রিমি লেয়ার’ তত্ত্বও উচ্চবর্ণীয় প্রশাসনিক, আধিকারিক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের প্রিয় বিষয়। বিচারপতিরাও সেই একই কথার প্রতিধ্বনি করেছেন। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল জাতিবর্ণের ভিত্তিতে। সামাজিক সুবিচারের একটি ধাপ হিসাবে। এখানে অপেক্ষাকৃত অর্থনৈতিক সচ্ছলতার প্রশ্ন বিবেচ্য নয়। পয়সা থাকলেই সামাজিক অসাম্য ও অত্যাচারের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় না। যেমন ধরুন, একজন দলিত ব্যক্তির বিয়েতে বরকে ঘোড়ার পিঠে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। বরপক্ষের ঘোড়া ভাড়া করার পয়সা আছে, তাঁরা করেছেন। কিন্তু রাস্তায় উচ্চবর্ণীয়রা দলিত কেন ঘোড়ায় চাপবে – এই অভিযোগে বরকে ঘোড়া থেকে টেনে নামিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলে। এই ঘটনা আকছার ঘটে থাকে। এই সামাজিক অসাম্য, অত্যাচারকে ‘ক্রিমি লেয়ার’ তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। শুনুন মহাশয়রা, আপনাদের মনুই বলে গেছেন, ‘শুদ্ররা ক্ষমতা থাকলেও ধনসঞ্চয় করবে না, কারণ তাতে ব্রাহ্মণের মনে আঘাত লাগে।’ সুতরাং আজ সংরক্ষণের ফলে যাঁরা কিছুটা অর্থনৈতিক সচ্ছলতার মুখ দেখেছেন তাঁরা সামাজিক অসাম্য থেকে মুক্তি পেয়ে যাননি, বরং এই সমাজে তাঁদের উপস্থিতি সবর্ণদের কাছে অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক, যা শূলের মত প্রতিনিয়ত ফুটে চলে।
একাধিক বিচারপতি বলেছেন, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এক প্রজন্মের বেশি থাকা উচিত নয়। তাহলে কি এক প্রজন্মের মধ্যেই দেশে জাতিবর্ণ ব্যবস্থার বিলোপ হয়ে যাবে? তা তো নয়। তাহলে এর অর্থ হল, বিচারপতিরা মোটের উপর সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে অর্থনৈতিক মানদণ্ডে দেখতে চাইছেন। আর এই জন্যেই দলিতবিদ্বেষী সবর্ণরা আদালতের রায় নিয়ে উচ্ছ্বসিত।
সিপিএম থেকে বিজেপি – সব সবর্ণ একজোট
বুর্জোয়া দলগুলি এই রায়ের পক্ষে থাকবে সে তো জানা কথা। জাতিবর্ণ ব্যবস্থার গায়ে আঘাত পড়ুক তা তো তারা কখনোই চায় না। এ প্রশ্নে সবথেকে আগ্রাসী হল ফ্যাসিবাদী বিজেপি। তারা তো উদ্বাহু হয়ে এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের আরও অনেক উদ্দেশ্য আদালতের এই রায়ের মধ্যে দিয়ে পূরণ হতে চলেছে। সময় সব ক্ষেত্রেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কখন এই রায়টি দেওয়া হল? খেয়াল করে দেখবেন, সংসদে ঠিক যে সময়ে দেশজুড়ে জাতভিত্তিক জনগণনার দাবি ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে, প্রায় সব বিরোধী দল এই প্রশ্নে একজোট, ঠিক সেইসময় এই রায় দেওয়া হল। স্বাভাবিকভাবেই এই রায়ের প্রশ্নে বিরোধীদের মধ্যে বিভিন্নরকম প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে। বিরোধী ঐক্যে ফাটল ধরার সম্ভাবনাও থাকছে। যেমন পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের দলিত নেতা চন্দ্রশেখর আজাদ এই রায় নিয়ে যথেষ্ট সংশয় প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেসের সিদ্দারামাইয়া এই রায়কে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করেছেন।
সর্বাপেক্ষা মজাদার বিষয় হল, একটি কমিউনিস্ট দল হিসাবে নিজেকে বর্ণনা করা সিপিএম সোৎসাহে এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। ৩ অগাস্ট পার্টির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির মুখপত্র গণশক্তি সম্পাদকীয় প্রকাশ করে জানিয়েছে, ‘বামপন্থীরা যেমন জাত-বর্ণের মাপকাঠিতে পশ্চাৎপদতা নির্ণয় ও সংরক্ষণকে গুরুত্ব না দিয়ে আর্থ-সামাজিক অবস্থানের মাপকাঠিতে সংরক্ষণকে ন্যায়সঙ্গত মনে করে। অর্থাৎ জাতির পরিচয়ে নয়, আর্থিক অবস্থার বিচারে সংরক্ষণের সুবিধা পাওয়াটাই ন্যায়সঙ্গত।” আমরা জানি না, সিপিএমকে সমগ্র বামপন্থীদের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার কে দিয়েছে। বামপন্থীদের নামে এখানে তাঁরা একটা আদ্যোপান্ত ভুল কথা বলছেন শুধু নয়, এক্ষেত্রে তাঁদের সমগ্র বোধই ব্রাহ্মণ্যবাদী মানসিকতার উপর দাঁড়িয়ে আছে। তাঁরা যেহেতু কখনোই ভারতের জাতিবর্ণ ব্যবস্থাকে বোঝেননি, বোঝার চেষ্টা করেননি, তাই জাতিবর্ণভিত্তিক সংরক্ষণকেও বোঝেননি। আর সব সবর্ণদের মত তাঁরাও এটিই দেখেছেন এবং দেখাতে চেয়েছেন, যে সংরক্ষণ একপ্রকার দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচি। তাঁদের এই মনোভাবই তাঁরা উক্ত সম্পাদকীয়তে পরিষ্কার করেই বলেছেন ‘এটা ঠিক দারিদ্র্য দূরীকরণ, সমাজের সব অংশের কাছে উন্নয়নের সুফল সমানভাবে পৌঁছে দেবার ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ব্যবস্থা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ হতে পারে কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। তাই এই ব্যবস্থা অনন্তকাল চলতে পারে না।’
এঁরা বুঝতেই পারেন না, ভারতের সংরক্ষণ ব্যবস্থা দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচি নয়। জাতিবর্ণ ব্যবস্থা টিকে আছে বলেই তার পালটা সংস্কারমূলক ব্যবস্থা হিসাবে জাতিবর্ণভিত্তিক সংস্কার চালু করা হয়েছিল। সুতরাং এই সংরক্ষণ অনন্তকাল চলবে এমন কথা কেউই ভাবেননি। আম্বেদকর তো ননই। কিন্তু কতদিন চলবে? উত্তর হচ্ছে – যতদিন জাতিবর্ণ ব্যবস্থা চালু থাকবে ততদিন তার পাল্টা হিসাবে সংরক্ষণও চালু থাকবে। এর বিরুদ্ধাচরণ করার অর্থ হল ব্রাহ্মণ্যবাদের পক্ষে ভিড়ে যাওয়া। শুরু থেকেই ভারতের কমিউনিস্টদের বিপুল অংশ এই ফাঁদে পড়েছেন এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিপুল ক্ষতি করেছেন।
বিজেপি অবশ্য একথা ভাবেনি, যে বিরোধী ঐক্যে ফাটল ধরাতে গিয়ে তাদের নিজেদের ঐক্যে ফাটল ধরবে। এনডিএর মধ্যে ফাটল ধরছে। চিরাগ আদালতে যাবেন বলে জানিয়েছেন, আরও অনেকের গোপন অসন্তোষ থাকার সম্ভাবনা প্রবল। আগামীদিনে তা প্রকট হবে। আসলে বিজেপি এই রায়ের প্রশ্নে দক্ষিণ ভারত থেকে সমর্থন বেশি পাচ্ছে। সম্ভবত, বিজেপি ভাবছে, উত্তর ভারত যদি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তো হোক, দক্ষিণের দিকে মনোযোগ দেওয়া যাক। তাদের এই রণকৌশল কতটা কাজে লাগবে তা আগামীদিনে বোঝা যাবে।
কিন্তু একথা পরিষ্কার যে সুপ্রিম কোর্টের এই রায় প্রকৃতপক্ষে কোনো নিপীড়িতকেই সুবিচার দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়। এর পিছনে রাজনীতির কূটচাল আর কুটিল প্যাঁচপয়জারের খেলা ছাড়া আর কিছু নেই। কেন এই কথা বলছি? সেই প্রশ্নে দু-একটি কথা বলে এই লেখা শেষ করব।
স্তরীভূত অসাম্য
এতক্ষণ যা আলোচনা করা হল এর অর্থ কিন্তু এই নয়, যে পশ্চাৎপদ জাতি বা জনজাতিদের মধ্যে কোনো স্তরভেদ নেই। এমন নয় যে তাঁরা সকলেই একইরকম (homogenous)। ই ভি চিন্নাইয়া কেসে বিচারপতিরা বলেছিলেন, তাঁরা একইরকম (homogenous)। তাই তাঁরা রায় দিয়েছিলেন, জাতিবর্ণের মধ্যে উপবর্গীকরণ চলবে না। এই রায়কে খারিজ করে বর্তমান সাত সদস্যের বেঞ্চ অভিমত দিয়েছে, না, পশ্চাৎপদ জাতি-জনজাতিরা একইরকম নন, তাঁরা আলাদা (heterogeneous)। সুতরাং উপবর্গীকরণ করা দরকার। তাহলে কি সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান রায়ই সঠিক? ভারতে জাতিবর্ণের বিষয়টি ভালো করে জানা না থাকলে অনেক গণতান্ত্রিক মানুষই বিভ্রান্ত হবেন। সুতরাং বিষয়টি পরিষ্কার বুঝে রাখা দরকার।
আরো পড়ুন সংরক্ষণের সঙ্গে অর্থনৈতিক অবস্থার কোনো সম্পর্ক নেই
পশ্চাৎপদ জাতিবর্ণের মানুষ একইরকম (homogeneous) এবং বিভিন্ন (heterogeneous) – এই দুটোই সত্য। আম্বেদকর নিজেই বলেছিলেন, জাতিবর্ণ ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে স্তরীভূত অসাম্যের (graded inequality) উপর। সুতরাং তাঁদের মধ্যে অবস্থার তারতম্য থাকা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু উচ্চবর্ণের কাছে তাঁরা সকলেই এক। সকলেই দলিত, সকলেই অধিকারহীন। সেই অর্থে তাঁরা একইরকম। সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু হয়েছিল তথাকথিত উচ্চবর্ণ বনাম তথাকথিত নিম্নবর্ণ – এই ভাগাভাগিকে সামনে রেখে। আম্বেদকর কখনোই মনে করেননি, সংরক্ষণ দিয়েই সম্পূর্ণ সাম্য অর্জন করা সম্ভব। আম্বেদকর জানতেন, ব্রাহ্মণ্যবাদের অধীনে এবং সেইসঙ্গে পুঁজিবাদের অধীনে সাম্য অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই তিনি ব্রাহ্মণ্যবাদের পাশাপাশি পুঁজিবাদকে ধ্বংস করে শুদ্রদের (অর্থাৎ শ্রমিক) রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে জাতিবর্ণ ব্যবস্থার উচ্ছেদের কথা বারবার বলেছেন। ভারত রাষ্ট্রের যদি অতি পশ্চাৎপদ মানুষদের সম্পর্কে সত্যিই দরদ থাকত তাহলে জেলায় জেলায় গ্রামে গ্রামে আধুনিক বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা হত। অস্পৃশ্যতা বেআইনি বলে ঘোষণা করা হয়েছে বটে, কিন্তু যারা ছোঁয়াছুঁয়ি মেনে চলে তাদের গ্রেফতার করা, বিচার করা মোটেই নিয়মিত নয়। সংরক্ষণ ব্যবস্থাকেও যদি বাস্তবমুখী করে তোলার ইচ্ছা থাকত, তা হলে জাতভিত্তিক জনগণনা করে যাদের যত সংখ্যা সেই অনুযায়ী কোটা নির্ধারণ করা হত। আওয়াজ তো উঠেছেই, ‘যিসকা যিতনা হিস্যেদারী, উসকি উতনি ভাগীদারী”। কে মানছে সে কথা? তিন শতাংশ ব্রাহ্মণ কেন ৭০% পদ দখল করে থাকবে? কোনো আদালতই তো সে প্রশ্ন তুলছে না।
আসলে সুপ্রিম কোর্ট যে এই রায়ের মধ্যে দিয়ে সংরক্ষণ ব্যবস্থাকেই তুলে দেওয়ার পথে এগোতে চাইছে – এটি বুঝতে ভুল হলে ভবিষ্যতে সংগ্রামী শক্তিই বিপদে পড়বে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








