অঘ্রাণে শীতের রাতে মালদার মহদীপুর সীমান্ত দিয়ে ৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ভারতে প্রবেশ করলেন মাদার ইন্ডিয়া – সীমান্তরক্ষী পরিবেষ্টিত হয়ে ভারতীয় নাগরিক সোনালী বেগম ও তাঁর আট বছরের বালক পুত্র সাবির। ছবিটা আমরা সবাই দেখেছি। এই সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-ই এবছর জুন মাসে সোনালী সহ পাঁচজন, যাদের মধ্যে তিনজন নাবালক, তাদের জোর করে ঠেলে দেয় বাংলাদেশে।‌ শুক্রবার রাতে সোনালীকে ওপারের সীমানা অবধি পৌঁছে দিয়ে যান তাঁর স্বামী দানিশ শেখ এবং সুইটি বিবি ও তাঁর দুই ছেলে। ওঁরা সকলেই ভারতীয় নাগরিক, কিন্তু এখনো দেশে ফেরার অনুমতি পাননি।

ভারতের বর্তমান শাসকের ‘মানবিক’ সত্তা মামলার পর মামলা করার পর অবশেষে জেগে উঠেছে।‌ তাই নয় মাসের গর্ভ নিয়ে আসন্নপ্রসবা সোনালী ফিরতে পারলেন নিজের দেশে। যে শিশু জন্ম নেবে তার সময় হয়ে এল প্রায়। আর একটু হলেই সে জন্ম নিত বিদেশ বিভুঁইয়ে, আরও কতবার সদ্যোজাতের নাগরিকতা প্রমাণের জন্য আদালতে ছুটতে হত কে জানে!

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এরকমটা আগে কখনো ঘটেছে কিনা জানা নেই। সেদিক দিয়ে এ ঘটনা নাগরিকত্ব, সংবিধান, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ইতিহাসে এক মাইল ফলক হয়ে থাকল। দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল আজকের ক্ষমতাসীন শাসকের মুসলমানের প্রতি আক্রোশ, দরিদ্র প্রান্তিক নারীর প্রতি অত্যাচারের এবং বাঙালির প্রতি বিদ্বেষের। সবচেয়ে বড় কথা, দরিদ্র অসহায় মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের উপর রাষ্ট্রের চূড়ান্ত অমানবিক হস্তক্ষেপের।

তবু হিন্দুরাষ্ট্র জিততে পারেনি। হয়ত বা এখনো গণতন্ত্রের শরীরে প্রাণ আছে, হয়ত বা এখনো জনমত চাপ দিতে পারে, হয়ত বা এখনো ‘সেকুলার’ শব্দটা ব্রাত্য হয়ে যায়নি। তার চেয়েও বড় কথা, এখনো এই পৃথিবীতে, এই দেশে, সোনালীর মত কাগজকুড়ানিদের পাশে দাঁড়ানোর মানুষ আছে। সোনালীদের জন্যও ন্যায় আছে।

সোনালী এবং তাঁর পরিবার, বিধবা সুইটি বিবি ও তাঁর ছেলেরা বীরভূমের পাইকর গ্রামের বাসিন্দা।‌ সোনালীর বাড়িতে গেলে দেখতে পাবেন – বাবা ভাদু শেখ ও তাঁর মা জ্যোৎস্না দেবী কী ভয়ংকর অসহায়ভাবে বাঁচেন। বহুকাল ধরে সোনালীরা এ দেশের রাজধানীর বর্জ্য কুড়িয়ে নিজেদের পেট চালান, থাকেন ঝুপড়িতে। নিরুপায় এইসব মানুষের দ্বারাই আধুনিক মহানগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চলে। কিন্তু এঁদের তাড়িয়ে বেড়ায় প্রশাসন, বিশেষ করে যখন তাঁরা ভাষা বাংলা এবং তাঁরা ধর্মে মুসলমান।‌

গত জুন মাসে দিল্লি শহর থেকে তুলে নিয়ে সোনালী, সুইটিদের আসাম থেকে ঠেলে দেওয়া হয় বাংলাদেশে। কারণ দিল্লির মতে তাঁরা সন্দেহজনক অনুপ্রবেশকারী। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায় ‘ঘুসপেটিয়া’। কোনোরকম নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের থেকে কোনোরকম তথ্যানুসন্ধান না করেই এই কাজটি করা হয়।‌ এক কাপড়ে তাঁদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়। কীভাবে তাঁরা সম্পূর্ণ নাগরিক পরিচয়হীন হয়ে থেকেছেন, তা শুধু তাঁরাই জানেন।‌

কিন্তু ওঁদের সমস্ত কাগজপত্র আছে, যে কাগজপত্রের কারণে পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকার তাঁদের ভারতীয় নাগরিক হিসাবে চিহ্নিত করে। তবে নিজের দেশ, ভারত আমার ভারতবর্ষে, ততদিনে তাঁরা ‘সন্ত্রাসবাদী’, ‘রোহিঙ্গা’ – আরও কতকিছু হয়ে গেছিলেন। পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চ সোনালীর পরিবারের কাছ থেকে উপযুক্ত নথিপত্র যোগাড় করেছে, যাতে দেখা যাচ্ছে, তাঁদের কাছে ১৯৫২ সালের জমির দলিল আছে। স্থানীয় মানুষও জানান যে ভাদু শেখের পরিবার বংশপরম্পরায় বীরভূমের পাইকরে বসবাস করে আসছে। পাইকরের দর্জিপাড়ায় সোনালীর মা জ্যোৎস্না বিবি তাঁর ক্লান্ত বেদনাহত চোখ তুলে বলেছিলেন ‘কোন কাগজ চান? সব আছে।’

এঁরা কোনোদিন চাকরির বাজারে দাঁড়াননি। দিল্লির বস্তিতে এদের বেঁচে থাকা নিয়ে রাষ্ট্র কখনো ভাবেনি, কোনোদিন তাঁদের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়নি, বা এক টাকায় জমি দেওয়ার ব্যবস্থা করেনি।‌ রাষ্ট্রের কাছে সোনালীরাও বর্জ্য। সোনালীরা এভাবেই প্রায় নিখোঁজ হয়ে বেঁচে থাকেন। নিজভূমেই এঁরা পরবাসী। তারপর কখন কোথায় ডুবে যান কে জানে!

কিন্তু সোনালী লড়াই ছাড়েননি, বাংলাদেশ থেকে আসা ভিডিওতে নিজেদের বক্তব্যে তুলে ধরেছেন অসহায়তার কথা। এই হতদরিদ্র পরিবারের হয়ে লড়েছেন বীরভূমের ভূমিপুত্র, সাংসদ সামিরুল ইসলাম, এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সামিরুলকে আজ কৃতজ্ঞতা জানাতেই হয়। স্থানীয় সমাজকর্মী মফিজুল ছুটে গেছেন বাংলাদেশে।‌ এঁদের সকলের উদ্যোগে সোনালীর বিষয়টা আদালতে গেছে। কলকাতা হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টে, ওদিকে বাংলাদেশের আদালতেও। গত ২৪ সেপ্টেম্বর কলকাতা হাইকোর্ট কেন্দ্রকে চার সপ্তাহের মধ্যে সোনালীদের ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়। কিন্তু সে নির্দেশ মানা হয়নি, বরং মামলা সুপ্রিম কোর্টে গড়ায়। অবশেষে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশ থেকে যত দ্রুত সম্ভব সোনালী ও তাঁর আট বছরের ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়।‌

বাংলাদেশের চাপাইনবাবগঞ্জের এক আদালতও অবৈধভাবে বাংলাদেশে নির্বাসিত সকলের জামিন মঞ্জুর করেছে। সেখানেই সোনালীরা আটক ছিলেন।‌

না, সোনালী এবং তাঁর আসন্ন সন্তানের জন্য এই সেদিন পর্যন্ত কোনো চ্যানেলে পাঁচ মিনিট সময় দেওয়া যায়নি, কোনো বিশেষজ্ঞ ডেকে এনে আলোচনার আসর বসেনি। বুম নিয়ে যাঁরা বস্তিতে বস্তিতে নাগরিক তাড়াচ্ছিলেন, তাঁদের কাউকেও দেখা যায়নি। এখন ঠেকায় পড়ে খবর হচ্ছে। খবর হচ্ছে সোনালীর বাবা মায়ের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আছে।‌ অতএব এসআইআর দিয়ে সোনালীকে বেনাগরিক করা যাচ্ছে না। খবর হচ্ছে মানবিক সরকারের, যাদের মানবিকতার পরাকাষ্ঠা হল গর্ভবতী নারীকে তাঁর ছোট ছোট ছেলেদের নিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া। আজ যদি সোনালীর সন্তান জন্ম নিত বাংলাদেশে, তাহলে এই দেশের মুখ কেমন উজ্জ্বল হত কে জানে! এই উপমহাদেশ তথা গোটা দুনিয়ায় বিশ্বগুরুর কী সম্মান থাকত?

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মানবাধিকার সনদে স্পষ্ট লেখা আছে – গর্ভবতী নারী, সে অপরাধীই হোক আর দেশহীন হোক, তার প্রতি অত্যন্ত মানবিক ব্যবহার করতে হবে।‌ কোনো অবস্থাতেই তাকে বা তার অজাত সন্তানকে কোনোরকম শারীরিক বা মানসিক নিগ্রহের মধ্য দিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না।‌ এদেশে সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জীবনধারণ ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সকলের অধিকার। পাশাপাশি মেয়েদের মর্যাদা ও তাদের সুরক্ষার কথা বারবার বলা হয়েছে। ২০১১ সালে এক মামলায় দিল্লি হাইকোর্ট রায় দিয়েছিল – একজন গর্ভবতী মহিলার আর্থসামাজিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন, স্বাস্থ্য পরিষেবা দিতেই হবে। এ একজন মহিলার জন্ম দেওয়া সংক্রান্ত অধিকার।

আরো পড়ুন আর জি কর থেকে মামণির মৃত্যু: কিছু কি বদলেছে?

এই নিয়ে যাঁদের আন্দোলন করা দরকার ছিল, তাঁদের কিন্তু তেমনভাবে দেখা গেল না। মনে হয় শ্রেণিগত দূরত্ব ছাড়াও আরেকটা সমস্যা তৈরি হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা সাম্প্রদায়িকতা। শ্রমজীবী বাঙালি আক্রান্ত হলেও শেষপর্যন্ত সে মুসলমান। তাই হয়ত বর্ণহিন্দু মধ্যবিত্তের চিন্তায় তার স্থান নেই। কেবলমাত্র ডাক্তার ইঞ্জিনিয়াররাই প্রকৃত বাঙালি, বাকিরা নয় – এই ভাবনাটাই ভয়ংকর। মুখের ভাষা কিন্তু শেষ অবধি এই শ্রমজীবী মানুষই ধরে রাখেন। মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত সকলেই তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ইংরিজি মাধ্যমে পড়ায়। তাদের বাংলাটা আসে না বলে কত আহ্লাদ। আবার ভাষার শুদ্ধতা নিয়েও তাদের অনেক বক্তব্য। কিন্তু সোনালীদের মত মানুষ, যাঁরা শত নির্যাতনেও ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধরে রেখেছেন, তাঁদের জন্য একটা মিছিলেও কেউ পা মেলালেন না। বড় বিস্ময় লাগে।

সীমাহীন দ্বিচারিতা, শ্রেণি ও ধর্মের বিভাজন কখনো কোনো সফল আন্দোলন গড়তে পারে না। যে রাজ্য থেকে তাঁরা বিতাড়িত হয়েছিলেন, সেখানে বসবাসকারী বাঙালি মধ্যবিত্তের তরফেও কোনো প্রতিবাদ দেখা গেল না। বরং অন্য ভাষাভাষী সংবাদমাধ্যম, স্বাধীন সাংবাদিকরা তাঁদের নিয়ে খবর করছেন। সর্বভারতীয় স্তরে বেশ কিছু গণসংগঠন প্রতিবাদ জানিয়েছে। এখন অপেক্ষা বাকিদের ফিরিয়ে আনার।‌ অদ্ভুত ব্যাপার হল, মানবাধিকারের দাবিতে সোনালী ফিরলেন। কিন্তু তাঁর স্বামীকে এখনো ফেরানো হল না।

এই মুহূর্তে সোনালী এসে পৌঁছেছেন পাইকরে। সেখানে স্থানীয় বহু মানুষ জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছেন। কাছাকাছি রামপুরহাট হাসপাতালে তাঁকে রাখা হয়েছে, সন্তান প্রসবের সময় আগত প্রায়। মনে পড়ে কেয়া চক্রবর্তী ও অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় অনূদিত সেই কবিতার কথা ‘কিন্তু মশাই আপনারা সব/রাগ ঘৃণাকে আটকান,/কেননা যে জন্মেছে,/সে জন্মানোদের সাহায্য চায়।’

গণতন্ত্রের, মানবাধিকারের, সংবিধানের এই জয়ের দিনে কতজন বাঙালি, শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী মহত্বের পরাকাষ্ঠা নিয়ে এই মায়ের পাশে, অজাত সন্তানের পাশে দাঁড়াতে পেরেছিলেন? এটা কিন্তু বড় প্রশ্ন হয়ে থাকল।‌

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.