২০২৪ সালের আগে বিজেপি আবার অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে হাওয়া গরম করার খেলায় মেতেছে। দেওয়ানি বিধি বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার প্রভৃতি একগুচ্ছ বিষয় সম্পর্কিত আইন, যা আবার আমাদের দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিজস্ব ব্যক্তিগত আইনকানুনের মধ্যে পড়ে। সবাই জানেন, যে ভারত একটি বহুমাত্রিক জটিল দেশ। এখানে আপাতদৃষ্টিতে যা গণতান্ত্রিক ও আধুনিক বলে মনে হয় তা অনেকসময়েই প্রকৃতপক্ষে অগণতান্ত্রিক চেহারায় দেখা দেয়। ভারতীয় সংবিধানের ২৫ নম্বর ধারা যে ধর্মপালনের স্বাধীনতাকে স্বীকার করে, অভিন্ন বিধি বলবৎ করতে গেলে তার সঙ্গে সংঘাত হওয়া খুব স্বাভাবিক। বিজেপির ঠিক সেটাই লক্ষ্য। আপাতদৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ হিসাবে দেখিয়ে আসলে আঘাত করো ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের। আর এর মধ্যে দিয়ে ধর্মীয় সংখ্যাগুরু অংশের মধ্যে তৈরি করো এক কুৎসিত উন্মাদনা। সমাজের মধ্যে ধর্মীয় মেরুকরণকে জোরদার করো, দাঙ্গা পরিস্থিতি সৃষ্টি করো। তার উপর ভর দিয়ে ভোট বৈতরণী পার হও। খুব সহজ, সোজা ও পরীক্ষিত রাস্তা।

বিজেপি নেতারা এখন খুব নারী-দরদি হয়ে উঠেছে। যাদের রাজত্বে দেশে নারী নির্যাতন বেড়েছে কয়েকগুণ, যে বিজেপি এই সেদিনও যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত মহিলা কুস্তিগীরদের রাস্তা থেকে টেনে হিঁচড়ে গ্রেপ্তার করেছে, লাগাতার যৌন নির্যাতনে অভিযুক্ত কুস্তি ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ব্রিজভূষণ শরণ সিংকে গ্রেপ্তার পর্যন্ত করেনি, তারাই এখন মুসলমান মহিলাদের বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত করা যায় তার জন্যে ভেবে আকুল হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তে দেশে এমন ব্যক্তি প্রায় নেই যিনি একথা সত্যিই মনে করেন যে বিজেপি নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি লাগু করতে চাইছে। সাম্প্রদায়িকতার নেশায় ডুবে থাকা মোদীভক্তরা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে উৎসাহিত, কারণ এতে করে “মুসলমানদের টাইট দেওয়া যাবে”। স্কুলের বাচ্চারাও আজ বোঝে যে, মুসলমানদের “টাইট দেওয়া”-র লক্ষ্যেই বিজেপির এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে লাফালাফি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে সমস্যা আমাদের দেশে নতুন নয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে যখন ব্রিটিশরা ভারতের আইনকানুন বানাচ্ছিল তখনই তারা খেয়াল করেছিল যে, বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ বা উত্তরাধিকার প্রভৃতি প্রশ্নে তারা ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলির নিজস্ব আইনকানুন অস্বীকার করে এগোতে পারবে না। এগোতে গেলে বিদ্রোহ হবে। সুতরাং তারা এই ব্যাপারে ছাড় দিয়েই এগোতে শুরু করে। পরবর্তীকালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন সংবিধান তৈরি হয়, তখনো দেখা যায় ভারতের মত বিচিত্র এবং জটিল দেশে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। ব্যাপারটা শুধু ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলির সঙ্গেই যুক্ত তা তো নয়। আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলিরও এসব ব্যাপারে নিজস্ব আইনকানুন আছে। উপর থেকে জোর করে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চাপানো হলে তাতে শুধু মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতার উপর আঘাত করা হবে তা নয়, একইসঙ্গে তা আদিবাসীদের রীতিনীতি ও আইনকানুনকেও আঘাত করবে। এই কারণেই বিজেপি সরকারের অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রবর্তনের সাম্প্রতিক উদ্যোগের বিরোধিতা করে পথে নামতে চলেছে দেশের সমস্ত আদিবাসী সংগঠন।

মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশে সাতশোর বেশি স্বীকৃত আদিবাসী জনগোষ্ঠী আছে। এদের মধ্যে অনেকেরই, যেমন নাগাদের, নিজস্ব রীতিনীতি/আইনকানুনকে পালন করার অধিকার সংবিধানস্বীকৃত (৩৭১এ ধারা) এবং সংরক্ষিত। নাগা নেতারা ইতিমধ্যেই দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নাকি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ওই রাজ্যের খ্রিস্টান এবং কিছু আদিবাসী উপজাতিকে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির বাইরে রাখা হবে। সুতরাং অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে সামাজিক ও আইনি বহু রকমের জটিলতা আছে। সবকিছুকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে গায়ের জোরে এগোতে গেলে দেশব্যাপী অস্থিরতা ও দাঙ্গা হাঙ্গামা এবং ফলস্বরূপ নানাবিধ সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ তৈরি হওয়া খুবই সম্ভব। বিজেপি সম্ভবত তাই চাইছে। ২০২৪ সালের নির্ণায়ক নির্বাচনের আগে তাদের সামনে এ ছাড়া অন্য রাস্তা খোলা নেই।

গত ২২ জুন পাটনায় অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলির এক বৈঠকে জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মহবুবা মুফতি বলেছিলেন যে মণিপুরে আজ যা চলছে তাই গোটা দেশের ভবিষ্যৎ। এই ওয়েবসাইটেই কিছুদিন আগে এ বিষয়ে একটি প্রণিধানযোগ্য নিবন্ধ লিখেছেন প্রতীক। খেয়াল করলে দেখা যাবে, মণিপুরে অতি সুকৌশলে মেইতেইদের সঙ্গে কুকি আদিবাসীদের সংঘাত লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বিজেপি সেখানে খোলাখুলি আদিবাসীবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। ব্রাহ্মণ্যবাদী দল হওয়ার কারণে বিজেপি শুধুমাত্র ধর্মীয় সংখ্যালঘুদেরই বিরোধী নয়, একইসঙ্গে দলিত এবং আদিবাসীবিরোধী দল। মধ্যপ্রদেশে সম্প্রতি এক বিজেপি নেতার এক আদিবাসী ব্যক্তির গায়ে প্রস্রাব করার ভিডিও ভাইরাল হবার পর মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ চৌহান যতই ওই আদিবাসী ব্যক্তির পা ধুয়ে মালা পরানোর নাটক করুন না কেন, বিজেপির মুসলিম-দলিত-আদিবাসী ঘৃণা আজ দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়ে গেছে দেশের সমস্ত মানুষের কাছে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি লাগু করার প্রচেষ্টা বিজেপি-আরএসএসের হিন্দুরাষ্ট্র গড়ে তোলার বৃহত্তর কর্মসূচিরই অংশ সেকথাও আজ প্রমাণিত হচ্ছে, পরিষ্কার হচ্ছে।

সাম্প্রতিককালে এক মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বিজেপি নেতাদের পরামর্শ দিয়েছে, কোনো একটি গোষ্ঠীর কথা না ভেবে গোটা দেশের কথা ভাবতে। এই পরামর্শের পরিপ্রেক্ষিত হল, দিনে দিনে একথা প্রকট হচ্ছে যে বিজেপি ভারতের মত জটিল ও বৈচিত্র‍্যপূর্ণ দেশ নিয়ে ভাবিত নয়, ভাবতে সক্ষমও নয়। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে ভীমরাও আম্বেদকরের নেতৃত্বে সংবিধান সভায় কী ধরনের আলোচনা, বিতর্ক চলেছিল, কোনো কৌতূহলী পাঠক যদি তা পড়ে দেখেন তাহলে বুঝবেন কতখানি জটিলতার মুখোমুখি হয়ে আম্বেদকর বিষয়টিকে নির্দেশমূলক নীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন, জবরদস্তি কোনো আইন প্রণয়ন করতে যাননি। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সমস্ত মানুষ আজও এই প্রশ্নে একমত যে, এই বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতেও দীর্ঘকাল কথাবার্তা, আলাপ-আলোচনা চালানোর দরকার হবে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে সংবিধান সভায় যখন কথা উঠেছিল তখন শুধু মুসলমান প্রতিনিধিরাই এর বিরোধিতা করেননি, হিন্দু প্রতিনিধিরাও বিরোধিতা করেছিলেন। কোনো কোনো প্রতিনিধি জবরদস্তি আইন করার পক্ষপাতী ছিলেন, কিন্তু আম্বেদকর সময় নিতে চেয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন যতদিন না এই ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলির আভ্যন্তরীণ সংস্কার ও প্রগতি-অগ্রগতির প্রক্রিয়া গতি পাচ্ছে, ততদিন উপর থেকে আইন করতে গেলে কাজের কাজ হবে না। শুধু দেশব্যাপী অশান্তি সৃষ্টি হবে এবং বিভেদকামী কায়েমি স্বার্থই লাভবান হবে। আজও দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এভাবেই বিষয়টিকে দেখে থাকেন।

আরো পড়ুন দ্য কেরালা স্টোরি: আষাঢ়ে গল্প বনাম জেহাদি বাস্তব

বিজেপি দলটির সঙ্গে আজকাল বুলডোজার বিষয়টি অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত হয়ে গেছে। ফ্যাসিবাদীদের ক্ষেত্রে তা হওয়াই স্বাভাবিক। অনেকেই আজ বলছেন, বিজেপির সঠিক প্রতীক চিহ্ন পদ্ম নয়, বুলডোজার। এক দেশ, এক নেতা, এক দল, এক আইন, এক পুলিস – দেখবেন বিজেপির সব কিছুতেই এই একের আধিপত্য খুব বেশি। বাদবাকি সব কিছুই বুলডোজার দিয়ে ওই ‘এক’-এ মিশিয়ে মণ্ড পরিণত করাই তাদের নীতি। বিজেপির যে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই চলে এই নীতির ভিত্তিতে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়েও তাদের কার্যকলাপ সেই ধারারই অনুসারী। কিন্তু এতে একথাই প্রমাণিত হচ্ছে, যে ভারতের মত দেশের শাসক হিসাবে বিজেপির মত একটি দল কতখানি বেমানান। আর বাস্তবের সঙ্গে বেমানান কোনো কিছুই বেশিদিন টেকে না। হয় তাকে বাস্তবে অঙ্গীভূত হতে হবে, নয়ত বাস্তব তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। সে রাস্তা শান্তিপূর্ণ হবে কিনা সেকথা অবশ্য আলাদা।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.