উমর খালিদদের জামিনের আর্জি আরও একবার খারিজ হয়ে গেছে দিল্লি হাইকোর্টে। এই খবর এখন আর তেমন আলোড়ন ফেলে না। ভারতীয় বিচারব্যবস্থার থেকে অন্যকিছু প্রত্যাশিত ছিল না, তবু আশাই একমাত্র অনুভূতি যা মানুষকে টিকিয়ে রাখে। সে আশাও এবারের মত শেষ। এরপর আবার নতুন পথ চলা। এবার সুপ্রিম কোর্ট।
মূলত উমরকে নিয়েই আমরা কথা বলি, কারণ আমাদের সামাজিক নেটওয়ার্কের দৌলতে সে আমাদের কাছে অনেক বেশি পরিচিত। কিন্তু যে মামলার শুনানি চলছে অনন্তকাল ধরে – নিম্ন আদালত, দিল্লি হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, আবার নিম্ন আদালত, আবার দিল্লি হাইকোর্ট – তার সাম্প্রতিকতম অঙ্ক অভিনীত হল গত ২ সেপ্টেম্বর, বিচারপতি শালিন্দর কাউর এবং বিচারপতি নবীন চাওলার বেঞ্চে। সেই মামলা, যা সাধারণভাবে দিল্লি দাঙ্গা ষড়যন্ত্র মামলা নামেই পরিচিত, সেখানে উমর একমাত্র অভিযুক্ত নন। সঙ্গে আছে আরও আটজনের নাম। হয়ত তাঁদের দু-একজনের নাম আমরা জানি, তবু তেমনভাবে চিনি না।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আজ যখন অভিযুক্তদের আইনি সহায়করা আবার সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ পিটিশন দাখিল করার কাজ শুরু করেছেন, তখন বিভিন্ন মূলধারার এবং সমান্তরাল ধারার সংবাদমাধ্যমের এ নিয়ে প্রতিবেদনের লিংকের নিচের মন্তব্যগুলো পড়লে প্রচুর হতাশা, শাপশাপান্ত এবং উল্লাস দেখতে পাওয়া যায়। হিংস্র উল্লাস। সেসব উল্লাস কোন বিশেষ ধরণের অনুভূতিপ্রসূত, তা আলাদা করে বলে দেবার প্রয়োজন নেই। তবু ভোঁতা হয়ে যাওয়া অনুভূতি নিয়ে সেইসব মন্তব্য পড়ে বোঝার চেষ্টা করি – কেন এই উল্লাস। বিনা বিচারে পাঁচ থেকে ছ বছর হতে চলা কিছু যুবক যুবতীর নিরন্তর কারাবাসে কারা আনন্দ পায়, কেন আনন্দ পায় – তা বোঝার চেষ্টা করি। একটা নকশা পাই। সে নকশা অজ্ঞতার, অজ্ঞানতার আনন্দের। আজ থেকে ৫-৬ বছর আগে এক বা একাধিক ঘৃণার ব্যবসা করা সংবাদমাধ্যম উমর এবং অন্যদের নামে যে মিথ্যা ছড়িয়েছিল, তার ফলেই এই ছেলেমেয়েগুলো দাগী অপরাধী হিসাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের মনে পাকাপাকি জায়গা দখল করে নিয়েছে।
আজ যখন আমরা তাকিয়ে রয়েছি, সুপ্রিম কোর্টে আবার কবে জামিনের আবেদনের শুনানি হবে তার দিকে, ততক্ষণে এই ছেলেমেয়েগুলোকে একবার জেনে নেওয়ার চেষ্টা করলে কেমন হয়?
উমরের কথা আমরা সবাই জানি। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, সে যখন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ছাত্র, তখন তাঁকে, কানহাইয়া কুমারকে এবং অনির্বাণ ভট্টাচার্যকে এক সুচতুরভাবে তৈরি করা ভুয়ো ভিডিওর সূত্রে (ফরেন্সিক পরীক্ষায় প্রমাণিত) রাতারাতি গ্রেফতার করা হয় দেশদ্রোহের অভিযোগে। তা সত্ত্বেও কানহাইয়াকে ১০,০০০ টাকা জরিমানা নিয়ে ছাড়া হয়, উমর আর অনির্বাণকে এক সেমিস্টারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর পরেও ২০১৮ সালে জেএনইউ কর্তৃপক্ষ উমরের পিএইচডি থিসিস জমা দিতে বাধা দেয়। উমরকে দিল্লি হাইকোর্ট থেকে থিসিস জমা করার আদেশ নিয়ে আসতে হয়। এরপর উমর একাধিক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, যার মধ্যে ছিল জেএনইউয়ের হারিয়ে যাওয়া ছাত্র নাজিব আহমেদকে খুঁজে বের করার দাবিতে আন্দোলন, ২০১৮ সালের ভীমা কোরেগাঁওয়ের সভা এবং ২০১৯-২০ সালে দিল্লির শাহীনবাগ এবং ভারতের অন্যান্য জায়গায় চলা সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলন।
২০১৮ সালে দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবের সামনে তাঁকে লক্ষ করে গুলি চালানোর চেষ্টা করে একটি লোক। পিস্তল জ্যাম হয়ে যাওয়ায় উমর প্রাণে বেঁচে যান। দুজন গ্রেফতার হয় এবং পরে ছাড়াও পেয়ে যায়। এরপর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি ভারতে আসেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর তখনকার প্রিয় বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর সফরকালেও দিল্লির উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা। মারা যান, আহত হন এবং এলাকা ছাড়া হন শতাধিক মানুষ। বিজেপি সাংসদ কপিল মিশ্রের এক ঘৃণাভাষণের পরেই সেই দাঙ্গার সূত্রপাত হয় বলে অভিযোগ আছে। দাঙ্গা প্রশমিত হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দেশ এবং সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে করোনা, শুরু হয় লকডাউন। তার মধ্যেই মামলা সাজানো হতে থাকে। অবশেষে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, উমরকে তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিস। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত উমরের ঠিকানা তিহার জেল। পাঁচ বছরে উমর দুবার প্যারোলে ছাড়া পেয়েছে। প্রথমবার বোনের বিয়ের জন্য – ২৩-৩০ ডিসেম্বর, ২০২২। তারপর ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৪- ৩ জানুয়ারি ২০২৫, আরেকজন আত্মীয়ের বিয়ে উপলক্ষে।
একাধিক এফআইআরের সবকটাতেই উমর জামিন পেয়ে গেছে, শুধুমাত্র দিল্লি দাঙ্গা ষড়যন্ত্র মামলায় পায়নি, যার চার্জশিট দিল্লি পুলিস আজও জমা দিতে পারেনি। এখনো ‘তদন্ত চলছে’।
দিল্লি হাইকোর্টের ২ সেপ্টেম্বরের আদেশের কপিতে প্রথম নাম শার্জিল ইমামের। উমরের নাম দু নম্বরে। গত কয়েক দিনে এ সংক্রান্ত প্রায় সব প্রতিবেদনেই উমরের সঙ্গে শার্জিলের নাম দেওয়া হয়েছে শিরোনামে। ফলে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয়দের উল্লাস উমরের থেকেও শার্জিলের বন্দিদশার জন্যে বেশি। কেন?
কারণ মোটামুটি সকলেই জেনে গেছে যে উমরের নামে মামলা চলছে দিল্লি দাঙ্গায় যুক্ত থাকার অভিযোগে। কিন্তু শার্জিল সেই লোক, যিনি বলেছিলেন ভারত থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হোক। এটাই সাধারণ ধারণা। মতামত সকলের থাকে, কিন্তু কোনো বিষয় সম্পর্কে অবগত হয়ে তবেই মতামত তৈরি করা উচিত। সে অনেক পরিশ্রমের কাজ। ফলে জাতীয়তাবাদীরা হা হা হাসি আর ‘বেশ হয়েছে’ ধরনের মন্তব্য করার পথই বেছে নিয়েছে। ২০১৯ সালের মূলধারার সংবাদমাধ্যম দেখিয়েছিল যে শার্জিল টুকড়ে টুকড়ে গ্যাঙের সদস্য, তিনি নাকি ভারতকে কেটে টুকরো করতে চেয়েছিলেন। অথচ যে ভাষণের জন্যে তিনি বন্দি, সেই ভাষণে তিনি অবরোধ তৈরি করার কথা বলেছিল।
তাহলে শার্জিল কেন বন্দি?
আমরা তার কারণ জানি না, সম্ভবত দিল্লি পুলিস জানে। কিন্তু আজও চার্জশিট দাখিল করে উঠতে পারেনি। শার্জিলকে পুলিস গ্রেফতার করে ২৮ জানুয়ারি, ২০২০। দিল্লির দাঙ্গা তখনো শুরু হয়নি। আরও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে দিল্লির দাঙ্গা যখন ঘটছে, তখন শার্জিল গৌহাটি জেলে বন্দি, কিছুদিন পরেই তাঁকে কোভিড পজিটিভ অবস্থায় পাওয়া যাবে।
আগামী জানুয়ারিতে জেলে তাঁর ছ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এর মধ্যে তিনি একদিনের জন্যেও জামিন বা প্যারোলে মুক্তি পাননি। জামিনের জন্য তাঁর আইনজীবী দরখাস্ত করেন ২০২২ সালের ২২ এপ্রিল। সে দরখাস্ত আজও শোনার সময় হয়নি ভারতীয় বিচারব্যবস্থার।
এফআইআরে তৃতীয় নাম আতাহার খান। কে তিনি? দিল্লির চাঁদবাগের বাসিন্দা আতাহার খানকে যখন দিল্লি পুলিস দিল্লি দাঙ্গার ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার অভিযোগে তুলে নিয়ে যায় ২২ জুলাই, ২০২০। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর। ২০২০ সালের গোড়ার দিকে দিল্লি পুলিস জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে ঢুকে নির্দয়ভাবে পেটাতে শুরু করেছিল সেখানকার আবাসিক ছাত্রছাত্রীদের। লাইব্রেরিতে ঢুকে বই পড়া অবস্থায় ছাত্রছাত্রীদের উপর অমানবিকভাবে লাঠি চালিয়েছিল। বহু ছাত্রছাত্রী গুরুতরভাবে জখম হয়েছিল, একজনের একটা চোখ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।
সেই ঘটনা যুবক আতাহারকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সে তার এলাকা চাঁদবাগের সিএএবিরোধী জমায়েতে বসতে শুরু করে। আতাহারের বাবার একটা এম্ব্রয়ডারির দোকান ছিল। সেটা ভাল চলত না, বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ২০১৪ সালে। আতাহার নিজে পরে একখানা ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করে। কিন্তু পরপর নোটবন্দি আর জিএসটির ধাক্কায় সে ব্যবসাও বন্ধ হয়ে যায়। তারপর সে এক টেলিকম কোম্পানিতে যোগ দেয়। ২০২০ সালের পর থেকে চরম অভাবের মধ্যে আতাহারের মা একটা ছোট মশলার দোকান শুরু করেন। সেটাই কোনোমতে চলছে। কোনও ভালো আইনজীবী নিয়োগ করার ক্ষমতা আতাহারের পরিবারের নেই। পাঁচ বছর এক মাস হয়ে গেছে, একদিনের জন্যেও সে প্যারোল বা জামিন পায়নি।
চতুর্থ নাম আবদুল খালিদ সইফি। দিল্লির খুরেজি খাস এলাকায় জন্ম, বেড়ে ওঠা। আসবাবপত্রের পৈতৃক ব্যবসা। নার্গিসের সঙ্গে বিয়ে এবং তিন সন্তানের জন্ম। সেই ব্যবসা চালাতে চালাতেই খালিদ বুঝতে পারে, ঘুষ না দিয়ে দিল্লি শহরে ব্যবসা করা যায় না। মূলত সেই হতাশা থেকে খালিদ যুক্ত হন ইন্ডিয়া এগেনস্ট করাপশন আন্দোলনের সঙ্গে, ২০১২ সালে। তারপর আম আদমি পার্টি তৈরি হয়, তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। তবলিগী জামাত ভাবধারার পরিবারে বড় হওয়ার ফলে তবলিগী গোষ্ঠীর ভোট আপের ঝুলিতে ভরে দেওয়ার জন্য খালিদের সাহায্য নেওয়া হত। অরবন্দ কেজরিওয়াল, মনীশ সিসোদিয়া, আতিশী মারলেনা, যোগেন্দ্র যাদবদের অতিপরিচিত ব্যক্তি খালিদ। কিন্তু ক্রমশ আপের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে, তিনি যুক্ত হন ইউনাইটেড এগেনস্ট হেট নামের আরেকটা ছোট দলের সঙ্গে। উমর সেই দলে ছিলেন। ওই দল একটা টোল ফ্রি হেল্পলাইনও চালু করে, যেখানে কেউ সাম্প্রদায়িক বা অন্য কোনোরকমের ঘৃণার শিকার হলে ফোন করতে পারে। হেল্পলাইন চালু হওয়ার দিনই সারা ভারত থেকে ৫,০০০ কল আসে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই সংগঠন নাম করে ফেলে, ফলে দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলোর কুনজরে পড়ে।
আরো পড়ুন তবলিগী জামাত নির্দোষ প্রমাণিত, কিন্তু অপপ্রচার খারিজ করবে কে?
খালিদদের সংগঠনের ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম’ হেল্পলাইনে আসা কলের তদন্ত করতে গিয়ে অনেক অস্বস্তিকর তথ্য প্রকাশ করে ফেলে। ২০১৯ সালে সিএএ-এনআরসি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন খালিদ ও তাঁর স্ত্রী নার্গিস। দিল্লি দাঙ্গার মাঝে, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, খালিদকে পুলিস গ্রেফতার করে খুরেজি খাস এলাকার অবস্থান স্থল থেকে। সেখানে মহিলাদের জমায়েতে দিল্লি পুলিস লাঠি চালাচ্ছিল। খালিদ দৌড়ে গিয়েছিলেন মহিলাদের বাঁচাতে, খালি হাতে দাঁড়িয়েছিলেন পুলিসের মুখোমুখি। সেই শেষ সুস্থ অবস্থায় স্বামীকে দেখেন নার্গিস। পরদিন খালিদকে কাকরদুমা কোর্টের মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে পেশ করা হয় যখন, তখন খালিদ হুইলচেয়ারে বসে। এক রাত পুলিশ তাঁকে নির্মমভাবে পিটিয়েছিল। খালিদও তিহার জেলেই বন্দি, কখনো জামিন বা প্যারোল পাননি।
পঞ্চম নাম মহম্মদ সেলিম খান। সেলিমকে তিহার জেলে নিয়ে যাওয়া হয় ১৩ মার্চ, ২০২০। তখন তাঁর বয়স ছিল ৪৭ বছর। দিল্লির মুস্তাফাবাদ এলাকার চাঁদবাগে ছিল সেলিমের কাপড়ের দোকান। তাঁর একমাত্র দোষ, দাঙ্গার দিন, ২৪ ফেব্রুয়ারি, তিনি দোকানে ছিলেন। পুলিস সেলিমকে দাঙ্গার একজন হোতা বলে চালিয়ে দেয়। তিনখানা এফআইআর হয় তাঁর নামে, দুটোয় খুব তাড়াতাড়িই জামিন হয়ে যায়। তিন নম্বরটাতেই তিনি আটকে রয়েছেন গত পাঁচ বছর। দুই মেয়ে আর এক ছেলেকে নিয়ে একলা লড়ার চেষ্টা করে চলেছেন সেলিমের স্ত্রী সাইমা খান। সেলিমও কোনোদিন জামিন বা প্যারোল পাননি।
ষষ্ঠ নাম শিফা উর রহমান। দিল্লি দাঙ্গার ঠিক পরেই, লকডাউন শুরু হওয়ার প্রায় একমাস পরে, ২৬ এপ্রিল ২০২০ শিফাকে গ্রেফতার করা হয় দিল্লি দাঙ্গায় ইন্ধন জোগানোর অভিযোগে। একই এফআইআর, সেই ইউএপিএ আইনে মামলা। কিডনির সমস্যায় জর্জরিত শিফাকে চিকিৎসার সুবিধাও দেওয়া হয়নি। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া অ্যালামনি অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট, মানবাধিকার কর্মী শিফাকে অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন নেতা আসাদুদ্দিন ওয়েসি এবছর দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী করেন আরেক জেলবন্দি প্রাক্তন আপ নেতা তাহির হুসেনের সঙ্গেই। দুজনেই অবশ্য হেরে যান, তবে ভোটের প্রচারের জন্য তাঁরা পাঁচ দিনের প্যারোল পেয়েছিলেন, দৈনিক ১২ ঘন্টার জন্য। ওই ১২ ঘন্টায় বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল শিফা উরকে। যেমন সবসময় সমস্ত জনসভায় একজন কনস্টেবল তাঁর হাত ধরে থাকবেন, তিনি মোবাইল ফোন স্পর্শ করতে পারবেন না ইত্যাদি। শেষ দুদিন আদালতের হস্তক্ষেপে ব্যাপারটা বন্ধ হয়।
মীরন হায়দার বিহারের সিওয়ান জেলায় জন্মান। দিল্লি পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে ২৯ বছর বয়সে। মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েট, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেসে এমবিএ, তারপরে সাউথ এশিয়ান স্টাডিজে এম ফিল, তিনটে ডিগ্রিই জামিয়া মিলিয়া থেকে নেওয়া। মীরন প্রথমে আপের ছাত্র সংগঠন ছাত্র-যুব-সংঘর্ষ-সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১ এপ্রিল ২০২০, কোভিড লকডাউনের দ্বিতীয় সপ্তাহে মীরন যখন এলাকায় আটকে থাকা মানুষের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেবার কাজে ব্যস্ত, সেইসময় দিল্লি পুলিস তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। চোদ্দ দিনের পুলিস হেফাজত শেষ হওয়ার আগেই মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে মুক্তি দেন, কিন্তু দিল্লি পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে নতুন এফআইআর করে গ্রেফতার করে। এও সেই দিল্লি দাঙ্গা ষড়যন্ত্র মামলা। মীরনও কখনো জামিন বা প্যারোল পাননি।
গুলফিশা ফতিমা এই মামলার একমাত্র মহিলা অভিযুক্ত। বাবার ছোট্ট দোকান, তা দিয়ে সংসার চলে। আদরের মেয়ে গুলের জন্য অপেক্ষা করতে করতে মায়ের চোখের জল শুকিয়ে গেছে অনেকদিন, মনের জোর এক ফোঁটাও কমেনি। সিএএ-এনআরসি প্রতিবাদ মঞ্চে যুক্ত হওয়ার অপরাধে গুলকে গ্রেফতার করা হয় ৯ এপ্রিল ২০২০। সেই থেকে টানা জেলে। মামলা চালাবার আর্থিক সঙ্গতি নেই গুলের পরিবারের, তবু গুলের বাবা-মা জোর গলায় আজও বলেন, মেয়ে ছাড়া পাওয়ার পর যদি আবার এই ধরনের কোনো প্রতিবাদ সভায় যেতে চায়, তাঁরা আটকাবেন না। হকের জন্য লড়া অন্যায় নয়।
এফআইআরে নবম ও শেষ নাম শাদাব আহমেদের। তাঁকেও গ্রেফতার করা হয় ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে, শাদাব তখন ২৭ বছরের যুবক। প্রাথমিকভাবে কনস্টেবল রতনলালের মৃত্যুর জন্য তাঁকে দায়ী করা হয়েছিল। পরে সে অভিযোগ বদলে যায় এবং পুলিশ হেফাজতে তাঁকে দিয়ে জোর করে এক স্বীকারোক্তি পত্রে সই করানো হয় বলে অভিযোগ, যেখানে লেখা ছিল যে তিনি হিংসা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে তৈরি হওয়া একাধিক হোয়াটস্যাপ গ্রুপে ছিলেন। শাদাবের সত্তরোর্ধ্ব বাবা শামশাদ আহমেদ একটি বেকারি চালান। নিয়মিত ছেলেকে দেখতে যাওয়ার সঙ্গতিও তাঁদের নেই। ছেলেকে ঈশ্বরের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন, কারোর কাছে কোনো অভিযোগ জানান না। শাদাবও একদিনের জন্যে জেলের বাইরে আসতে পারেননি গত সাড়ে পাঁচ বছরে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








