তৃপ্তা ত্যাগীকে শিক্ষিকা বলা যায় কিনা সেই বিতর্কে না গিয়ে বরং এইটুকু বলা যাক, সোশাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে ওই মহিলা ক্লাসের এক ছাত্রকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন এবং বাকি ছাত্রদের আদেশ দিচ্ছেন তারা যেন একে একে সেই ছেলেটিকে এসে মেরে যায়, কারণ ছাত্রটি ধর্মে মুসলমান। বাকি ছাত্রেরা শিক্ষিকার আদেশ পালন করে সহপাঠী বন্ধুকে ক্রমাগত মেরে গেছে। ভিডিওতে আমরা প্রহৃত ছাত্রকে কাঁদতে দেখেছি, অনেকে মানসিক যন্ত্রণা অনুভব করেছি। সঙ্গে শিক্ষিকার নির্মমতা দেখেছি। নিগৃহীত ছাত্রের বাবা প্রথমে পুলিস প্রশাসনের কাছে যেতে চাননি। শুধু স্কুলে দেওয়া পারিশ্রমিক ফেরত চেয়েছিলেন এবং ছেলেকে অন্য স্কুলে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কারণ রাজ্য প্রশাসনের উপর তাঁর কোনো আস্থা নেই। পরবর্তীকালে উত্তরপ্রদেশের কৃষকনেতারা ছাত্রটির বাড়িতে স্কুলের হিন্দু ছেলেদের নিয়ে গিয়ে পরিবেশ বদলানোর চেষ্টা করেছেন। শেষপর্যন্ত পুলিসে অভিযোগ দায়ের হয়েছে, কিন্তু সে অভিযোগে কাউকে তৎক্ষণাৎ গ্রেফতার করতে হয় না। জামিনও পাওয়া যায়। যেভাবে সংবাদমাধ্যমে তৃপ্তা নিজের সপক্ষে যুক্তি খাড়া করেছেন এবং দক্ষিণপন্থীরা তাঁর পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে, তাতে পরিষ্কার যে তৃপ্তার কোনো শাস্তি হবে না। উপরন্তু অল্টনিউজের সাংবাদিক মহম্মদ জুবেরের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়েছে। তাঁর অপরাধ তিনি তৃপ্তার কীর্তির ভিডিও রাষ্ট্র করে দিয়েছেন, তাতে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেটির পরিচিতি প্রকাশ পেয়ে গেছে।
এই ঘটনাক্রমে কুন্তল মুখোপাধ্যায়ের কবিতা মনে পড়ল “…বিয়েবাড়িতে একলা হওয়াই আমার স্বভাব, তবু সব বাড়িতেই একটি দৃশ্যে থমকে যাচ্ছে প্রাণ/দেখেছি হিন্দু ললনাদের প্রতি রাত্রে বিয়ে দিচ্ছেন বিসমিল্লা খান…”
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বিয়েবাড়িতে এমন নিশ্চয়ই এখনো এমন হয়। কিন্তু মানতে লজ্জা হলেও সত্যি, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের মধ্যে মুসলমানবিদ্বেষ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। একথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে ২০১১ সালের আগে এমনটা ছিল না। তখনো এ বিদ্বেষ ছিল, মহানগরী কলকাতায় মুসলমান ছাত্ররা ঘর ভাড়া পেত না। বর্ধমান শহরের মত জায়গায় একটি স্কুলে মুসলমান মেয়েদের প্রবেশাধিকার ছিল না। তবু বামপন্থী সংস্কৃতি চর্চা, মননশীলতা, ধর্মনিরপেক্ষতা বহুলাংশে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছিল। ২০১১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে আমাদের রাজ্য ক্রমশ উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। রাজ্যের এমন বহু জায়গার নাম বলা যাবে যেখানে সরকারি স্কুলে সকালে আরএসএসের শিবির চলে। সরকারি দল তৃণমূল কংগ্রেস তো কয়েক বছর ধরে রামনবমীতে অস্ত্রসহ শোভাযাত্রা বের করায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দলের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। ধর্মীয় উন্মাদনা নিয়ন্ত্রণ, প্রশমিত করার বদলে উৎসাহ দিয়ে চলেছে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ আসানসোল দাঙ্গার প্রত্যক্ষ প্ররোচক বাবুল সুপ্রিয়কে দলে নেওয়া এবং বিধায়ক করে মন্ত্রী বানানো।
আরো পড়ুন হ্যাঁ, সব ঠিক হয়ে গিয়েছে, মাননীয় বাবুল সুপ্রিয়
শাসক ভোটসর্বস্ব রাজনীতির স্বার্থে বিদ্বেষ ছড়ানোয় প্রশ্রয় দিচ্ছে। অস্বীকার করা যাবে না, আমাদের রাজ্যের কিছু জেলায় জামাতের প্রভাবে মুসলিম মৌলবাদও যথেষ্ট সক্রিয়। সেই সুযোগে করে আমাদের রাজ্যে তৃপ্তার মত শিক্ষক-শিক্ষিকারা কমন রুমে বিদ্বেষ চর্চা করে চলেছেন। শুধু তাই নয়, কেউ কেউ সম্ভব হলে তৃপ্তা হয়ে উঠে আত্মতৃপ্তও হবেন। বহু শিক্ষক-শিক্ষিকা বামপন্থী, ভোটও দেন বামপন্থী দলকে, কিন্তু নিজের সন্তানকে আরএসএস চালিত স্কুলে ভর্তি করেছেন। মনে করেন তাতে ‘চরিত্র গঠন’ হবে। বামপন্থীদের এমন দ্বিচারিতা মেনে নেওয়া যায় না।
সদ্য সোশাল মিডিয়ায় দুটি ভিডিও এসেছে। একটি পশ্চিম বর্ধমান জেলার রানীগঞ্জের, অপরটি শিলিগুড়ির। রানীগঞ্জের ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে একটি হলঘরে দুর্গা বাহিনী এক সভার আয়োজন করেছে। সেই সভায় একটি বিশেষ ধর্মের বিরুদ্ধে বিষ উগরানো হচ্ছে। এই ঘটনায় পুলিস প্রশাসন কিন্তু নির্বিকার।
Location: Raniganj, Paschim Bardhaman, West Bengal
Vishwa Hindu Parishad and Durga Vahini organised an event which featured far-right speakers promoting enmity towards Muslims. @WBPolice pic.twitter.com/UfK0Vl5qCn
— HindutvaWatch (@HindutvaWatchIn) August 26, 2023
শিলিগুড়িতে সম্প্রতি দুই যুবতীকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। অভিযুক্ত ভিন্ন ধর্মের লোক। অপরাধটি অবশ্যই চরম শাস্তিযোগ্য এবং এই ঘটনার বিরুদ্ধাচরণ করে পথে না নামাটাই অপরাধ। এমন বহু ঘটনা রাজ্যে ঘটছে। পূর্ব বর্ধমানের একটি ঘটনায় শাসক দলের এক নেতা ধর্ষণ করার পরে ধর্ষিতাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার নিদান দিয়েছে বলে অভিযোগ। যেহেতু এক্ষেত্রে ধর্ষক ধর্ষিতা একই ধর্মের, সেহেতু হিন্দুত্ববাদীদের কিছু যায় আসে না। ফলে ধর্ষকের শাস্তির দাবিতে শিলিগুড়িতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, দুর্গা বাহিনী সমেত একাধিক হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাজপথে মিছিল করেছে। পুলিসের উপস্থিতিতেই মিছিল থেকে স্লোগান দেওয়া হয়েছে “দেশ কে গদ্দারোঁ কো, গোলি মারো শালোঁ কো।” দিল্লি দাঙ্গার সেই কুখ্যাত স্লোগান বিজেপিবিরোধী মমতার রাজ্যে। তাঁর পুলিস কিন্তু নীরব দর্শক।
Location: Siliguri, West Bengal
Vishwa Hindu Parishad members organised a rally shouting hateful slogans: “Desh ke gaddaron ko, Goli maro salon ko (shoot the traitors of our country).” pic.twitter.com/93aI79CGkt
— HindutvaWatch (@HindutvaWatchIn) August 25, 2023
আসলে মমতা এবং তৃণমূলের মত দক্ষিণপন্থী, সুবিধাভোগী রাজনৈতিক দলের পক্ষে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। একমাত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে বামপন্থীদের যৌথ সংহতি, কিন্তু তা দেখা যাচ্ছে না। এই প্রবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত এই ঘটনাগুলো নিয়ে বামপন্থী দল বা গণসংগঠনগুলো কোনো প্রতিবাদ করেছে বলে জানা যায়নি। কিন্তু তারাই তো একমাত্র ভরসার জায়গা। অতীতের মত বামপন্থীদের এইসব বিষাক্ত স্লোগানের বিরুদ্ধে স্লোগান রচনা করতে হবে, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। বাংলার প্রতিটি মহল্লায়, গ্রামে গঞ্জে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে নিঃশর্ত আয়োজনে সমাজের অসাম্প্রদায়িক অংশকে সামিল করে বিকল্প সংস্কৃতি, লোকসংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বা দুর্গা বাহিনীকে প্রতিহত করতেই হবে। প্রয়োজনে বামপন্থীদের কোচবিহার থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী পদযাত্রা করতে হবে। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। হ্যাঁ, দরকার পড়লে কংগ্রেসকেও সাথে নিতে হবে। তবু কিছুতেই বাংলাকে হায়নাদের বিচরণভূমি হতে দেওয়া যাবে না।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








