২০১৮ সালের গ্রীষ্মে আসানসোলের চাঁদমারি মোড়ে দাঁড়িয়ে একজনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ওকে রোড কীভাবে যাব। ভদ্রলোক কার্যত আঁতকে উঠেছিলেন — “ওখানে যাবেন কেন! পুরোটাই মুসলিম মহল্লা। কখন কী হয়ে যাবে কিচ্ছু বলা যায় না। এখনও টেনশন রয়েছে। পুলিশ টহল দিচ্ছে। অন্য কোথাও যান।” খবরের কাগজের চাকরি। নূরানী মসজিদে না গিয়ে উপায় নেই। কিন্তু দেখলাম আমাদের স্থানীয় ড্রাইভারও ইতস্তত করছেন। স্বাভাবিক। একটু আগেই আমরা আধপোড়া রিলায়েন্স মার্কেট পেরিয়ে এসেছি। শুনশান রাস্তা। বাতাসে রক্তের গন্ধ। মাঝে মধ্যে বিজেপির নেতা-মন্ত্রীদের ঢাউস কনভয় ছুটে যাচ্ছে ‘আক্রান্ত’ হিন্দু এলাকায়। স্থানীয় সাংসদ বাবুল সুপ্রিয়, তখনও সাংসদ না হওয়া লকেট চট্টোপাধ্যায় এলাকা চষছেন। টহল দিচ্ছে আধাসামরিক বাহিনী। রাজ্য পুলিশের কর্মীরা জায়গায় জায়গায় সতর্ক পাহারায়। বিস্তীর্ণ এলাকায় ইন্টারনেট নেই। ভাঙচুরের চিহ্ন চারিদিকে। যে সমস্ত হিন্দু বা মুসলমান পাড়াগুলিতে গিয়েছি, সর্বত্র আতঙ্ক। ‘ওরা’ কীভাবে এসেছিল, তার জ্বলজ্বলে বয়ান। আতঙ্ক আর ঘেন্নার স্রোতে সদ্য স্নান সেরে উঠেছে শিল্পশহর। গা থেকে তখনও সেই জলের দাগ মোছেনি তার। আমার চিন্তা, কপি পাঠাব কী করে? ইন্টারনেট নেই যে! তাহলে কি কুলটির দিকে যেতে হবে!

চাঁদমারি, কল্যাণপুর, কসাই মহল্লা, শ্রীনগর, আমবাগান ঘুরছি আমরা। একটার পর একটা রিলিফ ক্যাম্পে গিয়েছি। দগদগে ক্ষত আর দুকূলপ্লাবী ঘৃণার সামনে থম মেরে বসে দেখেছি। দেখেছি, ঝাড়খণ্ডের নাম্বারপ্লেট লাগানো বাইক ঘুরছে। আরোহীদের গলায় গেরুয়া উত্তরীয়। মসজিদের সামনে জটলা। তাদের চোখে ভয় আর আক্রোশ হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে। দেখেছি এক দৃষ্টিহীন মুসলিম দম্পতিকে। যাঁদের “জয় শ্রীরাম” বলতে জোর করা হয়েছিল। ওঁরা বলছিলেন, “কেন আমাদের দিয়ে বলাবে বলো! আমাদের তো ধর্ম অন্য। আর সব ধর্মই তো মানুষকে ভালবাসার কথা বলে..”। কাজ হয়নি। মারের পর ভিডিও ঘুরেছে সোশাল মিডিয়ায়। ‘কাটার বাচ্চারা’ শিউরে উঠছে দেখে উল্লাস। সেই বিজয় হুংকার আমাদের গাড়ির বনেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ছে। আমি সহকর্মীকে চিনতে পারছি না। অথবা পারছি।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আমরা টানা কয়েকদিন ধরে ভয় দেখেছি। আমরা ভয় পেয়েছি। রিলায়েন্স মার্কেটের সামনে শুনশান রাস্তা। গাড়ি চলছে না। পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। মোড়ে মোড়ে গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি। সবমিলিয়ে একটা অদ্ভুত ইমেজ — শেষ মার্চের চাঁদিফাটা রোদ্দুর গায়ে মেখে অতিকায় সাপের মতো রাস্তা নেমে গিয়েছে। রাস্তার দুপাশে অসংখ্য গেরুয়া নিশান। এক একটা ১০ থেকে ১৫ ফুট উঁচু। পতপত করে উড়ছে। তার নীচে পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনীর ফ্ল্যাগ মার্চ। এর আগে তো এমন করে চিনিনি গেরুয়া পতাকাকে। তার যে এমন দাপট, এমন কর্তৃত্ব, সে যে এমন বুকের উপর পা দিয়ে রাখতে জানে, তা তো জানিনি নিজের সত্তায়। মহল্লার পর মহল্লা গেরুয়া ঝান্ডায় ছয়লাপ। হাজার হাজার গেরুয়া পতাকা, গোনা যায়,না, অসংখ্য। আমি লিখেছিলাম, “শিল্পশহরের শরীরে উল্কির মতো ওই নিশানগুলিই বলে দেবে, আপনি একুশ শতকের ভারতবর্ষের বাসিন্দা। আপনি এসেছেন অধিকৃত এলাকায়।” আর শুনেছি বড় বড় বক্স থেকে ভেসে আসা গান। হিন্দিতে, ভোজপুরিতে। এক একটা ছোট ট্রাক, যাকে চলতি ভাষায় ছোটা হাতি বলে, তার উপরে একটার পর একটা বক্স। মুসলিম এলাকায়, মসজিদের সামনে তারস্বরে বাজছে সেগুলো। মোদ্দা বক্তব্য, ভারতে থাকতে হলে রামের নাম করতে হবে, নয়ত পাকিস্তানের দরজা খোলা।

কিন্তু নূরানী মসজিদে তো যেতে হবেই। ইমামের সাক্ষাৎকার চাই। আগের দিন দূর থেকে দেখেছি তাঁকে। পাহাড় যেমন দেখে মানুষ, দূর থেকে। আজ ছুঁতে হবে বরফকে। লিখতেই হবে তাঁর কথা। না লিখলে যে ব্যর্থ শব্দের সঙ্গে এত বছরের যাবতীয় সখ্য।

চাঁদমারি ছাড়ালাম। কিছু দূর যাওয়ার পরই শুরু হল ঘিঞ্জি, নোংরা এলাকা। গায়ে গায়ে লেগে থাকা বাড়ি। ছোট, বড় মসজিদ। ঘেটো এলাকার মতো লাগছে। মাঝে মাঝে পুলিশ চৌকি। আধাসামরিক বাহিনীর ভারী বুটের শব্দে পড়িমড়ি ছিটিয়ে যাচ্ছে ভিড়। চারপাশে ফেজ টুপির মানুষ। কয়েকটা চাঁদ-তারা আঁকা নিশান। সেই সঙ্গে গেরুয়া পতাকাও, সংখ্যায় কম, কিন্তু আছে। রাস্তার দুপাশে তৃণমূল, বিজেপির অনেকগুলি দফতর। জমজমাট। বিজেপির অফিসের বাইরে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, বাবুল সুপ্রিয়ের ছবি। বাইরে অনেক বাইক। তার অর্ধেকের বেশি ভিন রাজ্যের নম্বরপ্লেটওয়ালা। আরেকটু এগোতে এলাকার চরিত্র বদলে গেল। এখানে হিন্দুর সংখ্যা কম। রাস্তায় ভিড়। গরীব মহল্লা। মলিন পোশাক। ডাস্টবিন উপচে পড়ছে। একটা চায়ের দোকানে দাঁড়ালাম। ভিড় জমে গেল। দোকানদারের চোখে সন্দেহ। জানতে চাইলাম, নূরানী মসজিদে কী করে যাব। পাশ থেকে উত্তর এল — “কী দরকার!” বললাম, যে ইমাম সাহেবের ছেলে মারা গিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই। ফোনে কথা হয়েছে। আসতে বলেছেন। এ বার পরিস্থিতি সহজ হল। পরিচয় জানতে চাইলেন স্থানীয়রা। কিছুক্ষণ কথা হল। রাস্তা বাতলে দিলেন দোকানদার। তারপর গলা নামিয়ে — “আসলে বুঝতেই পারছেন, এই কদিন ঝড় গেছে। এখনও পুরোপুরি মেটেনি। তাই…”

গাড়ি রেখে দিতে হল আগে। পুলিসকর্মীরা এসে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। প্রেস কার্ড দেখালাম। পারমিশন মিলল এগোনোর। স্টেশনের কাছাকাছি যখন এলাম, রাস্তায় একটাও লোক নেই। একদম শুনশান, ফাঁকা। এদিকে রাস্তাঘাটও চিনি না। ইমাম সাহেবকে ফোন করছি, ধরছেন না। অথচ সকালেই কথা হল। আচমকাই একটি মুসলিম পরিবারের সঙ্গে দেখা হল। এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক, তিনি কারবালা মসজিদের ইমাম। সঙ্গে স্ত্রী এবং আরেক আত্মীয়া। বললেন, নূরানী মসজিদেই যাচ্ছেন। গাড়িতে তুলে নিলাম, গল্প শুরু হল। প্রথমে খানিক সাবধানী, তারপর মন খুলে কথা বললেন। কারা দাঙ্গা করল, কী ভাবে করল, কারা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ঘুঁটি সাজাল, কারা এই সুযোগে দখল বাড়াল কোলিয়ারিতে, কারা পড়শি রাজ্য থেকে বাইক নিয়ে ঢুকে পড়ল দলে দলে — শুনলাম। সে সব বিশদে বলার নয়। শুধু একটি কথা কানে লেগে আছে — “আপনার বয়স কম, কলকাতায় থাকেন। কী বলব আপনাকে.. আমরা তিন পুরুষ ধরে এখানে থাকি। এই দাঙ্গা যে আমাদের কাছে কতবড় লজ্জা, তা বলে বোঝাতে পারব না। অথচ, বিশ্বাস করুন, এ রকম হওয়ার কথা ছিল না। এটা করানো হল।”

গলির পর গলি, সরু রাস্তা, রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে থাকা গরু আর অসংখ্য ধর্মীয় নিশান পেরিয়ে জাহাঙ্গীরী মহল্লায় পৌঁছনো গেল। সম্পূর্ণ মুসলিম এলাকা। হিন্দু কার্যত নেই। নূরানী মসজিদে ঢোকার ঠিক আগে, গলির মুখে গাড়ি ঘিরে ধরলেন জনা কুড়ি যুবক। নামতে হল। কোথা থেকে আসছি, কী দরকার সে সব বিস্তারিত জানতে চাইলেন। বললাম। মনে হল, বিশ্বাস করছেন না। ইতিমধ্যে ফের ফোন করলাম ইমাম সাহেবকে। ধরলেন না। হাওয়া গরম হচ্ছে। আমাদের গাড়িতে করে যে ইমাম এসেছিলেন, তাঁকেও দেখতে পাচ্ছি না। একজন একটু গলা চড়িয়েই বললেন, ক্যামেরা গাড়ির ভিতরে থাকবে। রাখা হল। একটু অস্বস্তি হচ্ছে। বুঝতে পারছি না কী করব। আচমকাই ফোন বাজল। ইমাম সাহেব ফোন করেছেন। বললেন, মসজিদে চলে আসতে। এক আত্মীয়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন তাই কল রিসিভ করতে পারেননি। যাঁরা ঘিরে ধরেছিলেন, তাঁদের বললাম। সঙ্গে সঙ্গে সহজ হল পরিস্থিতি। সবচেয়ে উত্তেজিত ছিলেন রিয়াজ নামে এক যুবক, তিনি ক্ষমা চেয়ে বললেন, “ভাইসাব, রাগ করবেন না। আপনার বাইরে থেকে এসে ভাবতে পারবেন না গত কয়েকদিন কী চলেছে! দুই সম্প্রদায়েরই সাধারণ মানুষের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গিয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে এমন করতে হচ্ছে।” এরপর ঘটনাক্রমের বিস্তারিত বর্ণনা দিলেন, সে সব বলার প্রয়োজন নেই।

নূরানী মসজিদ খুব বড়ো নয়। সাধারণ, মাঝারি মাপের। মসজিদের বাইরে খানিকটা খোলা জায়গা। সেখানেই গাড়ি রাখলাম। ওই জমিতেই ইমাম সাহেবের খুন হওয়া পুত্র সিবগাতুল্লার রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহটি রাখা ছিল কদিন আগে। জানাজার জন্য উপস্থিত হাজার হাজার উন্মত্ত জনতার সামনে বাওয়াব গাছের মতো দাঁড়িয়েছিলেন ইমাম মহম্মদ ইম্মাদুল্লাহ। শান্ত গলায় বলেছিলেন, “আল্লাহ সিবগাতুল্লাকে যেটুকু জীবন দিয়েছিলেন, ও সে কদিনই বেঁচেছে। আমরা যেন কোনও নির্দোষ ব্যক্তির উপর সে জন্য চড়াও না হই। ও আমার সন্তান। বাবা হয়ে যদি এ আঘাত সহ্য করতে পারি, তাহলে তোমরা কেন পারবে না! যদি কেউ কোনওরকম হিংসাত্মক ঘটনা ঘটাও, আমি এই মসজিদ এবং আসানসোল ছেড়ে চলে যাব।”

মসজিদের সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলা আর তিনতলার মাঝখানে একটি ছোট্ট ঘর। দেওয়ালের রং সবুজ। একটাই জানলা। মাটির উপর কম্বল পাতা। জানলার দিকে মুখ করে বসে ছিলেন ইমাম সাহেব। আমি ঘরে ঢুকতেই উঠে দাঁড়ালেন, হাত ধরে নিয়ে এসে বসালেন। জানলা দিয়ে তখন এক চিলতে আলো তাঁর মুখে এসে পড়েছে। সদ্য সন্তানহারা বাবার চোখ দুটি শান্ত, উজ্জ্বল। চোখের নীচে গভীর কালি। সম্ভবত, রাত্রি জাগার চিহ্ন। বললেন, “কলকাতা থেকে এসেছেন! বলুন কী জানতে চান। আমার মতো সামান্য মানুষ আপনাকে কী-ই বা আর বলব!” এরপর এক ঘন্টা আমরা অনর্গল কথা বলেছি। উনি হিন্দি আর ভাঙা বাংলা মিশিয়ে, আমি উল্টোটা। ধর্ম নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে, সংসার নিয়ে, ভালবাসা, মৃত্যু, সংস্কার-কুসংস্কার নিয়ে, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলেছি আমরা। সে সব আপাতত বিশদে লিখতে ইচ্ছে করছে না। ঘন্টাখানেক পর যখন মসজিদ ছেড়ে বেরোচ্ছি, মনে হচ্ছিল, স্নান করে উঠলাম।

ইমাম মৌলানা ইমদাদুল্লাহ রশিদি
ইমাম মৌলানা ইমদাদুল্লাহ রশিদি

ইমাম বললেন, “আমাকে অনেকে খুব অসাধারণ মানুষ ভাবছেন। আমি সত্যিই জানি না এর কারণ কী! আপনি পারতেন আপনার ছেলের মৃত্যুর জবাব হিসাবে আরও অনেকগুলো লাশ ফেলতে? তাতে কি আপনার মৃত সন্তানেরই অসম্মান হত না? এমন কেন করবে মানুষ! সকলে যা করতেন আমি সেটুকুই করেছি।” বললেন “আমি আপনাদের মতো শিক্ষিত নই। খুব সাধারণ একজন মানুষ। আল্লার সেবক। ইমাম হিসাবে আমি মনে করি, হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সকলেই আমার সন্তান। তাছাড়া, মৃত্যুর জবাব কখনও মৃত্যু হতে পারে না। হওয়া সম্ভব নয়। আমি যতদিন বাঁচব, আপ্রাণ ধর্মের নামে হানাহানি আর হিংসা রুখব। এটাই আমার ধর্ম। মানুষের ধর্ম।” বললেন “আমরা ভারতবর্ষের মানুষ। এ এক আশ্চর্য দেশ। কত বড় বড় ধর্মগুরুরা এ দেশে জন্মেছেন। এই দেশের মূল কথাই হল সম্প্রীতি। আমার ছেলের স্মৃতির মধ্যে দিয়ে আমি এই চিরন্তন ভারতবর্ষের খোঁজ করছি। যে ভারতবর্ষে ধর্মের নামে হানাহানি নেই, রক্তপাত নেই, তেমন ভারতবর্ষের খোঁজ করছি আমি।” বললেন “আমি রামায়ণের গল্প শুনেছি। আমি শুনেছি, রামচন্দ্র খুব বড় রাজা ছিলেন। দেশ ভাল চললে বলা হয় রামরাজ্য। আমার ছেলেকে যারা খুন করল, তারা রামকে চেনে না, হিন্দু ধর্মকেও জানে না, ইসলাম সম্পর্কেও জানে না। যদি ওরা সত্যিই ধর্ম সম্পর্কে জানত, তাহলে অমন ফুটফুটে ছেলেটাকে মারতে পারত না। ওদের হাত কাঁপত। আমি ওদের ক্ষমা করে দিয়েছি।”

প্রশ্ন করলাম “আপনার ছেলেকে যারা খুন করেছে, তাদের নামে অভিযোগ করবেন না পুলিশে!” উত্তর দিলেন, “আমি তো সেই সময় ঘটনাস্থলে ছিলাম না। কী করে নিশ্চিত হব যে ২৪ জনের নাম আমার কাছে আছে, তারাই সিবগাতুল্লাকে মেরেছে! নির্দোষরাও তো শাস্তি পেতে পারে। তাই আমি কারও নাম বলব না। বলতে পারব না। আমি শান্তি চাই। যদি এই শহরে শান্তি ফেরে তাহলেই সিবগাতুল্লার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে।”

ইমাম সাহেব অস্বাভাবিক শান্তভাবে উত্তর দিচ্ছিলেন আমার প্রশ্নের। একবার শুধু একটু রেগে গেলেন। বলেছিলাম “আপনি নিশ্চয় জানেন, আপনার সম্পর্কে বলা হচ্ছে, এই শহরের বাসিন্দাই নন আপনি। সিবগাতুল্লাও না কি বাইরে থেকে এসেছে।” কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর মৃত ছেলের ছবি আর কিছু ধর্মীয় বইপত্রের ভিতর থেকে দুটো আধার কার্ড বের করে বললেন, “ছবি তুলে নিন এগুলোর। যারা এমন বলছে, তাদের গিয়ে বলুন, আমরা শতাধিক বছর ধরে এই শহরে রয়েছি। আমার বাবাও আসানসোলেরই ইমাম ছিলেন। কেন এমন করছে ওরা! কী পাচ্ছে! আমার ছেলেটাকে মেরেও শান্তি হল না! আমি তো কাউকে কিছু বলিনি। নিজের মতো রয়েছি। কেন আমার নামে, আমার মরা ছেলের নামে এরকম বলছে! ওরা কি জানে না মৃত্যুর পর মানুষকে বিরক্ত করতে নেই!”

ছোটবেলায় আসানসোলেই পড়াশোনা করেছেন ইম্মাদুল্লাহ। তারপর উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষার জন্য চলে যান সাহারানপুরে। সেখান থেকে ফিরে ১৯৮৯ সালে ২০ বছর বয়সে নূরানী মসদিজের ইমাম হন। স্ত্রীর নাম খাদিজাতুলকুব্রা। বলছিলেন, “আমি তো কোনোরকমে ঠিক আছি, কিন্তু আমার স্ত্রীর দিকে তাকানো যাচ্ছে না। ছেলে মারা যাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ভুল বকছে, বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছে না। আসলে ছেলেটাকে বড্ড ভালবাসতাম আমরা। কেমন মন দিয়ে পড়াশোনা করত! ছোট থেকেই খুব পড়ুয়া ছিল। এই তো মাধ্যমিক দিল। দেখবেন, ভাল নম্বর পাবে। ইচ্ছে ছিল, আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিতে পড়াব। হল না! সব কি আর হয়!” মনে হল, এই এতক্ষণ পর ঈষৎ গলা কাঁপল ইমাম সাহেবের। তারপরই সামলে নিয়ে বললেন, “আমার একার তো ছেলে মরেনি। আরও মরেছে। সব সম্প্রদায়েরই মরেছে। আমরা যদি একসঙ্গে চেষ্টা করতে পারি, যদি আমরা প্রতিজ্ঞা করি আর হানাহানি করতে দেব না, দেখবেন অবস্থাটা বদলে যাবে।”

নূরানী মসজিদ থেকে বেরোতে বেলা হয়ে গিয়েছিল। অথচ মাননীয় সাংসদ বাবুল সুপ্রিয় সময় দিয়েছেন ঠিক দেড়টায়। লাঞ্চ স্কিপ করতে হল। বাবুল অত্যন্ত ব্যস্ত। তাঁর লোকসভা কেন্দ্রেই এমন ঘটনা। সারাক্ষণ ছুটতে হচ্ছে। তার মাঝেই মিনিট কুড়ি কথা বলার সুযোগ। বিজেপি সাংসদ চিরকালই গ্ল্যামারাস। তাঁর আপাত রুক্ষতাও যেন আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। হালকা সাদা শার্ট আর আকাশি ডেনিম (সম্ভবত) পরেছিলেন। শান্ত গলায় বললেন, “একতরফা হামলা চলছে। হিন্দু পাড়াগুলো আক্রান্ত। কিছু প্রতিরোধ হয়েছে। তবে পরিস্থিতি খুব তাড়াতাড়ি শান্ত হয়ে যাবে।” জিতেন্দ্র তেওয়ারি তখন তৃণমূল করতেন। তাঁর গলাতেও একই সুর। আমি দেখছিলাম, যে তৃণমূল নেতারা জন্মসূত্রে মুসলিম, তাঁরা চুপ করে রয়েছেন। মুখ খুলছেন না। কেন, তখন বুঝিনি। এখনও কি বুঝি?

আসানসোল থেকে ফিরতে ফিরতে বাবুল সুপ্রিয়র কথাগুলো মাথায় ঘুরছিল। “সব শান্ত হয়ে যাবে। সব ঠিক হয়ে যাবে।” হয়েছিল। কয়েক মাস পর মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোল। ইমাম সাহেবের ফোন। সিবগাতুল্লার নম্বর দেখে দিতে হবে। এখন আর ঠিক মনে নেই কত পেয়েছিল। মরা ছেলের নম্বর জেনে খুশি হয়েছিলেন ইমাম। বলেছিলেন, “মন দিয়ে পড়াশোনা করত। চাইত নতুন কিছু শিখতে..”

বাবুল সুপ্রিয় তৃণমূলে যোগ দিলেন। জিতেন্দ্র তেওয়ারি এখন বিজেপিতে। আমার কেবল মনে পড়ছে বাবুল সুপ্রিয়র খুব নিস্পৃহ স্বরে বলা “সব ঠিক হয়ে যাবে..”

হ্যাঁ, সব ঠিক হয়ে গিয়েছে। নূরানী মসজিদের ছোট ঘরটার দেওয়ালে ঝুলতে থাকা সিবগাতুল্লার ছবিটা কি কেঁপে উঠছে প্রাক শরতের হাওয়ায়?

আরো পড়ুন

রাহুলে না, বাবুলে হ্যাঁ: তৃণমূলের প্রকৃত এজেন্ডা নিয়ে কিছু প্রশ্ন