সায়ক ঘোষ চৌধুরী

পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং ইস্তফা দিয়েছেন। নতুন মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন ক্যাপ্টেনেরই এককালের ভাবশিষ্য এবং অধুনা বিরোধী চরণজিৎ সিং চান্নি। পাঞ্জাব শিখ এবং গুরুদ্বারা রাজনীতির আধার। তার সঙ্গে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত। পাঞ্জাবে মাত্র ১.৫% মুসলিম। তাই বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবারের ‘হিন্দুত্ব’ রাজনীতি বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। এখানে বিজেপির অবস্থান ঐতিহাসিকভাবে অকালি দলের সঙ্গে ‘ছোট শরিক’ হিসাবে। ১৯৮০-র দশকে শুরু হওয়া এই জোট অকালি দল (বাদল)-এর নেতা এবং পাঞ্জাবের ১৮ বছরের মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ সিং বাদল এবং তাঁর পরিবার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিজেপির সংগঠন জলন্ধর, লুধিয়ানা, ফাগুয়ারা, ফিরোজপুর ইত্যাদি শহর নির্ভর এবং আশ্চর্যজনকভাবে শিখ বিবর্জিত। অকালি দলের রাজনীতি আবার ‘রক্ষণশীল শিখ গুরুদ্বারা’ নির্ভর। ৫৮% শিখ এবং ৩৯% হিন্দুর এই রাজ্যে জাঠ শিখ এবং দলিত শিখের মধ্যে আবার কিছু ভাগ রয়েছে। ১১৭টা বিধানসভা আসনের ৩৪টা তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত এবং জনসংখ্যার প্রায় ৩২% দলিত।

দলিতদের এই বিপুল সংখ্যার কারণে উত্তর ভারতের দলিত নেতা কাঁসিরামের উত্থানও পাঞ্জাবের রোপার-হোসিয়ারপুর থেকেই। যদিও দলিত শিখরা আম্বেদকরপন্থী নন, তাঁদের মধ্যে ‘মাজহাবী’ এবং ‘রামদাসিয়া’ — এই দুরকম ভাগ রয়েছে। এঁদের মধ্যে ‘সৎনামী’ এবং ‘ডেরা সাচ্চা সৌদা’ নামে দুটি সংগঠনের প্রভাব রয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার কারণে পাঞ্জাবের রাজনীতিতে জাঠ শিখ অর্থাৎ উচ্চবর্ণের শিখ (ক্ষত্রী, অরোরা, রাজপুত)-দের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। পাঞ্জাবের প্রায় ৯০% জমির মালিক জাঠ শিখরা। পাঞ্জাবের সব শিখ মুখ্যমন্ত্রীই এই জনগোষ্ঠী থেকে এসেছেন। জাঠ শিখরা মোট জনসংখ্যার ২৫% এবং মোট শিখ জনসংখ্যার ৬৫%। পাঞ্জাবের রাজনীতি বুঝতে গেলে এই সংখ্যাগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু পাঞ্জাবের অর্থনীতি এখনও কৃষি এবং গ্রামনির্ভর। বৃহৎ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের অভাব রয়েছে। শিখ এবং হিন্দুদের মধ্যে সদ্ভাব আছে। হিন্দুরাও শিখ গুরুদ্বারাকে তাঁদের সংস্কৃতির অংশ বলে মনে করেন। শিখরা ‘আরদাস’ বা সেবার ভাবনায় প্রভাবিত।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

যদিও কেন্দ্রীয় সরকারে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহের ৭ বছর ৫ মাসের শাসনকালে বিভিন্ন রাজ্যে ২০ জন মুখ্যমন্ত্রী পরিবর্তন করেছে বিজেপি, কিন্তু কোনো কারণবশত পাঞ্জাবের কংগ্রেস পরিচালিত সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিংয়ের ইস্তফাই সংবাদমাধ্যমে অধিক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর একটা কারণ যদি হয় অমরিন্দর সিংয়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা, অন্যটা অবশ্যই গত পাঁচ মাস ধরে পাঞ্জাব রাজনীতিতে ঘটে চলা বিভিন্ন ঘটনার ঘনঘটা। পাতিয়ালার রাজপরিবারের প্রধান ক্যাপ্টেন অমরিন্দর বোধহয় স্বাধীন ভারতের সেই বিরল অভিজাতদের একজন যাঁরা গণতান্ত্রিক কাঠামোতেও নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। ২০০২-২০০৭, ২০১৭-২০২১, এই দু দফায় ৯ বছর ৭ মাস পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী থাকা ক্যাপ্টেন অমরিন্দরের নিজের জীবনও কম নাটকীয় নয়।

ঐতিহ্যশালী দুন স্কুলে ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সহপাঠী অমরিন্দর ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমির ‘বেস্ট ক্যাডেট’ হয়ে পারিবারিক ঐতিহ্য মেনে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে প্রবেশ করেন। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে অংশও নেন। ‘ক্যাপ্টেন’ নামের সেটাই কারণ। ১৯৮০ সালে বন্ধু রাজীবের অনুরোধে পাতিয়ালা কেন্দ্র থেকে লোকসভায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন কংগ্রেসের টিকিটে। কিন্তু ১৯৮৪ সালে অপারেশন ব্লু স্টারের প্রতিবাদে লোকসভা তথা কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন এবং শিরোমণি অকালি দলে যোগদান করেন। সুরজিৎ সিং বার্নালা মন্ত্রীসভার পঞ্চায়েত, বন এবং কৃষিমন্ত্রীও হন। পরে ১৯৯২ সালে অকালি দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণে নিজের পৃথক দল তৈরি করে নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। ১৯৯৮ সালে সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেস সভানেত্রী হওয়ার পর ক্যাপ্টেন আবার কংগ্রেসে ফিরে আসেন এবং গান্ধী পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে পাঞ্জাব কংগ্রেসের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন, যদিও তাঁর বিরুদ্ধে চিরকালই একনায়কতন্ত্র চালানোর অভিযোগ উঠেছে।

২০০২ সালে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সময় থেকেই অমরিন্দর গোষ্ঠী এবং রাজিন্দর কাউর ভট্টাল গোষ্ঠীর বিবাদ সুবিদিত। কিন্তু অকালি রাজনীতিতে ক্যাপ্টেনের প্রভাবের কারণে (গুরু গোবিন্দ সিংয়ের তলোয়ারসহ একাধিক শিখ পবিত্র স্মারকের রক্ষার ভার পাতিয়ালার রাজপরিবারের হাতে) তিনিই কংগ্রেসের সব আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াইয়ে জয়ী হতে থাকেন। এতসব বলার কারণ, ক্যাপ্টেনের আজকের ইস্তফার জন্যে ওঁর এই ইতিহাসও দায়ী। ২০০৭ এবং ২০১২ — দুবারই বিধানসভা নির্বাচনে ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে কংগ্রেস পরাজিত হয়। কিন্তু তাতে তাঁর উচ্চতা খাটো হওয়ার বদলে ক্রমাগত বাড়তে শুরু করে। তার কারণ (১) ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গার কালি গায়ে লেগে থাকা কংগ্রেসের পোস্টার বয় হিসাবে “গুরু গোবিন্দ সিংয়ের তলোয়ার রক্ষাকারী পাতিয়ালার মহারাজা” ক্যাপ্টেনের কোনো বিকল্প পাঞ্জাব রাজনীতিতে ছিল না। “বাদলদের সঙ্গে লড়াই করতে একমাত্র ক্যাপ্টেনই পারবেন”, এমন একটা ধারণা দিল্লির কংগ্রেস নেতৃত্বের মধ্যে গভীরভাবে বিদ্যমান ছিল। (২) সীমান্তবর্তী রাজ্য পাঞ্জাবে ক্যাপ্টেনের সেনাবাহিনীতে থাকার ইতিহাস ওঁর জনপ্রিয়তাকে অন্য মাত্রা দিয়েছিল, যেহেতু পাঞ্জাবের প্রায় প্রতি ঘর থেকেই ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যাওয়ার ট্র্যাডিশন আছে।

২০১৪ সালে ভারতীয় রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদীর উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে গান্ধী পরিবারসহ অনেক রাজনীতিকের ব্র্যান্ড ভ্যালু নিম্নগামী হয়, ব্যতিক্রম ক্যাপ্টেন। তার কারণ জাতীয়তাবাদ, সামরিক বিষয়ে জ্ঞান, স্বচ্ছ ভাবমূর্তি, দক্ষ প্রশাসক — সব বিষয়েই ক্যাপ্টেনই যেন নরেন্দ্র মোদীর কংগ্রেসি উত্তর। ক্যাপ্টেনের জনপ্রিয়তা আরো বৃদ্ধি পায় যখন তিনি “মোদী ঝড়” আটকে অমৃতসর লোকসভা কেন্দ্রে মোদী সরকারের “দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ মুখ” অরুণ জেটলিকে ১,০২,৭৭০ ভোটে পরাজিত করেন। তারপর থেকেই দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তার গ্রাফ যত ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, পাঞ্জাবে অকালি-বিজেপির “মুখিয়া” বাদলদের গ্রাফ তত নিম্নমুখী।

পাকিস্তানী প্রেমিকার সঙ্গে পরকীয়া, অলস মানসিকতা, জনসংযোগহীনতা ইত্যাদি নানা অভিযোগ ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে উঠলেও ২০১৭ সালে পাঞ্জাবে সরকার গড়ার মরিয়া লড়াইয়ে ক্যাপ্টেনকে মুখ করতে কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্ব তাই দুবার ভাবেননি। দুর্নীতি, মাদক মাফিয়া যোগাযোগ, বেকারত্ব, শিখ ধর্মীয় স্মারককে অসম্মান ইত্যাদি নানা অভিযোগে যুব সম্প্রদায় অকালি-বিজেপি জোটের প্রতি বিমুখ হন এবং বাদল সরকারের পতন ঘটে। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন হন ক্যাপ্টেন। কিন্তু এবার মন্ত্রীসভার সূচনাতেই ঈশান কোণে মেঘ রূপে এক ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে। তিনি বিজেপি থেকে কংগ্রেসে সদ্য আগত তিনবারের সাংসদ নভজ্যোৎ সিং সিধু। ক্যাপ্টেনের মতো সিধুর পরিবারও পাতিয়ালার, ক্রিকেটার হিসাবে দীর্ঘ দুই দশক ভারতীয় দলে খেলার ফলে সিধুর পরিচিতিও যথেষ্ট। সর্বোপরি সিধুর পরিবারও কংগ্রেসি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ওঁর পিতা কংগ্রেস বিধায়ক এবং প্রদেশ সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। খেলোয়াড় এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব হিসাবে জনপ্রিয় সিধু বাগ্মী এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তিনি ক্যাপ্টেনের নেতৃত্ব মানতে অস্বীকার করেন।

কিন্তু ক্যাপ্টেনও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। “সাত মাস ধরে ফাইল সই করছেন না”, এই অভিযোগে তিনি সিধুকে নিজের মন্ত্রিসভার পর্যটনমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেন। অন্য সময়ে এবং অন্য কারোর সঙ্গে এমন হলে তাঁর রাজনৈতিক সন্ন্যাস নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকত না। কিন্তু নভজ্যোৎ সিং সিধু যে সে লোক নন। তাঁর বাগ্মিতা রাহুল গান্ধী এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যাঁরা সারা ভারতে মোদীবিরোধী ওজস্বী ভাষণ দেওয়ার জন্যে একটি শিখ মুখ খুঁজছিলেন। ব্যাস, সিধু ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে। তিনি কংগ্রেসের দিল্লির নেতৃত্বের কাছের লোক হয়ে ওঠেন। কিন্তু পাঞ্জাবে ক্যাপ্টেনের জমিতেই ক্যাপ্টেনকে ঘায়েল করা চাট্টিখানি কথা নয়, যেখানে বিধায়করা ক্যাপ্টেন মনোনীত। কিন্তু সে সুযোগ হঠাৎ এসে যায় কয়েকটা কারণে।

(১) বর্তমানে ভারতে বেশিরভাগ মন্ত্রীসভাতে, রাজ্যই হোক বা কেন্দ্রীয়, একনায়কতন্ত্রের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বাকি মন্ত্রীদের গুরুত্ব কমিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর বা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের গুরুত্ব বাড়ানো মোদির মন্ত্রীসভার মত মমতার মন্ত্রীসভাতেও। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের অকেজো রেখে আমলারাই সব সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন। এই কাঠামোর সপক্ষে যুক্তি হল (ক) নেতার মুখ দেখিয়ে ভোট হয়, অতএব ম্যানিফেস্টোতে বলা প্রতিশ্রুতির দায় মেটানোর দায়িত্ব শুধু মুখ্যমন্ত্রী/প্রধানমন্ত্রীর। (খ) আমলাদের হাতে থাকলে কাজ দ্রুত হয়, দুর্নীতি কমে। (গ) বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন দপ্তরে ছুটে বেড়াতে হয় না পরিকল্পনার অনুমতি নেওয়ার জন্যে, PMO বা CMO-ই সব করে দেয়। এই সিস্টেমের বিপক্ষে যুক্তি হল (ক) মন্ত্রীদের কোন দাম থাকে না, একনায়কতন্ত্রের জন্ম হয়। (খ) আমলারা মন্ত্রীদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে যান জনগণ বা গণতন্ত্রের প্রতি কোনোরকম প্রত্যক্ষ দায়বদ্ধতা ছাড়াই। (গ) শাসক দলের সংগঠনের দীর্ঘকালীন ক্ষতি সাধিত হয়।

(আশ্চর্যজনকভাবে মূলত ভোটকৌশলী প্রশান্ত কিশোরের পরামর্শে যে নির্বাচনগুলো লড়া হয় বা যে সরকারগুলো তৈরি হয়, সবার চরিত্রেই এই CMO বা PMO-ভিত্তিক আমলা নির্ভরতা বেশি দেখা যায়। এর কারণ সম্ভবত, মোদীকালীন রাজনীতিতে “নেতার মুখ” নিয়ে বর্তমান কর্পোরেট মিডিয়ার বাড়াবাড়ি।)

ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিংয়ের বিরুদ্ধেও তাঁর মন্ত্রীসভার সদস্যরা অভিযোগ তুলতে থাকেন

(১) তিনিও ওইরকম “মুখ্যমন্ত্রীর অফিসনির্ভর প্রশাসন” তৈরি করেছেন। অন্য মন্ত্রীদের কোনো গুরুত্ব নেই।

(২) ক্যাপ্টেন এমনিতেই চিরকালই সামাজিকভাবে মেলামেশা কম করেন। ওঁর রাজনৈতিক উত্থান তৃণমূল স্তর থেকে হয়নি, তাই সাধারণের সঙ্গে মেলামেশার অভাব ওঁর চিরকালই ছিল। কিন্তু ৭৯ বছর বয়সে সেই বিচ্ছিন্নতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পাঞ্জাবের অনেক সমস্যারই সমাধান হয়নি বলে বিরোধীরা দাবি করতে থাকেন। যেমন মাদক সমস্যা, বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত মাশুলের সমস্যা, কর্মসংস্থানের সমস্যা। সমাধান করতে কার কাছে যাওয়া হবে? স্বয়ং ক্যাপ্টেন যদি সময় বিশেষে “বেপাত্তা” থাকেন? এর সঙ্গে সঙ্গে অকালি নেতা প্রকাশ সিং বাদল এবং সুখবীর সিং বাদলের Orbit Aviation সংস্থার বেআইনি বাসের সংখ্যা কমাতে আইনি ব্যবস্থাও ক্যাপ্টেনের প্রশাসন নেয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। এর কারণ হিসাবে ক্যাপ্টেন-বাদল ব্যক্তিগত সম্পর্কের দিকে আঙুল তোলা হয়।

(৩) কৃষক আন্দোলনের ফলে পাঞ্জাবে এখন বিজেপিবিরোধী হাওয়া চলছে। অকালিদের অবস্থাও ভাল নয়। কারণ পাঞ্জাবের কৃষকদের মনোভাব না বুঝে অকালি দল শুরুতে মোদী সরকারের তিনটে বিতর্কিত কৃষি বিল সমর্থন করেছিল। পরে হাওয়া বুঝে বিরোধিতা করে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার কৃষিমন্ত্রিত্ব থেকে হরসিমরত কউর বাদল পদত্যাগও করেন। অকালি-বিজেপির চার দশকের জোটও ভেঙে যায়। কিন্তু সেক্ষেত্রে অকালিরা যা সবসময় করে থাকে সেটাই করার চেষ্টা করছে। শিখ ধর্মীয় প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। তাতে ২০১৫ সালে শিখ স্মারকগুলোর অবমাননাও উঠে আসছে, যা প্রকাশ সিং বাদল সরকারের সময়ে ঘটেছিল। ক্যাপ্টেন ক্ষমতায় এসেছিলেন দোষীদের শাস্তি দেবেন বলে, কিন্তু দোষীদের চিহ্নিত করা যায়নি। এখন অকালিরা সেই নিয়েই পাল্টা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।

(৪) যুবসমাজের মধ্যে ক্যাপ্টেনের সংযোগহীনতা এবং কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি শহরাঞ্চলে কিছুটা প্রভাব বৃদ্ধি করেছে। যার ফলে ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের অনেক বিধায়কই আসন্ন ২০২২ পাঞ্জাব বিধানসভায় পরাজয়ের সম্ভাবনার মুখে পড়েছেন।

এই রকম বেশকিছু কারণে ক্যাপ্টেনের নিজের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাই তাঁর উপরে আস্থা হারাতে শুরু করেন। তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরবেন কে? একজনই আছেন — নভজ্যোৎ সিং সিধু, যাঁর মুখ তাঁর খেলোয়াড় জীবনে অফস্পিনারকে স্টেপ আউট করে ছক্কা মারার মতই চলে।

এমতাবস্থায় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব চেষ্টা করেছিলেন সিধুকে পাঞ্জাব প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি এবং ক্যাপ্টেনকে মুখ্যমন্ত্রী রেখে সমস্যার সমাধান করতে, কিন্তু পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেছিল। পাঁচ মাস বাদে পাঞ্জাবে বিধানসভা নির্বাচন। ক্যাপ্টেনকে মুখ করে বিধানসভা নির্বাচনে যেতে অধিকাংশ বিধায়কই রাজি ছিলেন না। তাঁরা বারবার দিল্লীতে গিয়ে ধরনা দিতে শুরু করেন। অগত্যা ক্যাপ্টেন নিজের সম্মান বাঁচাতে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। নতুন মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন ক্যাপ্টেনের এক সময়ের বিশ্বস্ত সহযোগী এবং অধুনা বিরোধী, কারিগরী শিক্ষা মন্ত্রী চরণজিৎ সিং চান্নি। যিনি পাঞ্জাবের প্রথম দলিত মুখ্যমন্ত্রীও বটে।

ক্যাপ্টেনকে সরানোর সিদ্ধান্ত কংগ্রেসের পক্ষে সঠিক হল না ভুল ? এই সিদ্ধান্ত নির্বাচনী লাভের কারণ হবে কিনা সেটা সময়ই বলবে। কিন্তু কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্বের সামনে অন্য কোনো রাস্তা ছিল না। চরণজিৎকে মুখ্যমন্ত্রী করে কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্ব এক ঢিলে অনেক পাখি মারলেন বলেই মনে করা হচ্ছে।

(১) ক্যাপ্টেন অমরিন্দরের বিরুদ্ধে ওঠা বিরোধীদের সব অভিযোগ এখন ভোঁতা হতে বাধ্য।

(২) চরণজিতের দলিত পরিচয় পাঞ্জাবের ৩২% দলিত জনসংখ্যার মধ্যে কংগ্রেসের পক্ষে প্রবাহ তৈরি করতে পারে। যার প্রভাব পড়শি রাজ্য উত্তরপ্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ডের নির্বাচনেও পড়তে পারে। ২০২২-এ ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে যে পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন হবে, তার কমপক্ষে চারটে রাজ্যে না জিতলে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের রাজনৈতিক অস্তিত্বের সঙ্কট দেখা দেবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন লাগাতার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ঘোষণা করে বিরোধী ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করছেন বিজেপির সঙ্গে কিঞ্চিৎ বোঝাপড়ায়, তার জোর বাড়বে। উল্টো দিকে উত্তরপ্রদেশ হেরেও যদি পাঞ্জাব-উত্তরাখন্ড-গোয়া-মণিপুর জেতা যায়, তাহলে বিরোধী জোটে কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা বন্ধ হয়ে যাবে।

(৩) সংগঠনের কাছেও বার্তা গেল যে ক্যাপ্টেনের মতো উচ্চতার নেতাকে যদি পদত্যাগ করানো যায়, তাহলে কেউই আর অপরিহার্য নন । হয় খেটে নির্বাচনে ভালো ফলাফল করো, না হলে বিদেয় হও। যে সিদ্ধান্তহীনতার অভিযোগ কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্বের সম্বন্ধে উঠছিল, তা খানিকটা হলেও ভুল প্রমাণিত হল।

কিন্তু এর ফলে ২০২৪ সালে নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদিকে কি আটকানো যাবে?

তার উত্তর এখুনি দেওয়া যাবে না। তবে যে সময়ে পাঞ্জাবের প্রত্যেক গ্রামের প্রত্যেক ঘরে কৃষক বিদ্রোহের পতাকা উড়ছে, সেই সময়ে এক কৃষক পরিবারের দলিত কারিগরি শিক্ষামন্ত্রীকে মুখ্যমন্ত্রী করে কংগ্রেস তাদের একটা উদ্দেশ্য জানান দিল। তারা আগামী নির্বাচনগুলোতে দলিত-কৃষক-কর্মসংস্থান ইস্যুতে জনসমর্থন আদায়ের জন্যে ঝাঁপাবে। তার সঙ্গে আরেকটা বার্তাও গেল। অতীত পারফরমেন্সের উপর ভিত্তি করে আর আগামী দিনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। ক্যাপ্টেনের মতো মহীরূহও টিমের প্রয়োজনে বাতিল হতে পারেন।

এই পুরো বিষয়টা নিয়ে যমুনার পূর্ব পাড়ের মতামতের সঙ্গে পশ্চিম পাড়ের মতামত মিলছে না। দিল্লীস্থিত জাতীয় মিডিয়া যখন হা হুতাশ করছে ক্যাপ্টেনকে সরানো নিয়ে, পাঞ্জাবের স্থানীয় মিডিয়া কিন্তু এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছে। পাঞ্জাবের জনতা কী ভাবছেন তা জানার জন্যে ফেব্রুয়ারি -মার্চ মাসের বিধানসভা নির্বাচন তো আছেই।

নিবন্ধকার রাজনৈতিক বিশ্লেষক। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। মতামত ব্যক্তিগত।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.