পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিংয়ের বিদায় আপাতদৃষ্টিতে নভজ্যোৎ সিং সিধুর সাথে তাঁর দ্বন্দ্বের ফল। কিন্তু পাঞ্জাবের কংগ্রেস নেতাদের সাথে কথা বললে টের পাওয়া যাচ্ছে, যে কৃষক আন্দোলনের বিরুদ্ধে ক্যাপ্টেনের সাম্প্রতিক বিবৃতিগুলোও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। পাঞ্জাবে বিধানসভা নির্বাচন আসন্ন। কংগ্রেস নেতৃত্বকে সে কথা মাথায় রাখতে হয়েছে।

গত বছর নভেম্বর মাসে কৃষক আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই আন্দোলনকারীরা অমরিন্দরকে কর্পোরেটপ্রেমী কণ্ঠ বলেই মনে করে এসেছেন। ডিসেম্বরেই পাঞ্জাবের এই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, দিল্লির কাছে হাইওয়ের উপর কৃষকদের আন্দোলন শুধু যে পাঞ্জাবের অর্থনীতির ক্ষতি করবে তা নয়, “জাতীয় নিরাপত্তা”-র পক্ষেও বিপজ্জনক। গত সপ্তাহেও তিনি বলেছিলেন “কৃষকদের যদি ধরনায় বসতেই হয়, পাঞ্জাবের বদলে হরিয়ানা আর দিল্লিতে চলে যাওয়া উচিত। এই আন্দোলন আমাদের রাজ্যের অর্থনীতির উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।”

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অমরিন্দরের এই বিবৃতিতে সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা রুষ্ট হয়। চল্লিশের বেশি কৃষক ইউনিয়ন এই সংগঠনের সদস্য। পাঞ্জাব কংগ্রেস তাদের অসন্তুষ্টি বুঝতে পেরেছিল এবং পাঞ্জাবের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা হরিশ রাওয়াতের মাধ্যমে পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে সে কথা জানিয়েছিল।

সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার অন্যতম নেতা হারনেক সিং মহিমা বললেন “ওই বিবৃতি দিয়ে ক্যাপ্টেন প্রমাণ করে দিলেন যে তিনি কর্পোরেটদের লোক। রাজ্যের অর্থনীতিকে বাঁচাতে কৃষকদের পাঞ্জাবের বাইরে চলে যেতে হবে? আমি জানতে চাই, আমাদের আন্দোলনের সাথে রাজ্যের অর্থনীতির সম্পর্ক কী? এই আন্দোলনের ফলে যেসব বহুজাতিক আর ভারতীয় কর্পোরেট হাউস চাল আর অন্যান্য কৃষিপণ্যের ব্যবসা করে, তাদের সরবরাহ ব্যবস্থার উপর প্রভাব পড়েছে। ক্ষতি তো তাদের হচ্ছে, পাঞ্জাবের মানুষের মানুষের তো নয়। অমরিন্দর কর্পোরেটের স্বার্থেই এসব কথা বলেছেন।”

পাঞ্জাবের কৃষকরা ৪০০-র বেশি জায়গায় আন্দোলন করছেন, তবে এই ১০ মাসব্যাপী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হল দিল্লির নিকটবর্তী সিঙ্ঘু বর্ডার আর হরিয়ানার তিকরি। ২০২০ সালের নভেম্বরে যখন কৃষকরা সিঙ্ঘুতে এসে প্রথম ক্যাম্প তৈরি করেছিলেন, ওখানকার মেজাজ এখনো তখনকার মতই তাজা। কৃষকরা এখনো সেদিনের মতই আত্মবিশ্বাসী।

“যতক্ষণ এই সরকার ওই তিনটে কালা কানুন প্রত্যাহার না করছে, আমরা কোত্থাও যাব না,” বললেন ৭২ বছর বয়সী কৃষক শরণ সিং, যিনি এসেছেন কপুরথলা থেকে। “আমাদের লড়াই শেষ হওয়ার আগে কেউ আমাদের এখান থেকে নড়াতে পারবে না। মিডিয়া বলছে এই আন্দোলন মরে গেছে, কারণ মানুষের সংখ্যা কমছে। কিন্তু সংখ্যা দিয়ে সাফল্যের বিচার হয় না। লক্ষ লক্ষ কৃষক তৈরি হয়ে আছে। দরকার পড়লেই এসে হাজির হবে। যেহেতু বেশিরভাগই সরাসরি চাষবাসের সাথে যুক্ত, সেহেতু পালা করে তারা এই আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে। সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার এক ডাকে তারা সবাই খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এখানে পৌঁছে যাবে।”

কৃষক আন্দোলনের দাবিগুলো এতদিনে সকলেই জেনে গেছেন। সরকারের আনা নতুন তিনটে কৃষি আইন বাতিল করতে হবে আর ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (MSP) আইনের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয় দাবির কারণ, কৃষকরা মনে করেন আইনে লেখা না থাকলে এই সরকার ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে কৃষকদের কাছ থেকে ফসল না-ও কিনতে পারে। আর সরকারের কেনার নিশ্চয়তা না থাকলে চড়া সহায়ক মূল্যও অর্থহীন।

মজার কথা, ২০১১ সালে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী এবং ওয়ার্কিং গ্রুপ অফ কনজিউমার অ্যাফেয়ার্সের চেয়ারম্যান হিসাবে আজকের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই এই পরিকল্পনা দিয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে তুলে দেওয়া তাঁর প্রতিবেদনে মোদি সুপারিশ করেছিলেন “MSP আইনপূর্বক বলবৎ করুন। কারণ বাজারের কার্যকলাপে মধ্যস্বত্বভোগীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এবং অনেক সময় তাদের কৃষকদের সাথে আগাম চুক্তি করা থাকে। সমস্ত অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের ক্ষেত্রে আমাদের আইনের ধারার মাধ্যমে কৃষকের স্বার্থরক্ষা করা উচিত, যেখানে লেখা থাকবে “কৃষক আর বিক্রেতার মধ্যে কোনো লেনদেন MSP-র চেয়ে কম মূল্যে করা চলবে না।”

Leave a Reply