সাহিত্যিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় চলে গেছেন এমন একটা সময়ে যে তাঁকে দীর্ঘায়ু বলা যাবে না। কর্কটরোগ ও মস্তিষ্কের প্রদাহ তাঁকে আগেই আক্রমণ করেছিল এবং আমাদের ভাবার সুযোগ ছিল “জীবন এত ছোট কেনে?” কথাটা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবি উপন্যাসে বসন বলেছিল। শ্যামলের প্রসঙ্গে মাঝেমাঝেই ওই কথাটিই মনে হয়। আমি স্মৃতিচারণে অভ্যস্ত নই, কারণ মৃত মানুষের সঙ্গে জীবিত মানুষের কোনো সংলাপ হয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই দেখেছি অনেক মিথ্যে কথা সত্যের ছদ্মবেশ পরে অলীক স্বর্গে বসবাস শুরু করে। সুতরাং লেখক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা আলোচনা করাই ভাল। যদি তা করি, তাহলে আমরা দেখব, এই মিডিয়াসর্বস্ব যুগেও কীভাবে আস্তে আস্তে জল সরে গিয়ে ডাঙা দেখা দিলেই বোঝা যাচ্ছে যে পঞ্চাশ দশকের লেখকদের মধ্যে টিকে আছেন আসলে মতি নন্দী ও শ্যামল — দুই ভায়রাভাই — আর বেশ খানিকটা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও দেবেশ রায়। অসীম রায়কে এর সাথে যুক্ত করতে পারি, কিন্তু বাকিরা অনেকটাই তরল পদার্থ। তাঁদের বাজারদর ওঠানামা করে, লিটন স্ট্র্যাচি যেমন বলেছিলেন, কুড়ি বছর অন্তর। ওটা অনেকটা সেনসেক্সের হিসেব। তার খবর কলেজ স্ট্রিট বাজার দিতে পারে। কিন্তু শ্যামল যা লিখেছেন, তা পড়ে আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে তিনি বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। এটা আশ্চর্যের, যে তিনি সারাক্ষণ বিভূতিভূষণের কথা বলতেন — যিনি শ্যামলের মতে, ইতিহাসের পরপারে। বিভূতিভূষণের কাছে হর্ষবর্ধন, সম্রাট অশোক, গজনির মামুদ — সকলেই তুচ্ছ। আসলে তো কিন্নর দল আর বটগাছ ভারতবর্ষ গঠন করেছে। এই ছিল শ্যামলের অভিমত।

আরও এগোবার আগে একটা ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা জানাই। আমার সিনেমার উপর লেখা শুরু হয়েছিল শ্যামলদার অকৃপণ করুণায়। তিনি অমৃত পত্রিকার সম্পাদক হয়ে আমাকে প্রথম বাংলা ও হিন্দি ছবির সমালোচনার দায়িত্ব দেন। আমি যেরকম বেপরোয়া এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন সমালোচনা করতাম, যেসব বক্রোক্তি আমার লেখায় থাকত, তাতে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি অন্য কোনো বড় পত্রিকার সম্পাদক তা সহ্য করতেন না। শ্যামল অম্লানবদনে করে গেছেন। তিনি আমাকে লেখক মনে করতেন কিনা জানি না। কিন্তু সস্নেহে খুন করার ভয় দেখিয়েছিলেন, যদি আমি স্বর্গের আগের স্টেশন রিভিউ না করি। আজকাল পত্রিকায় সেই রিভিউ বেরিয়েছিল। এর বেশি ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করব না। আজ লেখক হিসেবে তাঁকে কীভাবে দেখব?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় জীবনকে ভালবেসেছিলেন, জীবনও তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেনি। গত শতাব্দী থেকে আজ পর্যন্ত সংস্কৃতিতে এমন এক গদ্যশিল্পীর ছায়া অম্লান, যিনি মানুষের জীবনকে অবৈধ সহবাস ও সংবাদপত্র পাঠের মধ্যে বন্ধনীভুক্ত দেখেছিলেন। তাঁরই মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের অনিলের পুতুল ছাপা হয়। অসুখকে আড়াল করে তবু জীবনের গল্পই সেখানে নায়ক হয়ে ওঠে। আলবেয়ার কামুর পৃথিবীর রং সিপিয়া, তিনি ফরাসি লেখক। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবন মানুষের সবুজ শৈশব — যেন লাউডগা সাপ — যেখানে উদ্যত বিস্ময়, মৃত্যুর অধিক উন্মোচন। এই উন্মোচন শব্দটিই শ্যামলের রচনাবলীর পাসওয়ার্ড।

কামুর প্রসঙ্গটি এল এই ভেবে, যে উত্তর-পঞ্চাশ বাংলা সাহিত্যে যে অবদমন, যে সন্দেহ ও ভয়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় তা থেকে অনেক দূরে বাস করেন। এক নিবিড় আস্তিক্যবোধ তাঁর রক্ষাকবচ। আমাদের মলিন সময়ে ইতিবাচনের জন্য যে নৈতিক দর্প প্রয়োজন, তা তাঁর আছে। জীবনের প্রতি তাঁর সর্বতোমুখী যাত্রা প্রায় ধর্মবিশ্বাসের মতই ইন্দ্রিয়ঘন — এ কথা তাঁর প্রয়াণের পর স্বচ্ছন্দে বলা যায়, এবং বোঝা যায় কেন বিভূতিভূষণ তাঁর কাছে গায়ত্রী মন্ত্র। অগ্রজের মতই তিনি দানা দানা হিংস্রতা ছড়িয়ে দেন আখ্যানের আনাচে কানাচে।

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা আসলে জীবনরহস্য। সেসব শব্দাবলী সংক্ষেপে আত্মজীবনী হয়ত, কিন্তু আরও গূঢ় অর্থে লেখকের আত্মার বিবরণী। শ্যামলের লেখার অন্তর্গত চালে নানাভাবে এই সত্যটুকু তো বেরিয়ে আসে, যে তিনি প্রকৃতই প্রাপ্তবয়স্কের দক্ষিণারঞ্জন। শৈশবকে সম্বল করে যিনি প্রতিভার নদীতে সাঁতার কাটতে নামেন, তিনি যে ছবি আঁকেন তা চিত্রকলা নয়, চলচ্ছবি। সে নদীর চরে কখনো ভেসে ওঠে অনিলের পুতুলকুবেরের বিষয় আশয়, ঈশ্বরীতলার রূপোকথা-র মত উপন্যাস; কখনো ‘যুদ্ধ’ বা ‘ধানকেউটে’ বা ‘পরী’-র মত গল্প।

আর যেহেতু শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের রচনা বস্তুকে সীমা মুক্ত করে, তাঁর বাস্তবতাও বৃদ্ধ বাবাকে অজানা মেল ট্রেনে তুলে দেয়, ট্রেনটা বাঁশি বাজিয়ে ভারতবর্ষের ভেতর হারিয়ে যায়। সাক্ষী হয়ে থাকে ডুমুর গাছ। হে পাঠক! লক্ষ করুন কোনো মানুষ নয়। এভাবেই শ্যামলের সত্য সাময়িকতার ফ্রেম ছেড়ে বেরিয়ে যায়। আজ যা ঘটনা, তা দুদিন বাদে সময়ের আশ্চর্য সৌজন্যে গজভুক্ত কপিত্থবৎ। তবে আর ইতিহাসকে অসূয়া কেন? শ্যামল পাঠককে বিশ্বাস করাতে চান বুদ্ধ থেকে মার্কস, প্রত্যেকেই অন্তত মনুষ্যত্বের থেকে বয়সে ছোট। ফলে ইতিহাসের অন্তর্গত না থেকে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বহির্গত হন। প্রান্তে নয়, বাইরে থাকেন। নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেন। মার্জিনের বাইরে দাঁড়িয়ে শনাক্ত করেন মানুষের ইতিহাস-পূর্ব আদিমতা, লোভ, কাম, দখল, সংস্কার। সভ্যতার শ্রেণিযোনিঋণরক্তরিরংসা ও ফাঁকিকে গুরুত্ব দেওয়ার মানুষ এই লেখক নন। সহজীবী অনেকেই যখন গালুডিতে সূর্যাস্ত বা প্রেমিকার ব্রীড়াভঙ্গ দেখেন, তখন শ্যামল সানন্দে বোঝেন ও বোঝাতে চান কলকাতার কুড়ি কিলোমিটারের মধ্যে স্বর্গের আগের স্টেশন। সেখানে এমন ধরনের ক্ষেত আছে, যা মহেঞ্জোদারোর থেকে পুরনো।

সেজন্যই পঞ্চাশ দশকের লেখক সমাবেশে আমার তাঁকে সবচেয়ে হিন্দু মনে হয়। তাঁর লেখায় কোনো ট্র্যাজেডি নেই। কোনো কমেডি নেই। মাঝেমধ্যে একজন নাজেহাল মানুষ, কি হাজরা নস্কর, এসে সেইসব ইতিবৃত্তের আঙিনায় গীতা পড়তে বসে। আক্ষরিক অর্থে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের অর্ধশতকপ্রাপ্তি শ্যামলের জ্ঞানপ্রাপ্তিরও ইতিহাস। দেশবিভাগের বিপর্যয় তাঁকে স্পর্শ করে। উদ্বাস্তু, বেকার বেশ্যা, মাতাল ও নাস্তিমান কাউকেই তিনি অস্বীকার করেন না। কিন্তু বিস্ময় যেহেতু তাঁকে পরিত্যাগ করে যায় না, তিনি ক্রোধে শোকে বিক্ষোভে চৌচির হয়ে যান না। যেহেতু হিন্দুদের মতই তিনি ঘটনা থেকে বিমুক্ত ও বিশ্বাসী, তাঁর লেখায় সুতরাং অনন্ত ভোরবেলা। অসম্ভব বেদনার থেকে অমোঘ আমোদ সেখানে বড় হয়ে দেখা দেয়। এতদিন পর্যন্ত শ্যামলের লেখা বিষয়ে আমরা সংলগ্ন তবু উদাসীন থেকেছি। এমনকি লক্ষ্মীকান্তপুর লাইনে খুলনার বাঙাল, তাঁকে আধুনিকতার পরিপন্থী বলেও ভাবা হয়েছে। আজ কি শ্রদ্ধা জানানোর সময় নয় এই একান্তভাবে বঙ্গীয় ভেরফ্রেমডাং-এ ফলাফলের জনয়িতাকে?

যদি আধুনিকতার পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করি, আমরা দেখব আখ্যান ও মুখশ্রীর দিক থেকে শ্যামল প্রথানুবর্তী। কিন্তু অস্থি সংস্থাপনের দিক থেকে নয়। অর্থাৎ তাঁর বাস্তবতার সারফেস ও স্ট্রাকচার আলাদা আলাদা। আজকাল কলকাতায় মার্কেজ ও তারকোভস্কির সৌজন্যে স্পেস-টাইম ডাইলেশন ও ম্যাজিক রিয়ালিজম নিয়ে প্রচুর কথা হয়। আমি তো সবিনয়ে বলব শ্যামল বাস্তবকে স্বপ্নবৎ প্রয়োগ করা শুরু করেছেন সেই অনিলের পুতুল থেকেই। ঈশ্বরীতলা বা স্বর্গের আগের স্টেশন অথবা পরী তো অস্বাভাবিকতাকে পরিবেশন করার এক স্বাভাবিক মহড়া মাত্র এবং তা জাক্সটাপোজিশন থেকে উৎপন্ন। সুয়েজ আক্রমণের সঙ্গে যদি মিশিয়ে দেওয়া যায় বালেশ্বরের ঝুপড়িতে বাস্তুচ্যুতি, তাহলে এক ধরণের মায়াবাস্তব রচিত হয়। তবু এই মায়া, এই আচ্ছন্নতা তো চিরদিনের নয়। তা মুছে গেলে যা থেকে যায় তা নির্যাস — আর এই নির্যাসটুকুই আমাদের চেতনার সম্পদ। তা-ই জীবনরহস্য।

মানুষ কর্মী। মানুষ শ্রমিক। প্রকৃতির মত প্রায় কোলাহল বিরহিতভাবে এতদিন পর্যন্ত সেই গঠন, সেই নির্মাণ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। আমাদের শহুরে পাণ্ডিত্য খেয়াল করেনি, ইতিমধ্যেই অর্ধশতকে তিনি নিজেই একটি স্থাপত্যে পরিণত হয়েছেন। আমি আকাদেমি বা অন্যান্য পুরস্কারের কথা তুলছি না। জীবন এত ছোট নয়, জীবনের রহস্য তো নয়ই। এই শহর, এই মিডিয়া, আকাদেমির এই বাতাবরণ থেকে একটু দূরে, যেখানে মরা সাপের শুকনো মাথায় ভেতর দিয়ে আকাশ নেমে আসে, স্বর্গের সেই আগের স্টেশনে শ্যামলদা আজ পায়চারি করছেন। আজ অলীকবাবুর ধ্বংসাবশেষ, বাসনার স্বর্গাভিযান একাকার হয়ে আছে।

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের দূরগামী একক যাত্রাও যে কি জীবনানুগত! নিষ্ঠুর ও উদার, যুগপৎ সন্ন্যাসী ও লোভী — এমন মানুষ আমি জীবনে বেশি দেখিনি। শ্যামলদা দরকার হলে নিজেকে বিপন্ন করতে জানতেন, অন্যকেও। আসলে সারাজীবন বিপন্ন হয়ে কাটানোর পর যে বিপদ আসে তা হৃদয়ঙ্গম করার জিনিস — এই ভেবে তিনি লিখতে বসতেন। তাঁর লেখা পূর্বনির্ধারিত নয়। তাঁর নিজের জীবন ছিল পরীক্ষাগার, তিনি অন্যকেও ভাবতেন পরীক্ষার বিষয়বস্তু। অসমবয়সী একটি তরুণীর সাথে প্রেম করে তিনি শেষ বয়সে একটি প্রেমের উপন্যাস লেখা শুরু করেন। সেখানেই আমাদের ভুল বোঝাবুঝি, সেখানেই আমাদের শীর্ষারোহণ। আমার গর্ব হয়, এই মানুষের সঙ্গে আমি কালীঘাট থেকে হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছি। জগুবাবুর বাজারে আমের দরদাম করেছি, এবং তিনি সস্নেহে বলেছেন “তোর কিস্যু হইব না।”

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.