সাল ১৯৬৯।

লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে আমেরিকার সঙ্গে তুলনামূলক কম খারাপ সম্পর্ক যে দেশের, সেই দেশের এক কালো ভদ্রলোক এক অদ্ভুত কান্ড করে বসলেন। নিজের ১০০০তম গোলটি করলেন এডসন অরান্তেস দো নাসিমেন্তো। দেশের নাম ব্রাজিল, এই ফুটবলারকে আমরা চিনি পেলে বলে। সারা বিশ্ব চমকে উঠল।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ওই বছর তার আগেই আমেরিকাও ঘটিয়েছে আরেক অবাক কান্ড। চাঁদের বুকে মানুষের প্রথম প্রতিনিধি হয়ে পা রেখেছেন নীল আর্মস্ট্রং এবং এডুইন অলড্রিন।

অনায়াস যুগসন্ধিক্ষণ।

দুটো সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী অর্থনীতির দেশের ঘটনা।

এবার আসা যাক, বক্তব্যে, যার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এই একই বছর — ১৯৬৯।

তবে ১৯৬৯ সালে এসে পৌঁছানোর আগে আরও কিছুটা পিছিয়ে যেতে হবে — দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে, সারা বিশ্বের পঙ্গু হয়ে যাওয়া অর্থনীতিকে সঞ্জীবনী দিলেন জনৈক অর্থনীতিবিদ। বললেন, অর্থনীতির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণের কথা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ মৌলিক পরিষেবা রাষ্ট্রায়ত্ত করার কথা। তাঁর নীতির ছত্রে ছত্রে খোদাই করা রইল ‘স্টেট অফ ওয়েলফেয়ার’-এর নীল নকশা।

সেই অর্থনীতিবিদ, পরবর্তীকালে ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের ডিরেক্টর, জন মেনার্ড কেইনস সেইসময় বলেছিলেন, “ভারতের মত এত বিপজ্জনক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা চালু আছে যে দেশে, তাদের অত্যন্ত সাবধানে ব্যাঙ্কিং চালানো উচিত। এবং সেটা ভারতের জন্য অবশ্যপ্রয়োজনীয়ও বটে।”

১৯৬৯ সালে জাতীয়করণের আগে পর্যন্ত ৫০ বছরে ভারতে দেউলিয়া হয়ে উঠে যাওয়া ব্যাঙ্কের সংখ্যা মাত্র ১,৮০০টি। ব্যাঙ্ক ফেল তখন আক্ষরিক অর্থেই ‘সাপ্তাহিক ঘটনা’।

কিন্তু ইতিহাসের চাকা ঘোরে। ১৯৭০-এর বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি সহ আরও নানা ঘটনায় মার্গারেট থ্যাচার, রোনাল্ড রেগান সহ নানা রাষ্ট্রপ্রধানের অঙ্গুলিহেলনে তখন বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হচ্ছে নিও লিবারেল অর্থনীতি, যে অর্থনীতির নীল নকশায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ সমস্তটাই হয়ে উঠছে পণ্য। সবটাই খোলা বাজার। পুঁজিবাদের আসল খেলা।

সেই সময় ভারতীয় উপমহাদেশে ঘটছে সব উল্টো রকমের ঘটনা।

বছর সেই ১৯৬৯।

পূর্ব পাকিস্তানে হচ্ছে গণ অভ্যুত্থান। পশ্চিমের একতরফা খবরদারির বিরুদ্ধে এককাট্টা লড়াই।

আর প্রতিবেশী দেশ তখন প্রথম বিশ্বের নিও লিবারেল অর্থনীতির বদলে আঁকড়ে ধরতে চাইছে জন মেনার্ড কেইন্সের তত্ত্বকেই। আর সেই তত্ত্ব আঁকড়ে ধরতে গিয়ে পদত্যাগ করতে হচ্ছে অর্থমন্ত্রীকে।

কিন্তু তা সত্ত্বেও ১৯৬৯ এর ১৯শে জুলাই, শনিবার, এক লপ্তে ১৪টি ব্যাঙ্কের জাতীয়করণ হয়ে যাচ্ছে। যা ১৯৮০-তে গিয়ে আরও ৬টি ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের রাস্তা তৈরী করছে। রাতারাতি স্পেশাল অর্ডিন্যান্সে সই করছেন রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি।

ঠিক যে সময়ে ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ হচ্ছে, সেই সময়ে ভারতে সেই অর্থে প্রায়োরিটি সেক্টর লেন্ডিং অনেকটা ‘আচ্ছে দিন’-এর মতো। পুঁজিপতিদের চা বাগান এবং কফি বাগিচায় কফি চাষের জন্য মঞ্জুর হওয়া ঋণকে ব্যাঙ্কগুলো তখন পরিচয় দিত কৃষিঋণ হিসাবে। কৃষিপ্রধান অর্থনীতির ভারতবর্ষে কৃষকের ব্যাঙ্কে প্রবেশাধিকার ছিল না। সিনেমা যেমন অনেকসময় সমকালের আয়না হয়ে ওঠে, তেমনই মাদার ইন্ডিয়া-র সুখী লালা চরিত্রটি সেই সময়ের সন্তান।

কৃষকের ব্যাঙ্ক ছিল না, কিন্তু সুখী লালারা ছিলেন। উচ্চ সুদে টাকা নিয়ে যে জমিতে ফসল ফলাতেন কৃষক, সেই ফসল আবার রাখতে হত কোন আড়তদারের ঠান্ডা ঘরেই।

তথ্যের স্বার্থে লিখে রাখা যাক, বিড়লাদের নিজস্ব ব্যাঙ্ক ছিল ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাঙ্ক, টাটাদের নিজস্ব ব্যাঙ্ক ছিল সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক, এমনকি খোদ ব্রিটিশ সরকার বাহাদুরেরও নিজের ব্যাঙ্ক ছিল, অত্যন্ত সুচারু রূপে একটি ভারতীয় শহরের নামে, এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক। সেই এলাহাবাদ যা আজকের প্রয়াগরাজ। প্রত্যেকেই সাধারণের টাকা ব্যাঙ্কে রেখে সেই টাকায় নিজস্ব পুঁজির বিস্তার করতেন। নিজেদের ব্যবসায় খাটত জনগণের টাকা। অতএব সাধারণের হাতে রইল কী? কিচ্ছুটি না।

অদ্ভুত এই প্রহেলিকা থেকে ভারতীয় নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মুক্তি শুরু হয় ১৯৬৯ সালে ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের সময় থেকে। সরাসরি কৃষিঋণ থেকে শুরু করে শিক্ষাঋণ, নিম্ন ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়া আরম্ভ হয়। ক্রমশ সুফল মিলছিল। কৃষিক্ষেত্রে ঋণের হার ২% থেকে বেড়ে হল ২১%, প্রত্যন্ত গ্রামে পৌঁছলো ব্যাঙ্ক।

আক্ষরিক অর্থেই ভারতীয় অর্থনীতি ক্লাস থেকে মাসের কাছে পৌঁছতে শুরু করল।

কাট টু ২০০৮। অর্থনৈতিক সুনামির সময়।

গ্রীসের সবকটা ব্যাঙ্ক ধসে যাচ্ছে যে সময়, যুক্তরাষ্ট্রীয় বড়দা নিজের দেশের অর্থনীতি নিয়ে বিপর্যস্ত যে সময়ে, এক সময়ের বিপজ্জনক অর্থনীতির দেশ ভারতে সেই অর্থে আঁচটুকুও এসে পৌঁছয়নি, স্রেফ খাতায় কলমে সম্পূর্ণ নিও লিবারেল অর্থনীতি হয়ে যায়নি বলেই। ‘স্টেট অফ ওয়েলফেয়ার’-এর ধারণাকে তখনো সম্পূর্ণ কবর দেওয়া হয়নি বলেই। আমেরিকার বিখ্যাত বিমা কোম্পানি এআইজি বা আমেরিকান ইনশিওরেন্স গ্রুপ রাতারাতি ধ্বসে গেছিল যে সময়, ভারতের নব্বই দশকের টিন এজারের দূরদর্শনে তখন নিয়মিত নিশ্চিন্ত বিজ্ঞাপন ছিল “জিন্দেগী কে সাথ ভি, জিন্দেগী কে বাদ ভি।”

কাট টু ২০২০-২১।

ভয়াবহ করোনাকালে বিপর্যস্ত অর্থনীতি নিয়ে নাস্তানাবুদ প্রত্যেকটি দেশ। পূর্বসুরী মার্গারেট থ্যাচারের প্রচারিত তথ্যের ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতে বক্তব্য রাখেন বর্তমানে গ্রেট ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী। নিও লিবারেল অর্থনীতির অন্ধ প্রচারক ফিনানশিয়াল টাইমসের ৪ঠা জুলাইয়ের সম্পাদকীয় হঠাৎ করেই আবার কেইনসের তত্ত্বের প্রচারক হয়ে উঠেছে। তারা লিখছে, “গত চার দশকের চালিকা নীতিগুলির র‍্যাডিকাল পরিবর্তন দরকার। সরকারকে অর্থনীতির ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। পাবলিক সার্ভিসে দায়বদ্ধ হতে হবে। শ্রমের নিরাপত্তা দিতে হবে। ধনীদের সুবিধাজনক নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। সর্বনিম্ন আয় এবং সম্পদ করের মতো বিষয়গুলিও আলোচনায় আসা দরকার।”

ঠিক যে সময়ে নিও লিবারেল নীতি থেকে দূরত্ব বাড়াতে শুরু করছে প্রথম বিশ্বের দেশগুলো, ঠিক সেইসময়ে ফেব্রুয়ারির পয়লা তারিখে ইউনিয়ন বাজেটে ভারতের অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করছেন, ব্যাঙ্ক বেসরকারীকরণের সিদ্ধান্ত!

সেই সিদ্ধান্তের পিছনে বড় কারণ হিসাবে দেখানো হচ্ছে ব্যাঙ্কগুলোর দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থাকে এবং বিপুল নন পারফর্মিং অ্যাসেটের বোঝাকে। অর্থনীতির হিসাবে যার ৯০% ভাগীদার কর্পোরেটরা এবং মাত্র ২%-এরও কম সাধারণ ভারতবাসী।

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসা কেন্দ্রীয় শাসক দল সরকারী ব্যাঙ্কগুলোর তথাকথিত বড়, অর্থাৎ কর্পোরেট এনপিএ, মোকাবিলার জন্য নিয়ে এসেছিল আইবিসি অর্থাৎ ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাঙ্করাপ্সি কোড। দ্বিতীয়বার বিপুল সমর্থনে ফিরে আসা সেই সরকারের অর্থমন্ত্রী গতবছর করোনা বিধ্বস্ত অর্থনীতি সামাল দেওয়ার কথা বলতে গিয়ে মে মাসে এই কোডের সারবত্তা বুঝিয়েছেন। সেখানে সরাসরি স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে ২২১টি কেসে ৫৬% ঋণ সরাসরি মকুব করে দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ ব্যাঙ্কগুলোর ব্যালেন্স শিটে ওই ঋণের আর অস্তিত্ব নেই। এরকম অস্তিত্বহীন ঋণের পরিমাণ ২.২৯ লক্ষ কোটি টাকা। বাকি ৪৪% উদ্ধারযোগ্য হলেও তা অংশত উদ্ধারযোগ্য। অর্থাৎ জনগণের যে বিপুল টাকা তথাকথিত কর্পোরেটদের ঋণ হিসাবে দেওয়া হয়েছিল, তার ৫৬%-এর সরাসরি হিসাব ব্যাঙ্কের ব্যালেন্স শিটে আর নেই।

তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হল, এই হিসাব নেই হয়ে যাওয়ার ফলস্বরূপ ব্যাঙ্কগুলোর ব্যালেন্স শিটের আমূল পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে, স্রেফ বিউটিফাইং ব্যালেন্স শিটের কথা মাথায় রেখেই। যে ব্যাঙ্কের ব্যালেন্স শিট যত ভাল, তার শেয়ার তত ভাল। এবং আরও ভাল সেই শেয়ার বিক্রির পদ্ধতি। যাঁরা ঋণখেলাপি হলেন, তাঁদের কাছেই ব্যাঙ্কগুলোর শেয়ার বিক্রি করা হবে ব্যাঙ্ক বাঁচানোর উদ্দেশ্য নিয়ে।

জনগণের টাকা উদ্ধারের ঐকান্তিক চেষ্টা থাকলে সবার প্রথমে প্রশ্ন ওঠা উচিত ছিল আইবিসি কিম্বা অ্যাসেট রিকনস্ট্রাকশন কোম্পানির বিরুদ্ধেই।

২০১৪ সালে একজন সিনিয়র সিটিজেন অবসরের পর তাঁর সঞ্চিত মাসিক আয় প্রকল্পে ১ লক্ষ টাকায় পেতেন ৯০০ টাকা, বর্তমানে পান ৬৬০ টাকা। অর্থাৎ গত সাত বছরে আয় কমেছে ৩০ শতাংশ। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধির হার লাগামছাড়া।

অক্সফ্যামের ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী ভারতের মোট সম্পদের ৭৫%-ই রয়েছে দেশের সবচেয়ে বিত্তশালী ১০%-এর কাছে।

বারংবার বেসরকারী হলে পরিষেবা ভাল হওয়ার আশ্বাস হাওয়ায় ভাসিয়ে দেওয়া দেওয়া হলেও, সরকারী হিসাব মত ২০১৪ সালে শুরু হওয়া জনধন যোজনার ৯৬% খোলা হয়েছিল সরকারী ব্যাঙ্কে, অ্যাকাউন্ট পিছু খরচ হয়েছিল ১২৭ টাকা। এই টাকা খরচ হয়েছিল ব্যাঙ্কের ঘর থেকে, সরকার কোনো খরচ বহন করেনি। মাত্র ৪% দিয়ে দায় সেরেছিল বেসরকারি ব্যাঙ্ক। ভারতীয় অর্থমন্ত্রীর দেওয়া অতি সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী ‘ইনঅপারেটিভ’, অর্থাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া এই ধরনের অ্যাকাউন্টের সংখ্যা সাড়ে ১১ কোটি।

এরপরেও সচেতন না হলে, কোনো ছদ্মনাম দিয়ে ভারতীয় অর্থনীতিকে বাঁচানো মুশকিল। ‘প্রাইভেটাইজেশন’ থেকে ‘ন্যাশনাল মনেটাইজেশন প্ল্যাটফর্ম’ নাম বদলের মতো করেই পুঁজিবাদও রূপ বদল করে। ২০২১ সালে এসে ক্রোনি ক্যাপিটালিজমকে অতি দ্রুত শনাক্ত করে উঠতে না পারলে সাইড বেঞ্চে বসে সুখী লালার সঙ্গে অসম লড়াইয়ে মাদার ইন্ডিয়াকে হারতে দেখা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না।

Leave a Reply