এক পুত্র আর এক পিতার গল্প বলি। প্রথম জনের বাবা খুন হয়েছিলেন গোরক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ মানুষদের হাতে, দ্বিতীয় জনের ছেলে খুন হয়েছিল দাঙ্গাবাজদের হাতে। দ্বিতীয় জনকে আমরা সবাই চিনি — আসানসোলের নূরানী মসজিদের ইমাম ইমদাদুল রশিদি। প্রথম জনের নাম অভিষেক সিং। একবিংশ শতাব্দীতে শোকের আয়ু এক বছরও নয়। অতএব মনে করিয়ে দেওয়া যাক, অভিষেকের বাবা সুবোধ কুমার সিং ছিলেন উত্তরপ্রদেশ পুলিসের ইন্সপেক্টর, একসময় দাদরির আখলাক আহমেদের খুনের ঘটনার তদন্ত করছিলেন। ইমামের ছেলে সিবগাতুল্লা খুন হয়েছিল ২০১৮ মার্চের দাঙ্গায়, ওই বছরেরই ৩ ডিসেম্বর উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহরের এক অঞ্চলে একটি গরুর মৃতদেহ নিয়ে গোহত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে জনতা উন্মত্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে সুবোধ গুলিবিদ্ধ হন। ইমাম রশিদিকে আমরা মনে রেখেছি দাঙ্গার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পুত্রশোক অগ্রাহ্য করে হিন্দু-মুসলমান মৈত্রীর বার্তা দেওয়ার জন্য। মুসলমানদের দিক থেকে বদলা নেওয়ার চেষ্টা হলে আসানসোল ত্যাগ করবেন বলার জন্য। সুবোধপুত্র অভিষেকও পিতৃশোকের মাঝেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছিলেন, বলেছিলেন বাবা শিখিয়ে গেছেন হিন্দু মুসলমান আলাদা নয়। ভারতীয়দের ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত। যেন এমন না হয় যে বহিঃশত্রুর দরকারই হল না, ভারতীয়রা নিজেরাই নিজেদের সর্বনাশ করে বসল।

কদিন হল ইমাম রশিদি আবার সংবাদের শিরোনামে এসেছেন পুত্র সিবগাতুল্লার খুনের মামলায় সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করার জন্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির স্বার্থে এত বড় ত্যাগ দেখে প্রশংসার বন্যা বয়ে যাচ্ছে, সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের ধর্মনিরপেক্ষ আমরা আপ্লুত। এই তো আমাদের দেশ, ইমামের মত লোকেরাই তো আমাদের আশার আলো, ইত্যাদি বয়ানে সংবাদপত্রের প্রথম পাতা থেকে ফেসবুক ওয়াল পর্যন্ত সবই মুখরিত। একটি সংবাদপত্রে সরকারপক্ষের উকিলের বিবৃতিও বেরিয়েছে। তিনি বলেছেন চার দশকের বেশি ওকালতির অভিজ্ঞতায় কখনো কোনো মৃতের বাবাকে এমন অবস্থান নিতে দেখেননি। যদিও ইমাম সাহেবের এমন আচরণ মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়। সিবগাতুল্লার হত্যার পরেই তিনি বলেছিলেন যে একজন হত্যাকারীকে ধরতে পেরেও ছেড়ে দিয়েছেন

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সুবোধ কুমারের ছেলে অভিষেক এবং পরিবারের বাকি সদস্যরা কিন্তু এত মহান নন। আর পাঁচটা খুনের মামলার মত করেই সে মামলা এগোচ্ছে। দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া কাগজের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, সুবোধের খুনে অভিযুক্ত ৪৪ জনের মধ্যে ৩৬ জনের বিরুদ্ধে পুলিস দেশদ্রোহ আইনে মামলা করার অধিকার পেয়েছে এ বছরের ১৬ মার্চ। শোনামাত্রই কেউ কেউ সিদ্ধান্ত করতে পারেন, যোগীর রাজ্যে ন্যায়বিচার হচ্ছে। কিন্তু ঘটনা হল অভিযুক্তদের মধ্যে মাত্র ছজন জেলে আছে, বাকি সকলেই জামিনে বাইরে। প্রধান অভিযুক্ত বজরং দলের সদস্য যোগেশ রাজও শুরুতেই এলাহাবাদ হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বাগড়া দেওয়ায় তার বেরিয়ে আসা হয়নি। বুলন্দশহরের পুলিস এফ আই আর করার সময়েই খুন, হিংসা এবং দেশদ্রোহিতার (সেকশন ১২৪এ) অভিযোগ এনেছিল। কিন্তু পরে আদালত শেষেরটি বাদ দেয়, কারণ রাজ্য সরকারের কাছ থেকে অনুমোদন পাওয়া যায়নি। সে অনুমোদন পাওয়া যায় ২০১৯ সালের জুন মাসে। তারও প্রায় তিন বছর পরে বুলন্দশহর জেলা আদালত এই অভিযোগ অনুমোদন করেছে। অথচ সারা দেশে কয়েকশো মানুষ, যাঁদের একটা বড় অংশ মুসলমান, এই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে কারাবাস করছেন। এদের মধ্যে সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পান, ছাত্রনেতা উমর খালিদ, শার্জিল ইমাম আছেন। অশীতিপর ফাদার স্ট্যান স্বামী তো শুনানি ছাড়াই জেলের মধ্যে মারা গেলেন। পারকিনসন্স ডিজিজে আক্রান্ত মানুষটির জন্য তাঁর আইনজীবীরা সামান্য জল খাওয়ার স্ট্রয়ের আবেদন করেও সফল হননি।

অথচ ভারতের বিচারব্যবস্থা কিন্তু অমানবিক নয়। এই তো গতকাল দিল্লির এক আদালত ওঙ্কারেশ্বর ঠাকুরকে জামিন দিয়েছে মানবিকতার কারণে। ওঙ্কারেশ্বর সুল্লি ডিলস বলে একটি অ্যাপ তৈরি করায় অভিযুক্ত, যে অ্যাপে মুসলমান মহিলাদের কাল্পনিক নিলাম করা হয়েছিল। বিচারক ওঙ্কারেশ্বরকে জামিন দিয়ে বলেছেন, অভিযুক্তের এটা প্রথম অপরাধ। তাকে দীর্ঘদিন আটকে রাখলে তার শরীর স্বাস্থ্যের উপর খারাপ প্রভাব পড়তে পারে।

এ তো পাতিয়ালা হাউস কোর্টের এক বিচারকের মন্তব্য। দেশের হাইকোর্টগুলো পর্যন্ত অত্যন্ত মানবিক। গত শনিবার দিল্লি হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর আর পরবেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তৃতার (হেট স্পিচ) অভিযোগে দায়ের হওয়া পিটিশনের উত্তরে বলেছে, কোনো কথা হেসে বললে অপরাধ হয় না। তাছাড়া ভোটের সময়ে বিদ্বেষমূলক কথা বললেও ক্ষতি নেই।

অর্থাৎ ক্ষেত্র বিশেষে বিচারকরা অত্যন্ত উদার, অত্যন্ত মানবিক। তবে সব ক্ষেত্রে অতটা হওয়া যায় না। ইমাম সাহেবের মত লোকেদের, ভারতের সংখ্যালঘুদের এই তারতম্য বুঝে না নিয়ে উপায় নেই। বিশেষত আজকের ভারতে মহান হওয়া সংখ্যাগুরুর কাছে একটি বিকল্প, সংখ্যালঘুর একমাত্র উপায়। আমাদের মধ্যে যাদের ইমাম সাহেবের প্রশংসা করতে গিয়ে আবেগে গলা বুজে আসে, তারা বুঝতে পারি না যে তিনি ছেলের খুনিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে, তাদের শাস্তি হলে মুহূর্তে সোশাল মিডিয়ার সাহায্যে কেবল আসানসোল কেন, গোটা দেশে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে পড়তে পারে। দ্য কাশ্মীর ফাইলস-এর চেয়েও দ্রুত প্রতিক্রিয়া হবে। এ দেশ এখন নরকের দক্ষিণ দুয়ারে পৌঁছে গেছে। এখানে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে গণহত্যার ডাক দেওয়া যায়, মুখে হাসিটি থাকলেই হল। এসব আমরা বুঝি না বলেই আসানসোল দাঙ্গার অগ্রণী নেতা বাবুল সুপ্রিয়র তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে ভোটে দাঁড়ানোর বিরুদ্ধে ইমাম বিবৃতি দিলেন না বললে আমাদের গোঁসা হয়। আমরা কিছুতেই বোঝার চেষ্টা করি না, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের চোখের সামনে এখন এমন কোনো বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি নেই, যারা দাঙ্গার সময়ে তাঁদের ঢাল হয়ে উঠবে বলে ওঁরা আশা করতে পারেন। রাজ্যের সর্বময় কর্ত্রীর উদ্দেশে “সকলি তোমারি ইচ্ছা, ইচ্ছাময়ী তারা তুমি” গাওয়া ছাড়া ইমাম সাহেবদের সামনে কোনো পথ খোলা নেই। ধর্মনিরপেক্ষ সংখ্যাগুরুর সামাজিক নিষ্ক্রিয়তা এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তাই তাঁদের বাধ্যতামূলক মহানতার একাকিত্বে বন্দি করেছে।

আরো পড়ুন

হ্যাঁ, সব ঠিক হয়ে গিয়েছে, মাননীয় বাবুল সুপ্রিয়

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.