বিহার বিধানসভা নির্বাচনের বেশি দেরি নেই। এমন একটা সময়ে গত ৩০ এপ্রিল নরেন্দ্র মোদীর সরকার হঠাৎ করেই ঘোষণা করেছে যে, দেশে এবার জাতভিত্তিক জনগণনা বা বর্ণশুমারি করা হবে। এই বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির সঙ্গে বিরোধী দলগুলির সংঘাত চলছিল। বিরোধীরা, বিশেষ করে রাহুল গান্ধী, দাবি করেছিলেন যে একমাত্র বর্ণশুমারি করলেই এটা বোঝা যাবে যে, উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের তুলনায় তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দুরা শিক্ষা, সম্পদ, চাকরি প্রভৃতি ক্ষেত্রে আজকের ভারতেও কতটা বঞ্চিত। বিজেপি নেতারা অবশ্য গলার শির ফুলিয়ে বলে এসেছেন, বিরোধীদের এই দাবি আসলে হিন্দু ঐক্যে ভাঙন সৃষ্টি করবে এবং সমাজের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের এই আকস্মিক ঘোষণা স্বাভাবিকভাবেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিরোধীরা অনেকেই এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এই ঘোষণা তাঁদেরই আন্দোলনের ফল। তারই প্রভাবে বিজেপি বাধ্য হয়েছে বর্ণশুমারি মেনে নিতে। অন্যদিকে কেউ কেউ এই ঘোষণাকে বিহার বিধানসভা নির্বাচন জেতার লক্ষ্যে মোদীর সুচতুর ‘স্টান্ট’ বলেও মনে করছেন।

বিহারের ভোট অবশ্যই মোদী তথা বিজেপির এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাথাব্যথা। উত্তর ভারতের প্রায় সমস্ত রাজ্যের মত বিহারের রাজনীতিতেও জাতি, বর্ণের সংঘাত একটা অন্যতম প্রধান বিষয় বরাবরই। আমাদের রাজ্যের বাঙালি ভদ্রসমাজ প্রায়শই যাকে ‘জাতপাতের রাজনীতি’ বলে ব্যঙ্গ করে, বিহারে তা এক অনিবার্য বাস্তবতা। উত্তর ভারতই ভারতে বর্ণবিভাজনের মধ্যে দিয়ে শ্রেণিবিভাজনের সুতিকাগার। ফলে এখানে জাতিবর্ণের সংগ্রাম যে আদতে শ্রেণিসংগ্রাম – তা বোঝার ক্ষমতা কোনোকালেই বাঙালি মধ্যবিত্ত কমিউনিস্টদের ছিল না। যা-ই হোক, জাতিবর্ণের সংগ্রামকে না বুঝে বিহারের রাজনীতিকে সম্পূর্ণভাবে আত্মস্থ করা সম্ভব নয়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

স্বাধীনতার পর থেকে বিহারের রাজনীতিতে কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকলেও ১৯৯০ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক দলগুলির ক্ষমতা বাড়তে থাকে। ১৯৯০ নির্বাচনে লালুপ্রসাদের নেতৃত্বে জনতা দল ক্ষমতায় আসে এবং পরবর্তী ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকে। তার আগে দুবার বিহারে অকংগ্রেসি সরকার ক্ষমতায় এসেছিল বটে (তার মধ্যে ১৯৭৭ সালে দেশব্যাপী জনতা পার্টির ঝড়ের সময়ে বিহারে তাঁদের সরকার হয়), কিন্তু টানা দেড় দশক আঞ্চলিক দল বা অকংগ্রেসি সরকারের ক্ষমতায় থাকা সেই প্রথম। প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক বিশ্লেষক এই প্রশ্নে একমত যে, এর পিছনে ছিল বিহারে দীর্ঘদিনের অবদমিত তথাকথিত ‘পিছড়ে জাত’ বা পিছিয়ে পড়া জাতিবর্ণ সম্প্রদায়গুলির পালটা ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। লালু তাঁদের আর কিছু দিতে পারুন বা না পারুন, তাঁদের আত্মসম্মান, অস্মিতা আর অধিকার প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলেন। একথা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মানুষ বুঝতে পেরেছিলেন। বিহারে দীর্ঘদিন এই তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষগুলি ভোটাধিকার পর্যন্ত প্রয়োগ করতে পারতেন না। লালু তাঁদের সেই অধিকার অর্জন করতে সাহায্য করেছেন বলে তাঁরা মনে করেছিলেন। কংগ্রেসের উচ্চবর্ণের শাসনকে প্রত্যাখ্যান করে বিহারে অভ্যুদয় হয়েছিল এক নতুন রাজনীতির।

আরো পড়ুন বর্ণশুমারি কৌশল থেকে মতাদর্শ হয়ে উঠলে তা বিজেপির শেষের শুরু

ওরই মধ্যে ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদে হামলা ও ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে সারা দেশেই বিজেপির শক্তিবৃদ্ধি ঘটতে শুরু করে। বিহারেও তার অন্যথা হয়নি। বিজেপির রাজনীতি প্রথম থেকেই ছিল হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি, যার সঙ্গে দলিত আত্মসম্মানকেন্দ্রিক বিহারের আঞ্চলিক দলগুলির টানাপোড়েন ও দ্বৈরথ প্রথম থেকেই তৈরি হয়েছিল। আবার একই সঙ্গে এই দুইয়ের মধ্যে সময় সুবিধামত বোঝাপড়াও হয়েছে। একথা খুবই পরিষ্কার যে, বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি, যা সমস্ত হিন্দুকে ঐক্যবদ্ধ হতে বলে, তা যদি জোরদার হয় তাহলে জনতা দল বা রাষ্ট্রীয় জনতা দলের দলিত রাজনীতির আর কোনো জায়গা থাকে না। সুতরাং এই দুইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকাই স্বাভাবিক। আবার অন্যদিকে, বিহারে দলিত রাজনীতিকে যাঁরা মুখ্যত নেতৃত্ব দেন, সেই লালুপ্রসাদ বা নীতীশ কুমারের দলগুলির উদ্ভবের বীজ পুরনো জনতা পার্টির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে। ১৯৭৭ সালে এই জনতা পার্টি তৈরি হয়েছিল পুরনো ধারার কিছু সোশালিস্ট, দক্ষিণপন্থী কয়েকটি দল এবং হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী পার্টি জনসঙ্ঘের অভূতপূর্ব মিলনের মধ্যে দিয়ে। সেই বছরের সাধারণ নির্বাচনে এরা জরুরি অবস্থা জারি করে কুখ্যাত হওয়া ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসকে হারিয়ে দেশের ক্ষমতায় আসে। ১৯৮০ সালে বিজেপি প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগে পর্যন্ত এই জনসঙ্ঘই ছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের প্রকাশ্য রাজনৈতিক দল। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে, লালুপ্রসাদ বা নীতীশের দলগুলির সঙ্গে বিজেপির এক ধরনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক যোগসূত্র ছিল।

বর্তমানে বিহারে লালুপ্রসাদের দলিত রাজনীতির সবথেকে শক্তিশালী প্রবক্তা হলেন নীতীশ। ২০২০ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জোট এনডিএ কান ঘেঁসে জেতে। খুবই সামান্য আসনের ব্যবধানে তারা ‘মহাগঠবন্ধন’-কে পরাজিত করে। বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠে ফলাফল নিয়ে কারচুপি করার অভিযোগ। নীতীশ আদতে ছিলেন মহাগঠবন্ধনের শরিক। ২০১৫ সালের নির্বাচনে সেই জোট বিজেপি জোটকে বড় ব্যবধানে হারাতে সক্ষম হয়। কিন্তু তারপর থেকে নীতীশ ক্রমাগত মহাগঠবন্ধন থেকে বেরিয়ে যাওয়া এবং ফিরে আসা, আবার বেরিয়ে যাওয়ার খেলা খেলে চলেছেন। বর্তমানে তিনি বিহারে বিজেপির বড় ভরসা শুধু নন, কেন্দ্রের সরকারেরও অন্যতম খুঁটি। তাঁকে তুষ্ট করে চলা বিজেপির রাজনৈতিক দায়। বর্ণশুমারি নীতীশের একান্ত গুরুত্বপূর্ণ দাবি, যা নিয়ে তিনি তাঁর ভোটারদের কাছে দায়বদ্ধ। ২০২৩ সালে মহাগঠবন্ধনে থাকার সময়ে নীতীশের সরকার বিহারে বর্ণশুমারি সম্পন্ন করে ফলাফলও ঘোষণা করেছিল। সামনেই বিহারের নির্বাচন। নীতীশকে খুশি রাখতে না পারলে বিজেপির সমূহ বিপদ। এই বিপদ শুধু বিহারেই নয়, সর্বভারতীয় ক্ষেত্রেও। জাতভিত্তিক ভোটগণনা নিয়ে এনডিএ শরিকদের চাপ বিজেপির পক্ষে অগ্রাহ্য করা শেষপর্যন্ত সম্ভব হয়নি। তদুপরি, গোটা বিরোধী শিবিরও এই প্রশ্নে এককাট্টা হয়ে রয়েছে। ফলে অনেক ঝুঁকি সত্ত্বেও বিজেপিকে এতে রাজি হতে হয়েছে – এমনই অনুমান প্রায় সকলের।

বিহারের ভোট যে বিজেপির কাছে গুরুত্বপূর্ণ তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু বর্ণশুমারিতে রাজি হওয়ার পিছনে বিজেপির আরও বড় দায় আছে। গত দশ বছরের রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে দিয়ে বিজেপি বুঝতে পেরেছে, তাদের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির দুর্যোধনের উরু হল জাতের প্রশ্ন। এই প্রশ্নে যদি ফাটল রয়ে যায়, তাহলে তা হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার রাজনীতির সামনে ভবিষ্যতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বর্ণশুমারিতে যদি তারা একেবারেই রাজি না হয় তাহলে তা অনেক বেশি বিপজ্জনক। বরং এই প্রশ্নে কৌশলী পদক্ষেপ নেওয়া তাদের পক্ষে অনেক কম ঝুঁকির। জাতগণনার সিদ্ধান্ত নেওয়া, কিন্তু তা আন্তরিকভাবে, সর্বশক্তি দিয়ে লাগু না করাই বিজেপির পক্ষে একমাত্র কার্যকরী পদক্ষেপ হতে পারে। এতে সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না। শাসকশ্রেণি এই ধরণের পদক্ষেপে হাত পাকিয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। সুতরাং বিজেপি হয়ত আত্মবিশ্বাসী যে এভাবেই তারা দিন কাটিয়ে দিতে পারবে। পাশাপাশি উগ্র জাতীয়তাবাদের অস্ত্র তো আছেই। তা তাদের অনেক দুর্বলতাই ঢেকে দিতে সক্ষম।

এখন দেখার বিষয়, বর্ণশুমারি আদতে কার অস্ত্র হয়ে ওঠে – বিরোধীদের, নাকি বিজেপির? আগামীদিনে এই প্রশ্নে যে খুবই কৌতূহলোদ্দীপক রাজনীতি দেখা যাবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.