তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকালে বাংলায় নতুনভাবে ফিরে এসেছে জায়গীরদার প্রথা, তৈরি হয়েছে নব্য সামন্তপ্রভুরা। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায়, বিভিন্ন ব্লকে এদের রাজত্ব। তৃণমূল দলের সর্বোচ নেতৃত্ব, সর্বোচ কাঠামোকে উপযুক্ত পরিমাণ কাটমানি দিয়ে এরা নিজের নিজের তালুকে স্বাধীন রাজত্ব কায়েম করেছে। এদের প্রভাব এতটাই যে পুলিস প্রশাসন এদের আজ্ঞাবহ। এই সামন্তপ্রভুদের ভয়ে পুলিস কাঁপে। কোথাও এদের নাম অনুব্রত মণ্ডল, কোথাও হুমায়ুন কবীর, কোথাও আরাবুল ইসলাম বা অর্জুন সিং, কোথাও শাহজাহান।
উত্তর ২৪ পরগনার দুর্গম দ্বীপাঞ্চল সন্দেশখালি বিধানসভার বেতাজ বাদশা শাহজাহান। ওই বিধানসভা কেন্দ্রে তিনিই তৃণমূলের একনায়ক। তৃণমূল দলের সন্দেশখালি ১ নং ব্লক সভাপতি। উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ শাহজাহানের প্রভাব এতটাই যে গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে তাঁর ভয়েই সন্দেশখালি ১ ও ২ নং ব্লকে ভোট হয়নি বললেই চলে। মানুষ পাচার, গরু পাচার, কাঠ পাচারে অভিযুক্ত শাহজাহানের উত্থান জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের হাত ধরে। নিজের এলাকায় দানধ্যানকারী হিসাবে পরিচিত শাহজাহানের দলের উপরতলায় যোগাযোগ ঈর্ষণীয়। ২০২১ সালে ইয়াস বিধ্বস্ত সন্দেশখালির সরবেড়িয়ায় ত্রাণ বিলি করতে গিয়ে শাহজাহান বাহিনীর হাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন তৃণমূল সরকারেরই মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী। সেই সময় সিদ্দিকুল্লা মন্তব্য করেন ‘শাহজাহান বলে যে নেতা রয়েছেন, তিনি গুণ্ডা, সমাজবিরোধী।’ নিজের দলের মন্ত্রীকে শারীরিক নিগ্রহ করার পরেও শাহজাহানের রমরমা কমেনি। শুভেন্দু অধিকারী, জ্যোতিপ্রিয়, অভিষেক ব্যানার্জি – সবার হাত তাঁর মাথায়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
রেশন দুর্নীতি কাণ্ডে প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় গ্রেফতার হওয়ার পরেই শাহজাহানের নাম বিশেষভাবে সামনে এসেছে। গত ৫ জানুয়ারি ২০২৪, রেশন দুর্নীতি মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি কাকভোরে সন্দেশখালিতে উপস্থিত হয়। ইডির সঙ্গে ছিল কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী। ইডি সেদিন শাহজাহানের নাগাল পায়নি। কিন্তু সেই সকালেই হাজার দুয়েক শাহজাহান অনুগামী সেখানে উপস্থিত হয়ে ইডি এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করে। হয়ত কৌশলগত কারণেই কেন্দ্রীয় বাহিনী প্রতিআক্রমণ করেনি। তারপর থেকেই শাহজাহান বেপাত্তা। কেন্দ্রীয় বাহিনী বা রাজ্য পুলিস – কেউ তাকে খুঁজে বের করতে পারছে না। সেদিন কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ফিরে আসতে হলেও, পরবর্তীকালে শাহজাহানকে ধরতে না পারার মধ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পুলিশের ব্যর্থতার চেয়েও বড় করে উঠে আসছে তৃণমূল-বিজেপির সেটিং তত্ত্ব। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠা উচিত, ইডি যেখানে সারা দেশে বিজেপিবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে সক্রিয়; বিহারে লালুপ্রসাদ, তেজস্বী যাদব, মহারাষ্ট্রে সঞ্জয় রাউত, দিল্লিতে মনীশ সিসোদিয়া, মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন সমেত একাধিক বিরোধী নেতার বিরুদ্ধে তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ চালাচ্ছে, সেখানে এই রাজ্যের শাসকদলের বিরুদ্ধে ইডি কেন তুলনায় নির্বিষ? বিভিন্ন নিয়োগ মামলায় ইডির ভূমিকা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের একাধিক বিচারপতি প্রশ্ন তুলেছেন। এই অবস্থায় শাহজাহানের এখন পর্যন্ত নিরাপদে লুকিয়ে থাকা ইডি ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর বকলমে কেন্দ্রীয় সরকার, অর্থাৎ বিজেপির ভূমিকার দিকেই আঙুল তোলে। শাহজাহানের এই অন্তর্ধান পর্বকে তৃণমূলের শীর্ষনেতারা আবার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের লুকিয়ে থাকার সঙ্গে তুলনা করেছেন। সিদ্দিকুল্লা যা-ই বলুন না কেন, দলের কাছে কিন্তু শাহজাহান ‘ভদ্রলোক’।

সন্দেশখালি এলাকার মধ্যেই যে পুলিসি ঘেরাটোপে শাহজাহান দিব্যি আছে – একথা প্রথম বলেন প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক নিরাপদ সর্দার। তিনিই প্রথম সন্দেশখালির ব্যাপারস্যাপার সংবাদমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন। এই প্রসঙ্গে উঠে আসে রীতিমত চমকপ্রদ তথ্য। শুধু শাহজাহান নয়, তাঁর শাগরেদ শিবু হাজরা, উত্তম সর্দারদের কীর্তিকলাপ। কীভাবে তারা গরিব মানুষের জমি লিজের নামে জবরদখল করেছে। কোথাও সরাসরি গায়ের জোরে জমি দখল করেছে, কোথাও চাষের জমিতে নোনা জল ঢুকিয়ে ফসল নষ্ট করে, জমি দখল করেছে। সাধারণ মানুষের একশো দিনের কাজের টাকা সমেত বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করা শাহজাহান, শিবু, উত্তমদের রোজকার কাজ। শাহজাহানের অবর্তমানে সন্দেশখালিতে সাধারণ অত্যাচারিত মানুষ জোট বেঁধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। তাঁদের বিবরণে বেআব্রু হয়ে পড়েছে শাহজাহানের সাঙ্গোপাঙ্গদের বর্বরতা। সংবাদমাধ্যমের কাছে মহিলারা অভিযোগ করেছেন – শাহজাহান, শিবু, উত্তমরা শুধু জমি দখলই করেনি, দখল করেছে তাঁদের ইজ্জত। ইচ্ছা মত দিনের পর দিন গ্রামের মেয়ে, বউদের তুলে নিয়ে যেত পার্টি অফিসে। দু-এক দিন নয়, এই ঘটনা নিত্যদিনের। তৃণমূল পার্টি অফিসে চলত নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনা। প্রতিবাদ করার উপায় ছিল না। প্রতিবাদ করলেই বাড়ির পুরুষদের উপর নেমে আসত অকথ্য নির্যাতন, নাম বাদ দেওয়া হত সরকারি প্রকল্প থেকে। ২০২৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের মত একটি রাজ্যে এমন বর্বরতা, ব্যভিচার বিশ্বাস করাই শক্ত। কিন্তু ক্রমশ বোঝা যাচ্ছে, মহিলারা যে অভিযোগ করছেন তা বিন্দুমাত্র মিথ্যা নয়। প্রশ্ন উঠছে, পুলিস প্রশাসন কী করছিল? তাদের কাছে কি খবর ছিল না? পুলিসের গোয়েন্দা বিভাগ? বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও কি দিনের পর দিন ঘটে চলা এই কাণ্ডের খবর ছিল না? রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে খবর না থাকা শুধু ব্যর্থতার নয়, রীতিমত লজ্জার কথা।
দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পরে গ্রামের মানুষই জোট বেঁধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। সোচ্চারে জানিয়েছেন কীভাবে তাঁদের একরের পর একর জমি দখল করে নিয়েছে, শাহজাহান, শিবু, উত্তমরা। তাঁদের প্রতিরোধ আন্দোলনে উত্তমের পোলট্রি ফার্ম পুড়েছে, শিবুর খামারবাড়িতে আক্রমণ হয়েছে। প্রতিরোধ আন্দোলনে সামনের সারিতে এসেছেন মহিলারা। তাঁরাই বলেছেন তাঁদের সম্মানহানির কথা। এমন প্রতিরোধ আন্দোলন বহুদিন দেখেনি বাংলা। শাসক তৃণমূল এই আন্দোলনে ভীত সন্ত্রস্ত। উত্তমকে দল থেকে ছ বছরের জন্য বহিষ্কার করেছে, পুলিস তাকে গ্রেফতার করেছে, বসিরহাটে আদালতে তার জামিনের বিরোধিতা করেনি, পরে আবার গ্রেফতার করেছে।
চলতি প্রতিরোধে সন্দেশখালির সমস্ত শ্রেণির মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত যোগ রয়েছে। কিন্তু বিজেপি প্রথম থেকেই এই ঘটনাকে হিন্দু-মুসলমান সংঘর্ষের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিজেপি দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বারবার বলার চেষ্টা করছেন, সন্দেশখালিতে শুধুমাত্র হিন্দু মেয়েদের ধর্ষণ করা হয়েছে।
প্রথমত, কাণ্ডটি তো করা হয়েছে তাঁরই এক সময়কার অনুচর সংখ্যালঘু শাহজাহানের নেতৃত্বে। দ্বিতীয়ত, সন্দেশখালি বিধানসভায় প্রায় ৮২% হিন্দু ভোটার। ভোটের অঙ্ক মাথায় রেখেই শুভেন্দু ও বিজেপি এই জঘন্য প্রচার চালাচ্ছে। অথচ গ্রামবাসীদের আঙুল মুসলমান শাহজাহানের সঙ্গে সঙ্গে শিবু, উত্তমের দিকেও। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমাদের রাজ্যে কোথাও কোথাও সংখ্যালঘু মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িক শক্তি রয়েছে এবং শাসক দল সেই শক্তির আশ্রয়দাতা। বিজেপি তা প্রচার করে বারবার রাজনৈতিক ফায়দা তুলেছে, তোলার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই ঘটনায় সেই মৌলবাদ বা সাম্প্রদায়িক শক্তির ভূমিকা কোথায়? বিজেপির দাবি অনুযায়ী রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস অকুস্থলে গেছেন। নির্যাতিতা মহিলারা তাঁদের নিরাপত্তার জন্য কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করার দাবি তুলেছেন। এই দাবি রাজ্যে সংবিধানের ৩৫৬ নং অনুচ্ছেদ প্রয়োগের পথ প্রশস্ত করে, যা রীতিমত উদ্বেগজনক।
আরো পড়ুন কালিয়াগঞ্জ: সংবেদনহীন প্রশাসন, সুযোগসন্ধানী বিজেপি
সন্দেশখালিতে এখন ১৪৪ ধারা, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ। রাজ্য সরকার চাইছে না সেখানে কী ঘটছে তা রাজ্যের মানুষ, দেশের মানুষ জানুক। সেখানকার গণআন্দোলনে প্রথম থেকেই আছেন সিপিএম নেতা নিরাপদ। তিনিই প্রথম সংবাদমাধ্যমে শাহজাহানের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন। এই আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, যা বিজেপি নেতা শুভেন্দুও অস্বীকার করতে পারেননি। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সন্দেশখালি কেন্দ্রে জয়ী হয়েছিলেন সিপিএম প্রার্থী। ২০১৪ সালের পর থেকে ছবি বদলাতে আরম্ভ করে। ২০২১ সালের নির্বাচনে সিপিএম সন্দেশখালি কেন্দ্রটি সহযোগী ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টকে (আইএসএফ) ছেড়ে দেয়। আইএসএফ ভোট পেয়েছিল প্রায় ২০,০০০। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে সন্দেশখালিতে কোনো ভোট হয়নি বলাই ভাল। সিপিএমের জেলা পরিষদ প্রার্থী ভোট পেয়েছিলেন মাত্র ২৬৫টি।
অর্থাৎ সন্দেশখালি অঞ্চলে সিপিএম প্রান্তিক শক্তি। তা সত্ত্বেও নিরাপদ এবং তাঁর দলের কারণেই আন্দোলন এখন পর্যন্ত মানুষের আন্দোলনের রূপ ধরে রাখতে পেরেছে। সিপিএম এই আন্দোলনে না থাকলে এতদিনে বিজেপি একে হিন্দু বনাম মুসলিম বানিয়ে ফেলত। সিপিএম তথা নিরাপদর ভূমিকা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তৃণমূল নেতা শিবু ১১১ জনের নামে যে এফআইআর করেছে, সেই তালিকায় প্রথম নাম নিরাপদ। শিবুর অভিযোগের ভিত্তিতেই জামিন অযোগ্য ধারায় নিরাপদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মীনাক্ষী মুখার্জি, কনীনিকা ঘোষ, ধ্রুবজ্যোতি সাহা, কলতান দাশগুপ্ত, দেবাঞ্জন দে, প্রণয় কার্য্যী সমেত একাধিক নেতাকে সন্দেশখালি যেতে বাধা দিয়েছে পুলিস। নিরাপদর গ্রেফতারের প্রতিবাদে মহম্মদ সেলিমের নেতৃত্বে বাঁশদ্রোণী থানায় কর্মী, সমর্থকরা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। রাজ্যের থানায় থানায় বিক্ষোভ হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই আন্দোলনে কংগ্রেস কোথাও নেই। শুধু কংগ্রেস কেন, সিপিএম বাদে অন্য কোনো বাম দল, বামপন্থী গণসংগঠন, প্রগতিশীল সংগঠনের উপস্থিতি অন্তত সংবাদমাধ্যমে নজরে পড়েনি। তাই এই আন্দোলনকে বামপন্থীদের হয়ে বিপথগামী হওয়া থেকে বাঁচানোর দায়িত্ব সিপিএমের।
সামাজিক অন্যায়ের প্রতিবাদ করে জেলে যাওয়া, গ্রেফতার হওয়া বামপন্থীদের কাছে নতুন কিছু নয়, বরং গর্বের। নিরাপদর মুক্তির দাবি সিপিএম অবশ্যই করবে, কিন্তু প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সন্দেশখালির মানুষের উপর হওয়া অত্যাচারের কথা রাজ্যজুড়ে প্রচারে আনা। যাঁদের জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে, যাঁদের সম্ভ্রম লুঠ করা হয়েছে, তাঁদের আন্দোলনে আরও বেশি করে সম্পৃক্ত হওয়া। কারণ সিপিএম এই আন্দোলনের রাশ আলগা করলেই গতিপথ বদলে যাবে, এটা হয়ে দাঁড়াবে বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির হাতিয়ার।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







