সরকারি পদাধিকারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য লোকপাল বা ন্যায়পাল নামে একটি সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসিত পদের জন্য নতুন আইন প্রণয়নের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয় দেশের রাজধানী দিল্লিতে। সেই আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন মহারাষ্ট্রের প্রবীণ সমাজকর্মী আন্না হাজারে। ২০১১ সালের ৫ এপ্রিল আমরণ অনশন শুরু করলেন আন্না। বিক্ষুব্ধ জনতা আর সংবাদমাধ্যমের সহায়তায় কয়েকদিনের মধ্যেই সেই বিক্ষোভ বিশাল আকার নেয়।

আন্নার দাবিতে সহমর্মিতা জ্ঞাপন করে ভারতের অন্যান্য শহরে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তার সঙ্গে রামদেব, কিরণ বেদী, অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং অন্যান্যরা জুড়ে দেন বিদেশি ব্যাঙ্ক থেকে কালো টাকা ফিরিয়ে আনার দাবি। প্রায় নতজানু হয়ে পড়ে মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন ইউপিএ সরকার। নানা কলঙ্কে জর্জরিত সেই সরকার মুখ থুবড়ে পড়ে তিন বছরে, বিজেপির নেতৃত্বে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ)। প্রধানমন্ত্রী হন নরেন্দ্র মোদী। অথচ লোকপালের দফতর আজ পর্যন্ত দুর্নীতি দমনে বলার মত কিছু করে উঠতে পারেনি, বিদেশি ব্যাঙ্ক থেকে কালো টাকাও ফেরত আসেনি। সে যা-ই হোক, ভারতের রাজনৈতিক দিগন্তে উদয় হল এক নতুন নক্ষত্রের – তাঁর নাম অরবিন্দ কেজরিওয়াল।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আজ এই প্রাক্তন আমলার নেতৃত্বে আম আদমি পার্টি বা আপ দিল্লি ও পাঞ্জাবের মসনদে বিরাজমান। গোয়ার বিধানসভা নির্বাচনেও পেয়েছে দুটি আসন, গুজরাট বিধানসভায় পাঁচটি। ইতিমধ্যে আপকে জাতীয় দল হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ২০১৪ ও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং ২০১৪ সাল থেকে ২১টি রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনার ভিত্তিতে গতবছর কমিশন এই সিদ্ধান্ত নেয়। জাতীয় দলের মর্যাদা পাওয়ায় অন্যান্য সুবিধার পাশাপাশি, আপ তাদের দলের প্রতীক ঝাড়ু এবার সারা দেশে নিজেদের প্রার্থীদের জন্য ব্যবহার করতে পারবে এবং রাজধানীতে পার্টি অফিসের জন্য জমি পাওয়ার অধিকার পাবে।

নির্বাচনী প্রতীক (সংরক্ষণ ও বরাদ্দ) আদেশ, ১৯৬৮ অনুসারে একটি রাজনৈতিক দল জাতীয় দল হিসাবে তখনই স্বীকৃতি পায় যদি তারা তিনটি শর্তের যে কোনো একটি পূরণ করে থাকে। প্রথমত, যদি লোকসভা বা বিধানসভা (চার বা তার অধিক রাজ্য) নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের কমপক্ষে ৬% পায় এবং লোকসভায় অন্তত চারজন সাংসদ থাকে। দ্বিতীয়ত, যদি মোট লোকসভা আসনের অন্তত ২% জেতে এবং প্রার্থীরা কমপক্ষে তিনটি রাজ্য থেকে জেতেন। তৃতীয়ত, যদি অন্তত চারটি রাজ্যে স্বীকৃত দল হয়। আপ এই তৃতীয় মানদণ্ডটি পূরণ করে।

সেই সঙ্গে মাত্র ১২ বছর বয়সেই ভারতের প্রাচীনতম দল কংগ্রেসকে বেশ প্যাঁচে ফেলেছে আপ। এমনিতেই ইন্ডিয়া জোটে আসন ভাগাভাগি নিয়ে রীতিমত বিপাকে কংগ্রেস। দেশের বৃহত্তম বিরোধী দল হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি যে কংগ্রেসের সঙ্গে রফা করবেন না তা প্রায় নিশ্চিত। ওদিকে উত্তরপ্রদেশে এককালে রাহুল গান্ধীর হাত ধরে বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে গোহারান হেরে সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব রাজ্যের ৮০টি আসনের মধ্যে ১১টির বেশি আসন দিতে নারাজ। পাঞ্জাব নিয়ে বাদ সেধেছেন কেজরিওয়ালও।

এমনিতেই এই ত্রয়ীকে ইন্ডিয়া জোটে ‘চাপ সৃষ্টিকারী শক্তি’ হিসাবে দেখা হয়ে থাকে। এদের মধ্যে আবার আলাদা রাজনৈতিক বোঝাপড়া আছে বলেও মনে করা হয়। যদিও ২০২২ সালের গোয়া বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে তৃণমূল-আপ মন কষাকষি হয়, কিন্তু তা আজ ইতিহাস। তা এবার কেজরিওয়াল কংগ্রেসকে আসনের বদলে বুড়ো আঙুল দেখালেন বলেই মনে করা হচ্ছে। পাঞ্জাবে জোট সমীকরণের ভরাডুবির পর দিল্লিতে কংগ্রেস আশা করেছিল ৪-৩ আসন সমঝোতা হলেও হতে পারে। নিদেনপক্ষে আপ কিছু না হলেও দিল্লির দুটি আসন তো ছাড়বেই ভেবেছিল তারা। সে গুড়েও বালি। মাত্র একটি আসন ছাড়তে রাজি আপ।

ফলে কংগ্রেস এখন নির্বাচনের শিয়রে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবের ১৩টি ও দিল্লির সাতটি আসনে প্রার্থী বাছার কাজ শুরু করে দিয়েছে। যদিও কিছু নেতা এখনো ক্ষীণ আশা পোষণ করছেন যে এই দুই রাজ্যে এখনো সমঝোতা হয়ে যেতে পারে। আপ কিন্তু চাপ আরও বাড়িয়ে বলে দিয়েছে, অন্যান্য রাজ্যে আসন ভাগাভাগির বিষয়ে দ্রুত অগ্রসর হওয়া উচিত, কারণ প্রস্তুতির সময় খুব অল্প। সব আলোচনা শেষ করে নির্বাচনের প্রচারে নামতে হবে যে।

ওদিকে আবার কেজরিওয়াল এক অন্য লড়াইতে ব্যস্ত। তাঁর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত মনীশ সিসোদিয়া দীর্ঘকাল হল জেলে। এই প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দিল্লির বাতিল হওয়া আবগারি নীতি প্রণয়নে পদ্ধতিগত হস্তক্ষেপ, নির্বাচিত মদ কোম্পানিগুলির সুবিধার জন্য তা পরিবর্তন করা এবং কোষাগারের কয়েকশো কোটি টাকার ক্ষতি করার অভিযোগ রয়েছে।

আরো পড়ুন আপ, তৃণমূল নেতাদের গ্রেফতারিতে লাভ কার?

ঘটনাচক্রে ২০১৫ সালে দল ক্ষমতায় আসার পর থেকে আপের এক ডজনেরও বেশি নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে আছেন প্রাক্তন মন্ত্রী সত্যেন্দ্র জৈন, সোমনাথ ভারতী, বিধায়ক আমানতুল্লা খান প্রমুখ। আবার বেশ কয়েকবার ইডির সমন পেয়েও কেজরিওয়াল একবারও হাজিরা দেননি। উল্টে অভিযোগ করেছেন যে তাঁকে লোকসভা নির্বাচনের আগে বিনা কারণে গ্রেপ্তার করতে চায় কেন্দ্রীয় সরকার। শেষে দিল্লির এক আদালত ১৭ ফেব্রুয়ারি কেজরিওয়ালকে তলব করে ইডির দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে, যে তিনি দিল্লি আবগারি নীতির সঙ্গে যুক্ত আর্থিক তছরুপের মামলায় সমন এড়িয়ে গেছেন। আপের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীকে ইডির একাধিক সমন কেন বেআইনি এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ তা নিয়ে আদালতে নিজেদের অবস্থান জানাবে পার্টি।

এই খর্বকায়, মাফলার জড়ানো ‘আম আদমি’ বা সাধারণ মানুষটি যে এভাবে একসাথে একাধিক ফ্রন্টে লড়ে যেতে পারেন, তা হয়তো ২০১১-১২ সালে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। তাঁর এই রাজনৈতিক যাত্রায় যে বা যাঁরা তাঁকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, তাঁরা কিন্তু আজ দলের বাইরে। প্রায় হারিয়েই গেছেন বলা যায়। যেমন প্রাক্তন নির্বাচন বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব, বিশিষ্ট আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ, সমাজসেবিকা মেধা পাটকার, প্রাক্তন সাংবাদিক আশুতোষ।

কেজরিওয়াল একদিকে যেমন সুচতুর কৌশলী, তেমনি সবকিছু এলোমেলো করে দেওয়া রাজনীতিতেও পারদর্শী। সাধারণ মানুষের বা ভোটদাতাদের মানসিকতা ভালই বোঝেন তিনি। পঞ্চান্ন বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদের সামনে এখনো দীর্ঘ পথ। পথটা হয়তো মসৃণ হবে না, কিন্তু দেশের নজর থাকবে তাঁর উপর।

বহুকাল আগে এক বামপন্থী নেতা আমায় কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, কেজরিওয়াল তাঁদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাঁদের জায়গাটাই দখল করছেন। হয়ত তাই…

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.