সিপিএম পার্টি এই মুহূর্তে তাদের পার্টি কংগ্রেস করার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। আগামী ২ এপ্রিল থেকে তামিলনাড়ুর মাদুরাইতে হবে সেই কংগ্রেস। নিয়মানুযায়ী পার্টি কংগ্রেসের আগে সমস্ত রাজ্যে একেবারে এরিয়া কমিটি থেকে শুরু করে রাজ্য স্তর পর্যন্ত সম্মেলন চলে। তারই অংশ হিসাবে আমাদের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সম্মেলন হয়ে গেল ২২-২৫ ফেব্রুয়ারি। আর তারপর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, সিপিএমের সম্মেলন নতুন কোনো রাজনৈতিক দিশা দেখাতে পারল কিনা। কমিউনিস্ট পার্টি বলে পরিচিত যে কোনো দলেরই বড় কোনো সম্মেলন বা মহাঅধিবেশন সর্বদা এই প্রশ্নের জন্ম দেয় যে, পার্টির এই বৃহৎ মন্থন প্রক্রিয়া কি হয়ে শুধুই একটি পালনীয় রাজনৈতিক আচার হয়ে দাঁড়াল, নাকি তা চিন্তার জগতে নিয়ে আসতে পারল তাজা হাওয়া, কোনো নতুন বার্তা? সংকটাপন্ন বঙ্গ সিপিএমের সম্মেলন ঘিরেও এই প্রশ্ন যে উঠবে তা খুবই সঙ্গত।
একটি পার্টির মহাসম্মেলনে কী আলোচনা হবে, কী সিদ্ধান্ত হবে তা নির্ভর করে সম্মেলন পূর্ববর্তী বছরগুলিতে তার অভ্যন্তরে কী ধরনের আলাপ আলোচনা চলেছে তার উপর। পার্টির অভ্যন্তরে চর্চা, আলোচনায় বা বিতর্কে যদি নতুন ভাবনাচিন্তার উপাদান না থাকে তাহলে হঠাৎ করে তা সম্মেলনে হাজির হয়ে যাবে – এমন চিন্তা মোটেই বৈজ্ঞানিক নয়। গত তিন বছরে সিপিএম পার্টির অভ্যন্তরে নতুনতর কোনো ভাবনাচিন্তা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। একের পর এক নির্বাচনে পার্টির ভরাডুবি, সাংগঠনিক সংকট, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পার্টির অগ্রগতি না হওয়া, তদুপরি ভারতে ফ্যাসিবাদের প্রশ্ন এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কোন পথে – এমন বহু গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক প্রশ্নে প্রবল বিভ্রান্তি সত্ত্বেও সিপিএম নতুন ভাবনাচিন্তা করতে মোটের উপর এখনো অনিচ্ছুক। এমনকি, গত ১৫-২০ বছরে পার্টির রাজনৈতিক বিপর্যয়ের গুরুতর মূল্যায়ন পর্যন্ত তাঁরা করে উঠতে পারলেন না। সারা বিশ্বে কমিউনিস্ট আন্দোলনের গুরুতর বিপর্যয়ের মধ্যেও যে দেশগুলিতে বামপন্থীদের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছে, যেমন শ্রীলঙ্কা বা গ্রীস, সেখানকার অগ্রগতির পর্যালোচনা করে কোনো শিক্ষালাভের কথাও তাঁরা ভেবে উঠতে পারছেন না। এমতাবস্থায় পার্টি সম্মেলনে নতুন কোনো আশার আলো দেখা যাবে না, তা প্রায় স্বতঃসিদ্ধ।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সিপিএম পার্টির মহাঅধিবেশনের একটিমাত্র খসড়া দলিল প্রকাশিত হয়েছে। সেটি হল কেন্দ্রীয় মহাঅধিবেশনের খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাব। কিন্তু খসড়া রাজনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্ট সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই। রাজনৈতিক রিপোর্ট মানে হল আগামী পার্টি সম্মেলন পর্যন্ত পার্টি কী করবে তার আলোচনা। আর রাজনৈতিক সাংগঠনিক রিপোর্ট হল গত সম্মেলন থেকে বর্তমান সম্মেলন পর্যন্ত সময়ে পার্টির কাজের মূল্যায়ন। এই দুটি রিপোর্ট যেমন কেন্দ্রীয় মহাঅধিবেশনে তৈরি হয়, তেমনই রাজ্য সম্মেলনেও হয়। রাজ্যের এই দুটি রিপোর্টে কী আলোচনা করা হয়েছে তাও অজ্ঞাত। কমিউনিস্ট পার্টি সাধারণত রাজনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্ট প্রকাশ করে না। কিন্তু জনগণ জানতে চায়, পার্টি কীভাবে তাদের গত ৩-৪ বছরের কাজের মূল্যায়ন করল। ফলে নির্বাচিত অংশ প্রকাশ করা যেতে পারে। গত তিন বছরে পশ্চিমবঙ্গের সর্ববৃহৎ বাম শক্তি হিসাবে সিপিএম কেন কার্যকরী আন্দোলন গড়ে তুলতে পারল না – তা তো গুরুত্বপূর্ণ চর্চার বিষয়। এটি শুধুমাত্র পার্টি সদস্যদেরই আলোচনার বিষয় নয়। এটি সামগ্রিকভাবে বাম আন্দোলনের প্রশ্ন, যে কেন রাজ্যে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু থাকা সত্ত্বেও সিপিএম কোনো কার্যকরী আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছে না।
সিপিএমের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রস্তাবে বলা হয়েছে যে পার্টিকে নয়া উদারবাদের প্রতিটি প্রয়োগের বিরুদ্ধে লড়াই সংগঠিত করতে হবে। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, গত সম্মেলনের প্রস্তাবেও ঠিক এই কথাই বলা হয়েছিল। তাহলে এবারের রাজ্য সম্মেলনের রাজনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্টে আলোচনা হওয়া উচিত ছিল, রাজ্যে তৃণমূল সরকারের এবং কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের নয়া উদারবাদী নীতির বিরুদ্ধে আমাদের রাজ্যে কেমন আন্দোলন সিপিএম গড়ে তুলল। এই সময়কালে সারা দেশের মত এ রাজ্যেও কর্মসংস্থানের অবস্থা ভয়াবহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নয়া উদারবাদী নীতির প্রভাবে সর্বত্র চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ চলছে। সরকারকে যেখানে বলা হয়ে থাকে ‘আদর্শ নিয়োগকর্তা’, সেখানে রাজ্য সরকার নিজেই শিক্ষক নিয়োগ করে চলেছে চুক্তির ভিত্তিতে। রামকৃষ্ণ মিশনের মত প্রতিষ্ঠানও ক্লাস প্রতি মাইনের চুক্তিতে শিক্ষক নিয়োগ করছে। সরকারি, বেসরকারি সর্বত্র নতুন শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে চুক্তিতে। পুলিস বিভাগেও স্থায়ী পুলিস কমছে। সিভিক পুলিসের নামে চুক্তির ভিত্তিতে নিযুক্ত পুলিসের সংখ্যা বাড়ছে। অস্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে, ন্যূনতম বেতন কোথাও দেওয়া হচ্ছে না। গিগ শ্রমিকদের অবস্থা ভয়াবহ। ব্যাংকিং ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগ বাড়ছে। স্থায়ী শ্রমিক কর্মচারীদের কাজ অস্থায়ী চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক কর্মচারী শিক্ষকদের দিয়ে করানো হচ্ছে। কিন্তু এসব নিয়ে বামেদের কোনো আন্দোলন নেই, প্রচার নেই। কেন?
দেউচা পাঁচামির কয়লা প্রকল্প নিয়ে গ্রামবাসীদের সঙ্গে সরকারের বিরোধ তুঙ্গে। কিন্তু আলাদা করে এই নিয়ে সিপিএমকে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে না কেন?
রাজ্যে কৃষকদের অবস্থা শোচনীয়। ফসলের যোগ্য মূল্য পাচ্ছেন না, বিমা নেই, পর্যাপ্ত সরকারি ঋণ নেই, বিদ্যুতের দাম ক্রমশ উর্ধ্বমুখী। তবু সিপিএমকে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে না। কেন?
সিপিএম পার্টিকে শুধু একবারই ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা যায় – নির্বাচন এসে পড়লে। ফলে একের পর এক নির্বাচনে বিপর্যয় অব্যাহত।
পার্টির মূল্যায়ন খুব দায়সারা। তা আসল সমস্যাকে স্পর্শ করে না। নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে পার্টির যত আস্ফালন সব কি সম্মেলনের দলিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে? সিপিএম যে বাস্তবে নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকরী আন্দোলন আমাদের রাজ্যে গড়ে তুলতে পারছে না, তার কারণ কি এই মনস্তত্ত্ব যে, আগামীদিনে সরকারে এলে তাদেরও ওই নীতি অনুযায়ীই কাজ করতে হবে? দলিল দস্তাবেজে শত হুঙ্কার সত্ত্বেও সিপিএম কি বাস্তবে নয়া উদারবাদের সঙ্গে এতটাই আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে গেছে যে, মানুষের সমস্যা নিয়ে কার্যকরী আন্দোলন গড়ে তুলতে সে অপারগ? এগুলি কিন্তু জ্বলন্ত প্রশ্ন, যার উত্তর যদি মহাসম্মেলনে না পাওয়া যায়, তাহলে সে সম্মেলন নিছক রাজনৈতিক আচার পালন ছাড়া আর কিছু হয়ে উঠতে পারে না।
সিপিএমের দলিলের যে অংশটি নিয়ে কদিন বিস্তর কথাবার্তা হল, তা হচ্ছে ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে পার্টির বক্তব্য। একথা সত্যিই চমকপ্রদ যে, সিপিএম মোদী সরকারকে বর্ণনা করেছে এমন এক সরকার হিসাবে যেখানে ‘দক্ষিণপন্থী, সাম্প্রদায়িক ও কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক শক্তিগুলি নয়া-ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্য সমেত একীভূত হয়েছে।’ আমাদের দেশের আজকের ফ্যাসিবাদ যে অতীতের জার্মানি বা ইতালির মত নয়, তার যে অনেকগুলি নতুন বৈশিষ্ট্য রয়েছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, যদিও অনেকেই তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আসল প্রশ্ন হল, মোদী সরকারকে কেন ‘নয়া ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন’ বলা হচ্ছে, কেন তা পূর্ণ পল্লবিত ‘নয়া ফ্যাসিবাদী’ নয়, তার কোনো ব্যাখ্যা সিপিএম দেয়নি। এরকম আধা বা সিকি হিসাবে ফ্যাসিবাদকে চিহ্নিত করার ফলে যে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আধা-ইচ্ছা নিয়ে লড়াই করার মানসিকতা গড়ে ওঠে, তা কি পার্টি নেতারা বোঝেন না?
রাজনৈতিক হিন্দুত্বের দর্শনের উপর দাঁড়ানো গৈরিক কর্পোরেট ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কোন কোন শক্তিকে একজোট করা দরকার, তা নিয়েও পার্টির ধ্যানধারণা বড়ই ঢিলেঢালা। তাঁরা শুধু রাজনৈতিক দলগুলিকে নিয়েই ভাবছেন। ফলে ইন্ডিয়া জোট নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু আরএসএস-বিজেপির বিরুদ্ধে কোন কোন সামাজিক শক্তিকে একত্র করা দরকার তা নিয়ে বিশেষ আলোচনা দেখা যাচ্ছে না। দলিলে মোদীর শাসনে দলিতদের অবস্থা যে খারাপ হয়েছে তা নিয়ে কিছু কথা অবশ্যই বলা হয়েছে। কিন্তু দলিত সাধারণের বিপুল ভোট কেন বিজেপির দিকে যাচ্ছে, কেন তা স্বাভাবিক মিত্র বামপন্থীদের দিকে আসছে না – তার কোনো বিশ্লেষণ নেই। জাতিবর্ণ প্রথা উৎখাত করার সংগ্রাম নিয়ে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দলিলে নেই। একটি বাক্য আছে, যেখানে বলা হয়েছে, ‘সমস্ত ধরণের বর্ণগত নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে পার্টির সক্রিয়ভাবে লড়াই করা উচিত।’ ব্যাস! যতদিন বর্ণব্যবস্থা থাকবে ততদিন বর্ণগত নিপীড়ন ও বৈষম্য থাকবে। সুতরাং বর্ণ ও জাত ব্যবস্থাকে উৎখাত করার লড়াই গড়ে তোলা এবং যাঁরা সে লড়াই লড়ছেন তাঁদের সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট তৈরি করা এবং ভারতের ৮০% হিন্দুর মধ্যে ৮০% তথাকথিত নিচু জাত, দলিত, নমঃশূদ্রদের থেকে বিজেপি-আরএসএসকে বিচ্ছিন্ন করার স্পষ্ট পরিকল্পনা সিপিএম দিতে পারল না। বরং অতীতে অর্থনৈতিক ভিত্তিতে সংরক্ষণকে সমর্থন করে, বিজেপির জাতের মধ্যে জাত খোঁজার অপকৌশলকে স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে পার্টি যে দলিত জনসাধারণের থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে, তা নিয়েও কোনো বোধোদয়ের লক্ষণ নেই।
আরো পড়ুন দলের ঊর্ধ্বে উঠতে গিয়েই মজলেন এবং মজালেন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব
মোদীর শাসনে যে নারীর অবস্থা শোচনীয়, সে বিষয়েও কেন্দ্রীয় দলিলে বিস্তারিত চর্চা করা হয়েছে। আমাদের রাজ্যে নারী মুখ্যমন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও নারীরা উত্তরোত্তর আক্রমণের শিকার। এর বিরুদ্ধে সর্বত্রই নারীদের মধ্যে জাগরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, আন্দোলনও হচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই আন্দোলন মূলত শহরাঞ্চলেই শক্তিশালী। গ্রামাঞ্চলের সাধারণ নারীদের কীভাবে শক্তিশালী নারী আন্দোলনে সংগঠিত করা যাবে – তা নিয়ে কিন্তু দলিলে বিশেষ চর্চা নেই। একইভাবে, পার্টির ভিতরকার শক্তিশালী পুরুষবাদী এবং পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে তা নিয়েও কথা নেই। সাম্প্রতিক অতীতে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বিতর্কে যেভাবে রাজ্য পার্টির একাংশ মহিলাদের ‘লোভী’, ‘ভিক্ষায় সন্তুষ্ট’ ইত্যাদি অভিধায় ভূষিত করেছেন, তা যে পার্টির মধ্যেকার নারীবিদ্বেষী উপাদানকেই প্রকাশ করেছে, তা কি চিহ্নিত করা হয়েছে? বাম আন্দোলন থেকে এই মানসিকতাকে সমূলে উৎপাটন করা চাই – এই জেহাদ কি ঘোষিত হয়েছে? আমাদের জানা নেই। আরও আশ্চর্যজনক হল, দলিলে একটি লাইনও রূপান্তরকামী, সমপ্রেমী বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে নিয়ে ব্যয় করা হয়নি। অথচ সারা পৃথিবীতেই অতি দক্ষিণপন্থী এবং ফ্যাসিবাদীদের সঙ্গে তৃতীয় লিঙ্গের দ্বন্দ্ব পেকে উঠছে। বিশেষ করে ট্রাম্প দ্বিতীয়বার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হয়ে আমেরিকায় তৃতীয় লিঙ্গের অস্তিত্ব মুছে দেওয়ার চেষ্টা করায় আন্তর্জাতিকভাবে এই দ্বন্দ্বে ঘৃতাহুতি হয়েছে। এদিকে সিপিএমের দলিল এ প্রশ্নে নীরব।
আদিবাসী উচ্ছেদের যে মহাযজ্ঞ মোদী সরকার চালাচ্ছে তার সঠিক বর্ণনা দলিলে রয়েছে। আদিবাসী এলাকায় তথাকথিত উন্নয়নের নামে যে কর্মযজ্ঞ চালানো হচ্ছে তা কর্পোরেটের স্বার্থবাহী – একথাও চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকার যে সেই একই কাজ করেছিল এবং বর্তমানের কেরালা সরকারও তার অন্যথা করছে না, সে স্বীকারোক্তি কি সিপিএম করবে? প্রকৃতপক্ষে ২.৫৯ অনুচ্ছেদে দলিলে যা বলা হয়েছে তা পুরোপুরিভাবে সিপিআইএমের সরকারগুলির ক্ষেত্রেও যে খেটে যায়, তা নিশ্চয়ই পার্টিনেতারা জানেন। ফলত শুধু দলিলে নয়, এর বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে দাঁড়াতে গেলে যে ইংরাজিতে যাকে বলে ‘প্যারাডাইম শিফট’ ঘটাতে হবে, তাও নিশ্চয়ই তাঁদের অজানা নয়। কিন্তু তার কোনো সৎ আভাস তাঁদের দলিলে নেই।
ভারতবর্ষের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো যে বিপন্ন এবং তাকে রক্ষা করার লড়াই যে লড়তে হবে, তা দলিলে বলা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে তা হবে তা নিয়ে বিশেষ আলোচনা নেই। মুশকিল হল, সিপিএম এখনো এই বিষয়টিকে প্রশাসনিক সমস্যা হিসাবেই দেখে থাকে। অথচ ভারতের রাজ্যগুলি যেমন ভাষার ভিত্তিতে গঠিত হয়েছে, তেমনই জাতি ও জাতিসত্তার ভিত্তিতেও গঠিত। অথচ বিজেপি ভারতের এই বহুজাতিক চরিত্রকেই স্বীকার করতে রাজি নয়। স্বাভাবিকভাবেই ভারতে বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতির লড়াই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে দেখা দিতে যাচ্ছে। তামিলনাড়ু যেভাবে কেন্দ্রিকতা ও হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, বহু উপাদান থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীরা তেমন গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি ভাবতে রাজি নন। কেন? কী তার ব্যাখ্যা? এরও কোনো জবাব দলিলে নেই, রাজ্য সম্মেলনের আলোচনায় নেই।
আসলে এই প্রশ্নগুলি পার্টির আভ্যন্তরীণ চর্চায় হয় নেই, নয় খুবই দুর্বল ও প্রান্তিক অবস্থানে আছে। অথচ এই প্রশ্নগুলিতে সঠিক দিশা দেখাতে না করলে কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলন থেকে কী বেরোবে? শুধুই একটি নতুন কমিটি? একজন নতুন সম্পাদক? জনগণ কিন্তু বামেদের কাছ থেকে অনেক বেশি প্রত্যাশা করেন। সে প্রত্যাশা মিটবে কবে?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








