অতীতে রাজা বাদশারা বসন্তকালে রানি, মহারানি, বাঁদী, ঝি, বিদূষক, পারিষদ, মোসায়েব, সৈন্যসামন্ত সমেত মৃগয়ায় যেতেন। সোল্লাসে শিকার চলত। অথবা প্রজারা বিদ্রোহ করলে রাজা যুবরাজকে পাঠাতেন বিদ্রোহ দমনে। বিদ্রোহ কঠোর হাতে দমন করে ফিরলেই যুবরাজের রাজ্যাভিষেক হত। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো, তৃণমূল দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধারী অভিষেক ব্যানার্জিকে মৃগয়ারত রাজা বা বিদ্রোহ দমনে উদ্যত যুবরাজ হিসাবে ধরে নিতে পারেন। বিশাল ক্যারাভ্যান, বিলাসবহুল বাস, প্রচুর লোকলস্কর, পুলিস, রাজকীয় তাঁবু নিয়ে ৫৬ দিনের নবজোয়ার যাত্রা আরম্ভ করেছেন। দৈনিক খরচ কোটিখানেক টাকা। আনুষঙ্গিক খরচ ধরলে দ্বিগুণও হতে পারে। ঝাঁ চকচকে একেকটা তাঁবুর ভাড়াই নাকি ২৫,০০০ টাকার বেশি। সবমিলিয়ে ৫৬ দিনের নবজোয়ার যাত্রার মোট খরচ ১০০ কোটি টাকার কাছাকাছি।
তৃণমূল অভিষেকের এই যাত্রার সঙ্গে রাহুল গান্ধীর ভারত জোড়ো যাত্রার তুলনা করছে। করতেই পারে। কিন্তু দুটো কোনোমতেই এক নয়। রাহুল গান্ধী ৩,০০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পায়ে হেঁটেছেন। তুষারপাতের মধ্যে কাশ্মীরের লাল চকে পতাকা উত্তোলন করেছেন। ভারত জোড়ো যাত্রায় রাহুল কোথাও নির্বাচনী প্রচার চালাননি। সাম্প্রদায়িক ঐক্য স্থাপন করাই মূল লক্ষ্য ছিল। অন্যদিকে অভিষেক পায়ে হাঁটছেন না, এবং তাঁর যাত্রার মুল কথাই হল পঞ্চায়েত নির্বাচন। তাই অভিষেকের যাত্রাকে মৃগয়া বলাই যায়। অনেকে বলছেন, তৃণমূল দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দল। প্রচুর অর্থ ব্যয়ে এমন যাত্রা করতেই পারে। এখানেই প্রশ্ন, একটা আঞ্চলিক দলের এত টাকা কোথা থেকে আসছে? টাকার উৎস কোথায়? দক্ষিণপন্থী দল হলেও যে বিলাস, বৈভব নগ্নভাবে বেরিয়ে আসছে, তা রীতিমত দৃষ্টিকটু এবং এতে রাজনীতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা আরও খারাপ হচ্ছে। হিন্দি সিনেমার সেটের মত একেক জায়গায় ঝকমকে তাঁবু, আলোর ফোয়ারা, সবমিলিয়ে এমন রাজনীতি বাংলা আগে দেখেনি।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
মৃগয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্রোহ দমনও অভিষেকের একটা উদ্দেশ্য বটে। সাগরদীঘি উপনির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূল স্পষ্টই বুঝতে পেরেছে একচেটিয়া সংখ্যালঘু ভোটে ভাঙন ধরেছে। রাজ্যজুড়ে পঞ্চায়েতে এত দুর্নীতি হয়েছে যা অতীতে কখনো হয়নি। একেবারে বেলাগাম দুর্নীতি। দুর্নীতির প্রশ্নে উচ্চতর নেতৃত্ব, পার্টির শৃঙ্খলা – কোনোকিছুই তৃণমূলের কাছে বাধা নয়। পঞ্চায়েত নির্বাচন আসন্ন। জেলায় জেলায়, ব্লকে ব্লকে প্রায় সমস্ত বুথে, আগামী নির্বাচনে কে দলীয় প্রার্থী হবে – তা নিয়ে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব চরমে। দ্বন্দ্ব কতটা প্রকট তা একটা উদাহরণ দিলেই পরিষ্কার হবে। গত ৩০ মে উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া থানার চুটিয়াখোর গ্রাম পঞ্চায়েতের এক বুথে আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী কে হবে তা নির্বাচন করার জন্য বুথ সভা বসে। সভায় এক গোষ্ঠীর একজনের নাম নির্দিষ্ট হলে অপর গোষ্ঠী সভাস্থলেই আগামী নির্বাচনে দল মনোনীত প্রার্থী বছর চুয়ান্নর ফাইজুল রহমানের উপর গুলি চালায়। হাসপাতালে ফাইজুলের মৃত্যু হয়। এই অন্তর্দ্বন্দ্ব বন্ধ করা খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। সম্ভবত পেশাদার সংস্থার সমীক্ষায় আরও ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। বিরোধীরা তৃণমূল দুর্নীতিগ্রস্ত দল, রাজ্যজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই কথাটা প্রচার করতে সফল হয়েছে। দলের ভাবমূর্তি উদ্ধার, বিদ্রোহ দমন এবং আগামীদিনে মমতার অবর্তমানে অভিষেককে তৃণমূল দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করতেই এই নবজোয়ার যাত্রা।
মৃগয়া তো হচ্ছে। বিদ্রোহ দমন হচ্ছে কি? না, বিদ্রোহ কিন্তু কিছুতেই থামছে না। প্রথম দিন দিনহাটায় তেমন কিছু না হলেও, দ্বিতীয় দিন গোঁসানিমারিতেই গোল বেধে যায়। ঠিক যেন ২০১৮ পঞ্চায়েতে নির্বাচনের ভোট লুঠের পুনরভিনয়। গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি, জেলা পরিষদে কে প্রার্থী হবে, তা ঠিক করতে নির্বাচন। দেখা গেল ব্যালট বক্সে আগে থেকেই নির্দিষ্ট নামে ভোট দেওয়া ব্যালট পেপার। ফলে অন্য পক্ষ ব্যালট বাক্স ভেঙে দিল। একবার ভাবুন, দলীয় ভোট পরিচালনা করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ পুলিসকে মোতায়েন করা হয়েছে। চরম বিশৃঙ্খলা থামাতে তারাও ব্যর্থ। প্রথম দিন ভোট বাতিল, অভিষেক দ্বিতীয় দিন পুনর্নির্বাচন ঘোষণা করলেন বটে, কিন্তু সেদিন আর কেউ ভোট দিতে আসেনি।
মালবাজার ভোট কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা, নেতা খগেশ্বর রায়ের পকেটমারি, অব্যবস্থা অব্যাহত।
ভোট দিতে না পারায়, ডামডিম গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান সহ ২০ জন পঞ্চায়েত সদস্য এক যোগে পদত্যাগ করেছেন।
ইসলামপুরে বর্ষীয়ান বিধায়ক করিম চৌধুরী বাড়িতে দিনভর অপেক্ষায় থাকলেন, কিন্তু অভিষেক বিধায়কের বাড়ি গেলেন না।
রায়গঞ্জে ভোট নিয়ে একইরকম বিশৃঙ্খলা।
মালদায় যেদিন অভিষেক সভা করছেন, সেদিন মানিকচকে কয়েকশো পরিবার তৃণমূল ছেড়ে সিপিএমে যোগ দেয়।
বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে নাকি নিজের দলের নেতাকেই অস্ত্র আইনে গ্রেপ্তার করানো হয়েছে। নবজোয়ার যাত্রার বিরোধিতা করেছিলেন দিনহাটা-১ ব্লকের আবুয়াল আজাদ। ঘোষণা করেছিলেন দিনহাটা-১ ব্লকের ১২টা পঞ্চায়েতে মঞ্চ গড়ে নির্বাচনে লড়বেন দলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে। আজাদের অভিযোগ, এই কারণে তাঁকে বেআইনি অস্ত্র রাখা সমেত একাধিক ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে বিদ্রোহ থামতেই চাইছে না। অভিষেক নিজেও মেজাজ হারিয়েছেন একাধিক সভায়। যে জেলায় পা রাখছেন সেখানেই ভাঙন। কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম – এ পর্যন্ত যেখানে গেছেন, সেখানেই তৃণমূল থেকে বিরোধী শিবিরে যোগদানের ঘটনা ঘটেছে।
আরো পড়ুন সাগরদীঘিতে তৃণমূলের ভরাডুবি যেসব প্রশ্ন তুলে দিল
দলের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলেন না। বিদ্রোহ দমন তো হলই না, বরং ভাঙন অব্যাহত। তাহলে কি পুরোটাই ব্যর্থ? নিশ্চয়ই নয়। আপাতভাবে চোপড়ার ঘটনার পুনরাবৃত্তি আটকাতে পেরেছেন। যদিও অনুমান, তৃণমূল দলের প্রার্থী তালিকা প্রকাশের দিন বিস্ফোরণ ঘটবে। অনেকে বলছেন আরেকটা সাফল্য আছে, অভিষেকের নাম ব্যবহার করে ব্লক ও জেলা স্তরের নেতারা নাকি নিজেদের পছন্দের লোকেদের টিকিট দেবে।
আরও একটা প্রশ্ন না করলেই নয়। অভিষেক বলেছেন, তাঁর যাত্রা শেষ হওয়ার পরেই আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করা হবে। তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অংশ নন, তৃণমূল দলের নেতা। একজন সাংসদ মাত্র। তিনি রাজ্য নির্বাচন কমিশনারও নন। তাহলে এই ঘোষণা তিনি কোন অধিকারে করতে পারেন? অভিষেকের এই ঘোষণা প্রমাণ করে, রাজ্য প্রশাসন, রাজ্য নির্বাচন কমিশন কতটা অযোগ্য, কতটা দেউলিয়া।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








