মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন তিনি চান রাজ্যে তিন বছরের ডিপ্লোমা ডাক্তার তৈরি হোক। প্রস্তাবটা যে সাধু তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই এবং ভাবনাটা যে অভিনব নয় তাও মাথায় রাখা দরকার। একইরকম চিন্তাভাবনায় বামফ্রন্ট আমলেও খালিপদ ডাক্তার (barefoot doctors) কোর্স চালু করা হয়েছিল, বাড়ির ঠিকানা অনুযায়ী গ্রামাঞ্চল থেকে ছাত্র ভর্তির ব্যবস্থাও হয়েছিল। সম্ভবত তিন বছরেরই কোর্স ছিল সেটি। দু-তিনটে ব্যাচ পাস করে বেরোবার পরেই সেই কোর্স বন্ধ করে দেওয়া হয়। যারা পাশ করে বেরিয়েছিল তাদের ব্লক প্রাইমারি হেলথ সেন্টারে কমিউনিটি হেলথ অফিসার (সিএইচএসও) পদে নিয়োগ করা হয়েছিল।
১৯৬৫ সালে চীনে প্রথম এই খালি পায়ের ডাক্তার প্রকল্প চালু করা হয়। চাষি, গ্রামীণ হাতুড়ে প্রমুখদের ৩-৬ মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামে, যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা অপ্রতুল, সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা – যেমন সন্তান প্রসবে সাহায্য করা, সেলাই করা, ইঞ্জেকশন দেওয়ার মত কাজের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এই দুটো প্রকল্প চালু করারই কারণ এক – যথাযথ ডাক্তারের অভাব। ১৯৮৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে কিংবা ১৯৬৫ সালে চীনে পাস করা ডাক্তারের সংখ্যা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। সেই কারণে বুনিয়াদি স্বাস্থ্যসেবাটুকু পৌঁছে দেওয়ার জন্যেই এই ঠেকনা দেওয়া ব্যবস্থা চালু করা হয়। ১৯৯১ সালে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা ছ কোটি ৮০ লক্ষ, ২০২২ সালে দশ কোটি ১৫ লক্ষ। অন্যদিকে ১৯৮৫-৯০ সালে নতুন এমবিবিএসের আসনসংখ্যা ছিল ৭০০, ২০০৭ সালে ১০০০, ২০১১ সালে প্রায় ১৩০০। এই ধারায় এখন আসন বেড়ে হয়েছে ৪,৮০০। এখন ইন্টার্নশিপ করার সময়ে তিনমাস গ্রামে নিয়োগ বাধ্যতামূলক। স্নাতকোত্তর স্তরের পর বন্ড পোস্টিং অধিকাংশ সময়েই গ্রাম বা জেলা হাসপাতালে হয়ে থাকে। তারপরেও প্রচুর ডাক্তার দরকার। সেজন্য জিডিএমও নিয়োগ করা যেতে পারে। হাউস স্টাফশিপ, রেসিডেন্টশিপে এখন একটা আসনের জন্য ৩০ জন আবেদন করে। তাহলে পাস করা ডাক্তাররা গ্রামে যায় না বলে ডিপ্লোমা ডাক্তার বা সিভিক ডাক্তার লাগবে – এ কথা আসছে কেন?
আসলে গ্রামের হাসপাতালে রামা শেখ, হরি মুদিদের প্রাণের দাম নেই, ভোটের দাম আছে। এক তো দুয়ারে ডাক্তার নিয়ে গিয়ে গ্রামের লোকেদের বোঝানো যাবে, দ্যাখো কত ডাক্তার দিয়ে দিলাম। তোমাদের আর আর জি কর বা নীলরতন সরকার হাসপাতাল অব্দি যেতে হবে না। দ্বিতীয়ত, এই ডাক্তারদের মাইনে হবে এমবিবিএস পাস ডাক্তারদের অর্ধেক। পেনশন বা গ্রাচুইটির ঝামেলাও থাকবে না, সবটাই হবে চুক্তিভিত্তিক। তৃতীয়ত, এদের নিয়োগ করতে গিয়েও কুন্তলরা টু পাইস কামিয়ে নেবে আর ভর্তি হবে ফাঁকা ওএমআর শিট ছেড়ে আসা উন্নয়নের কাণ্ডারীরা।
তারপরেও বাকি থেকে যায় তৃণমূল স্তরের মানুষের কাছে যথাযথ পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া যাবে কি? প্রত্যন্ত গ্রামে সত্যিই সব জায়গায় ডাক্তার পৌঁছতে পারবে না। তার জন্য কারোর তত্ত্বাবধানে না থাকা, মেডিকাল প্রশিক্ষণ নেই এমন কাউকে সাড়ে ছয় বছরের কোর্স তিন বছরে শেষ করিয়ে যদি বলা হয়, এবার চালাও বিপি ব্লেড আর সিজারিয়ান করো, তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম ক্ষমা করবে না বাঁদরের হাতে ছুরি তুলে দেওয়ার জন্য।
মাঝখান থেকে সবচেয়ে লাভবান হবে প্রাইভেট স্বাস্থ্য ব্যবসায়ীরা। এবার আর আয়ুশ (AYUSH) ডাক্তারও রাখবে না। আপনার, আমার বাড়ির লোকের জরুরি চিকিৎসার দরকার হলে তিন বছর পড়াশোনা করা ডিপ্লোমা ডাক্তার ঠিক করবে গোল্ডেন আওয়ারে কোন ওষুধ দেওয়া হবে। কারণ আরও কম মাইনে দিয়ে আরও বেশি লাভ করতে পারবে স্বাস্থ্য ব্যবসায়ীরা। কম পয়সার স্বাস্থ্য শ্রমিক তৈরি হবে। কলকাতায় ব্যাপারটা কম হলেও, শহরতলি এবং বিভিন্ন জেলায় প্রাইভেট হাসপাতালগুলো চালায় হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদ, ইউনানি চিকিৎসকরাই। এরাই রেসিডেন্ট ডাক্তারের কাজ করে। এমনকি কোভিডের সময় দেখলাম, গ্রামীণ হাওড়ার এক তালেবর হাসপাতালে এরাই কনসালট্যান্ট।
আরো পড়ুন পরীক্ষার মধ্যেই শুনছি ‘মেরে ডাক্তার হওয়া ঘুচিয়ে দেব’
তাহলে এখন উপায় কী? উপায় হল একদল মডার্ন মেডিসিনের ছাত্রছাত্রীদের এই কাজে নিয়োগ করা, যাদের এভিডেন্স বেসড মেডিসিনের প্রশিক্ষণ রয়েছে। এই রাজ্যে এরকম প্রায় ৫০০০ ডেন্টিস্ট, সিনিয়র এএনএম নার্স রয়েছে। ডেন্টাল সার্জনদের জন্য দুবছরের ব্রিজ কোর্স চালু করা হোক, কারণ প্রথম তিন বছর বিডিএস আর এমবিবিএসের সিলেবাস প্রায় এক। অ্যানাটমি, বায়োকেম, ফিজিওলজি, প্যাথোলজি, ফারমাকোলজি, সার্জারি, মেডিসিন সব কিছুই পড়তে হয়। সিনিয়র নার্স আর সিএইচএসও বা এএনএম নার্সদের এই ব্রিজ কোর্সের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া।
এই প্রস্তাব বহুচর্চিত। ২০১৬ সালে ডেন্টাল কাউন্সিল কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এই প্রস্তাব পাঠানোর পরে ২০১৯ সালে সরকার সম্মতি জানায়, কিন্তু এই পরিকল্পনা দিনের আলো দেখেনি।
মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর এই ডিপ্লোমা ডাক্তার বানানোর পরিকল্পনা যদি সত্যিই শুধু খবরের শিরোনাম দখল করে পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে চমক দিতে না চেয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবার হাল ফেরানোর জন্য হয়ে থাকে, তাহলে প্রস্তাবটা উনি খতিয়ে দেখতে পারেন।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








