“অধীর জমানা তবে শেষ?”

“বিধানসভা ভোটের ফলাফল তেমনই তো বলছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য।”

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

“কিন্তু বিধানসভা আর লোকসভার হিসেব কিন্তু আলাদা হয়। দিল্লী ভোট এমনকি পশ্চিমবাংলার এ যাবৎ ভোট ট্র্যাডিশন তেমনটাই বলছে।”

এরকম টুকরো টুকরো কথোপকথনে জমে উঠছে সংলাপ। বক্তাদের কন্ঠস্বরে রয়েছে অনিশ্চয়তা; উদ্বেগ আরও প্রকট। চোখের সামনে থেকে যেন উড়ে গিয়েছে নীলকন্ঠ পাখিগুলি। এমনই বিশ্বাসহীনতায় চলছিল পারস্পরিক কথোপকথন। কথাগুলি কোনও চায়ের দোকান, রকের আড্ডা, বাজার ফেরতা বৃদ্ধদের আলোচনা সারবস্তু নয়। কথাগুলি হচ্ছিল মুর্শিদাবাদ জেলার দুই জনপ্রিয় সাংবাদিকের মধ‌্যে। তবে এই প্রশ্ন কেবল যে ওই দুই সাংবাদিকেরই একান্ত এমনও নয়, এ প্রশ্ন তামাম পশ্চিমবাংলার।

লোকশ্রুতি পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে এসে, সীমান্তবর্তী জেলা মুর্শিদাবাদে বসতি স্থাপন করেন অধীর চৌধুরীর পরিবার। দিন আনা দিন খাওয়া সংসারে অভাব নিত্যদিনের। স্কুলে পড়াকালীন শিক্ষকের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে স্কুলের জানলা ভেঙে পলায়ন এবং পড়াশোনায় ইতি। তখন দশম শ্রেণি। নকশালবাড়ি আন্দোলনের তরঙ্গ তখন ছুঁয়েছে মুর্শিদাবাদকেও। সে আন্দোলন তরুণদের মধ‌্যে অন্য উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। কথিত আছে রাজনীতির সেই জটিল ঘূর্ণাবর্তের মধ‌্যে জড়িয়ে পড়েন অধীর চৌধুরী, বেছে নেন আত্মগোপনের রাজনীতি। নকশাল আন্দোলনের তাত্ত্বিক পরিসর বাদ দিলে যে জোরালো অভিযোগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে ওঠে তা হিংসাত্মক রাজনীতির। বলার অপেক্ষা রাখে না অধীর চৌধুরীও হিংসাত্মক রাজনীতির অংশীদার হয়ে ওঠেন। এই সুবাদে কারাবন্দী হন তিনি। জেল থেকে ফিরে অবশ‌্য ‘মোহভঙ্গ’ হয়, নকশালপন্থী রাজনীতির সংস্রব ত‌্যাগ করেন অধীর।

বহরমপুর শহরে তখন দুর্বৃত্তদের দাপট। অকথিত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল “এলাকা বাপের নয় দাপের”। বিভিন্ন “দাদা”-র দাপট ছিল শহরের আনাচে কানাচে। প্রায়ই তাঁদের এলাকা দখল ও আভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে উত্তপ্ত থাকত এলাকা, যার খেসারত দিতে হত সাধারণ মানুষকেই। সঙ্গত কারণেই এই দাপের রাজনীতির বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ ও অক্ষম ক্রোধ জমা হচ্ছিল শহরবাসীর মনে। কিন্তু এমন কোনও আশ্রয় ছিল না, যার তলায় দাঁড়িয়ে সংশয়াতীতভাবে রুখে দাঁড়ানো যায়। কারাবাস থেকে মুক্তির পর সেই আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়ালেন অধীর চৌধুরী। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে গড়ে তুললেন নিজস্ব বাহিনী। অদ্ভুত সাংগঠনিক দক্ষতায় এলাকাভিত্তিক দাদাদের দাপট ও হিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে কোথাও রুখে দাঁড়ালেন, কোথাও ব্যক্তিগত প্রভাবে “ম্যানেজ” করে ফেললেন। অধীর বাহিনীর কাছে প্রায় সকলেই নতজানু হতে বাধ্য হল। হিংসা আপাতভাবে রুখে দেওয়ার ফলে অধীর হয়ে দাঁড়ালেন বহরমপুরের মসীহা। এরপর তিনি সীমানা বিস্তার করলেন জিয়াগঞ্জ এবং কান্দি পর্যন্ত। রাজনীতির শিরোনামে উঠে আসে টাউন ক্লাবের নাম। জেলা জুড়ে নিজস্ব দাপট বজায় রাখতে গড়ে তোলেন নিজস্ব ত্রিস্তরীয় প্রশাসনিক বাহিনী। শহর ও গ্রামের যুবক বাহিনী নিয়ে গঠিত প্রথম স্তর। দ্বিতীয় স্তরে তুলনামূলক লড়াকু ও বুদ্ধিদীপ্ত “অবজার্ভার” টিম। তৃতীয় স্তরে খোদ অধীর চৌধুরী ও তাঁর কোর টিম। বহরমপুর শহরে জজকোর্ট প্রাঙ্গনে গড়ে ওঠে “বড়দার আদালত”। প্রতি সন্ধেয় সেই আদালতে নিজস্ব ঢঙে বিচার করতেন অধীর চৌধুরী। সেই বিচারে যারপরনাই খুশী হন এলাকাবাসীও। এমনকি স্থানীয় আদালতের বিচারের চেয়ে অনেকেই বেশি আস্থা রাখতেন বড়দার আদালতের উপর। শহরের প্রতিটি ইস‌্যুতেই টাউন ক্লাবের প্রত‌্যক্ষ অংশগ্রহণ, মানুষের দাবিদাওয়া, অভাবের শরিক হওয়ার জন‌্য নিজস্ব মেশিনারির যথার্থ ব‌্যবহার, বড়দার আদালতের জনপ্রিয়তা, এলাকার সমস্ত দুর্বৃত্তকে প্রায় কোণঠাসা করে ফেলা এবং সাংগঠনিকভাবে নিজস্ব মেশিনারির মজবুত কাঠামো অধীর চৌধুরীকে এনে ফেলে আলোচনার শীর্ষে। রাতারাতি তিনি হয়ে ওঠেন ‘রবিনহুড’।

এমতাবস্থায় এসে পড়ে বিধানসভা নির্বাচন। ১৯৮৭-র নির্বাচনে যুযুধান দুই শিবির কংগ্রেস ও আরএসপি। কংগ্রেসের শংকর দাস পাল ও আরএসপির দেবব্রত বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়ের জমি দখলের লড়াইয়ের ‘ঘুঁটি’ হন অধীর চৌধুরী। দেবব্রত বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়ের সেচমন্ত্রী তকমা বদলে “বোল্ডারমন্ত্রী” হলে আরএসপির পালের হাওয়া লাগে কংগ্রেসের পালে। শংকর দাস পালের জেতার সমূহ সম্ভাবনা দেখা যায়। পালের হাওয়া সপক্ষে টানতে আরএসপি বেছে নেয় অধীর চৌধুরীকে। সূত্র মারফত জানা যায় শংকর দাস পালের সঙ্গে বৈরিতার কারণে আরএসপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে অধীরের। নির্বাচনে “অধীর মেশিনারি” কাজ করে আরএসপির পক্ষে। নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যায় জয়ের চওড়া হাসির ফুটেছে আরএসপি নেতার ঠোঁটেই। পরেরবার নির্বাচনে অবশ‌্য অধীর চৌধুরী নবগ্রাম বিধানসভা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইলে বামেদের সায় না থাকায় কংগ্রেসের টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সেবার অবশ‌্য শিকে ছেড়েনি তাঁর ভাগ্যে। পরেরবার সমস্ত শক্তি তিনি প্রয়োগ করেন নবগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রেই এবং তখন “বামেদের ভিয়েতনাম” বলে পরিচিত কেন্দ্রটিতে কংগ্রেসের টিকিটে জয়লাভ করেন। তিন বছরের মাথায় ১৯৯৯ সালে লোকসভা ভোটে বহরমপুর কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং বিপুল ভোটে জেতেন। এরপর থেকেই বহরমপুর শহর অধীরের দুর্জয় ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত হয়। অন‌্য দিকে মুর্শিদাবাদ ও জঙ্গিপুর আসন দুটিও দীর্ঘদিন হাতছাড়া ছিল কংগ্রেসের। ২০০৪ সালে অধীরের ছায়াসঙ্গী মান্নান হোসেন এবং হেরো প্রণব তকমাধারী প্রণব মুখোপাধ‌্যায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন অধীরের দুই কাঁধে ভর দিয়ে। মুর্শিদাবাদ জেলার তিনটি লোকসভা আসনই যায় কংগ্রেসের পকেটে। অলিখিত কারণ “অধীর ফ‌্যাক্টর”।

ইদানীংকালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের জোয়ারেও অধীরগড় ছিল অটুট, কিন্তু এবারের বিধানসভা নির্বাচনে জেলা তো বটেই এমনকি বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রেও ভরাডুবি হয়েছে কংগ্রেসের। ২০১১ সালের নির্বাচনে জেলায় কংগ্রেস পেয়েছিল ১৪টি আসন, তৃণমূল ১টি। ২০১৬-র নির্বাচনে কংগ্রেস তাদের আসনগুলি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। কংগ্রেস জয়লাভ করেছিল ১৪টি আসনে, তৃণমূল ৪টি আসন দখল করতে সক্ষম হয়।

২০২১ নির্বাচনে জেলার ২২টি আসনের মধ‌্যে দুটি আসনের নির্বাচন এখনও হয়নি। কুড়িটি আসনের মধ্যে ১৮টি গিয়েছে তৃণমূলের দখলে, ২টি দখল করেছে বিজেপি। এমনকি বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রে বরাবর তৃতীয় স্থানে থাকা বিজেপি এবার সেখানে জয়ী হয়েছে। জেলার অধিকাংশ আসনেই বিজেপিই দ্বিতীয় শক্তি হিসাবে উঠে এসেছে, কংগ্রেস পরিণত হয়েছে তৃতীয় শক্তিতে।

এই ভরাডুবির কারণ কী?

রাজনৈতিক মহলের মত এর অন‌্যতম কারণ এবারের ভোটে ভোটারের মন অনেক আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল কিন্তু তা প্রকাশ করেনি কোথাওই। যার কারণে একের পর এক সমীক্ষা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

সংখ‌্যালঘু ভোট একজোট হয়েছে মমতার পক্ষে। এনআরসি, সিএএ ইস‌্যুতে সংখ‌্যালঘু মনে যে ভীতির জন্ম হয়েছিল, তা ফলে আন্দোলনগুলি প্রায় দাবানলের মতোই ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল। সীমান্ত লাগোয়া মুর্শিদাবাদের লালগোলা, সুতি সহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষ পথে নেমে সোচ্চার প্রতিবাদ জানিয়েছিল। ট্রেনে আগুন লাগানোর মত বিক্ষিপ্ত ঘটনাও ঘটতে দেখা গিয়েছিল। এছাড়াও ছোট বড় নানা ধরণের মিছিল, প্রতিবাদ সভা, অবস্থানকে কেন্দ্র করে জেলার মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদের সাড়া দেখা গিয়েছিল। এনআরসি, সিএএ ইস‌্যুতে মমতার প্রতিশ্রুতি সংখ‌্যালঘুরা বিশ্বাস করতে চেয়েছে। তার কারণ যাদের স্মৃতিতে একবার ভিটেমাটি হারানোর স্মৃতি এখনও টাটকা, কিংবা বংশপরম্পরায় যারা উদ্বাস্তু হওয়ার করুণ কাহিনী শুনে এসেছে বা আসামের অভিজ্ঞতা থেকে যারা বোধে পোক্ত হতে পেরেছে, আশ্রয় হারানোর ভয় তাদের ব‌্যাপকভাবেই পরিচালিত করতে পেরেছিল। এক্ষেত্রে নির্বাচনী প্রচারের মঞ্চ থেকে মমতার আশ্বাসবাণী তাদের ভরসার ক্ষেত্র হতে পেরেছে। সংখ‌্যালঘুদের কাছে বিষয়টি কেবল আইনি নিরাপত্তারই ছিল এমন নয়, বরং তাঁরা ভোটের লড়াইয়ে হারজিতকে দেখেছিলেন অস্তিত্বরক্ষার লড়াই হিসাবেই। একইসঙ্গে বিভিন্ন প্রচারমঞ্চ থেকে বিজেপি নেতাদের একের পর এক উস্কানিমূলক বক্তব‌্য, ঘৃণার রাজনীতির চাষ এবং মমতাকে সংখ‌্যালঘু তোষণকারী বলে ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে “মিনি পাকিস্তান”, “পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হবে” জাতীয় শব্দবন্ধ রীতিমতো ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছিল। এমনকি কান্দির জনসভা থেকে শুভেন্দু অধিকারীর উস্কানিমূলক মন্তব‌্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের একাংশের তুমুল উল্লাসের ফলে সংখ‌্যালঘু সম্প্রদায়ের শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে যাওয়া ভয়ের চোরাস্রোত এককাট্টা হয়েছে ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে। তার প্রভাব পড়েছে ইভিএমে।

পাশাপাশি অনগ্রসর শ্রেণির জন‌্য রাজ‌্য সরকারের চালু করা বিভিন্ন প্রকল্প, যেমন ঐক‌্যশ্রী, উপকৃত মানুষ আশীর্বাদ বলেই গণ‌্য করেছেন। এছাড়াও মমতার নানা জনমুখী প্রকল্প, যেমন সবুজসাথী, কন‌্যাশ্রী, স্বাস্থ‌্যসাথী, রূপশ্রী ইত্যাদি মানুষের কাজে লেগেছে। তাঁরা দু হাত তুলে সমর্থন করেছেন মমতাকেই, কারণ তাঁরা সরকারি প্রকল্প থেকে বঞ্চিত হতে চাননি। এক্ষেত্রে সংযুক্ত মোর্চার ইস্তেহারে প্রচুর প্রতিশ্রুতি থাকলেও এবং অধীর চৌধুরী এ জেলার বহু মানুষের “কাছের মানুষ, কাজের মানুষ” হলেও পূর্বতন বাম সরকারের অহঙ্কারী রাজনীতি, রাজ‌্যে সংযুক্ত মোর্চার ক্ষমতায় আসার অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিন বামেদের হাতে মার খাওয়া কংগ্রেস কর্মীদের একাংশের জোট সম্পর্কে বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি কার্যত কংগ্রেসের বিরুদ্ধেই গিয়েছে। একই সঙ্গে জোটে বঞ্চনার অভিযোগ বাম দলের শরিকদের ছিলই। অভিযোগ সম্পর্কে প্রকাশ‌্যে মুখ না খুললেও সেই বিক্ষুব্ধ ভোট জড়ো হয়েছে তৃণমূলে, এমনটাই অভিমত রাজনৈতিক মহলের।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ জানাচ্ছেন, এবারের নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ধারার প্রথম সারির সংবাদমাধ‌্যমগুলি ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনকে বিজেপি ও তৃণমূল শিবিরের মসনদ দখলের লড়াই হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল। ফলে রাজ‌্যবাসীর মন আটকে গিয়েছিল মূলত ওই দুই দলের রাজনৈতিক কর্মকান্ডেই। মুর্শিদাবাদও তার ব‌্যাতিক্রম হয়নি। পাশাপাশি এক ধারার সংবাদমাধ‌্যম ও বিভিন্ন শিবির থেকে মমতা মানেই সংখ‌্যালঘু — এরূপ প্রচার প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস জারি ছিল। অনেকাংশেই মমতার জন্য তা শাপে বর হয়েছে। সংখ‌্যালঘু অধ‌্যুষিত জেলা মুর্শিদাবাদে কেবল বিশেষ ধর্মপালনের কারণে “জঙ্গি”, “বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী” ইত‌্যাদি শব্দবন্ধের তুমুল অসম্মানজনক ব‌্যবহার এবং হয়রানির শিকার হওয়ার নজির রয়েছে। এবারের নির্বাচনে মুর্শিদাবাদ জেলাতেই নির্বাচনী সভা থেকে বিজেপি নেতাদের এমন শব্দবন্ধ ব‌্যবহারে অনেকে আশঙ্কার মেঘ দেখেছিলেন। একইসঙ্গে এই ধারণাও কাজ করেছিল যে স্বাধীনতার পর থেকে একমাত্র মমতার সরকারই কলকাতা কর্পোরেশনের এবং রাজ‌্যের পুর ও নগরোন্নয়ন বিভাগের যাবতীয় দায়িত্ব দিয়েছেন একজন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে। তিনি তৃণমূল সরকারের প্রথম সারির সৈনিকও বটে (ফিরহাদ হাকিম)। ভোটের প্রাক্কালে মুর্শিদাবাদ জেলায় পর্যবেক্ষক করে পাঠানো হয় তাঁকেই। ফলে বিশ্বাসের খুঁটি আরও শক্তপোক্ত হয় এবং তার অবশ‌্যম্ভাবী ফল পাওয়া গেছে ইভিএমে।

বিশ্লেষকদের আরও সংযোজন, নির্বাচন চলাকালীন শীতলকুচির ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের আপামর শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মনেই ভীতির সঞ্চার করে। ঘটনার পর বিজেপি নেতাদের বক্তব‌্যে, ভাষণে যে ধারা লক্ষিত হয়েছিল তাতে ভোটারের মন বিজেপির বিরুদ্ধেই রায় দেয়। শুধু তা-ই নয়, বিজেপির রাজনৈতিক বক্তব‌্যের তুমুল বিরোধিতার ক্ষেত্রে অন‌্যান‌্য রাজনৈতিক দলগুলির “ধরি মাছ না ছুঁই পানি” মনোভাব কার্যত তাদের বিরুদ্ধে যায়। সংখ‌্যালঘু অধ‌্যুষিত মুর্শিদাবাদ, মালদার বিরাট অংশের ভোটার রাতারাতি মত বদলে নেন এবং তৃণমূলের পক্ষে রায় দেন বলে অভিমত রাজনৈতিক মহলের একাংশের।

একইসঙ্গে রাজ‌্যের মুখ‌্যমন্ত্রীর চোট পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপান উতোর, বিজেপি রাজ‌্য সভাপতির মুখ‌্যমন্ত্রীকে হাফ প‌্যান্ট পরতে বলার অশালীন পরামর্শ, ক্রমাগত বিভিন্ন সভামঞ্চ থেকে একতরফা অরাজনৈতিক আক্রমণ তাদের ভরাডুবির কারণ হয়েছে। পাশাপাশি বিরোধী হিসাবে সংযুক্ত মোর্চা সংস্কৃতিগতভাবে আলাদা রাজনীতিক বার্তাবাহী হিসাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। বরং গড়পড়তা বিরোধিতাই চোখে পড়েছে তাদের প্রচারে। ফলে সংবাদমাধ‌্যমের বহুল পরিচিত বাইনারির বাইরে সংযুক্ত মোর্চা নিজেদের আলাদা রাজনৈতিক পরিচিতি গড়ে তুলতে ব‌্যর্থ হয়েছে। ফলে সাধারণ ভোটার তৃণমূল-বিজেপির বাইনারির বাইরে ভাবেননি। মুর্শিদাবাদেও সেই ধারা অক্ষুণ্ণ ছিল। সেইজন‌্য তৃতীয় বিকল্প হিসাবে অধীর চৌধুরীর নেতৃত্বে কংগ্রেসকে বেছে না নিয়ে মানুষ রায় দিয়েছে বিজেতার পক্ষে, জানাচ্ছে রাজনৈতিক মহল।

এছাড়াও পূর্বতন বাম সরকারের যাবতীয় কৃত কর্ম এবং বিরোধী আসনে থেকে বামেদের নানা বিষয়ে রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে মানুষ এখনও তৃণমূলের বিকল্প হিসাবে সংযুক্ত মোর্চাকে বিবেচনা করেননি হয়ত। পাশাপাশি বাংলার দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারা অনুসারে কংগ্রেস ও বামের জোট আপামর মানুষের মনে দাগ কাটতে পারেনি, জয় দূর অস্ত। একইসঙ্গে কেন্দ্রে কংগ্রেসের শোচনীয় পরিস্থিতি, ক্রমাগত শক্তিহীন হয়ে পড়ার কারণে এবারে কঠিন বঙ্গযুদ্ধে বাংলার মানুষ, বিশেষত মুর্শিদাবাদের মানুষ, কংগ্রেসের কাঁধে ভর দিতে দ্বিধা বোধ করেছেন। ফল হয়েছে কংগ্রেসের পক্ষে শোচনীয়।

এখন প্রশ্ন , তবে কি অধীরগড়ে অধীর জমানা শেষ?

রাজনীতিকদের মতে এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া প্রায় অসম্ভব। কারণ লোকসভা আর বিধানসভা ভোটের অঙ্কগুলি একইরকম নয়।

রাজনৈতিক মহলের আরও মত, রাজ‌্যে নতুন সরকার আসার পর অধীর চৌধুরীর আচরণগত কৌশল অত‌্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরকারের সমস্ত কাজে সহযোগিতার বার্তার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক পরিসর মেনে বিরোধিতা করার কথা তিনি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে সরকারি বিভিন্ন পদক্ষেপে তুমুল প্রশংসা বা তুমুল বিরোধিতা না করে তিনি বরং মধ‌্যপন্থা বজায় রাখছেন। সূত্রের খবর, বিধানসভা নির্বাচনে জোট কৌশল নিয়ে মতানৈক‌্য ছিল কংগ্রেসের অভ‌্যন্তরেও। প্রদেশ কংগ্রেস ও কংগ্রেস হাইকম‌্যান্ডের ‘পলিটিকাল লাইন’ হুবহু একইরকম ছিল না। যার ফলে ভোটের প্রাক্কালে বাংলার জোট নিয়ে সরব হয়েছিলেন কংগ্রেসের জাতীয় স্তরের বেশ কিছু নেতা। ভোটে ভরাডুবির পর সেই ক্ষত মেরামতি করতে সচেতন হয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস। আবার বহরমপুর শহরে আশির দশকে অধীর চৌধুরী যেমন টাউন ক্লাবকে ভিত্তি করে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে নিয়ন্তার ভূমিকা নিয়েছিলেন, তেমন করোনা পরিস্থিতিতে টাউন ক্লাব পুনরায় শহরের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। একের পর এক কল‌্যাণকামী কর্মসূচীর মধ‌্যে দিয়ে জনসংযোগ করে চলেছেন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে লোকসভা নির্বাচনকে মাথায় রেখেই হয়তো বহু আগে থেকে জমি প্রস্তুত করে রাখছেন অধীর।

লোকসভার ফলাফল লেখা থাকবে মহাকালের খাতার পাতায়। কিন্তু লোকসভা ভোট রাজনীতির যাবতীয় সমীকরণে ব‌্যাপক রদবদল ঘটাবে, এমনটাই মত রাজনীতির কারবারিদের। এমনকি বহরমপুর শহরেও লোকসভা ভোটে ভোটাররা যে সমীকরণ দেখতে অভ‌্যস্ত, তাতে বিস্তর রদবদল হতে পারে, এমনটাই অভিমত রাজনৈতিক মহলের। অগোচরে অজস্র কাহিনী রচনা শুরু হয়েছে ইতিমধ‌্যেই, ঘুঁটি সাজাতেও শুরু করেছেন অনেকেই। মহাকাল রয়েছেন প্রকাশের অপেক্ষায়।

মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি – ছবি উইকিপিডিয়া থেকে

Leave a Reply