অভিজ্ঞান সেনগুপ্ত

দেখা, শোনা, আর বোঝার মধ্যে আকাশপাতাল ফারাক, তা অনেক ক্ষেত্রেই আমরা ভুলে যাই। একটা স্কুলে একবার এক অভিভাবক প্রশ্ন করেছিলেন “কী বুঝনু মাস্টার, তাই তো হামি বুঝনু না।” বাংলার রাজনীতিতেও প্রথমেই একটা হাইপোথিসিস খাড়া করা হয়েছে, যে আব্বাস ও নওশাদ সিদ্দিকি এবং তাঁদের দল আইএসএফ সাম্প্রদায়িক। কেন? কারণ তাঁরা ধর্মগুরুদের পরিবারের লোক, আব্বাস এখনো সে কাজই করেন। তাঁদের ভাষা মেঠো, পরনের পোশাক গেঁয়ো, মাথায় ফেজ টুপি, গালে দাড়ি। অর্থাৎ তাঁরা দৃশ্যতই মুসলমান। অতএব আগেভাগে সাম্প্রদায়িক বলে ধরে নিয়ে তারপর এঁদের রাজনীতি আলোচনা করা হবে।

এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে অবশ্য কোনো সাংবাদিকের এই প্রশ্ন করার হিম্মত নেই, কেন আপনি সংখ্যালঘুদের মঞ্চে মাথায় কাপড় দেন, প্রার্থনার ভঙ্গিতে দুই হাত জড়ো করেন, আবার পুজো উদ্বোধনে গিয়ে কেন মন্ত্র আওড়ান? যখন তিনি ইমাম আর পুরোহিতকে ভাতা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন, তাঁর অনুগতরা ব্রাহ্মণ সম্মেলন করেন, সপার্ষদ পাড়ায় পাড়ায় দুর্গাপুজো করেন, কীর্তনের আসর বসান, গণেশপুজো করেন, রাজ্য সরকার করদাতাদের টাকায় দুর্গাপুজোর বিসর্জনের কার্নিভাল করেন, দীঘায় মন্দির তৈরি করান তখনো তাঁকে সাম্প্রদায়িক বলা হয় না, আমরা মনে করি সেটা স্বাভাবিক। জনসভার শেষে বিজেপির তরুণ নেতা (সদ্য তৃণমূল ফেরত) গলা উঁচিয়ে “জয় শ্রীরাম” বলেন, “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে” বলেন, তা নিয়ে বিশেষ কারোর আপত্তি থাকে না।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অথচ এসবের চেয়ে অনেক লঘু কথা বলার জন্যেই আব্বাস এবং তাঁর দলকে সটান সাম্প্রদায়িক বলে দেগে দেওয়া হয়েছিল সেই ২০২১ সালে। অথচ তাঁদের দলের ঘোষণাপত্রে কোনো সাম্প্রদায়িক বার্তা ছিল না, মিটিং মিছিলে কোনো সাম্প্রদায়িক কথা উচ্চারিত হয়নি। বরং মানুষের, বিশেষ করে নিম্নবর্গীয় হিন্দু, মুসলমান ও আদিবাসীদের হক আদায়ের কথা শোনা গিয়েছিল।

সেদিন এগিয়ে থাকা, এগিয়ে রাখা চ্যানেলের সাক্ষাৎকারে আব্বাস যতবার মানুষ বলেছিলেন, ততবার সবজান্তা সঞ্চালক তাঁকে সাম্প্রদায়িক মুসলমান প্রতিপন্ন করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন। অথচ তার কিছুদিন পরেই অমিত শাহকে একই সাংবাদিক জিজ্ঞেস করার সাহস পাননি, কেন একটাও হাসপাতালের শিলান্যাস না করে, দেশের মানুষকে লকডাউনের নামে ঘরবন্দি করে, প্রধানমন্ত্রী মন্দিরের শিলান্যাসে ব্যস্ত থাকেন।

আরো পড়ুন সুমন দে-কে খোলা চিঠি: প্রসঙ্গ আব্বাস

গুজরাট দাঙ্গার ভিডিও চালিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো বিজেপি নেতার সাক্ষাৎকার হয়েছে কোনো চ্যানেলে? আখলাক আহমেদকে পিটিয়ে হত্যা করার ভিডিও দেখিয়ে, গোরক্ষকদের গুন্ডামির ভিডিও দেখিয়ে যোগী আদিত্যনাথের কোনো সাক্ষাৎকারও হয়নি। বিধানসভা ভাঙচুর, রাজ্যজুড়ে শাসক দলের কর্মীদের বর্বরতা, ভোট লুঠের ভিডিও ক্লিপ চালিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কোনো সাক্ষাৎকারও হয়নি। হবেও না। শুধু পূর্বনির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন তুলে আব্বাসকে, নওশাদকে দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু উত্তর দেওয়ানোর চেষ্টা হবে, যাতে এটা প্রতিষ্ঠা করা যায় যে তাঁরা সাম্প্রদায়িক। দুবছর আগে শুরু হওয়া সেই প্রচেষ্টা এখনো চলছে সব স্তরে, কেবল সংবাদমাধ্যমে নয়।

আসলে নওশাদদের আমরা চিনিই না, কিছু স্টিরিওটাইপ দিয়ে তাঁদের বিচার করি। একজন ধর্মগুরু এবং পরিচয়ে মুসলমান, অতএব সাম্প্রদায়িক – এই সহজ অঙ্ক আমরা মনে মনে কষে ফেলি। আমরা, মানে ভদ্দরলোকেরা, এমনকি ভদ্রলোক শহুরে কমরেডরাও। আমাদের ‘প্রিভিলেজড’ অবস্থান থেকে নওশাদের ভক্ত ওমরপুরের ভ্যানচালক বছর কুড়ির ছেলেটার সমালোচনা করার অধিকার আমাদের আছে কি? সামাজিক উচ্চতা থেকে আমাদের মূল্যবান উপদেশ শোনার জন্য নিমতলা বাজারে ডিম বেচতে বসা মাধ্যমিক ফেল করা নওশাদের ভক্ত তরিকুল, পুরুলিয়ার তারিডিহির কেন্দুপাতা বিক্রেতা নবীন মার্ডি, পাঁশকুড়ার পলান বাউড়িরা আর উদগ্রীব নয়। তারা দেখে নিয়েছে যে তার পাশে আমি, আপনি মোটেই সবসময় থাকি না।  মাঝে মাঝে তাকে “আপনি” বলে সম্বোধন করেই ভেবে নিই ভদ্রতার কর্তব্য সারা হল, এবং যাবতীয় আর্থসামাজিক দূরত্ব রেখেই আমরা তাদের সঙ্গে মিশি। এতকিছুর পরে হঠাৎ একদিন আমার সংগ্রামী রাজনৈতিক ডাকে সাড়া না দিলেই তাকে সাম্প্রদায়িক বা সন্ত্রাসবাদী বলে ফেসবুকে লম্বা পোস্ট করতে পারি, কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছু হয় না।

আদিত্যনাথ আর নওশাদের মধ্য এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক তফাত একটাই। প্রথম জনের রাজনীতির প্রধান বিষয় ধর্ম, এমনকি সোচ্চার ধর্মীয় মৌলবাদ। সেখানে নওশাদ (যদিও আব্বাসের হাত ধরেই আইএসএফের আত্মপ্রকাশ এবং ধর্মগুরু হিসাবে আব্বাস অতীতে এমন মন্তব্য করেছেন যা যথেষ্ট পুরুষতান্ত্রিক ও গোঁড়া। কিন্তু আইএসএফ নেতা হিসাবে আব্বাসের আচরণে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি এবং এই লেখা পর্যন্ত আব্বাস আর সামনে নেই। নেতৃত্বে এখন শুধুই নওশাদ) এখন পর্যন্ত সাম্প্রদায়িকতার পরিচিত বয়ান কোথাও উচ্চারণ করেননি। তাঁর কর্মসূচি হিসাবে নিম্নবর্গের মানুষের রুজি, রুটি আর সংবিধান প্রদত্ত অধিকারের কথাই বরাবর উচ্চারিত হয়। অথচ তাঁর অনুগামীদের একটা বড় অংশ গরীব মুসলমান, যাঁরা গরীব হিন্দুদের মতোই ধর্মনির্ভর, কিন্তু মিলেমিশে থাকেন। নওশাদ তাঁদের সকলের কথাই বলছেন। তাই যোগী আর নওশাদ এক নন। এমনকি মমতা ব্যানার্জি, যাঁকে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ বিজেপির বিরুদ্ধে পরিত্রাতা হিসাবে দেখতে বাধ্য হয়েছিলেন, তিনি আর নওশাদও এক নন।

এ কথাও ভেবে দেখতে হবে যে হিন্দু নিম্নবর্গীয় বয়ান আর পরিচিতি সত্তার রাজনীতিকে স্বীকৃতি দিলে, শ্রেণির সঙ্গে বর্ণকে যুক্ত করতে চাইলে, বাম আন্দোলনকে আদিবাসী, দলিত পরিচিতি সত্তার রাজনীতির সঙ্গে জুড়ে দিতে চাইলে নিম্নবর্গীয় মুসলমান সমাজ তাদের পরিচিতি নিয়েই রাজনীতি করতে চাইলে দোষ ধরা চলে না। চাঁই মণ্ডল বা নাগর মণ্ডল সম্প্রদায়ের মানুষ বা অন্যরা হাজার শোষণ সত্ত্বেও তাদের জাত, ধর্মের পরিচয় ছাড়তে পারেন না। যখন সেই একই মঞ্চ থেকে সূর্যকান্ত মিশ্র, মহম্মদ সেলিম, মীনাক্ষী মুখার্জিরা সংখ্যালঘু উন্নয়নের কথা বলেন, তখন কি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করা হয়?

আব্বাস কিংবা নওশাদ ভদ্রলোকের ভাষা বলতে যা বোঝায়, তা বলেন না। সেটাই রাজনীতিতে এতদিন ছড়ি ঘুরিয়ে আসা ভদ্রলোক সংস্কৃতির সবথেকে বড় অস্বস্তির কারণ। প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্দশা, নিয়োগ দুর্নীতি, দুষ্কৃতিরাজ, নিম্নবর্গীয় ও সংখ্যালঘু মানূষের উন্নয়নে ব্যর্থতা, সিন্ডিকেট, কাটমানি, জমি থেকে ভোট লুঠ, কৃষকের দুর্দশা – সব মিলিয়ে এই মুহূর্তে তৃণমূলের বিরুদ্ধে এমনিতেই প্রবল প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া তৈরি হয়েছে। আইএসএফের ভিত্তি মূলত কৃষিজীবীরা এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকরা। ধর্মের দিক থেকে আইএসএফের সমর্থকদের প্রায় পুরোটাই অন্ত্যজ মুসলমান, দলিত ও আদিবাসী। সমাজের প্রান্তিক অংশের মানুষ হওয়ার ফলে সরকারের প্রতি এঁদের নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে বেশি আর স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণাও। এতদিন বিকল্পের অভাবে (মূলত বাম, কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতার জন্য) এঁরা তৃণমূলকে ভোট দিয়ে যেতে একরকম বাধ্য হচ্ছিলেন। কিন্তু এখন এঁদের একটা বড় অংশ মনে করছেন, পণবন্দি থাকার দিন শেষ। নওশাদও বারবার প্রশ্ন তুলছেন, সংখ্যালঘু সমাজ কারোর ভোটব্যাঙ্ক হয়ে থাকবে কেন? কথাটা রাজনৈতিক গুরুত্ব নেহাত কম নয়।

কেন বামেরা আইএসএফের সঙ্গে জোট করল? কেবল ক্ষমতা দখলের জন্য এই জোট, বামেরা তাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত। সুতরাং এতদিন এই দলকে ভালবাসলেও আর এদের ভোট দেব না – এই চিন্তাভাবনা ২০২১ সালে অনেকেরই ছিল। যে দলকে সমর্থন করি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে বলা নিশ্চয়ই আমার অধিকার। পাশাপাশি তার সিদ্ধান্তের পক্ষে, বিপক্ষে যে যুক্তিগুলো আছে সেগুলো বিচার করাও কর্তব্য। অতীতকে স্মরণ করার পাশাপাশি বর্তমানকে বোঝাও দরকার। তবেই সঠিক বিশ্লেষণ হয়।

আজকের অভিজ্ঞতার নিরিখেই তো কাজের দাবি তোলা। কেন বইখাতা কেড়ে নিয়ে বেকার যুবকের হাতে বোমা, পিস্তল, বাইকের চাবি তুলে দিল আজকের শাসক? কেন পশ্চিমবঙ্গে শিল্প নেই, নিরাপত্তা নেই? কেন এত সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ? কেন শ্রমিক, কৃষক বিপন্ন – এগুলোই বুনিয়াদি প্রশ্ন। এগুলো নিয়েই বামপন্থীদের লড়াই। ফলে আইএসএফ স্বাভাবিক সঙ্গী। নওশাদ বলছেন মুসলমান, দলিত, আদিবাসীদের নিয়ে মহাজোটের কথা। বলছেন কৃষক আন্দোলনকে সমর্থনের কথা, বেকারদের কর্মসংস্থানের কথা। এগুলো তো বামেদের কর্মসূচিও বটে। শুধুমাত্র শ্রেণি রাজনীতির কথা বলে সমাজের যে অংশের মানুষের কাছে পৌঁছনো যায়নি, আইএসএফের মাধ্যমে তাদের কাছেই পৌঁছতে চাওয়া হচ্ছে। শ্রেণিসংগ্রামের স্বার্থেই, শ্রেণি, বর্ণ, সম্প্রদায়ভিত্তিক লড়াইকে এক জায়গায় নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা অনেকদিন ধরেই অনুভব করা যাচ্ছিল। যতদিন আইএসএফ এই লড়াইয়ে থাকবে, ততদিন বামপন্থীদের তাদের হাতে হাত মিলিয়েই লড়াই করতে হবে। এখানে সাম্প্রদায়িকতা কোথায়? কিন্তু সেদিনের আব্বাস, আজকের নওশাদ আলোকপ্রাপ্ত বাবুদের সিলেবাসের বাইরে। তাই তাঁদের সহজ কথাটা বুঝতে অসুবিধা হয়।

সেদিনও বলেছিলাম চরম অন্যায় করেছেন ভাইজান (সবার দিদি থাকলে সবার ভাইজানও থাকতে পারে)। কেন তিনি সোজাসাপটা অধিকারের কথা বলেছিলেন? তিনি চরম অন্যায় করেছেন রাজানুগ্রহ উপেক্ষা করে। চরম অন্যায় করেছেন রাজনীতির মূল স্রোতে প্রবেশ করে, কেন না ওটা শুধুমাত্র আলোকপ্রাপ্ত অজ্ঞদের অধিকারের এলাকা। রুটিরুজির প্রশ্ন না তুলে তৃণমূলের মঞ্চে উঠে যদি আব্বাস ধর্মীয় বুলি আওড়াতেন অথবা অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন (এআইএমআইএম) প্রতিনিধির প্রস্তাব অনুযায়ী তাদের সঙ্গে জোট করতেন, তাহলে ভুলেও এবিপি আনন্দের সাক্ষাৎকারে সুট বুট পরা সাংবাদিক অতীতের ভিডিও দেখিয়ে আব্বাসকে ফ্যাসাদে ফেলার চেষ্টা করতেন না। ভাবুন, আব্বাস আর এআইএমআইএম যদি একত্রিত হত, তাহলে প্রবলতর সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ হত এবং আখেরে বিজেপির লাভ হত। কিন্তু আইএসএফ তা হতে দেয়নি।

আজকে নওশাদ বা আইএসএফকে শাসক এবং ভদ্রলোকদের পছন্দের বয়ানে ধরা যাচ্ছে না। সম্প্রদায়গত প্রেক্ষাপট থেকে আব্বাস কিংবা নওশাদের উঠে আসা হলেও লক্ষণীয় যে তাঁরা যদি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে চাইতেন, তাহলে সহজেই তা করতে পারতেন। এআইএমআইএম সেটাই করে এবং নিজেদের প্রভাবের এলাকা হায়দরাবাদ শহর এবং তেলেঙ্গানা রাজ্যের বাইরে মহারাষ্ট্র, বিহারের মত একাধিক রাজ্যে গিয়ে প্রার্থী দেয়। তাতে বিজেপির কিছুটা সুবিধা হয়। কিন্তু আইএসএফ তেমন কিছু করেনি। উল্টে তাদের দলের নামেই শুধু ‘সেকুলার’ শব্দটা রাখেনি, চোদ্দটা আদিবাসী, নিম্নবর্গীয় মানুষের ছোট ছোট দলকে নিয়ে সাধারণ মঞ্চ তৈরি করেছে। এতে জড়িয়ে আছে এক অহংবোধ, তাঁরা ভিক্ষা চাইছেন না। ২০২১ সালে কংগ্রেস, বামফ্রন্টের সঙ্গে জোট করার সময়েও তাঁদের এই অবস্থান বজায় ছিল। ভবিষ্যতে এই লড়াই আলাদা হয়ে গেলে পথও আলাদা হতে পারে – একথাও তখনই পরিষ্কার করে আব্বাস বলেছিলেন।

রইল বাম রাজনীতির ধর্মের হাত ধরার প্রসঙ্গ। এ নিয়ে বরাবর বিতর্ক হয়, যদিও এমন উদাহরণ দুর্লভ নয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়েও গির্জার যাজকরা ধর্মের নামেই মানুষের সমর্থন চেয়েছিলেন। এমনকি বলশেভিক বিদ্রোহের সময়েও। কখনও ধর্ম যদি অধর্মের বিরুদ্ধে মানুষকে জোটবদ্ধ করে তাতে ক্ষতি নেই। তাই নওশাদের সঙ্গে যদি দশ পা হাঁটা যায়, তাহলে হাঁটতে হবে। এগারো নম্বর পায়ে সমস্যা হলে পথ আলাদা হবে। একুশের সংযুক্ত মোর্চা আইএসএফের সেদিনের অবস্থানের উপর দাঁড়িয়ে নির্ধারিত হয়েছিল। অন্তত ধর্মগুরু আব্বাসকে সামাজিক লড়াইয়ে টেনে আনা গেছিল, একটা সাম্প্রদায়িক জোটের বদলে ধর্মনিরপেক্ষ জোট তৈরি করা গেছিল – এটা কম বড় সাফল্য নয়। অথচ সেদিন একে সাম্প্রদায়িক কিংবা সংশোধনবাদী জোট বলে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন অনেকে। আইএসএফ গত দুবছরে সাম্প্রদায়িক হওয়ার আশঙ্কাকে বারবার ভুল প্রমাণিত করেছে।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা হল, আইএসএফের সঙ্গে বাম দলগুলোর সখ্য বাংলার জনসংখ্যার প্রায় ৭৫% মানুষের থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রায়শ্চিত্তও বটে। গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার স্বপ্ন থেকে দূরে সরে যাওয়া। মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি যদি শহুরে মধ্যবিত্তের (পড়ুন হিন্দু মধ্যবিত্তের) চাওয়া পাওয়ার ভিত্তিতে চলা থেকে বেরিয়ে গরীবগুরবো কাছে ফিরতে পারে সেটাই তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রাপ্তি। সেখানে ধর্মীয় চেতনা বা সামাজিক বিন্যাসকে শুধু শ্রেণির নামে দূরে সরিয়ে রাখা এই উপমহাদেশে সঠিক পথ নয়।

এখানে আরও একবার সেই প্রসঙ্গটা না চাইলেও চলে আসবেই। গ্রামগঞ্জ এমনকি মফস্বলের মেঠো রাজনীতির ভাষাও আমরা, শহুরে এবং তথাকথিত শিক্ষিত রাজনৈতিক বোদ্ধারা আদৌ বুঝি কি? নারীবিদ্বেষী বক্তব্যও এই চরম পিতৃতান্ত্রিক ভারতীয় তথা বঙ্গ রাজনীতিতে আব্বাসই প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন এমন তো নয়। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলে (এমনকি বাম দলগুলোতেও) এমন প্রচুর মানুষ আছেন যাঁরা পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্যবাদী মনোভাব ছেড়ে বেরোতে পারেননি এবং বহুবার তেমন মন্তব্যও করেছেন প্রকাশ্যে। তা সত্ত্বেও সেদিন আব্বাসের নারীবিদ্বেষ আমাদের চোখের অমার্জনীয় অপরাধ হয়ে উঠেছিল কেন? তিনি তো তবু ক্ষমা চেয়েছিলেন, তাঁর আগে কতজন ক্ষমা চেয়েছেন ওই জাতীয় মন্তব্যের জন্য?

আমরা যারা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলি, তাদের বোঝা দরকার ধর্মনিরপেক্ষতা অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলে তা অর্থহীন। ধর্মনিরপেক্ষতাকে শুধু আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, অভিজাত, মধ্যবিত্ত, শহুরে, উদারপন্থী ও বামপন্থীদের মধ্যে বেঁধে রাখলে কোনো লাভ নেই। সমাজের একেবারে নিচ পর্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষতা না পৌঁছলে চলবে না। ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান রক্ষার শপথ নেওয়া ডজন ডজন নেতা, মন্ত্রী দেশজুড়ে খোলাখুলি সাম্প্রদায়িক স্লোগান দিয়ে বেড়াচ্ছেন, আমাদের মুখ্যমন্ত্রী সংখ্যালঘুদের দুধেল গাই আখ্যা দিচ্ছেন, এসব তো আকছার ঘটছে। ভোটারদের এই দুয়ের মধ্য থেকেই বিকল্প বেছে নিতে যাঁরা রাতদিন উপদেশ, উৎসাহ দিয়ে চলেছেন, তাঁরা আবার আইএসএফকে সাম্প্রদায়িক বলে দুষছেন, তাদের সমর্থন করায় সিপিএমের ঐতিহাসিক ভুল খুঁজছেন।

কোনো ব্যক্তি ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া বা না হওয়ার থেকে রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া বেশি জরুরি। এই সহজ সত্যিটাকে বারবার গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে বিজেপি। আপনাকে মিডিয়া এবং বিজেপি ভয় দেখাচ্ছে, আর যত ভয় তত ভাগাভাগি। কিন্তু নওশাদ যা বলছেন তা মৌলিক গণতন্ত্রের কথা, নাগরিকের অংশীদারিত্বের কথা। গত দুবছরে আইএসএফ অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য তুলে ধরার পাশাপাশি ধর্মের ইস্যুকে পিছনের সারিতে ঠেলে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে এবং মমতা ব্যানার্জির সংখ্যালঘু রাজনীতির নিরাপদ চারণভূমিতে ঢুকে পড়েছে। সেই কাজে সে আরও কতটা সফল হতে পারবে, তার উপর অনেকটাই নির্ভর করছে আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফলাফল। সেই কারনেই মরিয়া হয়ে তৃণমূলের আইএসএফ দলটাকে বিজেপি এজেন্ট বলে প্রমাণ করার চেষ্টা – নওশাদের গোপন হোয়াটস্যাপ চ্যাট ফাঁস করার নাটক, আব্বাসের একটামাত্র বাক্যের ভিডিও ক্লিপ সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া

একথা ঠিক যে আইএসএফ নিয়ে শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। যদি কখনো দেখা যায় আইএসএফ দলের মঞ্চ ব্যবহার করে মৌলবাদ চলছে, অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করা হচ্ছে, তখন অন্যরকম ভাবা যেতে পারে। আপাতত বামেদের নিজেদের দিকে তাকিয়েও ভাবতে হবে, আইএসএফ সাম্প্রদায়িক কিনা তা নিয়ে যখন মাথাব্যথা ছিল, তখন বাম রাজনীতির ভিতরের প্রতীকুর, সামিরুল, ইব্রাহিম, জামির, ভিক্টরদের মত অসংখ্য শিক্ষিত মুসলমান ছেলেমেয়েদের মাধ্যমে প্রান্তিক সংখ্যালঘুদের সঙ্গে সেতুবন্ধন করা যায়নি কেন?

শেষ করি দিনাজপুরের তেভাগা আন্দোলনের একটা বিখ্যাত স্লোগান দিয়ে

টিকি দাড়ি ভাই ভাই
লড়াইয়ের ময়দানে ভেদ নাই।

ঋণ: লেখাটি লিখতে সোশাল মিডিয়ার বিভিন্ন লেখা, মতামতের সাহায্য নিয়েছি। অনেকের লেখা, ভাবনা ধার করেছি। তাদের সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

  1. বা বা বা, অতীব উত্তম!! কমিউনিস্ট ” activists ” রা বহুকাল আগেই any kind of Liberal and enlightenment ideas বিসর্জন দিয়েছে বলেই জানি , অতএব কোনো আশ্চর্য নেই এই ধরনের শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা । আমি শুধু অবাক হই ….যত সমস্যা কমিউনিস্টদের caste-based ” identity” politics নিয়ে …। কমিউনিস্টরা তিন দশকের অধিক ক্ষমতায় ছিলো….কেন তারা fail করলো একটি শিক্ষিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ তৈরি করতে …. 30+ বছর কি কম একটি সুস্থ উন্নতিশীল সমাজ গঠনে??…যেখানে আগের এক শতকজুড়ে renaissance চলছিল??? …….Upper caste communists never bothered about dalits and muslims….

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.